কোলনের ঘটনায় জার্মানিতে শরণার্থী আসা কমেছে

উত্তর আফ্রিকার তিন দেশ – আলজেরিয়া, মরক্কো ও টিউনিশিয়া থেকে জার্মানিতে শরণার্থী আসার সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কমেছে৷ জার্মানির কোলন শহরে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের সময় ঘটে যাওয়া যৌন নিপীড়নের ঘটনা এর অন্যতম কারণ৷

ঐ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশ উত্তর আফ্রিকার বংশোদ্ভূত৷ তাই জার্মানি ঐ তিন দেশকে ‘নিরাপদ দেশ' হিসেবে উল্লেখ করে একটি আইন প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে৷ উল্লেখ্য, কোনো দেশ নিরাপদ বলে বিবেচিত হলে সেই সব দেশ থেকে আসা নাগরিকদের জার্মানিতে আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না৷

জার্মানির অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা, বিএএমএফ সম্প্রতি সংসদকে জানায়, গত জানুয়ারিতে ঐ তিন দেশ থেকে ৩,৩০০ জন জার্মানিতে আশ্রয়ের আবেদন জানিয়েছে৷ মার্চ মাসে সেই সংখ্যাটি ৪৮০-তে দাঁড়িয়েছে৷

চিকিৎসক থেকে শরণার্থী

সিরিয়ায় রাজধানী দামেস্কে চিকিৎসক হিসেবে ভালোই ছিলেন হামবার আল-ইসা৷ কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর জন্মভূমির সব সুখ ছেড়ে ইউরোপের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে হয় তাঁকে৷

অনেক পথ পেরিয়ে...

মেসিডোনিয়ায় পৌঁছানোর পর সার্বিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত যেতে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়েছে হামবারকে৷ হেঁটে কোনো শহরে পৌঁছালেই শুরু হতো ইন্টারনেট ক্যাফে খুঁজে বের করার চেষ্টা৷ পেলে প্রথম কাজ কোথায় আছেন, কেমন আছেন সে সম্পর্কে পরিবারকে বিস্তারিত জানানো৷ একা এসেছেন, তাই স্বজনদের তাঁর জন্য খুব চিন্তা৷ তাঁদের চিন্তা দূর করা ও তাঁদের সম্পর্কে জেনে নিজেকে নিশ্চিন্ত রাখতেই পছন্দ করেন হামবার৷

অবশেষে জার্মানিতে...

অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে জার্মানিতে পৌঁছেছেন হামবার৷ সিরিয়াতে সার্জন হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নতুন দেশে চাইলেই তো আর চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করা যায় না৷ জার্মান ভাষা শিখে নিজেকে তৈরি করতে হবে সবার আগে৷ সেই চেষ্টা চলছে৷ পাশাপাশি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অনুবাদকের কাজও করছেন৷ তাঁর স্বপ্ন অবশ্য জার্মানিতে বসবাস করা নয়৷ সুসময় ফিরে এলে নিজের দেশেই ফিরতে চান হামবার৷

দেশান্তরী এক আফগান কিশোরী

তোবার বয়স এখন ১৬ বছর৷ আফগানিস্তানের হেরাত থেকে জার্মানিতে এসেছে সে৷ হেরাতে নিয়মিত স্কুলে যেত সে৷ লেখাপড়া করেই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নও দেখতো৷ কিন্তু তালেবান বেছে বেছে মেয়েদের স্কুলে হামলা শুরু করায় তোবার পক্ষেও আর দেশে থাকা সম্ভব হয়নি৷

সপরিবারে জার্মানিতে

আফগানিস্তান থেকে জার্মানিতে অবশ্য একা আসেনি তোবা৷ দুই বোন এবং তাঁদের স্বামীও এসেছেন সঙ্গে৷ কাছের এই মানুষগুলো সঙ্গে থাকার কারণেই ইরান, তুরস্ক, গ্রিস এবং বলকান অঞ্চল হয়ে জার্মানিতে পৌঁছাতে পেরেছে তোবা৷

দুঃস্বপ্নে পোড়া স্কুল, স্বপ্নে সুন্দর আগামী

তালেবান হামলা থেকে বাঁচতে আফগানিস্তান ছেড়ে এলেও স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন কিন্তু ছাড়েনি তোবা৷ নিজেকে নতুন করে তৈরি করছে সে৷ জার্মান ভাষা শিখছে৷ স্বাবলম্বী হতে হলে জার্মানিতে ভাষা শেখাটা তো সবার জন্যই জরুরি৷

এক সাংবাদিকের পরিবার

ওপরের ছবির তিনজন জার্মানিতে এসেছেন সিরিয়ার ইদলিব থেকে৷ আহমেদ (মাঝখানে)-এর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী হেবা এবং বন্ধু সালেহ৷ সিরিয়ায় সাংবাদিক হিসেবে বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন আহমেদ৷

শৈশবেই প্রবাসী

আহমেদ-হেবা দম্পতির এই মেয়েটিও এসেছে জার্মানিতে৷ মাত্র এক বছর বয়সেই শুরু হয়েছে তার প্রবাসজীবন৷ ওর বাবা অবশ্য যুদ্ধ থামলেই ফিরে যেতে চায় সিরিয়ায়৷

