জঙ্গিবাদ ও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম

আমার সাংবাদিকতার শুরু আর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান কাছাকাছি সময়ে৷ তবে সেই সময়ে জঙ্গি শব্দটি ব্যবহারে অনেক চিন্তাভাবনা করতে হতো৷ কারণ সরকার স্বীকার করতে চাইত না যে দেশে জঙ্গি আছে, জঙ্গি তৎপরতা আছে৷

এখনও কোনো না কোনো ফর্মে জঙ্গি শব্দটার প্রতি সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়৷ যেমন এই সময়ে বাংলাদেশ পুলিশের অবস্থান হলো, জঙ্গি আছে কিন্তু বাংলাদেশে আইএস নেই৷ ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান হামলা পর পুলিশ এই শক্ত অবস্থানে যায়৷ সেগুলো বলার আগে আবার শুরুতে ফিরে যাই৷

আমার সাংবাদিকতার শুরু ও বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা শুরুর সময়কাল নিয়ে কথা বলছিলাম৷ রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের সকালে ছায়ানটের বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে জঙ্গি হামলার কথা আমি কখনো ভুলবনা৷ হামলার ঘটনা ঘটেছিল ২০০১ সালের পহেলা বৈশাখ৷ আর আমার ফুলটাইম সাংবাদিকতা শুরু ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি৷ তখন পহেলা বৈশাখে সংবাদপত্র পুরোপুরি বন্ধ থাকত, অনলাইন ছিলনা৷ আমদেরও ছুটি৷ বর্ষবরণের অনুষ্ঠান তখন বিটিভি লাইভ দেখাতো৷ তাই অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণ পর হামলা আমি লাইভ দেখতে পাই বাসায় বসে৷ আর আমাদের অনেকেই ছিলেন রমনা বটমূলে৷ সংবাদ-এর সে সময়ের চিফ রিপোর্টার কাশেম হুমায়ূনও (বর্তমানে ব্যবস্থাপনা সম্পাদক) ছিলেন রমনা বটমূলে৷ তিনি আমাদের সবাইকে খবর দিলেন৷ আর অনুষ্ঠানের ছবি এবং খবর সংগ্রহের জন্য কয়েকজন রিপোর্টার ও ফটোগ্রাফারতো ছিলেনই (পরের দিন পত্রিকা খবর দেয়ার জন্য)৷ আমরা সবাই অফিসে গেলাম৷ সিদ্ধান্ত হলো টেলিগ্রাম বের হবে৷ টেলিগ্রাম বের হলো ‘রমনা বটমূলে বোমা হামলা৷'

এটা যে জঙ্গি হামলা বা জঙ্গিদের কাজ সেটা সংবাদমাধ্যমকে বলতে আরও কয়েকদিন সময় নিতে হলো৷ সন্ত্রাসী হামলা বলেই লিখতে হলো৷ সাধারণভাবে সংবাদমাধ্যম জঙ্গি হামলা বলতে ধর্মীয় বিশেষ করে ইসলামের নামে উগ্রগোষ্ঠীর হামলা বোঝাত৷ আর সন্ত্রাসী হামলা বলতে সাধারণ কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা ব্যক্তির হামলা বোঝায়৷ এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে৷ আরো একটু স্পষ্ট করে বললে ইসলাম ধর্মের নামে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীকে এখানকার সংবাদমাধ্যম জঙ্গি গোষ্ঠী বলে চিহ্নিত করে৷ তাই সরকারে যারা থাকেন তাদের প্রবণতা থাকে এটাকে জঙ্গি না বলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বলার৷ এটার মধ্যে একটা রাজনীতি এবং বিদেশ নীতির বিষয় আছে

কয়েকটি উগ্র মতাদর্শ

ইসলামিক স্টেট, আইএস

একসময় পোশাকি নাম ছিল ‘ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দি লিভ্যান্ট’৷ সংক্ষেপে আইএসআইএল কিংবা আইএসআইএস৷ তবে বেশি পরিচিত আইএস বা দায়েশ নামে৷ বিশ্বজুড়ে ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে ২০১৪ সালে তারা আত্মপ্রকাশ করে৷ ২০১৫ সালের শেষ পর্যন্ত বিশ্বের ৮৫টি দেশ থেকে প্রায় ৩০ হাজার যোদ্ধা জঙ্গি গোষ্ঠীটিতে যোগ দেয়৷ সিরিয়া, ইরাকের একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছিল তারা৷ তবে সম্প্রতি শেষ ঘাঁটিটিও হারিয়েছে আইএস৷

