জার্মানিতেও জল জমে, গ্রামগঞ্জ বানে ভাসে

মধ্য ইউরোপের ভৌগোলিক বিশেষত্বগুলো আমাদের উপমহাদেশ থেকে আলাদা৷ এদেশে বনানীর পরিমাণ বেশি৷ এসব সত্ত্বেও প্রকৃতির রোষে পড়ে মানুষ৷ তবে সেই রোষ সামলানোয় এরা আমাদের চেয়ে দড়৷

জলাবদ্ধতা বলতে যদি বর্ষায় রাস্তাঘাটে জল জমে গাড়ির বনেট ডুবে যাওয়ার মতো অবস্থা বোঝায়, তাহলে তা জার্মানিতে বেশি ঘটে না৷ তার প্রথম ও প্রধান কারণ এ দেশের সমৃদ্ধি৷ শহর তৈরি করার আগে ও পরে এরা সেই শহরের পয়ঃপ্রণালী থেকে শুরু করে, পানি নিষ্কাশন ও ময়লা পানি পরিশোধনের দিকে নজর রাখে৷ আগে থেকে পরিকল্পনা করে৷ তারপর সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্ত বিভাগ তৎপর হয়, নির্মাণকার্য চলে৷ বর্ষা হলে রাস্তায় যে জল জমবেই, সেটাই যে বিধাতার নির্দেশ, এটা মেনে নিতে এ দেশের মানুষের দ্বিধা আছে এবং ছিল চিরকাল৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

ভারি বর্ষা এদেশেও হয়৷ ঠিক আমাদের দেশের মতো না হলেও, ছোট্ট মহাদেশ ইউরোপের উত্তর ও পশ্চিম থেকে ঋতু অনুযায়ী ঝড়বাদল এসে হানা দেয়, অকারণে প্রবল বৃষ্টি হয়৷ এদের মাপজোক করে তৈরি করা পানি নিষ্কাশন প্রণালীর মুখে ছাই দিয়ে সেই ঘণ্টা খানেক, ঘণ্টা দেড়েকের বৃষ্টিতেই দেখেছি, বাড গোডেসবার্গের কাছে রেললাইনের নীচে গাড়ি যাবার টানেল জলে ভরে গেছে – সে আবার গাড়ি-ডোবা জল! গাড়ি ব্যাক করে কোনোমতে লোকজন পালানোর পথ খুঁজছে৷ অথচ সে যা বৃষ্টি, তাতে কলকাতায় আমাদের গর্চা রোডের পিচ ঢাকত কিনা সন্দেহ৷ সভ্য দেশে কেন এমন হয়?

পরে বুঝলাম, সভ্য দেশ বলেই হয়৷ এসব দেশে সব কিছু হয়, হিসেব করে হয় – মানে হওয়া উচিত৷ কিন্তু বৃষ্টিবাদলকে তো আর কেউ সভ্য-অসভ্য শিখিয়ে দেয়নি, ‘ছি বাবা, বন শহর, হাজার হোক জার্মানির সাবেক রাজধানী, এখানে অমন তুমুল বৃষ্টি করলে চলে? অত জল যাবে কোথায়?' ‘কেন, রাইন নদে...৷' ‘রাইনও তো পানিতে ভরে আছে, সুইজারল্যান্ডে বরফ গলেছে কিনা৷ তায় আবার ঊনবিংশ শতকে রাইনের ধারগুলো কেটে সোজা করে দেওয়া হয়েছিল, নয়ত তোমার রাইনও তো ছিল আমাদের ছোট নদী চলে এঁকে-বেঁকে, তার মতন৷'

পাসাউ-এ ঐতিহাসিক বন্যা

পাসাউ শহরের বাসিন্দারা মাঝেমাঝে নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে অভ্যস্ত৷ এই শহরটি ডানিউব, ইন এবং ইলৎস নদীর মোহনায় গড়ে উঠেছে৷ শহরটির একাংশে মাঝেমাঝেই বন্যা দেখা দেয়৷ কিন্তু এবার পরিস্থিতি অন্যান্য সময়ের চেয়ে সঙ্গীন৷ গত সোমবার পাসাউ-এ পানি বৃদ্ধির পরিমাণ ১৯৫৪ সালের রেকর্ড ভেঙেছে এখনও পানি বাড়ছে৷

