ক্লিকের কাঙ্গালরা কি একটু নৈতিকতার চর্চা করবেন?

গত কয়েকবছর ধরে অনলাইন পত্রিকায় ক্লিকের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক৷ একটি লিংকে ক্লিক পেতে প্রায় সবাই নানাভাবে চেষ্টা করেন, কখনো কখনো সেই চেষ্টা হয়ে ওঠে প্রতারণার সামিল৷
আরাফাতুল ইসলাম
আরাফাতুল ইসলাম

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

‘‘বলিউড এর নতুন হটগার্ল!! দেখুন তার ইউটিউব তোলপাড় করা একটি হট ভিডিও ক্লিপ!'' – এই শিরোনামযুক্ত একটি নিউজের লিংক, সঙ্গে এক নারীর তিনটি ছবি, যার একটিতে তার স্তন প্রায় অনাবৃত৷ বাংলাদেশের এক আলোচিত মডেলের পরীক্ষিত ফেসবুক পাতা থেকে পোস্ট করা এই লিংকে আগ্রহ নিয়ে, ভুল করে কিংবা কৌতূহল বসে অনেকে ক্লিক করতে পারেন৷ কিন্তু ক্লিকের পর তারা কী দেখবেন জানেন?

সুনির্দিষ্ট লিংকটিতে ক্লিক করে দেখা গেলো, অগুনতি অনলাইন বিজ্ঞাপনে ঠাসা একটি পাতায় শিরোনামটি আরো কয়েকবার লেখা রয়েছে, আর রয়েছে একটি ইউটিউব ভিডিও, যার সঙ্গে শিরোনামের কোনো সম্পর্কই নেই৷ ভিডিওটি হচ্ছে ভারতে কিভাবে মেয়েদের অভিনয়ের নামে প্রতারণার শিকার করা হচ্ছে সেই বিষয়ে সচেতনতামূলক একটি সস্তা তথ্যচিত্র৷ আর তাতে অনাবৃত স্তনের মেয়েটারও কোনো উপস্থিতি নেই৷

জানালা পরিষ্কার

নিজ বাড়ির জানালা পরিষ্কার করাটা হয়ত ঝুঁকিপূর্ণ নয়৷ কিন্তু সেটা যদি হয় উঁচু কোনো ভবনের, তাহলেই সমস্যা৷ জার্মানির মতো দেশে সুউচ্চ ভবনগুলোর বাইরের দিকটা পরিষ্কারের সময় তাই বেশ কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়৷ তবুও দুর্ঘটনা তো ঘটতেই পারে৷

যুদ্ধ

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ চলছে৷ আর যুদ্ধ মানেই প্রাণহানি৷ তাই যুদ্ধে অংশ নেয়াটা যে-কোনো সৈন্যের জন্যই যে মারাত্মক হুমকির, তা বলাই বাহুল্য৷

পাইলট

ছোটবেলায় হয়ত সবারই ইচ্ছা হয় বড় হয়ে পাইলট হবার৷ আকাশে একটা আস্ত বিমান চালিয়ে নিয়ে যাওয়া রোমাঞ্চকরই মনে হয়৷ কিন্তু সমস্যা হলো, আকাশে বিমান দুর্ঘটনা হলে বাঁচার সম্ভাবনা শূন্যই বলা যায়৷ আর পাইলটদের ক্ষেত্রে নিজের কোনো ভুলের কারণে দুর্ঘটনা হলে নিজ জীবনের পাশাপাশি চলে যেতে পারে শত শত যাত্রীর জীবনও৷

দমকলকর্মী

আগুন লাগা মানেই সেখানে ছুটে যেতে হয় দমকলকর্মীদের৷ কিন্তু আগুনের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ যেতে পারে নিজেরও৷

পুলিশ

জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে প্রায়ই সন্ত্রাসীদের পেছনে ছুটতে হয়৷ তাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়৷ ফলে মৃত্যুর সম্ভাবনাতো থেকেই যায়৷ এছাড়া দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে সন্ত্রাসী কিংবা মাস্তানদের ধাওয়া করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে – অবাক হওয়ার কিছু নেই৷

গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা

প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আর বলে কয়ে আসে না৷ তাই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সময় কখন যে সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই৷ অবশ্য আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আগে থেকেই অনেক কিছু জানা সম্ভব৷ তবে এরপরও ঝুঁকি তো থেকেই যায়৷

বাড়ির ছাদ ঠিক করা

বাংলাদেশে টিনের বাড়ি দেখতে যেমন হয় জার্মানির অনেক বাড়িও সেরকম৷ শুধু পার্থক্য হচ্ছে, টিনের পরিবর্তে জার্মানিতে ‘টাইলস’ বসানো হয়৷ আর সেই কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটে৷ তাই এই কাজ শুরুর আগে একটা জীবন বিমা করাটা অতি আবশ্যক৷

গাছ কাটা

জার্মানিতে গাছ কাটতে যে যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়, সেটা যদি কোনোভাবে শরীরের সংস্পর্শে চলে আসে তাহলেই শেষ! ঘটতে পারে বড় কোনো দুর্ঘটনা৷ আর যে গাছ কাটা হচ্ছে সেটা কোনদিকে হেলে পড়তে পারে সেটা বুঝতে অনেকসময় ভুল হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়৷

