জলবায়ু পরিবর্তন থেকে যে বিপদ ঘনাচ্ছে

ভিডিও দেখুন 02:28
এখন লাইভ
02:28 মিনিট
11.02.2016

জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ

জলবায়ু পরিবর্তন কথাটা আজকাল ঘুরেফিরে হাজার বার আসে৷ কিন্তু এই পৃথিবীতে মানুষের জীবন ও সভ্যতার পক্ষে যে সেটা কত বড় বিপদ, তা কি আমরা উপলব্ধি করি? তাহলে এই বিপদ এড়ানোর পন্থাই বা কী?

ক্রমেই বিশ্বের আরো বেশি এলাকা শুষ্ক ও অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে৷ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে অসংখ্য মানুষের জীবিকা ও জীবন বিপন্ন হচ্ছে – বিশেষ করে বিশ্বের দরিদ্রতর অংশে৷ ছেষট্টি কোটি মানুষের বিশুদ্ধ পানীয় জল পাবার কোনো উপায় নেই৷ অথচ পানের উপযোগী পানীয় জলের পরিমাণও কমে আসছে৷ প্রায় ৮০ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছেন না৷

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমেই আরো বেশি এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে৷ উর্বর জমি লবণে ভরে যাচ্ছে৷ অথবা মাটি এতই শুকনো, যে সে মাটিতে ফসল বোনা প্রায় অসম্ভব৷

প্রশ্ন

পৃথিবী আসলে কতটা উষ্ণ হয়ে উঠেছে?

উত্তর

১৮৫০ সালে শিল্প-বিপ্লবের শুরু থেকে বিশ্বের তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে৷ তাই গবেষকদের আশঙ্কা, ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি কমানোর লক্ষ্যমাত্রা বিফল হবে৷ জলবায়ু গবেষণার ভিত্তিতে বড়জোর দেড় ডিগ্রির সীমা ধরে রাখার চেষ্টা করা উচিত বলে মনে করেন সমালোচকরা৷

প্রশ্ন

২১০০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পরিণতি কী হতে পারে?

উত্তর

পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বেশি মাত্রায় বাড়লে উপকূলবর্তী এলাকায় প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ বিপদে পড়তে পারেন৷ প্রায় ২০০ কোটি মানুষ জলের অভাবে সমস্যায় পড়বেন৷ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে৷

প্রশ্ন

গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবের উৎস কী?

উত্তর

কয়লা, পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস৷ জীবাশ্মভিত্তিক জ্বালানির সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ঘরবাড়ি গরম রাখা, পরিবহণ ব্যবস্থা চালানো এবং শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদনের ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড সৃষ্টি হয় এবং বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে৷ গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রায় ৬৫ শতাংশই কার্বন-ডাই-অক্সাইড৷ এছাড়া মিথেন, লাফিং গ্যাস ও ক্লোরোফ্লুরোকার্বন এর জন্য দায়ী৷

প্রশ্ন

আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার কারণে কোন দেশগুলি গত বছর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?

উত্তর

সার্বিয়া, আফগানিস্তান এবং বসনিয়া-হ্যারৎসোগোভিনা ২০১৫ সালে আবহাওয়া বিপর্যয়ের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ প্যারিস-ভিত্তিক পরিবেশ সংগঠন ‘জার্মানওয়াচ’ প্রকাশিত বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকির তালিকায় এই তথ্য উঠে এসেছে৷ তবে ১৯৯৫ সাল থেকে হন্ডুরাস, মিয়ানমার, হাইতি ও ফিলিপাইন্সের মতো দক্ষিণ গোলার্ধের দরিদ্র দেশগুলি বন্যা, বিধ্বংসী ঝড় ও তাপপ্রবাহের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷

প্রশ্ন

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র কেন বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়?

উত্তর

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গ্রিনহাউস গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইড সমুদ্রের পানির মধ্যে রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে৷ এই প্রক্রিয়ায় জলের ‘পিএইচ ভ্যালু’ কমে যায়৷ অ্যালজির মতো ক্ষুদ্র প্রাণী ও প্রবাল প্রাচীরের উপর তার প্রভাব পড়ে৷ জলে অম্লের মাত্রা যত বাড়ে, ক্যালশিয়াম বাইকার্বোনেট তত পাতলা হয়ে যায়৷ তখন প্রবালের মৃত্যু হয়৷ ফলে সমুদ্রের গোটা ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷

প্রশ্ন

বার্লিন থেকে প্যারিস যেতে হলে গাড়ি, বিমান অথবা ট্রেন – পরিবহণের কোন মাধ্যম পরিবেশের সবচেয়ে ক্ষতি করে?

উত্তর

এই দূরত্ব অতিক্রম করতে এয়ারবাস এথ্রিটুজিরো বিমানে যাত্রীপিছু ২৪৮ কিলোগ্রাম কার্বন-ডাই-অক্সাইড সৃষ্টি হয়৷ ফলক্সভাগেন কোম্পানির গল্ফ মডেলের নতুন গাড়িতে চড়ে গেলে নির্গমনের পরিমাণটা দাঁড়ায় ১৭৯ কিলো৷ অন্যদিকে সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব বাহন হলো ট্রেন৷ সে ক্ষেত্রে নির্গমনের পরিমাণ প্রায় ১১ কিলো৷

আফ্রিকা ও পূর্ব এশিয়ায় আগামী ১৫ বছরে দশ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের কবলে পড়বেন, যদি না তাদের শীঘ্র সাহায্য করা হয় – বলছে বিশ্বব্যাংক৷ ক্ষুধা-তৃষ্ণার তাড়নায় বহু মানুষ এই সব এলাকা বা দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করবেন৷ জমি, পানি, খাদ্য নিয়ে সংঘাত আরো বাড়বে, কেননা জমি আরো কম ফসল দেবে৷

