জার্মানিতে খুন ও সহিংসতা বেড়েছে

সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জার্মানিতে সহিংস অপরাধ বেড়েছে৷ তবে চুরি এবং বাড়িতে ঢুকে চুরির হার কমেছে৷ রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যেও অপরাধের প্রবণতা বেড়েছে৷

বার্লিনে এক সংবাদ সম্মেলনে ২০১৬ সালের অপরাধ পরিসংখ্যান পেশ করতে গিয়ে জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টোমাস ডেমেজিয়ার বলেন, ‘‘এখানে কোনো সুগারকোটিং করা হবে না’’ – অর্থাৎ অপ্রিয় সত্য গোপন করা হবে না৷

গত বছর সহিংস অপরাধের সংখ্যা বাড়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ – ২০১৫ সালে যেখানে ১,৮১,৩৮৬টি ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছিল, ২০১৬-য় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৯৩,৫৪২টি৷

মাদক সংক্রান্ত অপরাধও ৭ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,০২,৫৯৪টি ঘটনায়৷ চিন্তনীয় যে, আগ্নেয়াস্ত্র সংক্রান্ত অপরাধের পরিমাণ ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪,৪৪৩টি ঘটনায়৷

তবে সব মিলিয়ে অপরাধ কিন্তু বিশেষ বাড়েনি – ২০১৫ থেকে ২০১৬ সাল অবধি মাত্র শূন্য দশমিক সাত শতাংশ – সামগ্রিকভাবে প্রায় ৬৪ লাখ অপরাধের ঘটনা৷ ওদিকে চুরির সংখ্যা কমেছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ৷

রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসের উপর আক্রমণের সংখ্যা কিছুটা কমেছে

শারীরিক আক্রমণ, খুন, নরহত্যা এবং ধর্ষণ, সব কিছুর হার বেড়েছে ২০১৬ সালে৷ ডেমেজিয়ার এই প্রবণতাকে উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেন এবং এর জন্য সাধারণভাবে সমাজে ‘‘স্থূলতা বৃদ্ধি’’-কে দায়ী করেন৷ তবে তিনি এর জন্য গত বছর উদ্বাস্তুদের বিপুল সংখ্যায় আগমন বা অন্য কোনো গোষ্ঠীকে বিশেষভাবে দায়ী করতে অস্বীকার করেন৷ ‘‘আমরা দ্বেষ, শ্রদ্ধার অভাব এবং সাধারণভাবে সহিংসতা বৃদ্ধির ঘটনা দেখছি৷ সেজন্য আমরা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে দায়ী করতে চাই না - তা সে বাম, ডান বা বিদেশি, যেদিক থেকেই হোক-’’ বলেন ডেমেজিয়ার৷

রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে অপরাধ বৃদ্ধি

ডেমেজিয়ার যা-ই বলুন, যাবতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে একটি পরিসংখ্যান খুব গুরুত্ব পাচ্ছে, আর তা হলো ২০১৫ সালে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী ও উদ্বাস্তুদের মধ্যে অপরাধমূলক ঘটনার সংখ্যা ছিল ১,১৪,০০০; কিন্তু ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৭৪,০০০৷

অভিবাসীদের যৌন শিক্ষা দিচ্ছে জার্মানি

যৌনতা এক ‘নিষিদ্ধ’ বিষয়

আরবি, তুর্কি, ইংরেজি, জার্মানসহ মোট ১২টি ভাষায় যৌনতা বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য এবং চিত্রলিপি প্রকাশ করেছে জার্মান সরকার৷ অভিবাসীদের নারী, পুরুষের দেহ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দিতেই এই উদ্যোগ৷ কেননা, সরকার মনে করছে, তারা এমন অনেক দেশ থেকে এসেছে, যেখানে যৌনতা নিষিদ্ধ এক বিষয়৷ চলুন দেখে নেই সাইটটিতে ঠিক কী আছে৷

