গ্রিসে শরণার্থী কিশোররা শরীর বেচছে

মার্কিন গবেষকদের এক প্রতিবেদন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে৷ সেখানে বলা হয়েছে, গ্রিসে উদ্বাস্তু কিশোররা এখন জার্মানির মতো দেশে যাবার অর্থ সংগ্রহ করছে ‘শরীর বিক্রি' করে৷

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার কেন্দ্রের ড. ভাসিলেইয়া  এবং প্রফেসর জ্যাকলিন প্রতিবেদনে  ‘গ্রিসে অভিবাসী শিশুদের যৌন শোষণ ও অপব্যবহারের ক্রমবর্ধমান মহামারীর'' কথা বলেছেন৷ ডয়চে ভেলের আন্থে কারাসাভা বিষয়টি পরখ করতে অকুস্থলে গিয়েছিলেন৷

গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের কেন্দ্রে পেদিয়ন তু আরেয়স নামের সুবিশাল যে উদ্যান আছে, তার কাছের একটি বাস স্টপে এখন এই ‘দেহ ব্যবসা' চলে৷ আলি নামের এক পাকিস্তানি কিশোর তার ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে আন্থেকে ‘ভালো দাম দেওয়ার' প্রতিশ্রুতি দেয়৷

আরেক কিশোর জানায়, আন্থে ছেলের বদলে মেয়ে পছন্দ করলে তারও ব্যবস্থা করে দেয়া যাবে৷ এই কিশোরের নামও আলী৷ দুই ‘আলি'-র বয়সই ১৭৷ এই দুই কিশোরের কাছ থেকে জানা যায়, তারা দশ- পনেরো ইউরোর জন্য ‘তা' করে থাকে, কন্ডোম ছাড়াই৷ এভাবে জার্মানি যাবার জন্য নগদ টাকা সংগ্রহ করছে বলেও জানায় তারা৷

অরক্ষণীয়

১১-১২ বছরের শিশুদেরও এভাবে অর্থ উপার্জন করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন গবেষকরা৷ মনে রাখা দরকার, গ্রিসে যে ৬২,৩৭৫ অভিবাসী আটকা পড়েছে, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক৷ তাদের মধ্যে ২,৩০০ জন আবার অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গ্রিসে এসেছে৷

সমাজ

ঝুঁকি ছাড়া আবার জীবন কি?

আলজেরিয়া থেকে আসা ১৮ বছর বয়সের তরুণ মহম্মদ (বাঁ দিকে) আমাদের প্রশ্ন শুনে হাসলেন৷ সারাদিন লুকিয়ে থেকে মালগাড়িতে চেপে পালানোর প্রচেষ্টা কতটা বিপজ্জনক? ‘‘ঝুঁকি ছাড়া আবার জীবন কি?’’ বললেন মহম্মদ৷

সমাজ

এই টাকায় আর কতদিন যাবে?

আলজেরিয়া থেকে আসা আনোয়ার (বাঁয়ে) আর আহমেদ একটি পরিত্যক্ত বগিতে বসে পরের মালগাড়ির অপেক্ষা করছেন৷ ‘‘আমি তিনবার ট্রেনে লুকিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছি - দু’বার ধরা পড়েছি ম্যাসিডোনিয়ায় আর একবার ধরেছে গ্রিক পুলিশ,’’ বললেন আহমেদ৷ আনোয়ার জানালেন, ‘‘একটা জাল পাসপোর্টের জন্য ১,৫০০ ইউরো লাগে আর পাত্রাস বন্দর থেকে ইতালিতে আসার জন্য ৬০০ ইউরো৷ আমার কাছে আছে আর মাত্র ২৫ ইউরো, যা আমার সার্বিয়ার জন্য লাগবে৷’’

সমাজ

চূড়ান্ত লক্ষ্য

আলজেরিয়া থেকে আসা ২৯ বছর বয়সি জাকি একটি পরিত্যক্ত বগিতে একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছেন৷ তিনি গ্রিসে আসেন নয় মাস আগে, একটি অলিভ গাছের বাগানে মাসখানেক ধরে কাজও করেন৷ ছয় বার জার্মানিতে যাবার চেষ্টা করেছে৷ তার সর্বশেষ প্রচেষ্টা আংশিক সফল হয়েছে - সে এখন বলকান অঞ্চলের কোনো এক জায়গায়৷

সমাজ

যে ট্রেন কোথাও যায় না

মরক্কোর এক অভিবাসী একটি পরিত্যক্ত ট্রেনের কামরায় বসে তার ভবিষ্যতের কথা ভাবছেন৷ তিনি নাকি ট্রেনে লুকিয়ে পালানোর প্রচেষ্টায় তিনবার গ্রিস আর ম্যাসিডোনিয়ার সীমান্তে ধরা পড়েছেন আর একবার ধরা পড়েছেন পাত্রাস বন্দর থেকে ট্রাকে লুকিয়ে ইটালি যাবার চেষ্টা করার সময়৷

