1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

কে নেবে কোটি মানুষের মনের যত্ন?

১৫ অক্টোবর ২০২১

সর্বশেষ জাতীয় সমীক্ষা বলছে, কয়েক কোটি মানুষ নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় থাকলেও সেবা পান মাত্র ৭ দশমিক ৭শতাংশ মানুষ৷

https://p.dw.com/p/41jjW
Bangladesch | Dhaka nach dem Coronavirus Lockdown
ছবি: Mortuza Rashed/DW

সেপ্টেম্বরে আত্মহত্যা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী মাসুদ আল মাহাদী অপু৷ কাছাকাছি সময়ে জগন্নাথ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকতা বিভাগের দুই শিক্ষার্থী অমিতোষ হালদার ও ইমরুল কায়েসও আত্মহত্যা করে৷

তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা এই অগ্রসর তরুণরা কেন অকালে জীবনকে বিদায় জানালেন-এমন আলোচনায় সরব হয়েছে সামাজিক মাধ্যম৷

এর মাঝেই পুরনো একটি খবর আবার সামনে আসে৷ দেশে করোনাভাইরাস মহামারী শুরুর প্রথম ১২ মাসের এ রকম ১৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে জীবনকে বিদায় জানিয়েছে বাংলাদেশে৷ হ্যাঁ, সংখ্যাটা ১৪ হাজারই৷ যা একইসময়ে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যবরণকারী মানুষের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি৷

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার সুযোগ খুবই কম৷

সর্বশেষ জাতীয় সমীক্ষা বলছে, কয়েক কোটি মানুষ নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় থাকলেও সেবা পান মাত্র ৭ দশমিক ৭শতাংশ মানুষ৷

সবাইকে কাঁদিয়ে অপুর বিদায়

গত এক দশকে ঢাকা বিশ্ববিবিদ্যালয়ের এক পরিচিত মুখ ছিলেন মাসুদ আল মাহাদী অপু৷ কোটা সংস্কার, ডাকসু নির্বাচনের দাবি, সাত কলেজের অধিভূক্তির প্রতিবাদসহ শিক্ষার্থীদের নানা আন্দোলনে তুমুল সক্রিয় ছিলেন মাসুদ৷ সেই সাথে পড়াশোনায়ও বরাবর ভালো ছিলেন৷

মঞ্চের বক্তব্য কিংবা শিক্ষকদের সাথে দাবি আদায়ের বিতর্ক-সব সময়ই যুক্তিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করতেন অপু৷ সবাই তাকে চিনতো জীবনীশক্তিতে ভরপুর এক তরুণ হিসাবে৷ সেই অপু আত্মহত্যা করেছে চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর৷

তার মৃত্যুর পর প্রথম ধাক্কায় কেউই এটাকে আত্মহত্যা হিসাবে মানতে পারেননি৷ কিন্তু চিকিৎসক নিশ্চিত করার পর অনেকেই কারণগুলো খুঁজতে শুরু করেন৷ অপুকে তার নিজ বিভাগ ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষক ধারাবাহিকভাবে কম নম্বর দিতো বলে অভিযোগ করেছেন একই বিভাগের অন্য এক শিক্ষক৷ এটা নিয়ে ছাত্রজীবনে হতাশা ছিল অপুর৷

তার এক বন্ধু বলেছিল, অনেকগুলো চাকরির পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে উত্তীর্ণ হলেও সেগুলো দীর্ঘসূত্রিতার কবলে পড়ে৷ পরিবারের অবস্থা, দেশের অবস্থা নিয়েও চিন্তিত থাকতো অপু৷ এ সব হতাশা আত্মহত্যায় ভূমিকা রাখতে পারে বলে কেউ কেউ অভিমত দেয়৷

তবে অপুর অন্য এক বন্ধু এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের রুমমেট মোরশেদ ভূঁইয়া এ সব যুক্তি মানতে নারাজ৷

‘ডিপ্রেশনে ভোগা শিক্ষার্থীদের প্রোডাক্টিভিটি কমে যাবে’

