জামায়াত নিষিদ্ধ হলে যা যা হতে পারে

আজকের এই জামায়াতে ইসলামীর নাম জন্মলগ্নে ছিল ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ’৷ তখন তারা পাকিস্তান চায়নি৷ সেই দল পাকিস্তানে একবার নিষিদ্ধ হয়৷ একাত্তরের পর বাংলাদেশেও নিষিদ্ধ ছিল জামায়াত৷ জামায়াত কি আবার নিষিদ্ধ হবে?

এ বিষয়ে নানা জনের নানা অভিমত৷ বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণেও রয়েছে বিভিন্নতা৷ অবশ্য কারো কারো মুখে বা লেখায় প্রায় নিয়মিতই যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা হলো – আওয়ামী লীগ কি জামায়াতকে নিষিদ্ধ করবে? এর উত্তর শুধু আওয়ামী লীগ, আরো ভালো করে বললে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনারই হয়ত জানা আছে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

‘আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে না' – এ কথা তো বিচার প্রক্রিয়া শুরুর পরেও অনেকে অনেকবার বলেছেন৷ বলার কারণও ছিল৷ ‘টালবাহানা' আর কালক্ষেপন তো কম হয়নি৷ তবে বিষয়টিকে একটু অন্যভাবেও দেখা যায়৷ এমনিতেই ট্রাইব্যুনালের দুর্বলতা যতটা চোখে পড়েছে, খুব তাড়াহুড়ো করে বিচার শুরু এবং শেষ করতে গেলে সেই দুর্বলতা হয়ত দ্বিগুণ-ত্রিগুণ হারে প্রকাশিত হতো৷

যা হোক, দেশি-বিদেশি অনেক বাধা সত্ত্বেও এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে৷ গণদাবি ছিল৷ কারো কারো মতে, সেই দাবির চাপেই দেরিতে হলেও বিচার শুরু করে প্রক্রিয়াটাকে এত দূর নিয়ে এসেছে আওয়ামী লীগ৷ আবার কেউ কেউ মনে করেন, গণদাবি আর শেখ হাসিনার দৃঢ়তার কারণেই তা সম্ভব হয়েছে৷ তবে সব কথার শেষ কথা হলো, ‘আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে না' –এই ধারণাটি পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে৷ ‘‘আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধী ইস্যু নিয়ে শুধু রাজনীতিই করবে, কোনোদিন বিচার করবে না'' – এ কথা যাঁরা বলতেন, তাঁরা ওই প্রসঙ্গে একদম চুপ৷

রাজনীতি

জামায়াতের ইতিহাস

১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট জামায়াতে ইসলামী হিন্দ নামে উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামীর যাত্রা শুরু হয়৷ দলটির প্রতিষ্ঠাতা সায়েদ আবুল আলা মওদুদী৷ এরপর ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর গঠিত হয় জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান৷ বাংলাদেশ অংশের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী, যার প্রধান ছিলেন গোলাম আযম৷ ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়৷ তবে কয়েকমাস পরই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছিল৷

রাজনীতি

সুবিধাবাদী দল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক মামুন আল মোস্তফা সম্প্রতি এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘‘১৯৪১ সালে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের অবস্থান সুবিধা পেলেই বদলে ফেলেছে জামায়াত৷’’ তিনি বলেন, অন্য অনেক দলের মতোই যেখানে লাভ দেখেছে, বিনা দ্বিধায় সে পথে গেছে দলটি৷ ‘‘জামায়াত পাকিস্তানের বিরোধিতা করলেও ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব পাকিস্তানে চলে যায়৷’’ আরও জানতে ক্লিক ‘+’৷

রাজনীতি

মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে জাময়াতে ইসলামী৷ শুধু বিরোধিতা নয়, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আছে দলটির বিরুদ্ধে৷

রাজনীতি

বাংলাদেশে নিষিদ্ধ, তারপর আবার...