প্রশ্ন আসতে পারে, এমন লিংক তাহলে কেন শেয়ার করা হয়? উদ্দেশ্য সস্তায় কিছু পয়সা কামানো৷ লিংক যে পাতায় চলে যাচ্ছে, সেখানে থাকা বিজ্ঞাপনে কেউ যদি ক্লিক করেন তাহলে ওয়েবসাইটটির মালিক কিছু টাকা পাবেন, আর ইউটিউব ভিডিওটি দেখলে সেখানে প্রদর্শিত বিজ্ঞাপন থেকে টাকা পাবেন, যিনি সেটা পোস্ট করেছেন সেই ব্যক্তি৷

এই পুরো প্রক্রিয়ায় যার সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে, তিনি হচ্ছেন যে লিংকে ক্লিক করেছেন সেই ব্যক্তি৷ যে ফেসবুক পাতা থেকে লিংকটি পোস্ট করা হয়েছে, সেটির অনুসারীর সংখ্যা ১৫ লাখের বেশি৷ ফল বোঝাই যায়, সেখান থেকে প্রকাশিত নিউজের লিংকে ক্লিক করা মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়৷

বাংলা অনলাইন দুনিয়ায় ভুয়া শিরোনাম আর ছবি দিয়ে নিউজ বানানো ওয়েবসাইটের সংখ্যা এখন অনেক৷ এ সব সাইট দীর্ঘমেয়াদি হয়না, তবে যেটুকু সময় চালু থাকে, ততক্ষণে মানুষকে বিভ্রান্ত করে, বোকা বানিয়ে, অনেক সময় ভাইরাস বা ক্ষতিকর প্রোগ্রাম ডাউনলোডে বাধ্য করে ভালোই পয়সা কামিয়ে নেয়৷

এত গেলো অখ্যাত অনলাইন পত্রিকার কথা, এবার মোটামুটি বিখ্যাত একটি পত্রিকার দিকে তাকানো যাক৷ বাংলাদেশে সম্প্রতি এক পুলিশের স্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে৷ আলোচিত সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতি মানুষের আগ্রহ অনেক৷ হঠাৎ জানা গেল, সেই পুলিশকে রাতের আধারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গেছে গোয়েন্দারা৷ ব্যস, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু নানারকম জল্পনা-কল্পনা৷ এরই মধ্যে নামকরা অনলাইন পত্রিকাটিতে প্রকাশ করা হলো, ‘‘চাচাতো ভাই সাইফুলকে নিয়ে স্ত্রী খুনের ছক বাবুল আক্তারের!'' ফেসবুকে মুহূর্তের ছড়িয়ে গেল খবরটা৷ সেই পুলিশের সমালোচনায় সোচ্চার হলেন অনেকে৷ অথচ কোন রকম বিশ্বাসযোগ্য সূত্র ছাড়াই এই নিউজ প্রকাশ করে পত্রিকাটি, যদিও সেই পুলিশকে কিছুক্ষণ পরেই ছেড়ে দেয় গোয়েন্দারা৷

DW Bengali Arafatul Islam

আরাফাতুল ইসলাম, ডয়চে ভেলে

অনলাইন পত্রিকাটি এই শিরোনাম অবশ্য খানিক পরে বদলে ফেলেছে, তবে যতক্ষণ সেই শিরোনাম ছিল, ততক্ষণে অনেক মানুষ তাদের লিংকে ক্লিক করেছে, আর তাতে তাদের অনলাইন রেটিং বেড়েছে, বেড়েছে বিজ্ঞাপনের রেট৷

ফেসবুকে এরকম বিভ্রান্তিকর, প্রতারণামূলক শিরোনাম প্রতিনিয়তই দেখা যায়৷ অখ্যাত, বিখ্যাত, পরীক্ষিত বিভিন্ন পাতা থেকে সেসব প্রকাশ করা হয় শুধুমাত্র কিছুটা বাড়তি ক্লিক পাবার আশায়৷ অথচ এই অনৈতিক চর্চা মানুষের কতটা ক্ষতি করছে, কতটা নেতিবাচক প্রভাব তাদের উপর পড়ছে, তা নিয়ে এ সব পত্রিকায় কাজ করা মানুষদের কোনো মাথাব্যথা নেই৷ প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের নৈতিকতা শেখাবে কে?

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

‘‘বলিউড এর নতুন হটগার্ল!! দেখুন তার ইউটিউব তোলপাড় করা একটি হট ভিডিও ক্লিপ!'' – এই শিরোনামযুক্ত একটি নিউজের লিংক, সঙ্গে এক নারীর তিনটি ছবি, যার একটিতে তার স্তন প্রায় অনাবৃত৷ বাংলাদেশের এক আলোচিত মডেলের পরীক্ষিত ফেসবুক পাতা থেকে পোস্ট করা এই লিংকে আগ্রহ নিয়ে, ভুল করে কিংবা কৌতূহল বসে অনেকে ক্লিক করতে পারেন৷ কিন্তু ক্লিকের পর তারা কী দেখবেন জানেন?