জার্মানরা ম্যার্কেলের উদ্বাস্তু নীতির ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্ত

এক বছর আগে জার্মান চ্যান্সেলর বলেছিলেন, ‘‘আমরা পারব'', মানে উদ্বাস্তুদের দায়িত্ব নিতে পারব৷ ম্যার্কেল কি ঠিক বলেছিলেন? জার্মানি কি দশ লাখের বেশি উদ্বাস্তু নিয়ে ভুল করেছে? এ বিষয়ে জার্মানরা কী ভাবেন?

এ সব প্রশ্নের খুঁজে বার করার জন্য ডয়চে ভেলে একটি জরিপ করতে দিয়েছিল৷ গতবছর থেকে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক থেকে যে উদ্বাস্তুর স্রোত তথাকথিত ‘‘বলকান রুট'' ধরে উত্তরমুখি এসেছে, তার ছবি আজও কেউ ভোলেনি৷

২০১৫ সালের গ্রীষ্মের সূচনায় লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু জার্মানিতে এসে পৌঁছান৷ ৩১শে আগস্ট চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলকে বার্লিনে বলতে শোনা যায়, ‘‘আমরা পারব৷'' এই বাক্যটিই তাঁর উন্মুক্ত দুয়ার অভিবাসন নীতির মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে৷

সেই নীতি কি জার্মানিকে বদলে দিয়েছে? দিয়ে থাকলে, কীভাবে? ডয়চে ভেলে ইনফ্রাটেস্ট ডিমাপ জনমত সমীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়, জনসাধারণের মধ্যে জরিপ করে এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে৷ জরিপে জন্য গত ১৫ই আগস্ট থেকে ১৭ই আগস্ট মোট এক হাজার নথিভুক্ত জার্মান ভোটারের মতামত জানতে চাওয়া হয়৷ অংশগ্রহণকারীদের ম্যার্কেলের উদ্বাস্তু নীতির সম্ভাব্য ফলশ্রুতি সম্পর্কে চারটি বক্তব্য দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাঁরা সেই বক্তব্যের সঙ্গে একমত কিনা৷

শিক্ষা ও সামাজিক বিষয়াবলী

উদ্বাস্তু, বা সরকারি পরিভাষায় অভিবাসীদের সাহায্য করতে জার্মানির খরচ ধরা হয়েছে বছরে ১,৫০০ কোটি ইউরো বা ১,৭০০ কোটি ডলার৷ এর মধ্যে রয়েছে খাওয়া-থাকার ও জার্মান ভাষা শিক্ষার খরচ৷ এছাড়া উদ্বাস্তু শিশুদের ডে-কেয়ার ও স্কুলে পড়ার খরচ আছে৷ এর ফলে কি জার্মান শিক্ষা ও সামাজিক ভাতা ব্যবস্থার উপর বড় বেশি চাপ পড়বে?

বিশেষ করে এএফডি বা ‘‘জার্মানির জন্য বিকল্প'' রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে এই আশঙ্কা বিরাজ করছে, বলে জরিপে দেখা গেছে৷ জরিপে যে সব এএফডি সমর্থক অংশ নিয়েছেন, তাদের মধ্যে শতকরা চুরাশি ভাগ বিশ্বাস করেন যে, অভিবাসীদের ভার সামলাতে জার্মান শিক্ষা ও সামাজিক ভাতা ব্যবস্থাকে চাপে পড়তে হবে৷

অর্থনৈতিক ফলশ্রতি

যে অভিবাসীর জার্মান ভাষার দখল আছে, যে শিক্ষিত ও সবল শরীরের অধিকারী, তার পক্ষে জার্মানিতে কাজ বা চাকরি পাওয়া শক্ত না হওয়ার কথা৷ জার্মানিতে মানুষজন ক্রমেই বেশি দিন বাঁচছেন, সেই তুলনায় জন্মহার পর্যাপ্ত নয়, কাজেই জনসাধারণের গড় বয়স বেড়ে চলেছে৷ কোম্পানিগুলিও তা মালুম পাচ্ছে: জার্মানিতে প্রতি ১০০ বেকার প্রতি ২০০ চাকুরি খালি আছে, কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য৷ অভিবাসী ও উদ্বাস্তুরা কি সেই ফাঁক ভরাতে পারবেন?