বন্ধুর স্মৃতিচারণায় তিনি লিখেছেন, একটা মানুষ এমন হয় কি করে৷ এত পরিশ্রমী, এত অধ্যবসায়ী, এত মেধাবী, এত প্রতিবাদী, এত বিপ্লবী, এত মিশুক, এত বন্ধুপ্রতীম আর এত জ্ঞানী৷

‘‘এত কঠিন এবং জটিল বই ওকে পড়তে দেখেছি, যেই বইগুলোর দুই-তিন পাতা পড়ার পর আমার মনে হয়েছে এইসব আমার মাথায় ঢুকবে না’’

অপু সিনেমা বানানোর স্বপ্ন দেখতো৷ একবার বিভাগের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার ১০ মিনিটের একটি ‘মনোলগ' পিনপতন নিরবতায় শুনেছে মিলনায়তনভরা দর্শকরা৷

এ সব স্মৃতির কথা উল্লেখ করে মোরশেদ বলেন, অপু আসলে মানসিক কিছু যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে হয়ত নিজের জীবনাবসানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ আমাদের ব্যর্থতা, আমরা অপুর মেধা আর প্রজ্ঞাকে সমাজের কাজে লাগাতে পারিনি৷ সুযোগ করে দেইনি ওর স্বপ্নের পিছনে ছুটতে৷ স্বপ্ন থেকে সরে গিয়ে যখন ও দিন দিন ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়ছিল, তখন তাকে উদ্ধারে কেউ এগিয়ে আসিনি৷ সিম্পলি ভুলে গিয়েছিলাম, অপু নামের একটা সম্ভাবনাময় তারা চানখারপুলে একটা ছোট্ট কক্ষে প্রতিদিন একটু একটু করে নিভে যাচ্ছে৷

‘‘লাইব্রেরিতে বসে একই বিষয় বার বার পড়তে পড়তে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে অপু৷ সেই কঠিন কঠিন বই পড়া অপু, গগন কাঁপানো স্লোগান দেওয়া অপু, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামনে থেকে প্রতিবাদ করা অপু- অনেক আগেই মরে গিয়েছিল৷ সেদিন মরেছে চানখারপুল আর লাইব্রেরিতে ধুঁকতে থাকা অপু৷’’

‘আত্মহত্যা করেছে ১৪ হাজার মানুষ’

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সময়ে আত্মহত্যার হার নিয়ে ২০২১ সালের মার্চে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন৷

দেশে সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর তথা ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য, পুলিশ ও হাসপাতাল থেকে সংগৃহীত ডেটা বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি দেখিয়েছে, এই সময়ে বাংলাদেশে ১৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে৷ যা এর আগের বছরের চেয়ে ৪ হাজার জন বেশি৷

আত্মহত্যার এই সংখ্যাটি ওই নির্দিষ্ট সময়ে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী মানুষের সংখ্যার চেয়েও বেশি ছিল৷

সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছেন ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা, যা মোট সংখ্যার ৪৯ শতাংশ৷ এরপরেই সব থেকে বেশি আত্মহত্যা করেছেন ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মানুষেরা, ৩৫ শতাংশ৷ ৩৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী আত্মহত্যাকারী ১১ শতাংশ এবং ৪৬ থেকে ৮০ বছর বয়সী ৫ শতাংশ৷

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিয়ে আত্মহত্যার এই হার কমানো সম্ভব বলে মনে করে সংস্থাটি৷ এ জন্য তারা নিজেরাও প্রচার প্রচারণা, প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং-ইত্যাদি নিয়ে কাজ করছে৷

কত কোটি মানুষ মানসিক সমস্যায়?