অভিবাসীদের যৌন শিক্ষা দিচ্ছে জার্মানি

বিভিন্ন যৌন সমস্যার সমাধান

মোট ছয়টি বিভাগে যৌনতা, যৌন মিলন, সম্ভোগের রকমফের, যৌনতা বিষয়ক অধিকারের কথা তুলে ধরা হয়েছে সাইটটিতে৷ তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে ‘সেক্স’ বিভাগটি নিয়ে৷ এতে প্রথমবার সেক্স, কুমারিত্ব, যৌনাসন এবং বিভিন্ন যৌন সমস্যার সমাধান চিত্রলিপির মাধ্যমে ব্যাখা করা হয়েছে৷

অভিবাসীদের যৌন শিক্ষা দিচ্ছে জার্মানি

আকার গুরুত্বপূর্ণ নয়, যৌনাঙ্গচ্ছেদ নিষিদ্ধ

ওয়েবসাইটটির ‘বডি’ অংশে নারী-পুরুষের দেহের ধরন, যৌনাঙ্গ, বীর্য ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা দেয়া হয়েছে৷ পুরুষাঙ্গের আকার বা গড়ন যে যৌন সুখের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, তা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এই বিভাগে৷ রয়েছে নারীর যৌনাঙ্গচ্ছেদ যে ইউরোপে পুরোপুরি নিষিদ্ধ, সেই কথাও৷

অভিবাসীদের যৌন শিক্ষা দিচ্ছে জার্মানি

গর্ভধারণ ও যৌন মিলন

সন্তান জন্মদানের পুরো প্রক্রিয়া এই বিভাগে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে৷ সাথে গর্ভধারণের পর কতদিন এবং কিভাবে যৌন সম্পর্ক অব্যাহত রাখা যায়, তা-ও জানানো হয়েছে৷ বলা হয়েছে, কেউ যদি ভুল করে গর্ভধারণ করেন, তাহলে চাইলে গর্ভপাত না করে বাচ্চাটি জন্মের পর দত্তক দেয়া যেতে পারে৷ তবে গর্ভপাতে কোনো বাধা নেই৷

অভিবাসীদের যৌন শিক্ষা দিচ্ছে জার্মানি

কনডম যেভাবে পরবেন

কখনো জানতে চেয়েছেন কনডম কী? ওয়েবসাইটটির এই বিভাগে কনডম ব্যবহারের উপায় চিত্রলিপিতে পরিষ্কারভাবে দেখানো হয়েছে৷ পাশাপাশি অনিরাপদ যৌন জীবনের ফলে নারী ও পুরুষের কী কী রোগ হতে পারে এবং কী করলে তা থেকে মুক্তি সম্ভব, সে কথাও জানানো হয়েছে৷

অভিবাসীদের যৌন শিক্ষা দিচ্ছে জার্মানি

সঙ্গীকে দোষ না দিয়ে কথা বলুন

হোক সে যৌন জীবন কিংবা যৌথ সম্পর্কের অন্য কোনো দিক, যে কোনো বিষয়ে সঙ্গীর সঙ্গে সময় নিয়ে খোলামেলা আলোচনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে ওয়েবসাইটে৷ তবে আলোচনায় একে-অপরকে দোষ না দিয়ে বরং কার কী প্রত্যাশা সেদিকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে৷ প্রয়োজনে সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়ার উপায়ও জানানো হয়েছে সাইটটিতে৷

অভিবাসীদের যৌন শিক্ষা দিচ্ছে জার্মানি

যৌনসম্মতির বয়স ১৮ বছর

জার্মানিতে ১৪ বা ১৫ বছরের একটি ছেলে বা মেয়ে একই বয়সের সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে পারে৷ কিন্তু সেই বয়সের একটি ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে ১৬ বা তার বেশি বয়সের কেউ যৌন সম্পর্কে জড়ালে সেটা অপরাধ৷ এমনকি কম বয়সি সঙ্গী সম্মতি দিলেও৷ যৌন মিলনের জন্য নিরাপদ বয়স কমপক্ষে আঠারো৷

অভিবাসীদের যৌন শিক্ষা দিচ্ছে জার্মানি

অভিবাসীদের কি যৌন শিক্ষার দরকার আছে?