কয়েকটি উগ্র মতাদর্শ

আল-কায়দার উত্থান

জর্ডান-প্যালেস্টেনিয়ান মুসলিম ধর্মীয় গুরু আব্দুল্লাহ আজম৷ একটি জিহাদি জার্নালে আফগানিস্তানে লড়াইয়ের জন্য মুজাহিদিন বা বিদেশি যোদ্ধাদের বাহিনী গড়ার ধারণা দেন তিনি৷ ১৯৮৯ সালে মারা গেলেও তাঁর মতবাদই বৈশ্বিক জিহাদি ধারণার জন্ম দেয়৷ যার উপর ভিত্তি করে ১৯৮৮ সালে আল-কায়েদা প্রতিষ্ঠা করেন ওসামা বিন লাদেন৷ আফগানিস্তান থেকে রাশিয়ার সৈন্য প্রত্যাহারের পরে আল-কায়দার শাখা ছড়িয়ে পড়ে অনেক মুসলিম দেশে৷

কয়েকটি উগ্র মতাদর্শ

দেশে দেশে আল-কায়দা

বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামেও আল-কায়দার জিহাদি মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে জঙ্গি সংগঠন গড়ে ওঠে৷ তারই একটি আল শাবাব৷ সোমালিয়ায় শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে ২০০৬ সালে গোষ্ঠীটি প্রতিষ্ঠিত হয়৷ দেশটিতে বহু বিদেশি নাগরিক হত্যার জন্য দায়ী তারা৷ আফ্রিকার এমন আরেকটি জঙ্গি গোষ্ঠী নাইজেরিয়ার বোকো হারাম৷ ২০১৪ সালে ৩০০ স্কুল ছাত্রী অপহরণের ঘটনায় গোষ্ঠীটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে৷

কয়েকটি উগ্র মতাদর্শ

‘‘সাদারাই সেরা’’

বর্ণবাদী মতবাদের উপর ভিত্তি করে বিশ্বে যুগে যুগে নানা গোষ্ঠীর উত্থান হয়েছে৷ বিংশ শতকে ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’ বা সাদাদের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার উপর ভিত্তি করে অ্যামেরিকায় গড়ে ওঠে ‘কু ক্লুক্স ক্ল্যান’ নামের কট্টর বর্ণবাদী গোষ্ঠী৷ বর্ণবাদের উপর ভর করে ইউরোপে উত্থান হয় ফ্যাসিবাদের৷

কয়েকটি উগ্র মতাদর্শ

উগ্র ডানপন্থা

সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে পশ্চিমা দুনিয়ায় উগ্র ডানপন্থার প্রকটতা বাড়ছে৷ অ্যামেরিকা, ইউরোপ থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত এই মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ছে৷ ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের প্রতি এর অনুসারীরা রক্ষণশীল৷ সবশেষ নিউজিল্যান্ডে হামলা করে ৫০ জনকে হত্যায় অভিযুক্তও তেমনই একজন৷

কয়েকটি উগ্র মতাদর্শ

বামপন্থিদের সশস্ত্র লড়াই

সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কিংবা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেয় বিশ্বের অনেক উগ্র বামপন্থি সংগঠন৷ রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে, সরকারি কর্মকর্তা, সম্পদশালী মানুষদের তারা শত্রু বিবেচনা করে৷ ফিলিপিন্সের কমিউনিস্ট পার্টি নিও পিপলস আর্মি বা ভারতের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি তারই উদাহরণ - যাদেরকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করে আসছে দেশগুলোর সরকার৷

কয়েকটি উগ্র মতাদর্শ

স্বাধীনতাকামীদের সংগ্রাম

ইসরায়েলের দখলদারিত্বের অবসান ঘটিয়ে একটি স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে আসছে ফিলিস্তিনিরা৷ এজন্য সশস্ত্র যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে হামাস, প্যালেস্টাইন লিবারেশন ফ্রন্ট, প্যালেস্টাইন ইসলামিক জিহাদ৷ উগ্রতার কারণে এই দলগুলোকে সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র৷ এমন স্বাধিনতাকামী সংগঠন আছে আয়ারল্যান্ড, রাশিয়া, পাকিস্তান ভারতসহ বিশ্বের নানা দেশে৷