২০১৫ সালে উত্তর আফ্রিকার ঐ তিন দেশ থেকে প্রায় ২৬ হাজার মানুষ জার্মানিতে আশ্রয়ের আবেদন করেছিল বলে জানায় বিএএমএফ৷ এর মধ্যে মাত্র ২.১ শতাংশের আবেদন গৃহীত হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি৷

জার্মান সংসদকে দেয়া এক প্রতিবেদনে বিএএমএফ জানায়, ‘‘জানুয়ারি মাসে নতুন আইন প্রণয়নের আলোচনা শুরু হওয়া মাত্রই (ঐ তিন দেশ থেকে) শরণার্থী আসার সংখ্যা ব্যাপকহারে কমতে শুরু করে৷''

জার্মানির মিডিয়া কোম্পানি ‘ফুঙ্কে'র সংবাদপত্রে বিএএমএফ-এর এসব তথ্য নিয়ে সোমবার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়৷

ভিডিও দেখুন 03:32
এখন লাইভ
03:32 মিনিট
Focus on Europe | 03.02.2016

উত্তর আফ্রিকানরা চাপের মুখে

জনবলের অভাব

জার্মানির আরেক সংবাদপত্র ‘ডি ভেল্ট' জানিয়েছে, জার্মানিতে আসা শরণার্থীদের আবেদন যাচাইয়ের জন্য পর্যাপ্ত জনবল নেই বিএএমএফ-এর৷ আবেদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে দেশজুড়ে ৭ হাজার ৩০০ জন কর্মী নিয়োগ করতে চায় সংস্থাটি৷ কিন্তু এখন পর্যন্ত নিয়োগ দেয়া গেছে মাত্র ৫ হাজার জন৷ ফলে ডাক বিভাগ, সামরিক বাহিনী ও জাতীয় কর্মসংস্থান সংস্থা থেকে জনবল নিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে৷

২০১৫ সালে জার্মানিতে ১০ লক্ষেরও বেশি শরণার্থী এসেছে৷

আলেপ্পোয় সুখি সংসার

২০১৬ সালে তোলা কোটা পরিবারের ছবি৷ খলিল, তাঁর স্ত্রী হামিদা, সন্তান মান্নান, ডোলোভান, আয়াজ এবং নের্ভানা৷ তখন সিরিয়ায় কোনো গৃহযুদ্ধ ছিল না, ছিল না ধ্বংসলীলা৷

দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত

সিরিয়ায় ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর সময় খলিল কোটো সেদেশের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি শাখার প্রধান ছিলেন৷ গৃহযুদ্ধ শুরুর পর চাকুরি হারান এই ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার৷ একসময় খাদ্য এবং পানির অভাব প্রকট হতে থাকে৷ ২০১৪ সালের এপ্রিলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, তারা তুরস্ক চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে খলিলের মা বাস করতেন৷

ধাপে ধাপে আগানো

খলিল তুরস্কে কোনো কাজ খুঁজে পাননি৷ তাই ২০১৪ সালের জুলাইয়ে তাঁর পরিবার জার্মানিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন৷ খলিলের ভাই ইউরোপে বাস করেন৷ তিনিই পরিবারটিকে জার্মানিতে আসতে উৎসাহ যোগান৷ শরণার্থী হিসেবে জার্মানিতে আসার পথে বুলগেরিয়ায় একটি শরণার্থী শিবিরে ছয় মাস কাটান কোটো পরিবার৷ এই চামচটি সেই শিবিরের এক স্মৃতিচিহ্ন৷

জার্মানিতে স্বাগতম

অবশেষে জার্মানিতে কোটো পরিবার৷ জার্মানির উত্তরের শহর ব্রেমেনে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে৷ সেখানকার এক নারী খলিলকে এই জিন্সের প্যান্টটি দিয়েছেন, জার্মানিতে পাওয়া তাঁর প্রথম পোশাক এটি৷

অনিশ্চিত ভবিষ্যত

খলিলের সন্তানরা এখন জার্মান স্কুলে যাচ্ছেন৷ আর খলিল এবং তাঁর স্ত্রী হামিদা শিখছেন জার্মান৷ ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার জার্মানিতে একটি চাকরি পাবেন বলে আশা করছেন৷ সিরিয়ায় ফেলে আসা অতীত মাঝে মাঝে মনে করে আনন্দ খোঁজেন তারা৷ আয়াজের সিরিয়ার স্কুলের আইডি কার্ড এটি৷

জেডএইচ/ডিজি (কেএনএ, এএফপি, রয়টার্স)

ঐ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশ উত্তর আফ্রিকার বংশোদ্ভূত৷ তাই জার্মানি ঐ তিন দেশকে ‘নিরাপদ দেশ' হিসেবে উল্লেখ করে একটি আইন প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে৷ উল্লেখ্য, কোনো দেশ নিরাপদ বলে বিবেচিত হলে সেই সব দেশ থেকে আসা নাগরিকদের জার্মানিতে আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না৷