স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়৷ তবে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর জামায়াতে ইসলামী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়৷ ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান সুযোগ করে দিলে ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নামে জামায়াত কাজ শুরু করে৷ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই পালিয়ে যাওয়া গোলাম আযম ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে ফিরে এলে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নামে কাজ শুরু করে৷

রাজনীতি

নির্বাচনি রাজনীতিতে জামায়াত

জামায়াত বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচনে অংশ নেয় ১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে৷ সেই বার তারা ১০টি আসন পায়৷ এরপর ১৯৯৬ সালে ৩টি, ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করে ১৭টি আর ২০০৮ সালে দু’টি আসন লাভ করে৷ এর মধ্যে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত জামায়াতের দু’জন নেতা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন৷

রাজনীতি

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল গঠন

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ২০১০ সালে ২৫শে মার্চ যুদ্ধাপরাধের বিচারে মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে আওয়ামী লীগ সরকার৷ ট্রাইব্যুনালের রায়ে জামায়াত নেতাদের দণ্ড ছাড়াও দলটিকেও যুদ্ধাপরাধী রাজনৈতিক দল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে৷

রাজনীতি

মীর কাসেমের ফাঁসি বড় ধাক্কা

যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের জন্য জামায়াত সবসময়ই সক্রিয় ছিল৷ এ লক্ষ্যে প্রচুর অর্থ খরচ করে বিচার বন্ধ ও জামায়াত নেতাদের রক্ষায় আন্তর্জাতিক লবিস্ট নিয়োগ করা হয়৷ এই কাজের নেতৃত্বে ছিলেন মীর কাসেম আলী৷ তিনি মূলত জামায়াতের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান দেখভাল করতেন৷ গত ৪ সেপ্টেম্বর মীর কাসেম আলির ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় জামায়াতের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে আঘাত লেগেছে বলে মনে করা হচ্ছে৷

রাজনীতি

নিবন্ধন বাতিল হয়েছে, দল নয়

সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে৷ ফলে দলটি এখন আর দলীয়ভাবে এবং দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে না৷ তবে দল হিসেবে জামায়াত এখনও বৈধ একটি রাজনৈতিক সংগঠন৷ কারণ আইনমন্ত্রী আনিসুল হক একাধিকবার সংসদে আইন পাস করে দল হিসেবে জামায়াত নিষিদ্ধের কথা বললেও এখনও সেটি হয়নি৷

রাজনীতি

নতুন আমির কে হচ্ছেন?

যুদ্ধাপরাধের দায়ে দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতার ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় এবং অন্য বড় নেতারা পালিয়ে থাকায় জামায়াতের নতুন নেতৃত্ব গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে৷ ইতিমধ্যে অভ্যন্তরীণ ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে৷ বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমেদই দলটির নতুন আমির হচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে৷

এখন বলা হচ্ছে, ‘আওয়ামী লীগ জামায়াতকে কখনোই নিষিদ্ধ করবে না৷' বলার পক্ষে যুক্তি আছে৷ আবার কথাটা একশ ভাগ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলায় সামান্য ঝুঁকিও আছে৷ বলা তো যায় না, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো দেরিতে হলেও আওয়ামী লীগ যদি এই কাজটাও করেই ফেলে! আওয়ামী লীগ যতদিন চায়নি, ততদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়নি, যখন চেয়েছে তখন অনেক বাধা সত্ত্বেও বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে৷

এর ফলে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত যথেষ্ট বেকায়দায় পড়েছে৷ এখন আরেক কদম এগিয়ে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে নিষিদ্ধও করবে কিনা, যুদ্ধাপরাধী শীর্ষ নেতাদের বিদায়ের পর জামায়াত কীভাবে ঘর সামলাবে, দলটি নিষিদ্ধ হলে কী কী হতে পারে – জামায়াত প্রসঙ্গের আলোচনায় এ সব প্রশ্নই উঠে আসছে বারবার৷

যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বিদায়ের ক্ষতি জামায়াত নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করেই সামলাবে৷ দলটির সামনে আসলে আর কোনো বিকল্পও নেই৷ তাছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে মুক্তভাবে রাজনীতি করার সুযোগ পেলে হয়ত খুশিই হবে জামায়াত৷  

প্রশ্ন হলো, মুক্তভাবে রাজনীতি করার সুযোগ হারালে, অর্থাৎ জামায়াত নিষিদ্ধ হলে কী হবে? জামায়াত কি তখন আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স শুরু করে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করবে? সেই ক্ষমতা কি তাদের আছে? নাকি জামায়াতের নেতা-কর্মীরা তখন বিএনপি, সমমনা অন্যান্য দল এবং আওয়ামী লীগে ঢুকে উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করবে?