রমনা বটমূলের পর এই ধারায় বাংলাদেশে আরো অনেক হামলা হয়েছে৷ তবে সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে একটা বিভাজন স্পষ্ট ছিল৷ তা হলো কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম জঙ্গি হামলাকে বানানো কাহিনি বলার চেষ্টা করেছে৷ আবার সরকারের পক্ষ থেকেও জঙ্গিদের জঙ্গি বলে স্বীকার করা হয়নি৷ যেমন বাংলা ভাইকে তখনকার বিএনপি সরকার উলটো দেশপ্রেমিক বলে অভিহিত করেছে৷ জামায়াত নেতারা তখন বলেছেন দেশে কোনো জঙ্গি নেই৷ এরফলে সংবাদমাধ্যমগুলো পড়ে বিপাকে৷ একারণে সাংবাদিক এনামুল হক চৌধুরীকে জেলেও যেতে হয়েছিল৷ তার অপরাধ ছিল তিনি ২০০২ সালে ময়মনসিংহের সিনেমা হলে হামলাকে জঙ্গি হামলা বলে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন করেছিলেন৷

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার কথাই ধরুন৷ ওই গ্রেনেড হামলার চার্গেট ছিল তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা৷ তিনি আহত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে গেলেও ২৪ জন নিহত হন৷ তখনকার বিএনপি-জামায়াত সরকার এটাকে আওয়ামী লীগেরই সাজানো হামলা বলার চেষ্টা করে৷ সরকারের পক্ষ থেকে যখন এই অবস্থান নেয়া হয় তখন বাংলাদেশের মতো একটি দেশের সংবাদমাধ্যম বেকায়দায় পড়ে৷ তারপরও কিছু সংবাদমাধ্যম তখনকার সরকারের অনুসারী হয়ে সংবাদ পরিবেশন করলেও মূল ধারার সংবাদমাধ্যম কিন্তু এটাকে সাহস করে জঙ্গি হামলাই বলেছে৷ ওই হামলায় পাকিস্তানের আর্জেস গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়৷ আমি তখন যুগান্তরে কাজ করি৷ এই আর্জেস গ্রেনেডের বিষয়টি ব্রেক করে আমি তখন অনেক অনাকাঙ্খিত চাপের মুখে পড়ি৷

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৪ জেলার একটি বাদে ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা করে জামআতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)৷ এবার আর সরকার অস্বীকার করতে পারেনা৷ সংবাদমাধ্যম একে জঙ্গি হামলাই বলে৷ তারপর কিছু সংবাদমাধ্যম এটাকে সন্ত্রাসী হামলা বলে৷ বিশেষ করে জামায়াতের প্রতি ঝোঁক যেসব সংবাদমাধ্যমের, তারা জঙ্গিই খুঁজে পায়না৷ এরপর তারা বোমা হামলা চালিয়ে বিচারক হত্যা করে৷ আদালত এলাকায় বোমা হামলা করে৷ এসব ঘটনায় জেএমবি নেতা শায়খ আব্দুর রহমান এবং বাংলা ভাইসহ আরো কয়েকজনকে গ্রেপ্তার ও বিচার করে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়৷ কিন্তু এর আগে সংবাদমাধ্যমে তাদের জঙ্গি বলায় তখনকার সরকারের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল৷ ২০০২-২০০৩ সালে তখনকার বিএনপি জামায়াত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়ই রাজশাহী অঞ্চলে সর্বহারা দমনের নামে জেএমবি'র উত্থান হয়৷ তখন কিছু সংবাদমাধ্যম বাংলা ভাইকে হিরো বানিয়ে, তার সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রতিবেদনও প্রকাশ করে৷

জঙ্গিবাদের উত্থানের এই পর্যায় থেকে পরবর্তী পর্যায়ে সংবাদমাধ্যমের অবস্থান বলার আগে আরও কিছু তথ্য জানিয়ে রাখতে চাই৷

