‘জলবায়ু ফান্ডের সঠিক ব্যবহার চাই আমরা’

আন্তর্জাতিক অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের সাবেক কর্মকর্তা আসিফ মুনির দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফান্ডের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের দাবি করে বলেছেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে যে দেশগুলোর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম৷

ডয়চে ভেলের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের একটা অংশ সমুদ্রে বিলীন হয়ে যেতে পারে, আবার নতুন করে কিছু এলাকা জেগেও উঠতে পারে৷ আর এ সবের ফলে এখানে জলবায়ু শরণার্থী বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা৷'' আন্তর্জাতিক অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন বা আইওএম-এর এই সাবেক কর্মকর্তা ও জলবায়ু বিশ্লেষকের কথায়, ‘‘আমাদের দেশে যেটা হয়, সুশাসনের অভাবে দেশীয় ফান্ড বা আন্তর্জাতিক যে ফান্ড আছে, তার সদ্ব্যবহার সব সময় ঠিকমতো হয় না৷ বর্তমানে যথেষ্ট পরিমাণ ফান্ড আসছে৷ তার যেন ঠিকমতো ব্যবহার হয়, সেটাই চাই আমরা৷''

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

ডয়চে ভেলে: জলবায়ু শরণার্থী বলে একটা কথা প্রচলিত আছে৷ এর উদ্ভব কবে থেকে?

আসিফ মুনির: আসলে গত ১০-১৫ বছর ধরে, বিশেষ করে যখন থেকে জলবায়ু সম্মেলন শুরু হয়েছে, তখন থেকেই জলবায়ু শরণার্থী নামটি চলে আসছে৷ অনেক সময় দেশের মধ্যেই মানুষকে তাঁর স্থান পরিবর্তন করতে হয়৷ প্রাকৃতিক কারণে বা ভাঙনের কারণে প্রতিনিয়তই মানুষ তাঁর বাড়ি-ঘর হারাচ্ছে৷ এটা কিছুটা মনুষ্য সৃষ্ট৷ জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বৈশ্বিক৷ এর প্রভাব সবখানেই পড়ছে৷ এ সব কারণে গত ১০-১৫ বছরে এই টার্মটা একটু বেশি ব্যবহার হচ্ছে৷ 

বাংলাদেশে কি জলবায়ু শরণার্থী আছে? থাকলে এঁরা আসলে কারা?

এখনও সরাসরি বলা হচ্ছে না যে, বাংলাদেশে জলবায়ু শরণার্থী রয়েছে৷ কারণ জলবায়ুর কারণে যে প্রভাব পড়ছে, আমরা বাংলাদেশে সেটা চাক্ষুষ দেখতে পাচ্ছি না৷ নদী ভাঙন হচ্ছে, জলোচ্ছ্বাস হচ্ছে, ঝড় হচ্ছে বা সাইক্লোন হচ্ছে৷ কিন্তু সেটা যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হচ্ছে, তা সরাসরি বলা যাচ্ছে না৷ তবে এটা বলা হচ্ছে যে, আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরে বাংলাদেশের বড় একটা অংশ সমুদ্রে বিলীন হয়ে যেতে পারে৷ হয়ত নতুন কিছু জায়গা জেগে উঠবে৷ এই যে বিলীন হয়ে যাবে, সেটা হবে জলবায়ুর প্রভাবের কারণে৷

জলবায়ুর কারণে শরণার্থী যাঁরা হচ্ছেন, তাঁরা কি যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন?

বাংলাদেশে যেহেতু সরাসরি জলবায়ু শরণার্থী বলা যাচ্ছে না, তাই ক্ষতিপূরণের চেয়ে আমাদের প্রধান দরকার পূর্বপ্রস্তুতি৷ এর জন্য আন্তর্জাতিক ফান্ড রয়েছে, বাংলাদেশের জন্যও যার মধ্যে বরাদ্দ রয়েছে৷ আমাদের দেশে যেটা হয়, সুশাসনের অভাবে দেশীয় ফান্ড বা আন্তর্জাতিক যে ফান্ড আছে তার সদ্ব্যবহার সব সময় ঠিকমতো হয় না৷ মানুষের সাহায্যের ক্ষেত্রে যে কারিগরি দক্ষতা প্রয়োজন, সেগুলো সব সময় প্রস্তুত থাকে না৷ বর্তমানে যথেষ্ট পরিমাণ ফান্ড আসছে৷ তার যেন ঠিকমতো ব্যবহার হয়, সেটাই চাই আমরা৷

বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে অনেকেই নদীর ভাঙন কিংবা যে কোনো ভাবে হোক ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার কারণে ঢাকায় আসেন৷ এরা কী শরণার্থী হিসেবে পরিচিতি পাবেন?