ইতিহাস বলছে, জামায়াত এই উপ-মহাদেশে ইতিমধ্যে দু'বার নিষিদ্ধ হয়েছে৷ একবার পাকিস্তানে, আরেকবার বাংলাদেশে৷ জামায়াতের রাজনীতির সূচনা হয়েছিল ১৯৪১ সালে৷ অবিভক্ত ভারতে সে বছরই ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ' নামে একটি দল প্রতিষ্ঠা করেন সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী৷ দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে যখন ভারত থেকে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটির উদ্ভব প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন সেই পক্রিয়ার বিরোধিতাই করেছে ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ'৷ অর্থাৎ জামায়াত তখন মুসলমানদের জন্য আলাদা কোনো দেশ চায়নি৷

মালিতে ধ্বংসলীলা

এক সময় মালির টিমবাকটু শহরের অন্য নাম ছিল ‘মরুদ্যানের মুক্তা’৷ সেই শহরের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে ধ্বংস করেই চলেছে সেখানকার ইসলামি জঙ্গি সংগঠন৷ ২০১২ সালে শহরটিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকে মুসলমানদের গড়া অনেক স্থাপত্য নিদর্শনও ধ্বংস করেছে তারা৷ সম্প্রতি শহরটিকে জঙ্গিদের কবল থেকে পুরোপুরি মুক্ত করার দাবি করেছে মালির সেনাবাহিনী৷

সন্ত্রাসপ্রীতি এবং জ্ঞানভীতি

শুধু স্থাপনা বা গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনই নয়, অনেক গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপিও ধ্বংস করেছে জঙ্গিরা৷

তথাকথিত আইএস-এর হামলা

সিরিয়ার পালমিরা শহরের প্রায় ২,০০০ বছরের পুরনো স্থাপনাগুলোও রেহাই পায়নি৷ সে দেশে চলছে তথাকথিত ইসলামি জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস-এর ধ্বংসযজ্ঞ৷

পালমিরার মন্দির ধ্বংস

এক সময় সিরিয়ার হোমস নগরীর এই স্থাপনাটিকে নিয়ে গর্ব করত সিরিয়া৷ এটি এক সময় ছিল মন্দির৷ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন এই উপসনালয় দেখে পর্যটকরা মুগ্ধ হতেন৷ আইএস-এর হামলায় স্থাপনাটি এখন ক্ষতবিক্ষত৷

ধ্বংস যখন প্রচারণার হাতিয়ার

ধর্মীয় সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক সহাবস্থানকে হুমকির মুখে দাঁড় করানোর চেষ্টায় আইএস অক্লান্ত৷ নৃশংসতা, বর্বরতা ক্রমেই আইএস-এর প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে উঠছে৷ এভাবে পেট্রল ঢেলে স্থাপনা পোড়ালে সংবাদমাধ্যম লুফে নেয় খবর, খবর প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত জঙ্গিরাও পেয়ে যায় তাদের কাঙ্খিত প্রচার৷

আয়ের উৎস

সিরিয়া ও ইরাকের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ শুধু ধ্বংসই করে না, অনেক সময় কদর বুঝে সেগুলো চোরাপথে চড়াদামে বিক্রিও করে আইএস৷ প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছ থেকেও অমূল্য সম্পদ কেড়ে নিয়ে বিক্রি করার অভিযোগ আছে আইএস-এর বিরুদ্ধে৷

আফগানিস্তানে তালেবান বর্বরতা

আফগানিস্তানের এই বৌদ্ধ মন্দিরটিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের স্বীকৃতি দিয়েছিল ইউনেস্কো৷ ২০০১ সালে হামলা চালিয়ে এটি প্রায় ধ্বংস করে দেয় তালেবান৷