বাংলাদেশে জঙ্গিদের সামরিক কর্মকাণ্ড শুরু হয় ১৯৯৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কবি শামসুর রাহমানের উপর হামলার মধ্য দিয়ে৷ এরপর ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোর টাউন হলে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে বোমা বিস্ফোরণ ঘটনায় তারা৷ ২০০১ রমনা বটমূলে বোমা হামলার আগে ওই বছরেরই ২০ জানুয়ারি তারা ঢাকার পল্টন ময়দানে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা করে৷ কিন্তু এই জঙ্গি হামলাগুলো মিডিয়ায় ঠিকমত অ্যাড্রেস করা হয়নি বলে আমি মনে করি৷ এর কারণ ‘জঙ্গি না' এটা বলতে শাসকগোষ্ঠীর চাপ এবং একইসঙ্গে এই সব হামলাকে ‘নিজেদেরই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জঙ্গিদের বলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে' বলে একধরণের প্রচার প্রপাগান্ডা চালানো হয় একটি মহল থেকে৷

যেমন ২০০০ সালে ২০ গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখার ঘটনাই বলি৷ ২২ জুলাই কোটালীপাড়ার শেখ লুৎফর রহমান কলেজ মাঠে জনসভায় শেখ হাসিনার ভাষণ দেবার কথা ছিল৷ এই বোমা পুঁতে রেখেছিল হরকাতুল জিহাদের জঙ্গিরা৷ কিন্তু এটা নিয়েও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা নানান অপপ্রচার চালায়৷

হারুন উর রশীদ স্বপন, ডয়চে ভেলে

জেএমবি জঙ্গি যুগের অবসানের পর বাংলাদেশে জঙ্গিদের নতুন ধারা দেখা যায়৷ তারা লেখক, প্রকাশক, মুক্তচিন্তা ও ভিন্ন চিন্তার মানুষের ওপর হামলা ও তাদের হত্যা শুরু করে৷ ধারাটি শুরু হয় ২০০৪ সাল থেকেই লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে৷ ২৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর ওপর হামলা হয়৷ হামলা চালায় জেএমবি৷ গুরুতর আহত হলেও তিনি বেঁচে যান৷ পরে সুস্থ হয়ে জার্মানিতে গেলে সেখানে তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়৷

জেএমবি পর্বের পর বাংলাদেশে আরো কিছু জঙ্গি সংগঠনের উত্থান হয়৷ তাদের মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম আলোচনায় আসে ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিরপুরে ব্লগার ও শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে৷ গণজাগরণ মঞ্চ শুরুর ১০ দিনের মাথায় তাঁকে হত্যা করা হয়৷ এরপর তারা আরো অনেক লেখক, ব্লগারকে হত্যা করেছে৷ হত্যা করেছে এলজিবিটি অধিকার কর্মীদের৷ তারাই পরে নাম পরিবর্তন করে হয় আনসার আল ইসলাম৷ ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজান হামলার আগ পর্যন্ত পুলিশ এইসব জঙ্গিদের আইএস ভাবাদর্শের বলে উল্লেখ করে৷ এমনকি পুলিশ বাংলাদেশি আইএস সদস্যদের আটক এবং তাদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করে৷ আর সেই সব সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে তাদের তৎপরতা ও সদস্য সংগ্রহের কথাও বলা হয়৷ কিন্তু হলি আর্টিজান হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাংলাদেশে আইএস চ্যাপ্টার ক্লোজ করে দেয়, পুরোপুরি অস্বীকার করে৷

এখানে বলা দরকার ব্লগার হত্যায় সংবাদমাধ্যমে খবর পরিবেশনে দ্বিধাবিভক্তি স্পষ্ট ছিলো৷ কিছু সংবাদমাধ্যম হত্যাকারী না খুঁজে ব্লগাররা কোথায় কী লিখেছেন তা ফলাও করে প্রকাশ করে৷ আর জঙ্গিদের বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলোকে ‘সাজানো নাটক' বলতেও চেষ্টা করে৷ সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই ‘নাটক' ধারণা বদ্ধমূল হতে থাকে৷

সব ধারণা উবে যায় হলি আর্টিজান হামলার মধ্য দিয়ে৷ বিদেশি নাগরিকদের হত্যার উদ্দেশ্যেই ওই হামলা চালানো হয়৷ হামলায় ১৭ জন বিদেশিসহ মোট ২২ জনকে হত্যা করা হয়৷ সামনে আসে নব্য জেএমবি৷ যারা আইএস-এর আদর্শে পরিচালিত৷ এরপর বাংলাদেশে ব্যাপক জঙ্গিবিরোধী অভিযান সাধারণ মানুষের সমর্থন পায়৷ বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে নানা বিতর্কের অবসান হয়৷

বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম শুরুতেই জঙ্গি তৎপরতা চিহ্নিত করে৷ কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে এ নিয়ে নানা বিতর্ক হয়৷ মূল ধারার সংবাদমাধ্যমগুলো ইসলামের নামে সন্ত্রাসী তৎপরতাকেই জঙ্গি তৎপরতা বলে মনে করে৷ আর অন্যকোনো স্বার্থে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত সন্ত্রাসী তৎপরতাকে সন্ত্রাসবাদ বা সন্ত্রাসী তৎপরতা বলে মনে করে৷ কিন্তু এখন এই প্রশ্ন সামনে এসেছে যে শুধু ইসলাম ধর্ম ব্যবহার করে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালালে জঙ্গি কেন বলা হবে? অন্য ধর্ম বা কথিত আদর্শ ব্যবহার করলে তাকে কেন জঙ্গি বা জঙ্গিবাদ বলা হবেনা৷

আমার বিবেচনায় যে-কোনো কথিত আদর্শের নামে সন্ত্রাসই জঙ্গিবাদ৷ সেটা ইসলাম, সেটা খ্রিষ্টান, হিন্দু বা ইহুদি যে ধর্মের নামেই হোক না কেন৷ সেটা কোনো বর্ণ বা জাতিভিত্তিক হলেও৷ আমি বলতে চাই জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করার সুযোগ নেই৷ জঙ্গি বলে ইসলামের নামে সন্ত্রাসী তৎপরতাকে চিহ্নিত করে অন্য সন্ত্রাসবাদকে কম গুরুত্ব দেয়া একধরণের রাজণীতি৷ এই রাজনীতি অন্য জঙ্গিবাদকে আরো উৎসাহিত করতে পারে৷ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেরও এটা এখন ভেবে দেখার সময় এসেছে৷

স্তম্ভিত করে দেয়া গুলশান হামলা

গুলশানে হামলা

বিশ্ব মানচিত্রে পরস্পরের সঙ্গে লাগোয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশ অর্ধ শতাব্দী পূর্বে স্বাধীন হয়েছে ধর্ম নিরপেক্ষতার চেতনায়৷ দেড় দশক ধরে নানা জায়গায় মুসলিম জঙ্গিবাদ ছড়ালেও খানিকটা যেন নিরাপদেই ছিল দেশটি৷ রাজনৈতিক সহিংসতা ছিল৷ তার অনেকগুলোতে জঙ্গিদের ব্যবহারের কথাও তদন্তে উঠে আসে৷ তবে ঘোষণা দিয়ে বড় ধরণের হামলা আর হয়নি৷ এই ঘটনায় স্তম্ভিত হয়েছে গোটা দেশ৷

স্তম্ভিত করে দেয়া গুলশান হামলা

যেভাবে শুরু

তখন ছিল রমজান৷ ঘটনার দিন ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে একদল অস্ত্রধারী গুলশানের একটি রেস্টুরেন্ট ঢুকে পড়ে৷ স্প্যানিশ ওই রেস্টুরেন্টটির নাম হোলি আর্টিজান৷ ঢোকার সময়ই তারা বোমা ফাটিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে৷

স্তম্ভিত করে দেয়া গুলশান হামলা

জিম্মি দশা

অস্ত্রধারীরা রেস্টুরেন্টে ঢোকার পর সেখানে জিম্মি সংকট শুরু হয়৷ বাইরে চলে নানা গুজব৷ হামলার পর তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকজন রেস্টুরেন্টকর্মী বের হয়ে আসতে সক্ষম হন৷ বাংলাদেশে এর আগে ১৯৭৭ সালে ঢাকায় আরেকটি জিম্মি সংকট ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়েছিল৷ তখন মুম্বাই থেকে টোকিওগামী একটি জাপানি বিমানের যাত্রীদের জিম্মি করে বিমানটি ঢাকায় নামিয়েছিল দেশটির বামপন্থি বিদ্রোহী দল ‘ইউনাইটেড রেড আর্মি’৷

স্তম্ভিত করে দেয়া গুলশান হামলা

কোথায়

অবস্থানগত কারণেও এই ঘটনা আলোচনায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে৷ কারণ, রেস্তোরাঁটি ঢাকার গুলশান এলাকায়৷ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস রয়েছে এই এলাকায়৷ কয়েকটি দূতাবাস তো রেস্টুরেন্টের একেবারেই কাছে৷

