চীনে প্রথমবারের মতো গৃহ নির্যাতন আইনের খসড়া তৈরি

মাত্র তিন বছর আগে চীনে শারীরিক নির্যাতনকে তালাকের আবেদন করার অন্যতম গ্রহণযোগ্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়৷ এরপর এবার প্রথমবারের মতো গৃহ নির্যাতন আইনের খসড়া তৈরি করা হলো৷

দেশটিতে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা কর্মীরা সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন৷ পাশাপাশি, খসড়ায় কয়েকটি বিষয় স্থান না পাওয়ায় সে ব্যাপারে উদ্বেগও প্রকাশ করেন তাঁরা৷

বেইজিং ভিত্তিক ‘ম্যাপল ওমেনস সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং সেন্টার' গৃহ নির্যাতন ইস্যু নিয়ে কাজ করা চীনের অন্যতম বড় একটি সংগঠন৷ তার এক কর্মকর্তা হু ঝিমিং বলেন, ‘‘অনেক বছর ধরে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে আমরা আইনের অভাবে নিজেদের ক্ষমতাহীন ভাবতাম৷ এখন যদি খসড়াটি সত্যিই আইনে পরিণত হয় তাহলে আমরা খুব খুশি হব৷''

নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট

নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অহরহ৷ তার ওপর পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধের যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেটাও যথার্থ নয়৷ এছাড়া বিশ্বের মোট নারীর ৭ শতাংশ নাকি জীবনের যে কোনো সময় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷

উন্নত বিশ্বের নারীরাও রেহাই পান না

ধর্ষণ শব্দটি শুনলেই মনে হয় এ ধরণের অপরাধ হয়ে থাকে শুধু অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে৷ আসলে কিন্তু মোটেই তা নয়৷ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই শতকরা ৩৩ জন মেয়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়৷ এমনকি জার্মানির মতো উন্নত দেশের নারীরাও যৌন নিগ্রহ বা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত৷

ধর্ষিতা নারীরা জানাতে ভয় পান

জার্মানিতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত বা ধর্ষিত নারীদের সঠিক পদ্ধতিতে ‘মেডিকেল টেস্ট’-এর ব্যবস্থা করে, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত স্ত্রী বিশেষজ্ঞ ডা. সোনিয়া পিলস বলেন, ‘‘ধর্ষণের শিকার নারী লজ্জায় এবং আতঙ্কে থাকেন৷ তিনি পুলিশের কাছে গিয়ে সে অভিজ্ঞতা বা ধর্ষক সম্পর্কে তথ্য জানাতে ভয় পান, কুণ্ঠা বোধ করেন৷ অনেকদিন লেগে যায় ধর্ষণের কথা কাউকে বলতে৷

ধর্ষককে ধরার জন্য দ্রুত ডাক্তারি পরীক্ষা

ধর্ষণের পর নারীদের কী করণীয় – এ বিষয়ে জার্মানির ধর্ষণ বিষয়ক নির্দেশিকায় কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে৷ যেমন ধর্ষণের পর একা না থেকে কারো সাথে কথা বলা৷ গোসল, খাওয়া, ধূমপান, বাথরুমে যাওয়ার আগে, অর্থাৎ ধর্ষণের চিহ্ন মুঝে না যাবার আগে ডাক্তারি পরীক্ষা করানো৷ এ পরীক্ষা করালে ধর্ষক কোনো অসুখ বা এইচআইভি-তে আক্রান্ত ছিল কিনা, তা জানা সম্ভব৷ নারীর শরীরে নখের আচড় বা খামচি থাকলে ধর্ষকের চিহ্ন সহজেই পাওয়া যায়৷

যাঁরা ধর্ষণের শিকার, তাঁদের জন্য জরুরি বিভাগ

ধর্ষক যেসব জিনিসের সংস্পর্শে এসেছে, অর্থাৎ অন্তর্বাস, প্যাড এ সব তুলে রাখুন৷ ছবিও তুলে রাখতে পারেন৷ নিজেকে দোষী ভাববেন না, কারণ যে ধর্ষণের মতো জঘণ্যতম কাজটি করেছে – সেই অপরাধী, আপনি নন৷ জার্মানির বেশ কয়েকটি শহরের হাসপাতালে যৌন নির্যাতন বিষয়ক আলাদা জরুরি বিভাগ রয়েছে৷ তাছাড়া ধর্ষণ সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের উত্তর জানতে রয়েছে ‘গেভাল্ট গেগেন ফ্রাউয়েন’, যেখানে ২৪ ঘণ্টাই টেলিফোন করা যায়৷

গ্রুপ থেরাপি

যৌন নিগ্রহ বা ধর্ষণের শিকার নারীদের মানসিক ও শারীরিক সমস্যা সমাধানের জন্য জার্মানিতে রয়েছে গ্রুপ থেরাপি, যার সাহায্যে নারীরা আবার সমাজে সহজভাবে মিশতে পারেন এবং তাঁদের জীবনে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটি সহজে ভুলে যেতে পারেন৷

সবচেয়ে বেশি যৌন অপরাধ হয় বাড়িতেই

ভারতের কোথাও না কোথাও প্রতি ২২ মিনিটে একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে৷ তাই আদালতের নির্দেশে ভারতের পুলিশ বিভাগ এক সমীক্ষা চালিয়েছিল দিল্লির ৪৪টি এলাকায়৷ চলতি বছরের গত আট মাসে ২,২৭৮টি ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন এবং যৌন অপরাধের তদন্তের ফলাফলে দেখে গেছে: ১,৩৮০টি ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা হলেন পরিবারের লোকজন এবং পরিচিতজনেরা৷ অর্থাৎ নিজের বাড়িতেও মেয়েরা নিরাপদ নয়!