আফ্রিকায় হামলার শিকার মসজিদ

মসজিদও অনেকক্ষেত্রে তথাকথিত ধর্মীয় উন্মত্ততার শিকার৷ ২০১৫ সালে মুসলমানদের উপাসনালয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি হামলার খবর আসে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকান থেকে৷ খ্রিষ্টান-মুসলিম দাঙ্গায় সেখানে অন্তত ৪১৭টি মসজিদ আংশিক অথবা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে বলেও দাবি করা হয়৷

গির্জায় হামলা

ইসলামি জঙ্গিরা আফ্রিকা অঞ্চলে গির্জাতেও প্রায়সময়ে হামলা চালায়৷ হামলায় হতাহতের ঘটনাও ঘটে৷ ওপরের ছবিটিতে কেনিয়ার এক গির্জায় হামলার পরের দৃশ্য৷

ভারতের ইতিহাসের কালো অধ্যায়

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের ইতিহাসের ‘কালো দিন’৷ ভারতের উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদ জেলার বাবরি মসজিদে সেদিনই হামলা চালিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে হিন্দু মৌলবাদীরা৷ মুঘল সম্রাট বাবরের নামে গড়া সুপ্রাচীন এই মসজিদের ওপর হামলার ঘটনা ভারতের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে৷

বাংলাদেশে প্রতিবছরই মন্দিরে হামলা

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে মূলত একাত্তরের মুক্তযুদ্ধের সময় থেকেই ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুরা হামলা, নির্যাতনের শিকার৷ তবে মন্দিরে মুর্তি ভাঙা, মন্দিরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের অসংখ্য ঘটনা ঘটে প্রতিবছর৷ বৌদ্ধ মন্দিরেও হামলা হয়৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হামলার কারণ ধর্মীয় উগ্রতা৷ সারা বিশ্বে ধর্মের নামে ধর্মীয় উপাসনালয় বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর হামলা থামবে কবে?

কিন্তু দেশভাগের পর পাকিস্তানেই চলে যান জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী৷ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে তিনি ‘ইসলামী সংবিধান' ও ‘ইসলামী সরকার' প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচারণা শুরু করেন৷ অল্প দিনের মধ্যেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ কিন্তু ১৯৪৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মৃত্যু বরণ করায় হঠাৎ করেই উল্টো পথ ধরে পাকিস্তানের রাজনীতি৷ যে দেশ মওদুদীকে গ্রেপ্তার করল, ১৯৪৯ সালে সেই দেশই জামায়াতের ‘ইসলামী সংবিধানের রূপরেখা' গ্রহণ করে মওদুদীকে মুক্তিও দিয়ে দেয়৷ পাঁচ বছরের মধ্যে মওদুদীর নেতৃত্বে আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন' শুরু করে জামায়াত৷ দলটি তখন আহমদিয়াদের ‘অমুসলিম' ঘোষণা করার দাবিতে মাঠ গরম করে তোলে৷ লাহোরে বেধে যায় দাঙ্গা৷ দাঙ্গায় কমপক্ষে দু'শ জন আহমদিয়া-র প্রাণ যায়৷ সেই দাঙ্গার পর মওদুদীসহ জামায়াতের অনেক নেতা-কর্মীকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল৷

লাহোর কাণ্ডের জন্য তখন সামরিক আদালতে মওদুদীর ফাঁসির আদেশও হয়েছিল৷ কিন্তু সে আদেশ আর কার্যকর হয়নি৷  এক পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ড লঘু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়, তারপর যাবজ্জীবনের দণ্ডও মওকুফ করে মুক্তি দেয়া হয় মওদুদীকে৷

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতায় আসেন আয়ুব খান৷ এসেই তিনি সব ধর্মীয় রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন৷ ফলে জামায়াতও নিষিদ্ধ হয়৷ ১৯৬৪ সালে আয়ুব সরকার মওদুদীকে আবার জেলে পাঠায়৷ সেবছরই আবার মুক্তিও দেয়া হয় তাঁকে৷