স্তম্ভিত করে দেয়া গুলশান হামলা

টার্গেট বিদেশি, টার্গেট হোলি আর্টিজান

ঢাকার অভিজাত এই এলাকার রেস্টুরেন্টটিতে পোষা প্রাণী নিয়ে প্রবেশ করা যেতো৷ এর ভেতরে উন্মুক্ত লন ছিল, সেখানে বাচ্চারা খেলাধুলা করতে পারতো৷ ওই এলাকায় থাকা বিদেশিদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছিল রেস্টুরেন্টটি৷ বিদেশিদের টার্গেট করতেই এই রেস্টুরেন্টকে বেছে নেয়া হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন৷

স্তম্ভিত করে দেয়া গুলশান হামলা

প্রাণহানি পুলিশেরও

জিম্মি সংকট শুরুর পর ঘটনা সামলাতে এগিয়ে যায় পুলিশ বাহিনী৷ কিন্তু প্রথম দিকেই জঙ্গিদের হামলায় বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলাম প্রাণ হারান৷ এতে আতঙ্ক আরো বাড়ে৷

স্তম্ভিত করে দেয়া গুলশান হামলা

ডাক পড়ে সেনাবাহিনীর

পুলিশ হতাহত হওয়ার পর অভিযান নিয়ে নতুন করে চিন্তা শুরু হয়৷ এক পর্যায়ে জঙ্গিদের কবল থেকে ওই রেস্টুরেন্টটি মুক্ত করার অভিযান রাতে কার্যত স্থগিত হয়ে যায়৷ শেষ পর্যন্ত ডাক পড়ে সেনাবাহিনীর৷ সাঁজোয়া যান নিয়ে সেনা সদস্যরা অভিযান পরিচালনা করেন৷

স্তম্ভিত করে দেয়া গুলশান হামলা

আইএস সংশ্লিষ্টতা

রাতে জিম্মি দশা চলাকালে তথাকথিত ইসলামি জঙ্গি সংগঠন আইএস হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর আসতে থাকে৷ তবে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তা অস্বীকার করে৷

স্তম্ভিত করে দেয়া গুলশান হামলা

কিভাবে ঘটনার শেষ

ঘটনার অবসান হয় প্রায় ১২ ঘণ্টা পর সেনা অভিযানে৷ অবশ্য তার আগেই জঙ্গিরা সেখানে থাকা ২০ জনকে খুন করে৷ মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারির জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে৷ জীবিত উদ্ধার করা হয় এক জাপানি ও দুই শ্রীলঙ্কানসহ মোট ১৩ জনকে৷

স্তম্ভিত করে দেয়া গুলশান হামলা

আলোচিত সেই বাড়ি

ঘটনার পর রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায় গুলশানের সেই বাড়ি৷ যে রেস্টুরেন্টে হামলা হয়েছিল, তার মালিক ঘটনার পর বাড়িটি ফিরিয়ে নেন৷

স্তম্ভিত করে দেয়া গুলশান হামলা

নতুন ঠিকানায় হোলি আর্টিজান

গত বছরের ১ জুলাই রাতে যখন হামলা হয়, তখন হোলি আর্টিজান ছিল গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর বাড়িতে৷ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর জানুয়ারিতে এসে গুলশান এভিনিউর ‌র‌্যাংগস আর্কেডের দ্বিতীয় তলায় নতুন করে চালু হয় রেস্টুরেন্টি৷

স্তম্ভিত করে দেয়া গুলশান হামলা

জঙ্গিবাদ ও বিচার

এই ঘটনার পর আইএস দায় স্বীকার করলেও বাংলাদেশ সরকার এর জন্য স্থানীয় জঙ্গি সংগঠন জেএমবির পুনর্গঠিত একটি শাখাকে দায়ী মনে করে৷ ঘুরে ফিরে এর সঙ্গে জড়িত হিসাবে একই ব্যক্তিদের নাম আসতে থাকে৷ সরকার তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করে৷ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর আগাম পদক্ষেপে তাদের বহু ঘাঁটি ও অবস্থানস্থল ধ্বং হয়ে গেছে৷ সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, এই ঘটনার তদন্ত শেষ করতে ৫ ব্যক্তিকে খোঁজা হচ্ছে৷

হারুন উর রশীদ স্বপনের ব্লগ পোস্টটি কেমন লাগলো? জানান নীচের ঘরে৷

আমাদের অনুসরণ করুন