সমাজ

লুকানোর জায়গা

মালগাড়িটা ইঞ্জিন বদলানোর জন্য এই স্টেশনে থামার পর ১৬ বছর বয়সের জালোয়ান, ২৩ বছর বয়সি আবদেল রহমানকে একটি বগির তলায় ঢুকতে সাহায্য করছে৷ নিরাপত্তা প্রহরীদের বিবৃতি অনুযায়ী, ম্যাসিডোনিয়া পুলিশ নাকি ঠিক ঐ জায়গাতেই তাদের তল্লাসি শুরু করে৷

সমাজ

গন্তব্য অজ্ঞাত

মালগাড়িগুলির টাইমটেবল জানা নেই বলে উদ্বাস্তুরা অনেক সময় জানেন না, ট্রেনটা কোথায যাচ্ছে৷ কাজেই অভীপ্সিত উত্তরে না গিয়ে, ট্রেন হয়তো এথেন্সে গিয়ে থামতে পারে৷

সমাজ

শেষ নির্দেশ

আলজেরিয়ার এক অভিবাসী তাঁর বন্ধুকে মালগাড়িতে লুকানোর পন্থা বুঝিয়ে দিচ্ছেন৷ ট্রেনটিতে লোহালক্কড় বোঝাই করা হয়েছে৷ পথে শ্বাসরোধ ও জলাভাবের বিপদ আছে৷

সমাজ

এক লাফে...

অভিবাসী তরুণরা বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মীদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে পালাচ্ছে৷ প্রাইভেট সিকিউরিটি কনট্রাক্টরের নিযুক্ত লোকজন এখানে টহল দিয়ে থাকে৷

সমাজ

রসদ ঠিক রেখো

মহম্মদ কাছের সফটেক্স উদ্বাস্তু শিবির থেকে খাবারদাবার ও পানি নিয়ে যাচ্ছেন তার বন্ধুবান্ধবদের জন্য - যারা ইতিমধ্যেই মালগাড়িটায় লুকিয়েছেন৷

সমাজ

যাদের দেখার কথা

গ্রিক রেলওয়ে কর্মীরা দুপুরের লাঞ্চব্রেকে তাস খেলছেন৷ পানাজ্যোটিস (ডানদিকে) গত ৩৩ বছর ধরে এখানে কাজ করছেন৷ ‘‘প্রায় এক বছর ধরে এই ব্যাপারস্যাপার চলেছে, তবে গত গ্রীষ্ম থেকে প্রায় প্রতিদিন এ ধরনের ঘটনা ঘটছে৷ ওরা যায়, আবার এক দিন পরে ফিরে আসে৷ এভাবে পালানোটা খুবই বিপজ্জনক, কিন্তু আমরা ওদের থামাতে পারি না৷একবার দেখেছিলাম, এক সিরীয় মা তাঁর বাচ্চাটিকে নিয়ে একটি পেট্রোলের ওয়াগনে ঢুকবার চেষ্টা করছেন৷’

সমাজ

ওয়ার্নিং

গ্রিক কর্তৃপক্ষ আরবি ভাষায় নোটিশ টাঙিয়েছেন, বিদ্যুতের তারের ব্যাপারে সাবধান করে দিয়ে৷ গত নভেম্বর মাসে এক আলজেরীয় অভিবাসী ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান৷

যে শিশুরা তাদের দেহ বেচছে, গোড়ায় তাদের মধ্যে আফগান আর সিরীয় শিশুর সংখ্যাই নাকি বেশি ছিল৷ তাদের কারো কারো বয়স নাকি ১০ বছরের বেশি ছিল না৷ পরে ইরাকি, ইরানি আর ক্রমেই আরো বেশি পাকিস্তানি এই ‘সেক্স মার্কেটে' আসতে শুরু করে৷ অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের মাত্র ৮ শতাংশ মেয়ে আর তাদের দশ জনের মধ্যে নয় জনের বয়সই ১৪ বছরের কম বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ৷

পার্কের মধ্যেই গাছের ডালে পর্দা টাঙিয়ে তার পিছনে ব্যবসা চলতে দেখেছেন আন্থে কারাসাভা৷ অথচ পার্কে বেসরকারি সিকিউরিটি গার্ড থেকে শুরু করে উদ্যানকর্মী, সবই আছে৷