১৯৭১-এ জামায়াত শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতাই করেনি, হত্যা, লুট, ধর্ষণ, ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ সব ধরনের যুদ্ধাপরাধে অংশ নিয়ে স্বাধীনতাকে ঠেকানোর সর্বাত্মক চেষ্টাই চালিয়েছে৷ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে দলটি নিষিদ্ধ হয়৷ কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফেরানোর নামে জামায়াতকেও ফিরিয়ে আনেন রাজনীতিতে৷

১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত একেবারে নিরবচ্ছিন্নভাবেই ইতিহাসের আস্তাকুঁড় থেকে টেনে তুলে ‘যুদ্ধাপরাধীদের দল' জামায়াতকে আবার মূল স্রোতের রাজনৈতিক দল বানানো হয়৷ আওয়ামী লীগ সরাসরি এবং প্রবলভাবে সেই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেনি৷ বরং অনেক ক্ষেত্রে স্ববিরোধী ভূমিকাই নিয়েছে৷

‘‘জামায়াত একটি সন্ত্রাসী দল’’

বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (০১.০৮.১৩) বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছেন হাইকোর্ট৷ বিচারপতি এম মোয়াজ্জেম হোসেন, ইনায়েতুর রহিম এবং কাজী রেজা-উল-হকের সমন্বয়ে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ তাদের রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেন৷ রায়ে বলা হয়, ‘‘জামায়াতের গঠনতন্ত্র শুধু সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকই নয়, জামায়াত একটি সন্ত্রাসী দল৷’’

২০০৯ সালের রিটের রায়

রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কয়েকটি সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা হাইকোর্টে রিট করেন ২০০৯ সালে৷ রিটে জামায়াতের গঠনতন্ত্র সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়, জানান ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর৷ সেই রিটের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করলেন আদালত৷

জামায়াতের প্রতিক্রিয়া

আদালতের রায়ের পর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং এই মামলার আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক জানান, রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করবেন৷ সেজন্য ইতিমধ্যে রায়ের কার্যকারিতার স্থগিতাদেশ চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হয়েছে৷

স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান

১৯৭১ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ৷ বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ‘‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল৷ তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সেদলের কিছু নেতার হত্যা, ধর্ষণ এবং নির্যাতনের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে জামায়াত৷’’

ট্রাইব্যুনালে বিচার

জামায়াত যুদ্ধাপরাধের দায় অস্বীকার করলেও ২০১০ সালে গঠিত ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একের পর এক জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণ হচ্ছে৷ এই ছবিঘর তৈরির দিন (০১.০৮.১৩) অবধি ছয়জনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল৷ সর্বশেষ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলায় ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছে৷

ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বিতর্ক

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১০ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করে৷ তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল বিএনপি মনে করে, সরকার বিরোধী দলকে দুর্বল করতে এই ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করেছে৷ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে৷

জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি

এদিকে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের রায়ের পর দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি আরো জোরালো হয়েছে৷ অধ্যাপক মুনতাসির মামুন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানালেও সরকার এতটা সাহসী হবে বলে আশা করেন না৷ মুনতাসির মামুনের কথায়, ‘‘জামায়াত একটি যুদ্ধাপরাধী দল৷ ট্রাইব্যুনালের একাধিক রায়ে তা বলাও হয়েছে৷ তাই যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবেও জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব৷’’

ব্লগারদের সতর্ক প্রতিক্রিয়া

বৃহস্পতিবার আদালত রায় ঘোষণার আগেই ফেসবুকে আরিফ জিবতেক লিখেছেন, ‘‘হাইকোর্টের রায়টা কিন্তু জামায়াত নিষিদ্ধ নিয়া মামলা না৷ মামলাটা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনে জামায়াত আইনসিদ্ধভাবে নিবন্ধিত হয়েছে কিনা, সেটা নিয়ে বিবেচনা৷’’ এই ব্লগার লিখেছেন, ‘‘যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার চাই, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন নিয়া আমার মাথাব্যথা নাই৷’’

এই দাবি নতুন নয়

পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৪১ সালে জামায়াত প্রতিষ্ঠার পর মোট তিনবার দলটি নিষিদ্ধ হয়েছে৷ ১৯৫৯ এবং ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানে এবং ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে৷ ১৯৭৯ সালের ২৫শে মে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জামায়াত প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ পায়৷