পুরোপুরি না, এক্ষেত্রে আমরা বলছি অভ্যন্তরীণ অভিবাসন৷ তবে ভবিষ্যতে তাঁরা শরণার্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যেতে পারেন৷ আমরা যদি সঠিক ভাবে তাঁদের সহায়তা করতে না পারি৷ তবে এটা ঠিক যে, অনেক এলাকার মানুষ প্রকৃতির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নিজের এলাকায় থাকতে পারছেন না৷ বাস্তবতা যে তাঁরা শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছেন৷ এক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে যে উদ্যোগগুলো নেয়া দরকার, যেমন নদীর ভাঙন ঠেকানো হোক বা বাঁধ নির্মাণ হোক, এই কাজগুলো চালিয়ে যেতে হবে৷ পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করতে হবে যে, জীবন রক্ষার প্রয়োজনে যদি তাঁদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে চলে যেতে হয় তাহলে যেতে হবে৷

রাজনীতি

রোহিঙ্গা শরণার্থী

১৯৯১-৯২ সালে আড়াই লক্ষাধিক মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থী সামরিক জান্তার নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়৷ ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছরের অক্টোবর থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও ৭৪ হাজার নতুন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে৷

রাজনীতি

জলবায়ু উদ্বাস্তু: প্রতি সাতজনে একজন

বাংলাদেশের জলবায়ু শরণার্থীদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্লাইমেট রিফিউজি’ বা এসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে ৪৫ জনের মধ্যে ১ জন জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে৷ আর বাংলাদেশে সংখ্যাটা হবে প্রতি সাতজনে একজন৷ পরিবেশ বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, আগামীতে বাংলাদেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে৷

রাজনীতি

জলবায়ু উদ্বাস্তু: প্রতি বছর ২,০০০ মানুষ আসছে ঢাকায়

আগে কেবল দারিদ্র্যের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় আসত মানুষ৷ আর এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঢাকায় আশ্রয় নিচ্ছে অনেকে৷ প্রতি বছর নতুন করে দুই হাজার মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঢাকায় ঠাঁই নিচ্ছে৷

রাজনীতি

আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু সংস্থা আইওএম-এর রিপোর্ট

বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রতি বছর ঢাকার বাইরে থেকে কমপক্ষে ৪ লাখ মানুষ এই শহরে আসছে৷ আর আইওএম বলছে, ঢাকার বস্তিতে যেসব মানুষ থাকে, তার মধ্যে ৭০ ভাগই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘর-বাড়ি হারিয়ে এই শহরে আশ্রয় নিয়েছে৷

রাজনীতি

ইউরোপে শরণার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বাড়ছে

গত বছরের প্রথম তিন মাসে ইটালিতে গিয়েছিল মাত্র একজন বাংলাদেশি শরণার্থী৷ কিন্তু ২০১৭ সালে সেটা আশ্চর্যজনকভাবে বেড়েছে৷ প্রথম তিন মাসে ইটালিতে বাংলাদেশি শরণার্থী এসেছে ২ হাজার ৮শ’ জন৷ নৌকায় ভূ-মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইটালিতে পৌঁছেছেন তাঁরা৷

রাজনীতি

১০ হাজার ডলারের বিনিময়ে

দালালদের ১০ হাজার মার্কিন ডলার দিয়ে থাকেন এই শরণার্থীরা৷ প্রথমে যান দুবাই বা তুরস্ক, সেখান থেকে লিবিয়া হয়ে ইটালিতে পৌঁছান তাঁরা৷ এই দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দিতে তাঁদের অনেকের কয়েক বছর লেগে যায়, প্রাণ হারান কেউ কেউ৷

রোহিঙ্গারাও শরণার্থী হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে৷ এটা কেন?

শরণার্থীকে যদি আমরা সংজ্ঞা হিসেবে ধরি, তাহলে মূলত যাঁদের নিজের দেশে জীবন বিপন্ন হচ্ছে, এই কারণে তাঁরা অন্য একটি দেশে আশ্রয় নিচ্ছেন – তাঁরাই কিন্তু শরণার্থী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন৷ এই হিসেবে তাঁরা অবশ্যই শরণার্থী৷ কারণ মিয়ানমারে তাঁদের বাড়ি-ঘর ছিল, জমি ছিল৷ এ সব ফেলে তাঁরা জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসেছেন৷ তাঁদের অনেককে সেখানে প্রাণে মেরে ফেলা হচ্ছে, জীবননাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে৷ আন্তর্জাতিক ভাষ্য অনুযায়ী তাঁরা আমাদের দেশে প্রকৃত শরণার্থী৷

মানুষ তো মানুষই, সে কেন শরণার্থী হবে?

