গর্ভপাত নিয়ে বিরোধ কোনোদিন থামবে না

যদি না নারী-পুরুষের সম্পর্কে যা কিছু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংশয়-অসাম্য ও সংঘাত রয়েছে, তা হয় প্রগতি, নয়ত জাদুকাঠির ছোঁয়ায় উধাও হয়ে যায়৷ কেননা মানব অস্তিত্বের ও সমাজের কয়েকটি বুনিয়াদি প্রশ্ন বিষয়টির সঙ্গে জড়িত৷

নীতি-নৈতিকতা, দর্শন, জীববিজ্ঞান, ধর্ম বা আইন – সব কিছুই এসে পড়ে গর্ভপাতের কথা উঠলে৷ উঠে পড়ে মূল্যবোধ, সরকারের দায়িত্ব ও নারী অধিকারের প্রশ্ন৷ দেশ, সমাজ, এমনকি ধর্ম অনুযায়ী বিশ্বের সর্বত্র গর্ভপাত সংক্রান্ত আইনকানুন আলাদা৷

অথচ গর্ভপাত এমন একটি বিভাজক প্রসঙ্গ যে, আইন করে দু'পক্ষকে ঠাণ্ডা করা চলে না: অ্যামেরিকায় যেমন ‘প্রো-লাইফ' ও ‘প্রো-চয়েস' পন্থিদের মধ্যে বিরোধ – সে এমন এক বিরোধ যে, তার জন্য চারজন চিকিৎসককে প্রাণ হারাতে হয়েছে৷ শুধু গর্ভপাত করে থাকেন বলে ডেভিড গান, জন ব্রিটন, বার্নেট স্টেপিয়ান ও জর্জ টিলার-কে হত্যা করা হয়েছে ১৯৯৩ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে৷ এছাড়া আছে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় গর্ভপাত ক্লিনিকের কর্মীদের উপর আক্রমণ, এমনকি হত্যার ঘটনা৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজন গর্ভপাত সহায়ককে হত্যার দায়ে পল জেনিংস হিল নামের এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে৷

রো বনাম ওয়েড

আইন অনেক সময় ধরি মাছ না ছুঁই পানি করে পরিস্থিতির সামাল দেবার চেষ্টা করেছে৷ এক্ষেত্রে প্রথমেই নাম করতে হয় ‘রো বনাম ওয়েড' মামলাটির, যা যুক্তরাষ্ট্রে ইতিহাস সৃষ্টি করে৷ ঐ মামলায় আদালত সিদ্ধান্ত নেন যে, ‘‘একটি মনুষ্যজীবনের সম্ভাবনা সুরক্ষিত করতে (রাষ্ট্রের) গুরুত্বপূর্ণ ও বৈধ স্বার্থ'' আছে - বিশেষ করে ‘পয়েন্ট অফ ভায়াবিলিটি' বা যে সময় থেকে ভ্রুণটি একা বেঁচে থাকতে পারে, সেখান থেকে৷ কিন্তু সেই ‘পয়েন্ট অফ ভায়াবিলিটি'-তে পৌঁছানোর আগে নারীদের বুনিয়াদি অধিকারকে রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে বেশি বাধ্যতামূলক বলে গণ্য করা হবে৷ রো বনাম ওয়েড মামলার এই রায়ের ফলে ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের গর্ভপাত নিষেধ আইন বাতিল হয়৷

সমাজ

কোরানে উল্লেখ নেই, তবে...

কোরান শরিফে স্পষ্টভাবে গর্ভপাতের বিষয়ে কিছু বলা নেই৷ তবে কিছু নির্দেশনা আছে যেগুলো গর্ভপাতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে বলে ইসলামি বিষয়ে পণ্ডিতরা মনে করেন৷

সমাজ

ভ্রুণই জীবন

সূরা আল-মায়দাহের ৩০তম আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘যে বা যারা একটি আত্মার জীবনকে হত্যা থেকে বিরত থেকেছে, সে বা তারা যেন সব মানুষের জীবনকে হত্যা থেকে বিরত থেকেছে৷ যে বা যারা একটি আত্মাকে হত্যা করেছে, সে বা তারা যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করেছে৷’’ আর অধিকাংশ মুসলিম পণ্ডিত মনে করেন, গর্ভে থাকা ভ্রুণকেই ইসলাম জীবন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়৷

সমাজ

মায়ের জীবন রক্ষা

যদি মায়ের প্রাণ হুমকির মুখে থাকে তাহলে গর্ভপাত সমর্থন করে ইসলাম৷ মুসলিম আইন ‘দু’টি মন্দ জিনিসের মধ্যে যেটি কম মন্দ তাকে’ বেছে নেয়ার প্রতি সমর্থন জানায়৷ এক্ষেত্রে গর্ভপাতকেই ‘কম মন্দ’ মনে করা হয়৷ এর পক্ষে কয়েকটি যুক্তি হচ্ছে মা-ই ভ্রুণের ‘জন্মদাতা’, মায়ের জীবন আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত, মায়ের অন্যান্য দায়িত্ব আছে, মা একটি পরিবারের অংশ এবং মাকে মরতে দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভ্রুণও মরে যায়৷

সমাজ

দারিদ্র্যতার ভয়ে গর্ভপাত

কেউ যদি মনে করেন আগত শিশুকে লালনপালন করা তার পক্ষে হয়ত সম্ভব হবে না এবং সেই ভয়ে ভ্রুণকে মেরে ফেলেন, তাহলে সেটি মহাপাপ বলে বিবেচিত হবে৷ সুরা আর ইসরার ৩২ আয়াত বলছে, ‘‘তোমরা তোমাদের সন্তানকে দারিদ্রতার ভয়ে হত্যা করো না৷ আমরা তোমাকে এবং তোমার সন্তানকে দেখেশুনে রাখি৷ তাই তাদের হত্যা করে সত্যিকার অর্থেই একটি মহাপাপ৷’’