সহিংস প্রতিক্রিয়া

হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের রায় ঘোষণার পর সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে জামায়াতের কিছু কর্মী৷ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, ‘‘বৃহস্পতিবার ঢাকায় গাড়ি ভাঙচুর করেছে জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা৷’’ এছাড়া পাবনাতেও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে৷

২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে প্রথম দফায় আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেনি৷ এবং সে কারণে ২০০১-এ ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের মন্ত্রীত্ব দিয়ে তাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ‘ইসলামি রাজনীতিবিদ' হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে৷

তবে এত কিছুর পরও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে৷ এই পর্যায়ে জামায়াত যদি বাংলাদেশে আবার নিষিদ্ধ হয়? আওয়ামী লীগ যদি তাদের নিষিদ্ধ করে, তাহলে কী কী হতে পারে?

প্রথমত, কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ করার পর জামায়াত ও ‘জামায়াতবান্ধব আদর্শ'-কে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে মোকাবেলা করলে জামায়াত ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে৷ আর তা না করলে বিএনপি, সমমনা অন্যান্য দল এবং আওয়ামী লীগে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষমতাসীন এবং অন্য ক্ষমতাবানদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে আবার ফিরেও আসতে পারে জামায়াত৷

উপ-মহাদেশে জামায়াতের রাজনীতি এর আগেও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে৷ অনেকবারই দেখা দিয়েছে অস্তিত্বের সংকট৷ কিন্তু মহাসংকটের সময়ে সরকার বা সামরিক বাহিনী কিংবা উভয়ের সঙ্গে সমঝোতা করে আবার ফিরেও এসেছে তারা৷

পাকিস্তানে নিষিদ্ধ হওয়ার পর সেনাবাহিনী আর ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে আপোষ করেই অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল জামায়াত৷ নইলে যে দেশের সামরিক আদালত জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝোলায়,  সেই দেশে মৃত্যুদণ্ড পেয়েও জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওদুদী দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন লাভ করতে পারতেন না, পাকিস্তানে জামায়াতও মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতো না৷

একাত্তরের পর বাংলাদেশেও তো জামায়াতের রাজনীতির ‘কবর' হওয়ারই উপক্রম হয়েছিল৷ পদে পদে আপোস করেই জামায়াত সেই পরিণতি ঠেকিয়ে রেখে এতদূর এসেছে৷ '৭৫-এর পর থেকে তারা বিএনপির কাছ থেকে যত রকমের সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে, পৃথিবীর আর কোনো দেশে যুদ্ধাপরাধে জড়িত কোনো ব্যক্তি বা দল কারো কাছ থেকেই এর এক শতাংশও পায়নি৷

Deutsche Welle DW Ashish Chakraborty

আশীষ চক্রবর্ত্তী, ডয়চে ভেলে

আবার যে আওয়ামী লীগ এখন তাদের সব যুদ্ধাপরাধী নেতাকে ধরে ধরে বিচার করছে, এক সময় তাদের সঙ্গেও যুগপৎ আন্দোলনে নেমে বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুতও করেছে জামায়াত৷

সুতরাং নিষিদ্ধ হলে ইতিহাসের ধারা বজায় রেখে যে জামায়াত টিকে থাকার জন্য, ফিরে আসার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টাই করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ তবে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ তাদের ‘বিশেষ ছাড়' না দিলে, নিষিদ্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশে জামায়াত আর পূর্ণ শক্তিতে ফিরতে পারবে বলে মনে হয় না৷ যদি ফেরে তাহলে, প্রথমত আওয়ামী লীগ এবং চূড়ান্ত বিচারে বিএনপির সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা৷

এক সময় মুসলিম লীগের ঘাড়ে ভর করেছিল জামায়াত৷ বাংলাদেশে মুসলিম লীগ দৃশ্যত প্রায় নিশ্চিহ্ন৷ জামায়াত যদি নিষিদ্ধ হয় এবং নিষিদ্ধ জামায়াতকেও যদি বিএনপি আঁকড়ে ধরে রাখে, তাহলে বিএনপিরও মুসলিম লিগের দশা হতে পারে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