এটি আসলে রূঢ় বাস্তবতা৷ মানুষ হিসেবে মানুষকে যে সম্মান দেখানো দরকার, যে সহায়তা করা দরকার, আমরা অনেক সময় সেটা করতে পারি না৷ কারো অবস্থা ভালো থাকে, কারো অবস্থা খারাপ থাকে৷ মিয়ানমার থেকে যাঁরা আমাদের দেশে এসেছেন, তাঁদের তো সেখানে বাড়িঘর ছিল৷ বংশপরম্পরায় তাঁরা সেখানে বাস করেছেন৷ কিন্তু তাঁদের উপর নির্যাতন বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে হত্যার কারণে তাঁরা দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছেন৷ প্রকৃতির কারণেই হোক বা মানুষের কারণেই হোক সারা বিশ্বে শরণার্থী কমে আসবে তেমনটাই আমরা প্রত্যাশা করব৷ 

শরণার্থী বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশে কী ধরনের ভূমিকা পালন করে?

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মূলত মানবিক সহায়তার দিকটি নিশ্চিত করে থাকেন৷ আর শরণার্থীরা যদি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত হয়, তাহলে ইউএনএইচসিআর রয়েছে: তাঁরা আরো কিছু সহায়তা দিয়ে থাকেন৷ খাদ্য, চিকিৎসা এমনকি বাসস্থানের ন্যূনতম ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কাজটি তাঁরা করেন৷ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বা এনজিও অনেকক্ষেত্রে শিক্ষার ব্যবস্থাও করে থাকে৷

মানুষকে শরণার্থী বলার ক্ষেত্রে নীতিমালায় কোনো বাধা আছে কি?

মানুষকে শরণার্থী বলার ক্ষেত্রে নীতিমালায় কোনো বাধা নেই৷ শরণার্থীরা যে দেশে আশ্রয় নেন, সেই দেশের আইন অনুযায়ী বা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাঁদের একটা ক্যাটেগরিতে ফেলা হয়৷ যেমন ধরুন সিরিয়ার শরণার্থীরা যখন বাইরে গিয়ে আশ্রয় নেন, তাঁদের সুবিধার্থেই তাঁদের শরণার্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷ এর জন্য আলাদা নীতিমালার প্রয়োজন নেই৷ কারণ আন্তর্জাতিক একটা নীতিমালা বা কনভেনশন তো আছেই৷

শরণার্থী বলার মাধ্যমে আমরা কি তাঁদের মানুষ হিসেবে অবহেলা করছি না?

শরণার্থী বললে বরং কিছু সুবিধা আছে৷ কারণ যে মানুষগুলোকে শরণার্থী বলা হচ্ছে, তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কিছু কিছু সহায়তা করা সম্ভব হয়৷ তাঁরা অবশ্যই প্রথমত মানুষ৷ মানুষ হিসেবে তাঁদের কিছু অধিকার থাকে৷ শরণার্থী হয়ে পড়ার পর তাঁদের মানুষ হিসেবে যে অধিকার বা মানবাধিকার, সেটা কিন্তু অনেক সময় বিঘ্নিত হয়৷ ক্ষেত্রবিশেষে তাঁদের শরণার্থী হিসেবে চিহ্নিত করাটা তাঁদের জন্যই বেশি জরুরি৷ কারণ তাঁদের কিছু বেশি সুবিধা নিশ্চিত করাটা তখন সম্ভব হয়৷ তবে অবশ্যই তাঁরা প্রথমত মানুষ৷

জলবায়ুর প্রভাবের কারণে বাংলাদেশে তো ভবিষ্যতে জলবায়ু শরণার্থী বাড়ার সম্ভবনা রয়েছে৷ এক্ষেত্রে সরকারের প্রতি আপনার পরামর্শ কী হবে?

সরকার আন্তর্জাতিকভাবে এটা নিয়ে অনেক সক্রিয়৷ বিদেশে যখন এটা নিয়ে কোনো সম্মেলন হয়, তখন সরকারি প্রতিনিধি তো থাকেই৷ অনেক বেসরকারি প্রতিনিধিও সেখানে অংশ নেন৷ আমরা জানি এই বৈশ্বিক সম্মেলনগুলোতে অনেক বেশি টানাপোড়েন থাকে, রাজনৈতিক দেনদরবার থাকে, সেখানে আমাদের সরকারের অনেক বেশি সক্রিয় থাকতে হবে৷ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়টা জরুরি৷ কারণ আমরা জানি না এটা কখন কীভাবে আঘাত হানবে৷ তবে ধীরে ধীরে যে এর প্রভাব বাড়তে থাকবে, সেটা তো আমরা জানিই৷ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে এটা থাকতে হবে৷ প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ সহ সব ধরনের প্রস্তুতি সরকারি বা বেসরকারি ভাবেও নেয়া যেতে পারে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের  ঘরে৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়