জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষুধা, সংঘাত বাড়ার আশঙ্কা

বিশ্বব্যাপী কার্বন নির্গমন যতই বাড়ছে, ততই বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা৷ এ কারণে এই শতকেই বিশ্বের অনেক মানুষ খাদ্যাভাবে পড়বে, বাড়বে স্বাস্থ্য ঝুঁকি৷ আর তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানুষে মানুষে হানাহানি৷

সোমবার প্রকাশিত জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রতিবেদনে এ সব তথ্য জানানো হয়েছে৷ তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী যে জলবায়ু পরিবর্তন হবে, তার ফলে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হবে বলেও জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে৷ নীতি নির্ধারকরা বলেছেন, গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের ফলে প্রাকৃতিক যে বিপর্যয় হবে তার রূপটা হবে ভয়াবহ৷ জাতিসংঘের ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ আইপিসিসি-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে৷ ৩২ ভলিউমের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব এই অবস্থা মোকাবিলার জন্য মোটেও প্রস্তুত নয়৷

আইপিসিসি-র সভাপতি রাজেন্দ্র পাচৌরি বলেছেন, বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা যদি ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায় তবে ঝুঁকির পরিমাণও সেই অনুপাতে বাড়বে৷ জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব থেকে বিশ্বের কোনো মানুষই রেহাই পাবেন না৷

সবচেয়ে ভয়ংকর টর্নেডো

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টর্নেডোর ঘটনা ঘটে ১৯৮৯ সালে৷ সেবছরের ২৬ এপ্রিল মানিকগঞ্চ জেলার দৌলতপুর এবং সাটুরিয়া এলাকার উপর দিয়ে বয়ে যায় প্রলয়ংকরী টর্নেডো৷ এতে প্রাণ হারায় ১,৩০০ মানুষ৷

পুরোপুরি ধ্বংস

২৬ এপ্রিলের টর্নেডোতে কার্যত ছয় বর্গকিলোমিটার এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়৷ সেসময় অবজারভার পত্রিকায় এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘‘ধ্বংসযজ্ঞ এতই নিঁখুত যে, সেখানে কিছু গাছের চিহ্ন ছাড়া দাঁড়ানো আর কোনো বস্তু নেই৷’’

ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় টর্নেডো

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ক্যানাডার পর অন্যতম টর্নেডোপ্রবণ দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ৷ সর্বশেষ গত ২২ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টর্নেডোতে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারায়৷

পূর্বাভাষের প্রযুক্তি নেই

টর্নেডোর পূর্বাভাষের কোনো প্রযুক্তি নেই বাংলাদেশে৷ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এ কে এম মাকসুদ কামাল এই বিষয়ে বলেন, ‘‘আমাদের দেশে না থাকলেও এখন টর্নেডোর পূর্বাভাষ দেয়া সম্ভব৷ অ্যামেরিকা এবং ইউরোপ এক ধরনের রাডার ব্যবহার করে অন্তত ৪৫ মিনিট আগে টর্নেডোর পূর্বাভাষ দিতে পারে৷ আর এ ধরনের পূর্বাভাষ দিয়ে জীবন ও সম্পদ রক্ষার নজির আছে৷’’

ঘূর্ণিঝড়ের নিয়মিত শিকার বাংলাদেশ

টর্নেডো ছাড়াও ঘূর্ণিঝড়েরও নিয়মিত শিকার হয় বাংলাদেশ৷ উইকিপিডিয়ায় প্রকাশিত বাংলাদেশে মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ের তালিকায় ১৫৮২ সালের কথা উল্লেখ রয়েছৈ৷ সেসময় বাকেরগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারায় দু’লাখ মানুষ৷

স্বাধীনতা পরবর্তী বড় দুর্যোগ

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল৷ সেসময় চট্টগ্রামে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে প্রাণ হারায় কমপক্ষে ১৩৮,০০০ মানুষ৷ প্রায় এক কোটি মানুষ ঘরছাড়া হয়৷ ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটারের মতো৷