ব্যাপক উদ্ধার অভিযান

গোটা জার্মানিতে ২৮ হাজারের মতো উদ্ধারকর্মী বন্যা উপদ্রুত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছেন৷ তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন জার্মান কারিগরী ত্রাণ সংস্থা টিএইচডাব্লিউ-র ১,৭৬০ কর্মী৷ জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ১,৭৬০ জন সৈন্যকেও উদ্ধার কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নিয়োগ দিয়েছে৷

বন্যা মোকাবিলা

পাসাউ-এর এই মানুষগুলোর মতো অনেকেই কাজে যেতে কিংবা কেনাকাটা করার পর বাড়ি ফিরতে উদ্ধারকর্মীদের উপর নির্ভরশীল৷

স্থানান্তর

জার্মান সেনারা পাসাউ শহরের পুরানো অংশে এভাবেই আটকে পড়াদের খুঁজে বেড়াচ্ছে৷ বন্যার কারণে আটকপড়াদের এভাবে উদ্ধার করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যান সেনারা৷ এরপর সেখান থেকে তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়৷

বন্যা উপদ্রুত এলাকায় রাজনীতিবিদদের সফর

২০০২ সালে এলবে এবং ওডার নদী সংলগ্ন বন্যা উপদ্রুত এলাকা সফর করে ব্যাপক জনসমর্থন কুড়িয়েছিলেন তৎকালীন জার্মান চ্যান্সেলর গেয়ারহার্ড শ্র্যোডার৷ তারপর থেকে জার্মান রাজনীতিবিদদের বন্যা উপদ্রুত এলাকা সফরের আগ্রহ বেড়ে গেছে৷ ছবিতে মঙ্গলবার, পাসাউ-এ জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হানস-পেটার ফ্রিডরিশ৷

পানির নীচে পাসাউ

১৯৫৪ সালে পাসাউ-এর যেসব অঞ্চল বন্যা থেকে রক্ষা পেয়েছিল, এ বছর সেসব অঞ্চলও পানির নীচে তলিয়ে গেছে৷ ডানিউব নদীর তীর সংলগ্ন অনেক বাড়ির উপরের তলা অবধি পানি পৌঁছে গেছে৷

এলবে নদীতে ‘রেড অ্যালার্ট’

স্যাক্সনি রাজ্যের ক্লাফেনবাখ দুর্গের কাছে বন্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন উদ্ধারকর্মীরা৷ নীচকার কাছে একটি বাঁধ পানির নীচে তলিয়ে গেছে, ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল থেকে কিছু মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে৷ এলবে উপত্যকায় ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে৷

বিপর্যয়ে বিস্মিত অনেকে!

বন্যার তীব্রতা দেখে অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন৷ মিউনিখের কাছে রোজেনহাইম শহরের ছবি এটি৷ এই গাড়ির চালক নিঃসন্দেহে কল্পনাও করেননি রাতারাতি পানি পৌঁছে যাবে তাঁর গাড়ি অবধি৷

বালুর বস্তা অপরিহার্য

বন্যা প্রতিরোধে এক মোক্ষম অস্ত্র বালুর বস্তা৷ পাঠ এবং প্লাস্টিকের তৈরি এসব ব্যাগের প্রতিটিতে ১৫ কিলোগ্রাম বালু থাকে৷ পানি থেকে বিভিন্ন দোকান এবং প্রবেশপথ রক্ষায় বিশেষ কার্যকর এই ব্যাগ৷ উদ্ধারকর্মীদের কাছে এরকম লাখ লাখ বালুর বস্তা মজুদ আছে৷

পাসাউ-এর উপরে কালো মেঘ

জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছালেও পাসাউ শহরে পানি এখনো বাড়ছে৷ বিশেষ করে ইন নদীর পানি বৃদ্ধি বন্ধের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না৷

‘তারপর?' ‘রাইনে বন্যার জল এলে অতীতে তার পাশে যেসব ফাঁকা মাঠ বা জলাভূমি আছে, সেগুলো সেই জল ধরে রাখতো৷ পরে বাড়ি, বাগান, হাওয়া খাবার স্ট্র্যান্ড ইত্যাদি বানিয়ে রাইনের কাছ থেকে তার সেই রাইনাউয়ে বা রাইনের চর কেড়ে নেওয়া হয়েছে৷ তাই রাইনের জল এখন সাঁ সাঁ করে বন-কোলন-ড্যুসেলডর্ফে পৌঁছে যায়; যেখানে পারে পাথরের দেয়াল টপকে বিশেষ করে শহরে পুরনো অংশগুলোকে ডুবিয়ে দেয়, বাড়িঘরে জল ঢোকে, লোকজন জেরবার হয়৷' ‘কিন্তু তা বলে রাস্তায় জল জমবে?'