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর কত মানুষ মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছে-এটার কোন হিসাব কারো কাছে নেই৷ মানসিক রোগের বিস্তার সম্পর্কে জানতে দুটি জাতীয় সমীক্ষার তথ্য পাওয়া যায়, উভয়টি করোনাভাইরাস পূর্ব সময়ের৷

এর একটি হয়েছিল ২০০৩-০৫ সালে৷ এই সমীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, এখানে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের মধ্যে ১৬ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত৷ ২০১৮-১৯ সালে পরের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা হয়৷ এতে দেখা মানসিক রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে৷

ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য মতে, বাংলাদেশের এখনকার জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৬৮লাখ৷ এই জনসংখ্যার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ দাঁড়ায় ২ কোটি ৮০ লাখ৷ অর্থ্যাৎ করোনাভাইরাসের কারণে যদি বাংলাদেশে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের হার নাও বেড়ে থাকে, তাহলেও আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ৮০লাখ৷

বিপরীতে দেশে মনোচিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীর সংখ্যা ৯০০জনের মত, এমনটাই বললেন এই খাতে কাজ করা সংস্থা ‘মনের বন্ধু'র সিইও তৌহিদা শিরোপা৷

২০১৮-১৯ সালের সমীক্ষাকে উদ্ধৃত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্তদের মাত্র ৭ দশমিক ৭শতাংশ চিকিৎসা পায়৷ বাকী ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ থেকে যায় বাইরে৷

সাহায্য চাইছে ৩০০গুণ মানুষ

বেসরকারি সংস্থা ‘মনের বন্ধু' যাত্রা শুরু করে ২০১৬৷ যাত্রা শুরুর পর থেকেই মানসিক স্বাস্থ্যের উপর পরামর্শ সেরা দিয়ে আসছে সংস্থাটি৷ ২০২০ সালের মার্চে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর হঠাৎ করেই বেড়ে যায় সেবা প্রত্যাশীর সংখ্যা৷

মনের বন্ধুর ফাউন্ডার ও সিইও তৌহিদা শিরোপা ডয়চে ভেলেকে বলেন, করোনাভাইরাস শুরুর পর জুন পর্যন্ত আমরা প্রায় ৩২ হাজার মানুষ ফ্রি কাউন্সিলিং দিয়েছি৷ এর মধ্যে ৬০ শতাংশই তরুণ৷ এত মানুষ

যে সাহায্য চেয়েছে, এতেই বোঝা যায়, অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে মহামারীতে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার হারও বেড়েছে৷

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার সংস্থার কাছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যাশীর সংখ্যা করোনাভাইরাস আসার পর বেড়েছে ৩০০গুণ৷

অবশ্য তিনি মনে করেন, আক্রান্তদের সংখ্যা একই হারে বাড়েনি৷ অনলাইন সেবার প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেও সেবাগ্রহণকারীর এই সংখ্যা বেড়েছে৷

আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এত দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল না, ওয়ার্ক ফ্রম হোমের এত ব্যবস্থা অতীতে ছিল না৷ এ সময়ে কেবল অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাই নয়, আরো অনেক নিরাপত্তাহীনতা জীবনে এসেছে৷

‘‘শুরুর দিকে অনেকে বলতো, আমার যদি করোনা হয়ে যায়, তাহলে কী করবো-এই ভয়টা তখন ছিল৷ কেবল নিজেকে নিয়ে নয়৷ নিজের এবং চারপাশের মানুষদের নিয়েও ছিল ভয়৷ পরের দিকে ডিপ্রেশন ও অ্যাংজাইটি বেড়ে গেছে৷’’

বিষন্নতার বড় শিকার তরুণ-যুবারা

মহামারীর এই সময়ে তরুণ-তরুণীদের অবস্থা জানতে আঁচল ফাউন্ডেশন ‘করোনায় তরুণ তরুণীদের মানসিক বিপর্যয়' শীর্ষক একটি জরিপ করে, যার ফলাফল প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের জুলাই মাসে৷ এতে দেখা যায়, ৬১ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ-তরুণী মানসিক সমস্যায় ভুগছেন৷ জরিপে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ তরুণ-তরুণী এ সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন৷ শারিরীকভাবে নিজের ক্ষতি করেছেন ২৯ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ-তরুণী, যেটাকে আত্মহত্যার প্রাথমিক লক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি৷ ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ-তরুণী করোনাকালীন সময়ে আত্মহত্যার কথা ভেবেছেন৷

আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা তানসেন রোজ ডয়চে ভেলেকে বলেন, এর আগে আত্মহত্যা নিয়ে আমরা আরেকটি জরিপ করেছিলাম৷ সেখানে আমরা দেখেছি, ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২১ সালের ফেব্রুয়ারি সময়কালে ১৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে৷ যাদের ৪৯শতাংশই ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সের৷ এরপর আমরা তরুণ-তরুণীদের মানসিক অবস্থা বুঝতে এই জরিপটি করি৷

‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর করোনা মহামারীর প্রভাব: একটি প্রায়োগিক জরিপ'- শীর্ষক আরেকটি কাজ করে আঁচল ফাউন্ডেশন, যার ফলাফল চলতি অক্টোবরে প্রকাশিত হয়৷

জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৮৪.৬ শতাংশই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন৷ এর মাঝে পুরুষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৮০.৩৮ শতাংশ এবং নারী শিক্ষার্থীদের ৮৭.৪৪ শতাংশ এই মহামারীতে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন৷

প্রতিবেদনে বলা হয়, এতো বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যায় ভোগা পরিবার, সমাজ ও দেশকে নিঃসন্দেহে আতঙ্কিত করে তোলে৷

এক প্রশ্নের জবাবে তানসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের যে অংশটা ডিপ্রেশনে ভুগছে৷ এদের কিন্তু প্রোডাক্টিভিটি কমে যাবে৷

"কারণ ডিপ্রেশনে ভুগলে পড়াশোনা এবং অন্যান্য কাজে মনোযোগ দিতে পারে না তারা৷ এরা যখন ৮-১০ বছর পর সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় বড় জায়গায় যাবে৷”

"তখন তাদের প্রোডাক্টিভিটি কমার বিষয়টা স্পষ্ট হবে৷ তখন দেশেরও প্রোডাক্টিভিটি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে৷ এখনই তাদের বিষয়ে পদক্ষেপ না নেয়া হলে ভবিষ্যতে দুরবস্থা তৈরির একটা সমূহ সম্ভাবনা আছে৷”

পিছিয়ে চিকিৎসা-পরামর্শে-এসডিজি লক্ষ্যে ২০২০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর একটি ‘সিচুয়েশনাল এসেসমেন্ট' প্রকাশ

করে৷ এতে বলা হয়, বাংলাদেশে মনোচিকিৎসক রয়েছে ২৬০জন৷ সে হিসাবে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য দশমিক এক ছয় জন মনোচিকিৎসক রয়েছেন৷

আর দেশে মনোবিজ্ঞানী রয়েছে ৫৬৫ জন৷ সে হিসাবে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য দশমিক তিন চার জন মনোবিজ্ঞানী আছেন৷ এরা সবাই মোটামুটি শহর এলাকাতেই সেবা দিয়ে থাকেন৷ আর সাইকিয়াট্রিক নার্স আছে ৭০০জন৷

দেশে মানসিক হাসপাতাল রয়েছে ২টি, যেখানে মোট বেড ৭০০টি৷ এছাড়া ৫৬টি হাসপাতালে সাইকিয়াট্রিক ইউনিটে আরো ৫০৪টি বেড রয়েছে৷

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সাইকোসোশ্যাল ইন্টারভেনশনের' জন্য যোগ্য জনবলের অভাব সর্বত্র রয়েছে৷ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স পাওয়া গেছে কেবল দুই হাসপাতালে৷ যেখানে অন্য কোন হাসপাতালেই নেই বিশেষায়িত নার্স৷

‘মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যাশীর সংখ্যা করোনার পর ৩০০গুণ বেড়েছে’

লুনাসি অ্যাক্ট-১৯১২ রহিত করে ২০১৮ সালে পাস হয় মানসিক স্বাস্থ্য আইন৷ ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি' প্রণীত হয় ২০১৯ সালে, যা এখনো মন্ত্রিসভার সম্মতির অপেক্ষায়৷ অন্যদিকে ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০-৩০' এর খসড়া ২০২০ সালে চূড়ান্ত হয়৷ এই পরিকল্পনা সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে, এতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সর্বক্ষেত্রে অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে মানসিক স্বাস্থ্যকে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে৷ কিন্তু এটিও এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি৷