আইলার আঘাত

সর্বশেষ ২০০৯ সালে সাইক্লোন আইলায় কয়েকশত মানুষ প্রাণ হারায়৷ সাইক্লোনের পরপরই ডায়েরিয়া ছড়িয়ে পড়লে প্রাণ হারায় কমপক্ষে চার ব্যক্তি৷ এভাবে নিয়মিতই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ৷

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এখন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে৷ বিশেষ করে উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় বিশাল এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে৷

জাপানের ইয়োকোহামায় পাঁচ দিনের জলবায়ু সংক্রান্ত বৈঠকের পর এই প্রতিবেদন প্রকাশ হয়৷ এতে বলা হয়েছে, বৃষ্টিপাতের পরিমাণে দেখা দিয়েছে তারতম্য, ফলে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপে৷ শুধু তাই নয়, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলিতে পানি সংকট এবং খরা দেখা দেবে বলেও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে৷ এর ফলে ফসল ভালোমত হবে না, দেখা দেবে খাদ্য ঘাটতি৷

যদিও প্রতি ১০ বছরে ফসলের উৎপাদন ১০ ভাগ বেড়েছে, কিছু জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় তা অপ্রতুল৷ বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি হবে এর ফলে মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তি কঠিন হয়ে পড়বে৷ বেড়ে যাবে খাদ্যদ্রব্যের দাম৷ দরিদ্র মানুষেরা চরম খাদ্যাভাবে পড়বেন৷ জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় খাদ্যের ঘাটতির কারণে শুরু হবে হানাহানি৷ এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মশার উৎপাত এবং পানিবাহিত রোগ ব্যাপক হারে ছড়াবে৷ ফলে দেখা দিবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি৷

বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে প্রবালসহ বেশ কিছু প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী নিশ্চিহ্ন হওয়া আশঙ্কা রয়েছে৷ এই প্যানেল গত বছরের সেপ্টেম্বরে একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী মানুষের কর্মকাণ্ড৷

Bildergalerie Wilderei

গলছে বরফ, হারিয়ে যাচ্ছে শ্বেত ভাল্লুকের মতো বহু জীব

তৃতীয় প্রতিবেদনটি এপ্রিলে প্রকাশিত হবে বার্লিনে৷ যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কত মানুষ উদ্বাস্তু হবে তার একটা পরিসংখ্যান তুলে ধরা হবে৷

তাপমাত্রা বৃদ্ধি

রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই শতকে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে ০.৩ থেকে ৪.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷ এমনকি শিল্পকারখানা যেখানে বেশি সেখানে গড়ে ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে৷ ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রে পানির উচ্চতা বাড়বে ২৬ থেকে ২৮ সেন্টিমিটার৷

বাকি বিশ্ব থেকে দ্বিগুণ

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সারা বিশ্বে তাপমাত্রা যে হারে বাড়ছে, আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলে সেই মাত্রাটা প্রায় দ্বিগুণ৷ এভাবে বরফ গলার কারণে আর্কটিকে যাওয়ার পথ সহজ ও সংক্ষিপ্ত হচ্ছে৷ ফলে সেখানে থাকা সম্পদ আহরণের কাজে সুবিধা হবে৷ তাই খুশি এ খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠী৷

খুশি আর্কটিকের দেশগুলোও

ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পাঁচটি আর্কটিক দেশ – ক্যানাডা, ডেনমার্ক, নরওয়ে, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র – বিভিন্নভাবে সেখানে তাদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে৷ উল্লেখ্য, আর্কটিকের কতটুকু অংশ কার নিয়ন্ত্রণে সেটা নিয়ে এখনো দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ রয়েছে৷

প্রায় এক চতুর্থাংশ

ভূতত্ত্ববিদদের ধারণা, বিশ্বে এখনো যে পরিমাণ তেল ও গ্যাস আছে তার প্রায় এক চতুর্থাংশ রয়েছে আর্কটিকের বরফের নীচে৷