আবহাওয়ার দুর্যোগ আরো ঘন ঘন আসবে৷ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাগরের পানির উচ্চতা বাড়বে, ঘূর্ণিঝড় আর প্লাবনে দ্বীপ ও উপকূল বিপদগ্রস্ত হবে৷ ব্যাপক এলাকা পানির নীচে ডুবে যেতে পারে৷ শহর ও শিল্পকেন্দ্রগুলিও রেহাই পাবে না৷ এ সবের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি আরো দুর্বল হয়ে পড়বে৷ জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর সব মানুষের বিপদ ডেকে আনছে৷ বিশেষ করে সংঘাতপ্রবণ এলাকা ও রাজনৈতিক স্থিতিবিহীন দেশগুলির পক্ষে যা আরো বিপজ্জনক হবে৷ যে সব দেশের অর্থনীতি আকারে ছোট কিংবা দুর্বল, তারাও সমস্যায় পড়তে পারে৷

এই জলবায়ু পরিবর্তন রোখার জন্য প্যারিস-চুক্তির মতো বোঝাপড়া প্রয়োজন৷

দুই মাস আগে, পরে

জলবায়ু যে পরিবর্তন হচ্ছে তা বোঝার অন্যতম উপায় প্রবালের দিকে খেয়াল করা৷ উপরে যে ছবিটি দেখছেন তার বাম পাশেরটি ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে তোলা, আর ডানেরটি দুই মাস পর, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসের৷ এবার নীচে কোরালগুলোর দিকে তাকান৷ বামেরগুলো এক রংয়ের আর ডানেরগুলো সাদা হয়ে গেছে৷ হ্যাঁ, এটা জলবায়ু পরিবর্তিত হয়ে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে হয়েছে৷ ছবিটি অ্যামেরিকান সামোয়া এলাকার৷

সাদা হয়ে যাওয়া

এই ছবিটি হাওয়াই এলাকার৷ এখানেও সাদা হয়ে যাওয়া কোরাল দেখা যাচ্ছে৷ কোরাল তার গায়ে থাকা জলজ উদ্ভিদ, অ্যালজির কারণে বেঁচে থাকে৷ কিন্তু তাপমাত্রা বেড়ে গেলে কোরাল থেকে ঐ উদ্ভিদ ঝরে পড়ে৷ ফলে কোরালেরও আয়ু শেষ হতে থাকে৷

একেবারে স্পষ্ট

এতক্ষণ দূর থেকে সাদা অংশ দেখেছেন৷ এখন দেখুন একেবারে কাছ থেকে তোলা ও বর্ধিত করা একটি ছবি৷ এটি কোরালের একটি অংশ৷ দেখুন, গায়ে থাকা জলজ উদ্ভিদ আর না থাকায় কীরকম সাদা হয়ে গেছে কোরালটি৷

চারদিক কেমন যেন খাঁ-খাঁ করছে

মন খারাপ করা একটি ছবি৷ অ্যালজি না থাকায় মরে গেছে কোরাল৷ পড়ে আছে শুধু কঙ্কাল৷

কয়েক দশক সময় প্রয়োজন

এবার আরেকটি ছবি৷ বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি থেকে কোরাল রিফের বেঁচে উঠতে (আদৌ যদি বেঁচে ওঠে) কয়েক দশক সময় লাগতে পারে৷

প্রমাণ সংগ্রহ

বিশ্বের কোরাল রিফগুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণে ২০১২ সালে ক্যাটলিন গ্রুপের সহায়তায় ‘এক্সএল ক্যাটলিন সিভিউ সার্ভে’ নামে একটি সমীক্ষা শুরু হয়৷ এর মাধ্যমে উচ্চপ্রযুক্তির ক্যামেরা ও রোবট ব্যবহার করে কোরালের বর্তমান অবস্থা তুলে আনা হচ্ছে৷ অনেক ছবি গুগল স্ট্রিট ভিউ-তে আপলোড করা হয়েছে৷

হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে তাপমাত্রা বাড়ছে তার প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি অংশ শুষে নেয় সাগর৷ ফলে জলবায়ু যে পরিবর্তন হচ্ছে তা বোঝার একটি ভালো উপায় হচ্ছে কোরাল৷ সমুদ্রের প্রায় ২৫ শতাংশ প্রজাতির বেঁচে থাকার পেছনে রয়েছে কোরাল রিফ৷ তাই কোরাল না থাকে মানে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়া৷

প্রাণিকুলের খাবার

দেখছেন অ্যামেরিকান সামোয়ার ‘এয়ারপোর্ট রিফ’৷ স্বাস্থ্যবান এ সব কোরালের মধ্যে যে গাছপালা থাকে সেখান থেকেই খাবার সংগ্রহ করে পানির নীচে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী৷

খাবার পাবে কোথায়?

লম্বা নাকের সুন্দর এই মাছটি কোরাল থেকে খাবার সংগ্রহ করে থাকে৷ কিন্তু কোরালই যদি না থাকে তাহলে তার কী হবে?

ক্রমেই বিশ্বের আরো বেশি এলাকা শুষ্ক ও অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে৷ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে অসংখ্য মানুষের জীবিকা ও জীবন বিপন্ন হচ্ছে – বিশেষ করে বিশ্বের দরিদ্রতর অংশে৷ ছেষট্টি কোটি মানুষের বিশুদ্ধ পানীয় জল পাবার কোনো উপায় নেই৷ অথচ পানের উপযোগী পানীয় জলের পরিমাণও কমে আসছে৷ প্রায় ৮০ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছেন না৷