জলবায়ু পরিবর্তন চোখ রাঙাচ্ছে স্ট্যাচু অফ লিবার্টিকে

জলবায়ুর পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাবে এবার হুমকির মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’-র মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা, যে দেশটি কার্বন গ্যাস নিঃসরণ কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘদিন গড়িমসি করেছে৷

যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক সংস্থা ‘ইউনিয়ন অফ কনসার্নড সায়েন্টিস্ট' এ রকম দুই ডজন স্থাপনার তালিকাসহ একটি প্রতিবদেন প্রকাশ করেছে, যেগুলো দাবানল, উপকূলীয় ভূমিক্ষয় এবং বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন৷ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ুর পরিবর্তন এই ঝুঁকির মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে৷

নিউ ইয়র্কের লিবার্টি আইল্যান্ডে হাডসন নদীর মুখে সোয়া শ' বছরের পুরনো ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি'-র পাশাপাশি এই তালিকায় রয়েছে নিউ ইয়র্ক হারবারের কাছে ‘অ্যালিস আইল্যান্ড'-এর নাম৷ এই দ্বীপ হয়ে ১৮৮৬ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ অভিবাসী অ্যামেরিকায় প্রবেশ করেন৷

বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত একশ বছরে নিউ ইয়র্ক শহর ঘিরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার বা এক ফুট৷ ২০০২ সালে হ্যারিকেন স্যান্ডির সময় লিবার্টি ও অ্যালিস আইল্যান্ড জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হলে দুই দ্বীপের অধিকাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ সংস্কারের জন্য দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা হয় এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র৷

সবচেয়ে ভয়ংকর টর্নেডো

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টর্নেডোর ঘটনা ঘটে ১৯৮৯ সালে৷ সেবছরের ২৬ এপ্রিল মানিকগঞ্চ জেলার দৌলতপুর এবং সাটুরিয়া এলাকার উপর দিয়ে বয়ে যায় প্রলয়ংকরী টর্নেডো৷ এতে প্রাণ হারায় ১,৩০০ মানুষ৷

পুরোপুরি ধ্বংস

২৬ এপ্রিলের টর্নেডোতে কার্যত ছয় বর্গকিলোমিটার এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়৷ সেসময় অবজারভার পত্রিকায় এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘‘ধ্বংসযজ্ঞ এতই নিঁখুত যে, সেখানে কিছু গাছের চিহ্ন ছাড়া দাঁড়ানো আর কোনো বস্তু নেই৷’’

ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় টর্নেডো

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ক্যানাডার পর অন্যতম টর্নেডোপ্রবণ দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ৷ সর্বশেষ গত ২২ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টর্নেডোতে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারায়৷

পূর্বাভাষের প্রযুক্তি নেই

টর্নেডোর পূর্বাভাষের কোনো প্রযুক্তি নেই বাংলাদেশে৷ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এ কে এম মাকসুদ কামাল এই বিষয়ে বলেন, ‘‘আমাদের দেশে না থাকলেও এখন টর্নেডোর পূর্বাভাষ দেয়া সম্ভব৷ অ্যামেরিকা এবং ইউরোপ এক ধরনের রাডার ব্যবহার করে অন্তত ৪৫ মিনিট আগে টর্নেডোর পূর্বাভাষ দিতে পারে৷ আর এ ধরনের পূর্বাভাষ দিয়ে জীবন ও সম্পদ রক্ষার নজির আছে৷’’

ঘূর্ণিঝড়ের নিয়মিত শিকার বাংলাদেশ

টর্নেডো ছাড়াও ঘূর্ণিঝড়েরও নিয়মিত শিকার হয় বাংলাদেশ৷ উইকিপিডিয়ায় প্রকাশিত বাংলাদেশে মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ের তালিকায় ১৫৮২ সালের কথা উল্লেখ রয়েছৈ৷ সেসময় বাকেরগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারায় দু’লাখ মানুষ৷

স্বাধীনতা পরবর্তী বড় দুর্যোগ

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল৷ সেসময় চট্টগ্রামে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে প্রাণ হারায় কমপক্ষে ১৩৮,০০০ মানুষ৷ প্রায় এক কোটি মানুষ ঘরছাড়া হয়৷ ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটারের মতো৷

আইলার আঘাত

সর্বশেষ ২০০৯ সালে সাইক্লোন আইলায় কয়েকশত মানুষ প্রাণ হারায়৷ সাইক্লোনের পরপরই ডায়েরিয়া ছড়িয়ে পড়লে প্রাণ হারায় কমপক্ষে চার ব্যক্তি৷ এভাবে নিয়মিতই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ৷

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এখন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে৷ বিশেষ করে উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় বিশাল এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে৷

এ দুটি দ্বীপের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা এখন এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০ ফুট উঁচু প্লাবনেও সমস্যা না হয়৷

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভার্জিনিয়ার এক সময়ের ব্রিটিশ উপনিবেশ জেমসটাউন আইল্যান্ড, সাউথ ক্যারোলাইনার সবচেয়ে পুরনো শহর চার্লসটন, দাস ব্যবসার অবসান ও অ্যামেরিকার গৃহযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ফোর্ট মনরোও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে৷

কেবল ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, উপকূলীয় এলাকায় নাসার সাতটি রকেট উৎক্ষেপণ ও নভোচারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পাঁচটিই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন৷

ভার্জিনিয়ায় নাসার রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের কাছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৯৪৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ২৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে৷ ওই কেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত ১৬০০টি রকেট উৎক্ষপণ করেছে নাসা৷

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকেই কেনেডি স্পেস সেন্টারের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসাবে বিবেচনা করছে নাসার পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর৷ এ কারণে ফ্লোরিডা থেকে হিউস্টন পর্যন্ত এলাকার মধ্যে নাসার প্রতিটি স্থাপনার বাইরে উঁচু প্রাচীর তৈরি করা হচ্ছে৷ সরিয়ে নেয়া হচ্ছে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ভবনগুলো৷

Start NASA Space Shuttle Atlantis Juli 2011

নাসার রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে

নাসার কর্মকর্তা রাসেল ডি ইয়ুং বলেন, ‘‘এক কথায় উঠে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়৷ এখানকার স্থাপনাগুলো বিশাল৷ ফলে উপকূল থেকে আমাদের একটু একটু করে সরে আসতে হচ্ছে৷''

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঝুঁকি কমাতে নতুন স্থাপনা নির্মাণ, সংস্কার ও প্রস্তুতিতে বহু টাকা প্রয়োজন হবে ঠিক, কিন্তু কিছু না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে মূল্য দিতে হবে অনেক বেশি৷

ইউনিয়ন অফ কনসার্নড সায়েন্টিস্ট-এর পরিচালক অ্যাডাম মার্কহ্যাম বলেন, ‘‘যে বিপদের কথা আমরা বলছি তা কেবল হিমশৈলের দৃশ্যমান অংশ৷ আমাদের এখন দুর্যোগ প্রশমন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে৷ আর তা বাস্তবায়নে যেখানে যে পরিমাণ তহবিল লাগে, তার যোগান দিতে হবে৷''

জেকে/ডিজি (এএফপি, এপি)

যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক সংস্থা ‘ইউনিয়ন অফ কনসার্নড সায়েন্টিস্ট' এ রকম দুই ডজন স্থাপনার তালিকাসহ একটি প্রতিবদেন প্রকাশ করেছে, যেগুলো দাবানল, উপকূলীয় ভূমিক্ষয় এবং বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন৷ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ুর পরিবর্তন এই ঝুঁকির মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে৷