‘চিকুনগুনিয়া থেকে সতর্ক থাকুন’

ঢাকায় বৃষ্টিপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়া৷ রোগ তত্ত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট আইইডিসিআর ভাইরাসঘটিত রোগটির বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার পরামর্শ দিচ্ছে৷

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই জ্বরের লক্ষণ ও সতর্কতা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন অনেকেই শেয়ার করেছেন৷ অনেকে আবার তুলে ধরেছেন নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

জাহিদুর রহমান ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, ‘‘আমার চিকনগুনিয়া জ্বর হয়েছে৷ ডাক্তার ৬ দিন বিছানায় পূর্ণ বিশ্রাম এবং ২ মাস স্বাভাবিক বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন৷ সিঁড়িতে ওঠা-নামা, বেশি হাঁটা চলা, নিচে বসা, হাঁটুভেঙে বসা যাবে না, এমনকি কলম দিয়ে লেখাও যাবে না৷ নিজেকে এখন প্রতিবন্ধী মনে হচ্ছে৷’’

ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার বিডি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘এডিস প্রজাতির এডিস ইজিপ্টি এবং এডিস এলবোপিকটাস মশা থেকেই চিকুনগুনিয়া রোগের সংক্রমণ ঘটে৷ ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাসও এই মশার মাধ্যমে ছড়ায় এবং রোগের লক্ষণ প্রায় একই রকম বলে চিকিৎসকরা জানান৷ বাংলাদেশে প্রথম ২০০৮ সালে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়৷ বর্ষার পর পর যখন মশার উপদ্রব বাড়ে, তখন চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিও বাড়ে৷’’

একটি পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে অন্যদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে চিকিৎসকরা বলেছেন, ‘‘মশা খুব দ্রুতই একজন থেকে অন্যজনের দেহে এই রোগ নিয়ে যায়৷ তাই দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা৷ চিকুনগুনিয়ায় শরীরে ভীষণ ব্যথা হয়, অনেক সময় নড়াচড়াই করা যায় না, ব্যথা হয় সব অস্থিসন্ধিতে৷ গিটে গিটে ব্যথার পাশাপাশি মাথা কিংবা মাংসপেশিতে ব্যথা, শরীরে ঠাণ্ডা অনুভূতি, চামড়ায় লালচে দানা, বমি বমি ভাবও চিকনগুনিয়ার লক্ষণ৷ চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা না করে জ্বর হলে প্যারাসিটামল সেবনের পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা৷ আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি প্রচুর পানি ও তরল জাতীয় খাবার খেতে পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা৷’’

অন্বেষণ | 11.07.2014

বাসার আশেপাশে ফেলা মাটির পাত্র, কলসী, বালতি, ড্রাম, ডাবের খোলা ইত্যাদিতে পানি জমলে সেখানে এডিস মশা প্রজনন করে৷  তাই এসব স্থানে যেন পানি জমতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে এবং নিয়মিত বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা৷জুবায়ের আহমেদ এ সংক্রান্ত একটি খবর শেয়ার করে লিখেছেন, ‘‘এই রোগকে অবহেলা করবেন না৷ আমার পরিচিত  দুই জনের অবস্থা আশংকাজনক৷ সিলেটের ভালো ভালো ডাক্তার দেখানো হচ্ছে কিন্তু উপশম হচ্ছে না৷’’

মোজাদ্দিদ আল ফাসানি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘‘চিকনগুনিয়া নামে যে একটা জ্বর আছে, সেটা গতকালই প্রথম জানলাম৷ গত দুইদিন ধরে আম্মা আর ছোট বোন প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত৷ প্রথমে ভেবেছিলাম ভাইরাল জ্বর, কিন্তু চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করে জানা গেল এটা এক ধরনের ভাইরাস জ্বর, যা শুধুমাত্র স্ত্রী এডিস মশার কামড়ে হয়৷ শুনতে পাচ্ছি, ঢাকা শহরে আরো অনেকেরই এই জ্বর হচ্ছে৷ যে পরিমান শারীরিক কষ্ট আমার মা আর বোনকে পেতে দেখলাম, তাতে এই চিকনগুনিয়া নিয়ে আমার যথেষ্ট আতংক তৈরি হয়েছে৷ সবচেয়ে আতংকের কথা, এই সকল ব্যথা-বেদনা নিরাময় হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত লেগে যেতে পারে৷ অনুগ্রহ করে সবাই সর্তক থাকুন৷’’

মশাবাহিত রোগ

এডিস অ্যালবোপিকটাস ও এডিস এজিপটি নামক মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়া জ্বর হয়ে থাকে৷ তবে কেবল নারী এডিস মশাই এই জ্বরের জন্য দায়ী৷

লক্ষণ

মশার কামড় খাওয়ার পাঁচ দিন পর থেকে শরীরে এই রোগের লক্ষণ ফুটে ওঠে৷ এক্ষেত্রে মাথাব্যথা, সর্দি, বমি বমি ভাব, হাত ও পায়ের গিঁটে এবং আঙুলের গিঁটে ব্যথা, ফোসকা পড়া ও শরীর বেঁকে যেতে পারে৷ জ্বর উঠতে পারে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত৷ থাকতে পারে ২ থেকে ১২ দিন৷ তবে সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত জ্বর থাকে৷

ডেঙ্গু নয়

অনেকে চিকুনগুনিয়া জ্বরকে ডেঙ্গু জ্বর মনে করতে পারেন৷ কারণ এদের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে৷ তবে ডেঙ্গুর সঙ্গে চিকুনগুনিয়ার মূল পার্থক্য হলো, এই জ্বরে হাড়ের জোড়াগুলো ফুলে যায়, ডেঙ্গু জ্বরে যেটা হয় না৷

চিকিৎসা

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি শনাক্ত করা যায়৷ এখন পর্যন্ত চিকুনগুনিয়ার কোনো ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি৷ তাই চিকুনগুনিয়া সারাতে সাধারণ জ্বরের চিকিত্সা নিলেই চলবে৷ বিশ্রাম, প্রচুর তরল খাবার ও প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে৷ তবে চিকুনগুনিয়া জ্বর প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজনন বন্ধ করতে হবে৷

ঢাকায় চিকুনগুনিয়া

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট বা আইইডিসিআর গত বছর এই রোগের উপর একটি সমীক্ষা চালায়৷ এ সময় ঢাকার মোট ৬০১ জনের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়৷ এদের মধ্যে ২০৭ জনই চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত বলে পরীক্ষায় জানা যায়৷ সে হিসেবে ঢাকার প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত৷

ইতিহাস

১৯৫২-৫৩ সালে আফ্রিকার তাঞ্জানিয়ায় প্রথম এই রোগের আবির্ভাব ঘটে৷ বাংলাদেশে প্রথম এ রোগে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায় ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং ঢাকার দোহার ও কেরানীগঞ্জে৷ পরে ২০১১ সালের নভেম্বরে নতুন করে পাবনার সাঁথিয়ায় আবারও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়৷ আর ঢাকায় প্রথম দেখা দেয় ২০১৩ সালের আগস্টে৷

সংকলন: অমৃতা পারভেজ

বিজ্ঞান পরিবেশ | 10.01.2013

সম্পাদনা: আশীষ চক্রবর্ত্তী

প্রিয় পাঠক, আপনি কিছু বলতে চাইলে জানাতে পারেন নীচে মন্তব্যের ঘরে...

সংশ্লিষ্ট বিষয়