সঠিক বিচার চাই

২০১৩ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দিল্লিতে গণধর্ষণ ঘটনার পর, ভারতে ঘটা করে বিচার বিভাগীয় কমিশন বসিয়ে ধর্ষণ, যৌন নিগ্রহ দমনে আইন-কানুন ঢেলে সাজানো হয়৷ শাস্তির বিধান আরো কঠোর করা হয়৷ কিন্তু তাতে যৌন অপরাধের সংখ্যা না কমে বরং বেড়েছে৷

বাংলাদেশে ধর্ষণের শিকার

বাংলাদেশে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১১ সালে ৬২০ জন, ২০১২ সালে ৮৩৬ জন, ২০১৩ সালে ৭১৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ মাত্র ছ’মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪৩১টি এবং এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮২ জন৷ তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ করে ধর্ষণ এবং পরে হত্যার ঘটনাও অনেক বেড়েছে৷

নারীর পোশাকই কি ধর্ষণের জন্য দায়ী?

বাংলাদেশের একজন পুলিশ কর্মকর্তা একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘‘বাংলাদেশের নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেপরোয়াভাবে, বেপর্দায় চলাফেলার কারণে ধর্ষণের শিকার হন৷’’ পুলিশের কর্মকর্তার দাবি, ধর্ষণের দায় প্রধানত নারীদের৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘বখাটে ছেলেরা তো ঘোরাফেরা করবেই৷’’ এ কথা শুধু পুলিশ কর্মকর্তার নয়, ভারত-বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থাই এরকম৷ ধর্ষণ বন্ধ করতে এই মধ্যযুগীয় চিন্তা, চেতনার পরিবর্তন প্রয়োজন৷

ছোট বেলা থেকে সচেতন করতে হবে

ধর্ষণ সম্পর্কে ছোটবেলা থেকে সঠিক ধারণা দিলে স্বাভাবিকভাবে ধর্ষণের সংখ্যা কমবে৷ তাছাড়া পাঠ্যপুস্তকেও বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া উচিত৷ ধর্ষিতা নারীকে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হতে হয়, সে সম্পর্কেও সচেতনতা দরকার৷ অনেকে যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন৷ গোটা সমাজও নারীকেই দোষ দিয়ে থাকে৷ ডাক্তারি বা মনস্তাত্ত্বিক সাহায্য ছাড়াও প্রয়োজন পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও সমাজের বন্ধুবৎসল আচরণ৷

তবে প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে, অবিবাহিত ও তালাকপ্রাপ্তরা এই আইনের সুবিধা পাবেন না৷ এ বিষয়টিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ৷ ইউএন ওমেন-এর চীনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ইউলিয়া ব্রুসার্ড বলেন, ‘‘চীনা কর্মীদের এক যুগেরও বেশি সময় ধরে করা দাবির প্রেক্ষিতে খসড়া প্রকাশিত হওয়ায় জাতিসংঘ ‘রোমাঞ্চিত'৷ তবে আমরা দেখছি যে, পারিবারিক সম্পর্কের বাইরে যাঁরা আছেন তাঁরা এর আওতায় পড়বেন না৷ অথচ আমরা জানি, পারিবারিক সম্পর্কের বাইরেও গৃহ নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটে, যেমন ডেটিং, একসঙ্গে বসবাস কিংবা সমলিঙ্গের মধ্যে বিয়ে ইত্যাদি৷ ফলে আমাদের আশঙ্কা প্রস্তাবিত খসড়া পাস হলে তার সুবিধা থেকে একটা অংশ বাদ পড়ে যেতে পারে৷''

চীনের সরকারি সংবাদপত্র ‘চায়না ডেইলি'-তে প্রকাশিত একটি সংবাদ অনুযায়ী, সে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ নারী, যাঁরা বিবাহিত কিংবা একটা সম্পর্কে জড়িত, তাঁরা শারীরিক অথবা যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে থাকেন৷

প্রস্তাবিত খসড়ায় কোন বিষয়গুলো গৃহ নির্যাতন কিংবা পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে পড়বে, তা বলে দেয়া আছে৷ বর্তমানে এসবের অভাবে নির্যাতিতরা অভিযোগ করেও কোনো বিচার পান না৷ শুধুমাত্র মারাত্মকভাবে আহত হলেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে থাকে৷

জেডএইচ/ডিজি (এএফপি)

দেশটিতে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা কর্মীরা সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন৷ পাশাপাশি, খসড়ায় কয়েকটি বিষয় স্থান না পাওয়ায় সে ব্যাপারে উদ্বেগও প্রকাশ করেন তাঁরা৷

আরো প্রতিবেদন...