সামরিক উপস্থিতি

সীমানা নিয়ে বিরোধ থাকার কারণে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্থিক লাভের বিষয়টি সামনে আসায় ডেনমার্ক, ক্যানাডা, রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্র সেখানে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে৷ ছবিতে মার্কিন একটি সাবমেরিনকে বরফের নীচ থেকে বের হতে দেখা যাচ্ছে৷

গ্রিনপিসের বিরোধিতা

আর্কটিকে তেলের ড্রিলিং এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রিনপিসের৷ কারণ ড্রিলিং করতে গিয়ে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে উত্তর মেরুর পরিবেশের উপর তার বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে সংগঠনটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে৷ কেননা দুর্গম ঐ পরিবেশে উদ্ধার তৎপরতা চালানোও বেশ কঠিন হবে৷

উত্তর মেরুতে বিমানযাত্রা

ছবিতে বিমান থেকে বরফ সরাতে দেখা যাচ্ছে৷ আর্কটিক সার্কেলে ওড়াওড়ি করা বিমানের জন্য এটা একটা নিয়মিত ব্যাপার৷ তবে গবেষণায় দেখা গেছে, আর্কটিকের উপর বিমান চলাচলের কারণে সেখানকার পরিবেশে কার্বনের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে৷ এই কালো কার্বনের পার্টিকেল সূর্যের আলো শোষণ করে বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে৷

চীনের আগমন

আর্কটিকের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়া সেখান থেকে লাভবান হতে চায় চীনও৷ তাইতো ‘স্নো ড্রাগন’ নামের এই জাহাজটি ২০১২ সালে আর্কটিকের মধ্য দিয়ে যাত্রা করে ইউরোপে পৌঁছেছে৷ এ বছর মে মাসে চীনকে আর্কটিক কাউন্সিলের অবজারভার স্ট্যাটাস দেয়া হয়৷

ভারতের গবেষণা

২০০৮ সালে আর্কটিকের নরওয়ের অংশে এই গবেষণা কেন্দ্রটি চালু করে ভারত৷ এর বাইরে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও আর্কটিক নিয়ে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে৷

সম্মেলনের উপ-সভাপতি ক্রিস ফিল্ড বলেছেন, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এমন কিছু ঘটনা ঘটবে যা মানুষকে সহিংস করে তুলবে৷ যার ফলাফল হবে ভয়াবহ৷ এইসব পরিস্থিতি এতই চরম রূপ ধারণ করবে যা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না৷''

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, ‘‘প্রতিবেদনে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তা আসলেই ভয়াবহ যা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই৷ তাই দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার বিকল্পও নেই৷''

রিপোর্টে অবশ্য এ কথাও বলা হয়েছে যে, গ্রিন হাউজের কার্বন নির্গমন যদি কমানো যায় তবে নাটকীয়ভাবে এই শতকের শেষ দিকে এসব ঝুঁকি কমে আসবে৷ ২০০৭ সালে আইপিসিসি-র প্রকাশিত প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে বিশ্বনেতারা একমত হন বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে তারা পদক্ষেপ নেবেন৷ কিন্তু কার্বন নিঃসরণ রোধের ব্যাপারে এখনও একমত হতে পারেনি বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো৷

এপিবি/ডিজি (এপি, এএফপি, ডিপিএ, রয়টার্স)

সোমবার প্রকাশিত জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রতিবেদনে এ সব তথ্য জানানো হয়েছে৷ তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী যে জলবায়ু পরিবর্তন হবে, তার ফলে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হবে বলেও জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে৷ নীতি নির্ধারকরা বলেছেন, গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের ফলে প্রাকৃতিক যে বিপর্যয় হবে তার রূপটা হবে ভয়াবহ৷ জাতিসংঘের ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ আইপিসিসি-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে৷ ৩২ ভলিউমের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব এই অবস্থা মোকাবিলার জন্য মোটেও প্রস্তুত নয়৷