উত্তরটা খুব সহজ নয়৷ জার্মানিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, গাড়ি শিল্প ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং মিলিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনের মোট ২০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে৷ উদ্বাস্তু-অধিবাসীরা যে সব দেশ থেকে আসে, সেখানে এই সব শিল্পের বিশেষ চল নেই৷ সেই কারণে তাদের অধিকাংশের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা যোগ্যতাও নেই৷ তা সত্ত্বেও জরিপে অংশগ্রহণকারী জার্মানদের অর্ধেকের কিছু বেশি বিশ্বাস করেন যে, অভিবাসী শ্রমিকরা জার্মান অর্থনীতিকে আরো জোরদার করবে৷

এখানেও, এএফডি সমর্থকদের ৯১ শতাংশ মনে করেন না যে, অভিবাসীদের আগমনের ফলে জার্মান শ্রম বাজারের কোনো সুবিধা হবে৷ অপরদিকে রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শ নির্বিশেষে তরুণ ও শিক্ষিত জার্মানদের ধারণা যে, উদ্বাস্তুরা জার্মান অর্থনীতিকে আরো জোরদার করবে৷ যাদের বয়স পঞ্চাশোর্ধে এবং যারা স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে কখনো কলেজ-ইউনির্ভার্সিটির মুখ দেখেননি, তারা এর ঠিক উল্টো মনোভাবই পোষণ করে থাকেন৷

জার্মানি কি আর ততটা জার্মান থাকবে না?

উদ্বাস্তুদের আগমনের প্রভাব সমাজের উপরেও পড়বে৷ ইতিমধ্যেই জার্মানিতে বহু বিদেশি বংশোদ্ভূতের বাস, ভবিষ্যতে তা আরো বাড়বে৷ এ-বিষয়ে জার্মানদের কি মনোভাব?

এক্ষেত্রেও তরুণ এবং উচ্চশিক্ষিত জার্মানরা তথাকথিত ‘‘মাল্টিকালচারাল'' বা নানাবিধ সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সমাজের সপক্ষে – উত্তরদাতাদের রাজনৈতিক বা দলগত আনুগত্যের ভূমিকা এখানে গৌণ৷ এদের কাছে ম্যার্কেলের উদ্বাস্তু নীতি ও জার্মানিতে সন্ত্রাসী আক্রমণ বাড়ার মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই৷ অপরদিকে জরিপের বয়ষ্ক ও অল্পশিক্ষাসম্পন্ন উত্তরদাতাদের মতে, উদ্বাস্তুদের আগমনের ফলে আগামীতে জার্মানিতে সন্ত্রাসী আক্রমণের সংখ্যা বাড়বে৷

সামনে আরো বেশি ইসলামি সন্ত্রাস?

সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে যাবতীয় প্রশ্নে উত্তরদাতা কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক, তা দৃশ্যত একটা বড় ভূমিকা পালন করে৷ এএফডি সমর্থক ৯৩ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন যে, ভবিষ্যতে জার্মানিতে সন্ত্রাসী আক্রণের সংখ্যা বাড়বে৷

সব মিলে দেখা যাচ্ছে, সর্বক্ষেত্রেই এএফডি সমর্থকদের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী দৃশ্যত সবুজ দলের সমর্থকরা৷ চরম দক্ষিণপন্থি এএফডি-র সমর্থকরা প্রায় বিনা ব্যতিক্রমে মনে করেন যে, জার্মানির উপর সরকারের উদ্বাস্তু নীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে; অপরদিকে সবুজ দলের তিন-চতুর্থাংশ সমর্থকদের ধারণা যে, জার্মানি এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে উদ্বাস্তু বা শরণার্থীদের আগমন থেকে লাভবান হতে পারবে৷

বন্ধু, আপনি কি ম্যার্কেলের শরণার্থী নীতিকে সমর্থন করেন? লিখুন নীচে, মন্তব্যের ঘরে৷

একটা সেলফি যেভাবে তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে

আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ

বার্লিনে এক শরণার্থী শিবিরে থাকার সময় আনাস মোডামানি একদিন শুনলেন যে, জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল তাদের দেখতে আসবেন এবং তাদের সঙ্গে কথাও বলবেন৷ ১৯ বছর বয়সি সিরিয়ান তরুণ, যিনি কিনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক ভক্ত, সুযোগটা হাতছাড়া করেননি৷ তিনি তখন ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে ম্যার্কেলের সঙ্গে একটি সেলফি তোলেন৷

