জাফর ইকবালদের সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা অব্যাহত থাকুক

ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলার পর তাঁর অগ্রজ হুমায়ূন আহমেদের পুত্র নুহাশ ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া লিখেছেন, ‘‘আমার পরিবার সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা বন্ধ রাখবে না৷''

ঘটনার পরদিনই নুহাশ হুমায়ূন তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে এই প্রতিক্রিয়াটি দেন৷ তাঁর পুরো বক্তব্যে নেই কোনো আবেগের বাগাড়ম্বর৷ নেই কাউকে আঘাত করার মানসিকতা৷ কিন্তু একইসঙ্গে তা দৃঢ়সংকল্পের প্রতিচ্ছবি৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

তিনি ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, যার বাংলা করলে মানে অনেকটা এমন হয়, ‘‘এটা সবার ক্ষেত্রেই হয়৷ আপনি হয়তো একটা ফোন পেলেন বা কেউ টেক্সট মেসেজ পাঠলো যে, আপনার পরিচিত কেউ ভালো নেই৷ আপনি হাসতাপালে ছুটে যান৷

সাধারণত, হার্টের অসুখ বা ব্রেন স্ট্রোক বা অন্য কিছু৷ কিন্তু আজ ভিন্ন কিছু ঘটেছে৷''

রাজনীতি

হামলার দিন

শনিবার বিকালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে এক তরুণ ছুরি নিয়ে অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালায়৷ হামলার পরপরই ফয়জুল নামে ওই তরুণকে ধরে ফেলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা৷ পরে ফয়জুলের মামা, চাচা ও বাবা-মাকেও আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী৷ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করেছে৷

রাজনীতি

পুলিশ পাহারার মাঝেই হামলা

এ ঘটনায় কর্তব্যরত পুলিশদের ভূমিকা এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷ বিশেষ করে ঘটনার সময় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত দুই পুলিশ সদস্যের দূরে দাঁড়িয়ে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকার ছবি (ওপরে) অনেকের মনে হতাশা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে৷ জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ জাফর ইকবাল বিভিন্ন সময়ে হত্যার হুমকি পাওয়ায় ২০১৬ সালে তাঁকে নিরাপত্তা দেয় সরকার৷

রাজনীতি

কারা জড়িত?

ফয়জুল কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কিনা বা তার সঙ্গে আর কেউ ছিল কিনা এসব বিষয়ে র‌্যাব-পুলিশ এখনও সরাসরি কিছু বলেনি৷ হত্যাচেষ্টার ঘটনায় সিলেটের জালালাবাদ থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে যে মামলা করা হয়েছে, সেখানে ফয়জুলসহ অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে৷

রাজনীতি

ছয়টি জখম

শনিবার হামলার পরই ড. জাফর ইকবালকে বিশেষ হেলিকপ্টারে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে আসা হয়৷ সেখানকার চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের মাথা, পিঠ ও হাতে ছুরির আঘাতের ছয়টি জখম রয়েছে, তবে এখন তিনি আশঙ্কামুক্ত৷ অবশ্য পুরোপুরি সুস্থ হতে আরো কয়েক দিন লাগবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা৷

রাজনীতি

প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালে

দেশের জনপ্রিয় লেখক এবং শিক্ষক ড. জাফর ইকবালকে দেখতে রোববার সিএমইচে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ জাফর ইকবালের স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হক এবং মেয়ে ইয়েশিম ইকবালও তখন সেখানে ছিলেন৷

রাজনীতি

স্ত্রী ইয়াসমিন হক যা বললেন

অধ্যাপক ইয়াসমিন হক রোববার জানিয়েছেন, জাফর ইকবাল এখন শংকামুক্ত৷ শিগগিরই তিনি সুস্থ হয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে যাবেন বলেও আশা প্রকাশ করেছেন ইয়ামিন হক৷ হামলার জন্য পুলিশের ব্যর্থতাকে দায়ী করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি৷

রাজনীতি

চলছে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ

শাহজালাল বিজ্ঞান প্রুযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শনিবার থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চলছে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ৷ জাফর ইকবালের সহকর্মীরা সোমবার হামলার প্রতিবাদে কর্মবিরতি পালন করেছেন৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির ডাকে সোমবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এ কর্মবিরতির পালিত হয়৷

রাজনীতি

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিবাদ কর্মসূচি

রোববার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট৷ সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরও সেখানে উপস্থিত ছিলেন৷

রাজনীতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ

ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন বিক্ষোভ, মানববন্ধন করেছে৷

রাজনীতি

শাহবাগে মানববন্ধন

হামলার প্রতিবাদে রোববার শাহবাগে জাতীয় যাদুঘরের সামনে মানববন্ধন করেছে গণজাগরণ মঞ্চ৷