এই প্রশ্নটা অনেকেই করছেন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে৷ এর মানে কি অভিবাসীরা যৌন মিলন সম্পর্কে অজ্ঞাত? এ সব প্রশ্নের জবাবে নির্মাতার জানিয়েছেন, বিশ্বের অনেক দেশে যৌনতা নিয়ে আলোচনা এক ‘নিষিদ্ধ বিষয়’৷ তাই দরকার এমন একটা সাইট৷ বাংলা ভাষাতেও এ রকম একটি সাইটের দরকার বলে ফেসবুকে লিখেছেন একাধিক বাংলা ব্লগার৷

অভিবাসীদের যৌন শিক্ষা দিচ্ছে জার্মানি

চিত্রলিপির ‘কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ, শেতাঙ্গ নারী’

ওয়েবসাইটটিতে প্রদর্শিত যৌন মিলনের কিছু চিত্রলিপিতে পুরুষকে কৃষ্ণবর্ণে এবং নারীকে শ্বেতবর্ণে দেখানো হয়েছে৷ আর এটা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আপত্তি করেছেন অনেকে৷ কারো কারো মতে, শরণার্থী বা অভিবাসীদের যৌনশিক্ষা, যেমন কনডম পরানো শেখানোর মাধ্যমে আসলে বোঝানো হয়েছে যে, তারা কিছুই জানে না, যা একধরনের ‘বৈষম্যমূলক মনোভাব’৷

অভিবাসীদের যৌন শিক্ষা দিচ্ছে জার্মানি

যারা তৈরি করেছেন

বেলজিয়ামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে জার্মানির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যশিক্ষা কেন্দ্র ‘জানজু ডটডিই’ ওয়েবসাইটটি তৈরি করেছে৷ এ জন্য সময় লেগেছে তিন বছর৷ মূলত অভিবাসীদের বিভিন্ন প্রশ্ন এবং প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে সাইটটি তৈরি করা হয়৷ তিন সপ্তাহ আগে প্রকাশের পর থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার মানুষ এটি ‘ভিজিট’ করছেন৷

‘‘সহিংস অপরাধে সংশ্লিষ্ট জার্মানদের সংখ্যা বেড়েছে এক শতাংশ, কিন্তু অভিবাসীদের অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে ৯০ শতাংশ,’’ বলেছেন ডেমেজিয়ার৷ অপরদিকে বহু অপরাধ ঘটেছে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের নিজেদের মধ্যে, তাদের নিজস্ব আবাস ও শিবিরে – যোগ করেন ডেমেজিয়ার৷

স্যাক্সনি রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কুস উলবিশ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের সভাপতি হিসেবে৷ তিনি জানান যে, উদাহরণস্বরূপ স্যাক্সনিতে মাত্র এক শতাংশ অধিবাসী যাবতীয় অপরাধের জন্য দায়ী; এছাড়া সিরিয়া থেকে আগত উদ্বাস্তুদের চেয়ে অন্যান্য দেশ থেকে আগত উদ্বাস্তুদের অপরাধে সংশ্লিষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বেশি৷

চরম দক্ষিণপন্থি ও অপরাপর ‘হেট ক্রাইম’

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা অভিসন্ধি থেকে সম্পাদিত অপরাধের ক্ষেত্রে চরম দক্ষিণপন্থিরা অর্ধেকের বেশির জন্য দায়ী৷ মোট  ৪১,৫৪৯টি ঘটনার মধ্যে ২৩,৫৫৫টির জন্য তারাই দায়ী৷ তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধের ক্ষেত্রে অ-জার্মানরাও ৩,৩৭২টি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ছিল, ২০১৫ সালের তুলনায় যা ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি৷

গতবছর জার্মানিতে তথাকথিত হেট ক্রাইমের সংখ্যাও বেড়েছে – বিশেষ করে বহিরাগতদের বিরুদ্ধে৷ ইহুদিবিদ্বেষ সংক্রান্ত ঘটনার সংখ্যা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৪৬৮-তে৷ অপরদিকে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসের উপর আক্রমণের সংখ্যা কিছুটা কমেছে৷

বেন নাইট/এসি

আমাদের অনুসরণ করুন