একটা সেলফি যেভাবে তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে

ইউরোপে পালিয়ে আসা

দামেস্কে যখন তাঁদের বাড়ির উপর বোমা পড়ে, তখন মোডামানি এবং তাঁর বাবাম ও ভাইবোনেরা গরিয়া নামক একটি ছোট্ট শহরে চলে যান৷ সেখান থেকে ইউরোপের পথে যাত্রা করেন তিনি৷ প্রথমে লেবানন, এরপর তুরস্ক হয়ে গ্রিসে৷

একটা সেলফি যেভাবে তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে

বিপজ্জনক যাত্রা

মোডামানি যাত্রাপথে প্রায় মরতে বসেছিলেন৷ আরো অনেক শরণার্থীর মতো, একটা রাবার বোটে করে তুরস্ক থেকে গ্রিস আসতে হয়েছিল তাঁকে৷ মোডামানি জানান, নৌকাটি অতিরিক্ত বোঝাই ছিল এবং এক পর্যায়ে সমুদ্রে তলিয়ে যায়৷ তিনিও প্রায় ডুবে যাচ্ছিলেন৷ কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান৷

একটা সেলফি যেভাবে তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে

পাঁচ সপ্তাহ পায়ে হাঁটা

গ্রিস থেকে পায়ে হাঁটা পথে মেসিডোনিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন মোডামানি৷ হাঙ্গেরি এবং অস্ট্রিয়ায় তিনি হেঁটেছেন অনেকটা পথ৷ এরপর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে পৌঁছান তাঁর চূড়ান্ত গন্তব্য মিউনিখে৷ জার্মানিতে আসার পর তিনি বার্লিনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন৷ তখন থেকেই তিনি বার্লিনেই আছেন৷

একটা সেলফি যেভাবে তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে

রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার আশায়

বার্লিনে পৌঁছানোর পর মোডামানি বেশ ক’টা দিন কাটিয়েছেন লাগেসো শরণার্থী কেন্দ্রের সামনে৷ তিনি জানান, সেখানকার অবস্থা বেশ জটিল, বিশেষ করে শীতের সময়৷ এক পর্যায়ে তাঁকে বার্লিনের স্পানডাও অঞ্চলের শরণার্থী কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়৷ তিনি শরণার্থী হিসেবে তাঁর অবস্থা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন৷ আর ম্যার্কেলের সঙ্গে সেলফি তাঁকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে৷

একটা সেলফি যেভাবে তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে

অবশেষে এক পরিবারের সন্ধান

মোডামানি জানিয়েছেন, চ্যান্সেলর ম্যার্কেলের সঙ্গে তোলা সেলফি জীবন বদলে দিয়েছে৷ সেই ছবি ইন্টারনেটে প্রকাশের পর গণমাধ্যমের নজর পড়ে তাঁর দিকে এবং একটি জার্মান পরিবার তাঁকে আশ্রয় দেয়ার সিদ্ধান্তে নেয়৷ গত দু’মাস ধরে জার্মান পরিবারের সঙ্গে আছেন তিনি৷ আর সেই পরিবার তাঁকে পরিবারের সদস্যদের মতোই সহায়তা করছে৷

একটা সেলফি যেভাবে তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে

বাড়ির কথা মনে পড়ে

জার্মান পরিবারের সঙ্গে বসবাসের পর থেকে বেশ ভালোই আছেন মোডামানি৷ জার্মান ভাষা শিখছেন এখন৷ তাঁর বেশ কিছু বন্ধুও হয়েছে৷ জার্মানিতে পড়াশোনা করতে চান তিনি৷ তবে তাঁর আপাতত লক্ষ্য হচ্ছে জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া৷ কেননা তাহলে নিজের পরিবারকে জার্মানি নিয়ে আসা সহজ হবে তাঁর জন্য৷

একটা সেলফি যেভাবে তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে

শরণার্থীদের সম্পর্কে নেতিবাচক মানসিকতা

জার্মানিতে একটি উন্নত ও নিরাপদ জীবনের আশা মোডামানি৷ তবে শরণার্থীদের সম্পর্কে জার্মানির বর্তমান মনোভাব নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত তিনি৷ তাঁর আশঙ্কা, শরণার্থীদের সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব ভবিষ্যতে আরো বাড়তে পারে৷ সেক্ষেত্রে তা শরণার্থী বিষয়ক আইনের উপর প্রভাব ফেলবে৷ ফলে তাঁর আবেদন হয়ত বাতিল হবে৷ আর নিজ পরিবারকে জার্মানিতে আনার স্বপ্ন হয়ত স্বপ্নই থেকে যাবে৷

আমাদের অনুসরণ করুন