‘‘আমার পরিবারের একজনের ওপর হামলা হয়েছে৷ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, আঘাতের বিষয়টি নিয়ে হলিউড অ্যাকশন মুভির মতো সরাসরি খবর প্রচার করছে৷ আমার নিউজফিড ভেসে যাচ্ছে নানা প্রতিক্রিয়া, ভাবনা ও দোয়ায়৷''

সমাজ-সংস্কৃতি | 04.03.2018

তিনি কোনো অভিযোগ করেননি৷ কিন্তু ফুটিয়ে তুলেছেন হাসপাতালে নেয়ার চিত্র৷ মিডিয়া স্পট থেকে যেমনটি করে তখন প্রচারের প্রতিযোগিতা চালাচ্ছিল, তা অনেকেরই কাছে দৃষ্টিকটু ঠেকেছে৷

ছাত্রদের মধ্যে যারা সঙ্গে ছিলেন, তারা টিভি বা পত্রিকার আলোকচিত্রীদের ক্যামেরা সরিয়ে নেবার অনুরোধ করছিলেন৷ এ রকম ঘটনা প্রথম নয়৷ খবর প্রচারের প্রতিযোগিতায় দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়াটা ঠিক ঘটনা ঘটার মুহূর্তে অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে৷ কিন্তু এ থেকে বেরিয়ে আসাটা জরুরি৷

তবে এ-ও ঠিক গণমাধ্যমের প্রচারণার কারণেই এত দ্রুত খবরটি ছড়িয়েছে৷ কর্তৃপক্ষ তড়িৎ সিদ্ধান্তও নিতে পেরেছেন৷ তাছাড়া গণমাধ্যমের ভূমিকার কারণেই প্রশাসনও বিষয়টি ভালোভাবে তলিয়ে দেখার একটা চাপ অনুভব করে৷

নুহাশের প্রতিক্রিয়ার দ্বিতীয় অংশটি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ঠেকেছে অনেকের কাছে৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘দেখুন, আমি শুধু চাই আমার চারপাশের মানুষগুলো এই দেশে নিরাপদে থাকুক৷ কিন্তু, বাস্তবতা সে কথা বলছে না৷ আমার জন্য এটা রাজনৈতিক, নৈতিক বা আদর্শিক বিষয় নয়৷ আমার কাছে এটা পারিবারিক বিষয়৷ আর আমি এটা বলতে পারি যে, আমার পরিবার অত্যন্ত শক্ত এবং অবিশ্বাস্য রকমের দৃঢ়৷ এবং সামনে যা-ই আসুক না কেন, যন্ত্রণা বা সংঘাত বা মৃত্যু, আমার পরিবার সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা বন্ধ রাখবে না৷ লিখে রাখতে পারেন৷'' অত্যন্ত সুদৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন তিনি৷

হামলার ঘটনার পর অধ্যাপক জাফর ইকবাল বা তাঁর স্ত্রী ইয়াসমিন হকের প্রতিক্রিয়াও উদাহরণ তৈরি করেছে৷ কতটা মানবিক হলে একজন মানুষ তাঁর ওপর হামলাকারীর খোঁজ খবর নিতে পারেন, ছুরির আঘাতে মাথা থেকে রক্ত পড়ার সময়ও ছাত্রদের শান্ত থাকতে বলতে পারেন, হামলাকারীর খোঁজ-খবর নিতে পারেন, ছাত্রদের অনুরোধ করতে পারেন হামলাকারীকে যেন মারধর না করে৷

Zobaer Ahmed

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

সামাজিক গণমাধ্যমেও এই বিষয়টি নিয়ে অনেকে লিখেছেন৷

জাফর ইকবালের স্ত্রী ইয়াসমিন হকও গণমাধ্যমের সামনে যা বলেছেন, তা প্রশংসনীয়৷ তিনি বলেছেন, ‘‘জাফর ইকবাল ক্যাম্পাসে ফিরে যাবেন৷ তাঁর পাঁচটা কোর্স আছে৷'' একটি দম্পতি পেশাগত দায়িত্বে কতটা নিবেদিত এমন সময়েও এ কথা বলতে পারে!

ঘটনার জন্য তিনি কাউকে দোষারোপ করতেও রাজি নন ইয়াসমিন হক৷ বারবারই বলছিলেন, পুলিশ সবসময়ই পাহারা দিয়েছে৷ বরং জাফর ইকবালই মাঝে মাঝে বিরক্ত হতেন, এতটা নিরাপত্তা কেন দেয়া হচ্ছে৷ তাঁর কণ্ঠে উদ্বেগ ছিল না, ছিল না অনুযোগ বা অভিযোগের সুর৷ বরং পুরো পরিবারটিরই বিপর্যয়ের সময়ও শান্ত থেকে লড়ে যাবার মানসিকতা প্রকাশ করতে দেখা গেছে, যা সত্যিই অনুসরণীয়৷

এ ব্যাপারে আপনার কিছু বলার থাকলে লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