তবে এর মাঝেই চলে এসেছে করোনাভাইরাস৷ এই সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যের বহু কিছুই বদলে গেছে৷

এখানে মনে রাখতে হবে এসডিজি প্রণীত হয়েছে এই ২০৩০ সালকে সামনে রেখেই৷ যেখানে বাংলাদেশের সরকারি দপ্তরে দপ্তরে এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখতে মাসে মাসে অগ্রগতি প্রতিবেদন করা হয়, সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে করা জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনই পায়নি৷ পরিকল্পনায় ২০২০ সালকে শুরুর বছর হিসাবে বিবেচনা করলেও অনুমোদনের আগেই পার হয়ে যাচ্ছে ২০২১ সালও৷

এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনিস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে এসডিজির মতো আকাশচুম্বী করি নাই৷ আমরা আমাদের লক্ষ্যকে সেখান থেকে কিছুটা কমিয়ে নির্ধারণ করেছি৷

"যেমন আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি ১০শতাংশ হ্রাস করা৷ গ্লোবাল প্ল্যানে হয়ত এটা ২০শতাংশ আছে৷ আমরা আমাদের লিমিটের মধ্যে পরিকল্পনার করার চেষ্টা করেছি৷”

তিনি বলেন, এ সব নীতি ও পরিকল্পনা নেয়ার সময় করোনাভাইরাস ছিল না৷ মহামারী আসার পর কিছু কিছু পরিকল্পনা পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে৷ কারণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা যে হারে বাড়ার কথা ছিল, এখন তার চেয়ে দ্রুত হারে বাড়ে৷

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের যেহেতু মনোচিকিৎসক এবং মনোবিজ্ঞানীদের সংখ্যার সংকট রয়েছে৷ তাই আমরা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের সকল ডাক্তার-স্বাস্থ্যকর্মীদের নানা মেয়াদে প্রশিক্ষণের প্রস্তাবনা আছে৷ ৩দিন থেকে ৮৫দিন মেয়াদে এই প্রশিক্ষণ দেয়া হবে৷ কিছু কিছু প্রশিক্ষণ এখনই চালু আছে৷ বাকীগুলো চালু করা হবে৷

"কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার থেকে চিকিৎসক পর্যন্ত সবাই এই প্রশিক্ষণ পাবেন৷”

করোনাভাইরাসের সময়কার মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে কী করা উচিত-এমন প্রশ্নে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সরকারের লিড এজেন্সি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনিস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার ডয়চে ভেলেকে বলেন,কিছু মানুষকে ধরে চিকিৎসা করলেই সমস্যা সমাধান হবে না৷ এর জন্য সবকিছুকে স্বাভাবিক করে নিয়ে আসতে হবে৷ আর এরই মধ্যে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদেরকে সাহায্য করা৷

দীর্ঘমেয়াদের করণীয় প্রশ্নে তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য এমন একটা প্রসঙ্গ এবং এটা কীভাবে কীভাবে এফেক্টেড হতে পারে-সে সম্পর্কিত আইডিয়া থেকে সবকিছুতে এই বিবেচনা নিয়ে আসা দরকার৷

‘‘যেমন, নগর পরিকল্পনা-ভবন পরিকল্পনা থেকে অফিস-স্কুল কীভাবে চলবে-সবকিছুতেই মানসিক স্বাস্থ্য প্রসঙ্গ নিয়ে আসতে হবে৷ এটা হচ্ছে, মানসিক স্বাস্থ্য প্রমোশন৷ এটা মানসিক স্বাস্থ্যের এক ধরনের পরিচর্যা৷ এটা ঠিক চিকিৎসা না৷ এটাকে পজেটিভভাবে দেখা৷ এতে বড় একটা সংখ্যক মানুষ মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হবে না৷”

‘‘আর পরবর্তী সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা৷ যারা এ সব পদক্ষেপের মধ্যেও আক্রান্ত হবেন, তারা যেন চিহ্নিত হন এবং সেবা পান৷ এটা একটা সার্বিক পরিকল্পনা৷ দুইটা মুখই থাকবে এখানে৷ এভাবে আমরা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়কে হ্যান্ডেল করতে পারি৷”