সমাজ

ত্রুটি ধরা পড়লে

গর্ভধারণের চার মাসের মধ্যে যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ভ্রুণ ত্রুটি নিয়ে বাড়ছে এবং এর সমাধান সম্ভব নয়, এবং এই সমস্যা পরবর্তীতে শিশুর জীবন দুর্বিসহ করে তুলতে পারে, তাহলে সেক্ষেত্রে গর্ভপাত সমর্থন করেন অনেক পণ্ডিত৷ এক্ষেত্রে অন্তত দু’জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে৷ অবশ্য এক্ষেত্রেও গর্ভপাতের পক্ষে নন এমন পণ্ডিতও আছেন৷

সমাজ

চার মাস পর...

গর্ভধারণের সময় ১২০ দিন পেরিয়ে গেলে গর্ভপাত সমর্থন না করার পক্ষে মোটামুটি পণ্ডিতদের মধ্যে মিল রয়েছে৷ তবে এক্ষেত্রে যদি ভ্রুণের ত্রুটি মায়ের জীবন হুমকির মুখে ফেলে দেয় তাহলে অন্য কথা৷

সমাজ

মুসলিম দেশের জরিপে বাংলাদেশ শীর্ষে

২০১৩ সালে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপ বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ১৮ শতাংশ মুসলিম নাগরিক নৈতিক বিবেচনায় গর্ভপাত সমর্থন করেন৷ অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন বাংলাদেশি মুসলমানের মধ্যে একজন গর্ভপাতের পক্ষে৷ ৩৭টি দেশের মসুলমানদের উপর পরিচালিত এই জরিপে বাংলাদেশেই গর্ভপাতের পক্ষে সবচেয়ে বেশি মানুষ পাওয়া গেছে৷ আরও জানতে উপরের ‘+’ চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সমাজ

ভ্রুণ কি ব্যথা পায়?

২০০৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্রুণের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে তার মধ্যে ব্যথা, এমনকি তার আশেপাশে কী ঘটছে, তা বোঝার মতো নার্ভাস সিস্টেম গড়ে ওঠে না৷ আরেক গবেষণা বলছে, ব্যথা পাওয়ার জন্য যে ‘নিউরো-অ্যানাটোমিকাল অ্যাপারেটাস’ প্রয়োজন তা গড়ে ওঠার কাজ গর্ভধারণের ২৬ সপ্তাহ আগে সম্পূর্ণ হয় না৷ অবশ্য এই বিষয়ে বিতর্ক এখনও থেমে নেই৷ দু’টি গবেষণা সম্পর্কে আরও জানতে উপরে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

জনমত

গর্ভপাত নিয়ে যে দেশেই জরিপ করা হোক না কেন, তার ফলাফল ভিন্ন হতে বাধ্য৷ যেমন চেক প্রজাতন্ত্রে মহিলাদের গর্ভপাতের অধিকার সমর্থন করেন অধিকাংশ মানুষ, কিন্তু পোল্যান্ডে সেই সংখ্যা তত বেশি নয়৷ উত্তর অ্যামেরিকায় ক্যানাডা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটা অনুরূপ প্রভেদ লক্ষ্য করা যায়৷

অপরদিকে মেক্সিকোর মতো দেশে জনগণের একটা বড় অংশ গর্ভপাতের বিরোধী৷ এক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা মেক্সিকোর তুলনায় বেশি উদার৷ অপরদিকে ব্রাজিল কিংবা কলম্বিয়ার জনসাধারণের একটা বড় অংশ গর্ভপাত বৈধ করা উচিত নয়, বলে মনে করেন৷

জার্মানি

গর্ভপাতের প্রসঙ্গটির সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শের যে কতটা যোগ আছে বা থাকতে পারে, তার সেরা দৃষ্টান্ত হল জার্মানি৷ নাৎসি আমলে কোনো ‘আর্য' মহিলাকে গর্ভপাত করতে সাহায্য করার সাজা ছিল মৃত্যুদণ্ড৷ যে সব (জাতিতে ও নাগরিকত্বে) জার্মান মহিলা চার কিংবা তার বেশি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন ও প্রতিপালন করেছেন, তাদের ‘মুটারক্রয়েৎস' বা ‘মায়ের ক্রুশ'-এ ভূষিত করে সম্মান জানানো হতো৷

Deutsche Welle DW Arun Chowdhury

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুই জার্মানিতে গর্ভপাত প্রথমে নিষিদ্ধ থাকে: পশ্চিম জার্মানি যুদ্ধপূর্ব ১৯২৭ সালের আইন বহাল রাখে৷ যে সব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে গর্ভপাত করানো চলবে, ১৯৫০ সালেই পূর্ব জার্মানিতে সেগুলির সংখ্যা বাড়ানো হয়৷ শেষমেষ পূর্ব জার্মানি গর্ভধারণের দ্বাদশ সপ্তাহ অবধি গর্ভপাত বৈধ করে ১৯৭২ সালে – যা পশ্চিম জার্মানিতেও চালু হয় ১৯৭৬ সালে৷

দুই জার্মানির গর্ভপাত আইনের মধ্যে সমন্বয় ঘটে জার্মান পুনর্মিলনের পর, ১৯৯২ সালে, যখন বুন্ডেসটাগ গর্ভধারণের প্রথম তৃতীয়াংশে গর্ভপাতকে বৈধ করে – তবে তার পূর্বশর্ত হয় যে, সন্তানসম্ভবাকে ‘কাউন্সেলিং' বা গর্ভপাত সম্পর্কে পরামর্শ নিতে হবে ও তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