জার্মানি ইউরোপ | 05.08.2013

‘আহা-হা, রোজ কি জমে? বললাম না, মিউনিসিপালিটির হিসেবে নেই, এমনধারা বৃষ্টি হলে, তবেই জমে৷ যখন রাস্তার ম্যানহোলের ভেতর থেকে জল বেরোতে শুরু করে আর কি! ও হ্যাঁ, শুধু বৃষ্টিবাদলাই নয়, মাঝেমধ্যে মাটির নীচে জলের পাইপ ফেটে রাস্তা ভেসে যায়৷ ভেসে যায় মানে ধরো হাঁটুজল – তাতেই কিন্তু এদেশে উর্দি পরা দমকলের লোক এসে রাবারের ডিঙিতে করে বুড়োবুড়িদের শুকনো ডাঙায় নিয়ে যায়৷'

‘ঠাট্টা করছ?'

‘আমার ঘাড়ে ক'টা মাথা! তবে একবার গাড়িতে ইটালি থেকে সুইজারল্যান্ড হয়ে জার্মানিতে ফেরার সময় দেখেছিলাম – দু'পাশের পাহাড় থেকে একটির পর একটি জলধারা নামছে, ঠিক যেন জলপ্রপ্রাতের মতো! সে কি জল, যেন অটোবান – মানে মোটরওয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে৷ ঐ জলই তো আস্ত জার্মানি বেয়ে ধেয়ে আসে বন শহরের দিকে৷ ওদিকে দেড় শতাব্দী ধরে নদী দখল চলেছে, রাইনের আর কোথাও যাবার জায়গা নেই৷ তাই সাঁওতাল বিদ্রোহের মতো রাইন তার ঘোলা জল নিয়ে ঢুকে পড়ে তার আগের সেই উন্মুক্ত চারণভূমিতে৷ বেচারা বন শহরের কথা ভাবো: দু'পাশে পাহাড়, মাঝখানে ভরভর্তি রাইন, তার ওপর আবার বৃষ্টি৷ তা বানভাসি হওয়ার চেয়ে পানিবন্দী হওয়াই ভালো, নয় কি?'

জার্মানি ইউরোপ | 15.06.2013
Deutsche Welle DW Arun Chowdhury

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

‘আর দুরমুশের কথা কী বলছিলে?'

‘জার্মানিকে দেখলে আমার চিরকাল মনে হয়, বড় ঘরের ভালো ছেলে: মা যেন গাল টিপে, মাথা আঁচড়ে, পরিপাটি করে সাজিয়ে রেখেছে৷ এখানকার বনভূমি পর্যন্ত সাইজ করে৷ মুশকিল এই যে, সেই বনভূমিতে সব কাজ হয় ভারী ভারী ট্রাক্টর দিয়ে৷ সেই সব ট্রাক্টরের চাপে বনের মাটি যেন দুরমুশ দিয়ে পিটে শক্ত হয়ে যায়, পানি যেতে পারে না৷ তাই বৃষ্টির জল পাহাড়ের ঢালের বন বনানী থেকে সর সর করে নেমে আসে নীচে শহর আর নদীর দিকে৷ ওদিকে শহর জুড়ে শুধু বাড়ি আর রাস্তা তৈরি হচ্ছে, সেখানেও পানি যাবার পথ নেই৷ জার্মানির ১২ শতাংশ জমি শহর, তার আবার অর্ধেক এইভাবে ‘সিলড', অর্থাৎ সিল করে বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ ওদিকে শহুরে বসতি বাড়ছে দিনে ১৩০ হেক্টার করে৷'

‘তাহলে উপায়?'

‘চলো রাইনের ওপর খানিকটে নৌকোবিহার করে আসা যাক৷'

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