জঙ্গি না হয় মারা গেল, কিন্তু মতাদর্শ মারার উপায় কী?

ইরাকে শিয়াদের উপর আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে এক বাংলাদেশি জঙ্গি৷ ‘আইএস’ সেই জঙ্গির ভিডিও প্রকাশ করেছে অন্যদের উৎসাহিত করতে৷ এদিকে, বাংলাদেশে মরেই চলেছে সন্দেহভাজন জঙ্গি৷ প্রশ্ন হচ্ছে, জঙ্গিদের মতাদর্শে আঘাত হানার উপায় কী?

সুইডেনে বসবাসরত সাংবাদিক তাসনিম খলিলের সঙ্গে কথা হয় মাঝেমাঝে৷ বাঙালি জিহাদিদের অনলাইন তৎপরতার দিকে তিনি নজর রাখেন, পেশার খাতিরে আমিও রাখি৷ ফলে তিনি কোনো তথ্য পেলে জানান, আমিও কিছু যোগ করার থাকলে তাঁকে বলি৷ গতকালের ঘটনাও সেরকম৷ সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ জানালো, আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের হয়ে কাজ করা এক বাংলাদেশি জঙ্গির ‘কৃতিত্ব' নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেছে জঙ্গি গোষ্ঠীটির একটি সহযোগী সম্প্রচার কেন্দ্রের বাংলা বিভাগ৷ মাঝেমাঝে হাসি পায় ব্যাটাদের সাংগঠনিক কাঠামো দেখে৷ তাদের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীর মিডিয়া উইংয়ের একটা বাংলা বিভাগ করতে পারে, যেখানে বিশ্বের বড় বড় দেশের অনেক মিডিয়া হাউসেরই বাংলা বিভাগ নেই!

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

যাক সেকথা৷ আমাদের দেশের গণমাধ্যম সাইট ইন্টেলিজেন্সকে যতটা গুরুত্ব দেয়, তাসনিম খলিলকে ততটা দেয় না৷ অথচ বাঙালি জিহাদিদের অনলাইন তৎপরতার খবর সাইটের চেয়ে বেশি তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে ও নিউজ লেটারে পাওয়া যায়৷ খলিল নিজেই ঘাঁটাঘাটি করে অনেক তথ্য জোগাড় করেন৷ তিনিই জানালেন, আইএস যে জিহাদিকে নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেছে, সে ব়্যাবের নিখোঁজ তালিকায় ছিল৷ তারপর ফেসবুক ঘেঁটে সেই জঙ্গির নাম, বৈবাহিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বন্ধুতালিকা – সবই পাওয়া গেল কিছুক্ষণের মধ্যে৷

আইএস-এর জন্য আত্মঘাতী হয়ে ওঠা জঙ্গির নাম নিয়াজ মোর্শেদ রাজা৷ অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা চট্টগ্রামের এই ব্যক্তি ২০১৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ফেসবুকে সক্রিয় ছিল৷ তার প্রোফাইলে থাকা ছবিগুলোর মধ্যে অধিকাংশই তার মেয়ের, নাম মারিয়াম৷ আইএস তার নাম দিয়েছিল আবু মারিয়াম আল-বাঙালি৷ এই নামের প্রথমাংশের অর্থ হচ্ছে মারিয়ামের বাবা!  এত আদরের সন্তানকে রেখে কিসের মোহে সমাজে প্রতিষ্ঠিত এই যুবক জঙ্গি হলো, সেটা আমার কাছে এক বিস্ময়৷

কেউ কেউ বলবেন, বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই৷ এরকম ঘটনা অনেক৷ সেটাও ঠিক৷ গত বছর গুলশানে জঙ্গি হামলার পরপরই দেখা গেছে, এতকাল জঙ্গি বলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাদ্রাসার টুপি পরা শিক্ষার্থীদের দিকে আঙুল তোলা হলেও পরিস্থিতি আসলে অনেক বদলে গেছে৷ এখন বিত্তবান পরিবারের ছেলেরা, যারা জীবনে অভাব কী জিনিস চোখে দেখেনি, তারাও জঙ্গি হচ্ছে৷

DW Bengali Arafatul Islam

আরাফাতুল ইসলাম, ডয়চে ভেলে

আশার কথা হচ্ছে, গুলশান হামলার পর শক্তহাতেই জঙ্গি দমনে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী৷ যদিও তাদের কাজের ধরন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে৷ বিশেষ করে, তাদের অভিযানে যারা নিহত হচ্ছে, তাদের অধিকাংশই সন্দেহভাজন জঙ্গি, মানে তাদের জঙ্গি পরিচয় প্রমাণিত হয়নি৷ তা সত্ত্বেও এভাবে একের পর অভিযানে সন্দেহভাজনদের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে৷ আর সন্দেহের অবকাশ নেই যে, সন্দেহভাজন জঙ্গিদের জীবিত ধরার বিশেষ চেষ্টা পুলিশ বাহিনীর নেই৷ তা সত্ত্বেও এসব অভিযান যে মানুষের মনে স্বস্তি এনে দিচ্ছে, জঙ্গি তৎপরতায় লাগাম টানতে পারছেু, তা পরিষ্কার৷ কিন্তু এটাই কি একমাত্র সমাধান?

ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো যে বিষাক্ত মতাদর্শ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, সেটা দমনের উপায় খুঁজে বের করা জরুরি বলে আমার মনে হয়৷ বর্তমানে যেভাবে পশ্চিমা বাহিনীর অভিযান চলছে, তাতে অচিরেই শেষ হয়ে যাবে ইরাক ও সিরিয়ার কিছু অংশে থাকা ইসলামিক স্টেটের দখলদারিত্ব৷ জঙ্গি গোষ্ঠীটির পক্ষে সেভাবে সংগঠিত হওয়া হয়ত অদূর ভবিষ্যতে আর সম্ভব হবে না৷ কিন্তু থেকে যাবে তাদের ছড়িয়ে দেয়া বিষাক্ত মতাদর্শ৷ এই মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইটা তাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ৷ সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যেখানে ইউরোপই হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ কি তৈরি?

বন্ধু, বিষয়টি নিয়ে আপনার কিছু বলার আছে? তাহলে লিখুন নীচের ঘরে৷

রাজনীতি

আইএস কোথা থেকে এসেছে?

ইসলামিক স্টেট (আইএস) সুন্নী ইসলামিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী আল-কায়েদার একটি উপদল, যেটি আইএসআইএল, আইসিস এবং দায়েশ নামেও পরিচিত৷ ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আক্রমণের পর এটির বহিঃপ্রকাশ ঘটে৷ এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন আবু বকর আল-বাগদাদি৷ জঙ্গি গোষ্ঠীটির লক্ষ্য হচ্ছে ইরাক, সিরিয়া এবং অন্যান্যা অঞ্চল নিয়ে একটি ইসলামিক স্টেট বা খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা৷

রাজনীতি

আইএস কোথায় কাজ করে?

বিশ্বের ১৮টি দেশে আইএস সক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা হয়৷ ইরাক এবং সিরিয়ার কিছু অংশ এই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এটি সিরিয়ার রাকা শহরকে রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করে৷ তবে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে এখন অবধি নিজেদের দখলে থেকে এক চতুর্থাংশ এলাকা তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে৷

রাজনীতি

কারা তাদের বিরুদ্ধে লড়ছে?

আইএস-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বেশ কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে৷ বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশের সমন্বয়ে তৈরি মার্কিন নেতৃত্বাধীন একটি ‘কোয়ালিশন’ আইএস অধ্যুষিত এলাকায় বিমান হামলা চালাচ্ছে৷ এই কোয়ালিশনে কয়েকটি আরব দেশও রয়েছে৷ অন্যদিকে সিরিয়া সরকারের পক্ষে সেদেশে বিমান হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া৷ তবে ভূমিতে তাদের বিরুদ্ধে লড়ছে কুর্দিশ পেশমার্গার মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো৷

রাজনীতি

আইএস-এর অর্থের উৎস কী?

জঙ্গি গোষ্ঠীটির অর্থ আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে তেল এবং গ্যাস৷ এটি এখনো সিরিয়ার তেল উৎপাদনের এক তৃতীয়াংশ দখলে রেখেছে৷ আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিমান হামলার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে জঙ্গি গোষ্ঠীর এই মূল্যবান সম্পদ৷ এছাড়া কর, মুক্তিপন এবং লুট করা পুরাকীর্তি বিক্রি করেও অর্থ আয় করে এই জঙ্গি গোষ্ঠীটি৷

রাজনীতি

আইএস কোথায় কোথায় জঙ্গি হামলা চালিয়েছে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসংখ্য জঙ্গি হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস৷ চলত বছর সবচেয়ে ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলাটি চালানো হয়েছে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে, যেখানে দু’শোর বেশি মানুষ নিহত ও অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছে৷ আইএস-এর নেতারা জঙ্গি গোষ্ঠীটির আদর্শে বিশ্বাসীদের এককভাবে বিভিন্নস্থানে আঘাত হানতে উৎসাহ প্রদান করে৷

রাজনীতি

অন্যান্য আর কী কৌশল ব্যবহার করে আইএস?

নিজেদের ক্ষমতার পরিধি বাড়াতে অনেক কৌশল ব্যবহার করে আইএস৷ জঙ্গি গোষ্ঠীটি ‘কালচারাল ক্লিনজিংয়ের’ নামে সিরিয়া এবং ইরাকের অনেক ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম লুট ও ধ্বংস করেছে৷ এছাড়া সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর কয়েকহাজার মেয়েকে ক্রীতদাসী বানিয়েছে৷ গোষ্ঠীটি নিজেদের ‘প্রোপোগান্ডা’ এবং নিয়োগের কাজে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে থাকে৷

রাজনীতি

শরণার্থী হয়েছেন কতজন?

সিরিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে সেদেশের প্রায় ৬০ লাখ মানুষ প্রতিবেশী লেবানন, জর্ডান এবং তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছেন৷ অনেক সিরীয় ইউরোপেও পাড়ি জমিয়েছেন৷ এছাড়া প্রায় ৩০ লাখ ইরাকে ইরাকের মধ্যেই অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন বলে খবর৷