এক প্যাকেট সিগারেটের জন্য

হার্ভার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যৌন ব্যবসায়ের ক্রেতা বা গ্রাহকরা ৩৫ বা তার বেশি বয়সের পুরুষ৷ এই পার্কটি ও এর কাছের ভিক্টোরিয়া স্কোয়্যার বহু বছর ধরে মাদক আর দেহ ব্যবসায়ের কেন্দ্র ছিল এবং এখনও আছে৷ শুধু ‘বিক্রেতারা' এখন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু৷ এখন নাকি এক প্যাকেট সিগারেট কিংবা এক বেলা পেট ভরে খাওয়ার জন্যে ১৫ বছরের কিশোররা স্বেচ্ছায় অন্যের যৌন লালসার শিকার হয়৷

এ বছর এই অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১,৩৫২ জনকে আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷ ৯০০ জন এখনও পথে৷ এছাড়া তাদের কেউই জার্মানি বা অনুরূপ কোনো দেশে যাওয়ার স্বপ্ন ছাড়তে কিংবা গ্রিসে থেকে যাওয়ার কথা ভাবতে রাজি নয়৷

বাড়িটা যেমন ছিল

সিরিয়ার এক শরণার্থী মেয়ে কলম আর কাগজ বেছে নিয়েছে তার জীবনের গল্প বলতে৷ এই ছবির ক্যাপশনে সে লিখেছে, ‘‘এটা সিরিয়া, মৃত্যু দূত৷ সিরিয়ার রক্ত ঝড়ছে৷’’ মেয়েটির আঁকা ছবিতে দেখা যাচ্ছে ট্যাঙ্ক থেকে একটি শহরের দিকে গোলা ছোড়া হচ্ছে৷ একইসঙ্গে আকাশ পথে চলছে হামলা৷ ফলে বাড়িগুলো আগুনে পুড়ে যাচ্ছে আর একটি কবরের পাশে দাঁড়িয়ে একজন তা দেখছে৷

মৃত্যু এবং হতাশা

‘‘এটা আমার বাবা, মা এবং পরিবারের - এবং সিরিয়ার সকল পরিবারের কবর,’’ মেয়েটা লিখেছে৷ তার কথায়, ‘‘সিরিয়ার শিশুদের অবস্থা এমন৷’’ তার হাতে থাকা ছবিটিতে তিনটি কবর এবং শুয়ে থাকা কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে৷

শিশুরা মারা যাচ্ছে

এখানে এজিয়ান সাগরে ডুবে প্রাণ হারানো আয়লান কুর্দির মরদেহ আঁকার চেষ্টা করেছে মেয়েটি৷ তার মৃত্যু গোটা ইউরোপকে নাড়িয়ে দিয়েছিল৷ সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের কারণে শিশুদের চরম দুর্দশা ফুটে উঠেছিল কুর্দির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে৷

‘এটা সিরিয়ার মানুষের আসল ট্রাজেডি’

যুদ্ধ থেকে বাঁচতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষ সমুদ্রে ডুবে মারা গেছে৷ অনেক শিশু হারিয়েছে তাদের অভিভাবক৷ অবৈধ পথে সিরিয়া থেকে ইউরোপের উদ্দেশ্যে যাত্রা খুবই বিপজ্জনক৷

থমকে যাওয়া জীবন

গ্রিসের ইডোমেনি শরণার্থী শিবিরে কিছু শিশু ছিল যারা তাদের অভিভাবকের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হওয়ার আশায় ছিল৷ তাদের বাবা-মা সীমান্ত বন্ধ হওয়ার আগেই ইউরোপে প্রবেশে সক্ষম হয়েছিল৷ কিন্তু বাকিদের আশা ধীরে ধীরে ক্ষীন থেকে ক্ষীনতর হচ্ছে৷ ছবির ক্যাপশন, ‘‘শিশুদের সব আশা, স্বপ্ন এখন ময়লার বাক্সের মধ্যে আছে৷’’

হারানো স্বপ্ন

‘‘শিশুদের ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন হারিয়ে গেছে-’’ লিখেছে মেয়েটি৷ তার কথায়, শরণার্থী শিবিরে থাকা অনেক শিশু ইউরোপে শান্তিতে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল৷ কিন্তু তারা বুঝতে পেরেছে, সেই স্বপ্ন শীঘ্রই বাস্তব হওয়ার আশা নেই৷

‘তাদের বুঝতে হবে যে তারা শিশু’

দশ বছর বয়সি এই শিশুটির মতো আরো অনেক শিশু ইডোমেনি ক্যাম্পে রয়েছে৷ মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করে, শরণার্থী শিবিরে শিশুদের দিকে আলাদাভাবে খেয়াল রাখা হচ্ছে না৷

আন্থে কারাসাভা/এসি