জার্মানিতে প্রথম সমকামী বিবাহ উদযাপন

জার্মানিতে সমকামী পুরুষ ও মহিলারা এতদিন তাদের সম্পর্ক রেজিস্ট্রি করতে পারতেন বটে, কিন্তু নারী-পুরুষের বিবাহের যাবতীয় আইনগত অধিকার পেতেন না৷ রবিবার থেকে জার্মানিতে সমকামী বিবাহ সম্ভব ও বৈধ৷

বার্লিনের দুই সরকারি কর্মচারি – কার্ল ক্রাইলে ও বোডো মেন্ডে রবিবার জার্মানির প্রথম সমকামী দম্পতি হিসেবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন৷ এর পটভূমিতে রয়েছে গত জুন মাসে জার্মান সংসদের ভোট, যার মাধ্যমে সমকামীদের বিবাহ ও দত্তক নেওয়া বৈধ করা হয়৷ বার্লিনের মেয়র মিশায়েল ম্যুলার নবদম্পতিকে অভিনন্দন জানান ও তাঁদের বিবাহকে একটি ‘ঐতিহাসিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেন৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

‘‘সকলের জন্য বিবাহ পূর্ণাঙ্গ আইনগত ও সামাজিক সাম্যের পথে একটি মাইলফলক,’’ বলেন ম্যুলার৷ এর পাশাপাশি যেসব সমকামী পুরুষ ও মহিলা সমানাধিকারের জন্য বহু বছর ধরে সংগ্রাম করে আসছেন, তাঁদের প্রশংসাও করেন তিনি৷

পরিবেশ

লম্বা গলার জিরাফ

জিরাফদের সমলিঙ্গের মধ্যে ভালোবাসার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়৷ এমনকি গবেষকরা বলছেন, জিরাফদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই সমলিঙ্গের সঙ্গীর সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হয়৷

পরিবেশ

বোতলনাক ডলফিন

এই প্রজাতির স্ত্রী ও পুরুষ দুই ধরনের ডলফিনের মধ্যেই সমকামিতা দেখা যায়৷ মুখ এবং নাক দিয়ে স্পর্শ করে সঙ্গীকে আদর করে তারা৷ পুরুষ ডলফিনরা সাধারণত উভকামী৷

পরিবেশ

সিংহের আনুগত্য

পশু রাজ সিংহের মধ্যেও সমকামিতা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার৷ দুই থেকে চারটি পুরুষ সিংহ একটি জোট গঠন করে, যাতে সিংহীরা তাদের কাছে আসতে না পারে৷ অন্য জোট থেকে বাঁচতে একে অপরের উপর ভীষণ নির্ভরশীল তারা৷

পরিবেশ

বাইসন

পুরুষ বাইসনদের মধ্যে সমকামিতা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার৷ কেননা স্ত্রী বাইসনদের সঙ্গে বছরে একমাত্র একবার মিলন হয় তাদের৷ তাই প্রজনন মৌসুমে পুরুষ বাইসনরা একে অপরের সঙ্গে দিনে বহুবার মিলিত হয়৷

পরিবেশ

বানরদের ‘ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড’

ম্যাকাক প্রজাতির নারী ও পুরুষ বানর – উভয়ের মধ্যে এই প্রবণতা রয়েছে৷ যেখানে পুরুষরা মাত্র একরাতের জন্য সমলিঙ্গের সঙ্গে মিলিত হয়, সেখানে স্ত্রী বানররা নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী বন্ধন গড়ে তোলে এবং একে অপরের সঙ্গে থেকে যায়৷

পরিবেশ

অ্যালবাট্রসদের বন্ধন

হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের লেসন অ্যালবাট্রসরা তাদের সমকামী বন্ধনের জন্য ভীষণভাবে পরিচিত৷ এরা এতটাই বন্ধনে জড়িয়ে যায় যে পুরো জীবন একসাথে কাটিয়ে দেয়, যেন মনে হবে একটি সন্তান সহ স্বামী-স্ত্রীর সুখি পরিবার৷

পরিবেশ

যৌন-বিকারগ্রস্ত বনোবো

পিগমি শিম্পাঞ্জী বা বনোবোকে বলা হয় মানবজাতির সবচেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ প্রাণী৷ তারা খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে মিলিত হতে থাকে, এমনকি সমলিঙ্গের সঙ্গে৷ নিজেদের আনন্দের জন্যই এটা করে তারা৷ তবে এটা ঠিক তারা এটাকে নিজেদের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করা এবং দুশ্চিন্তা দূর করার উপায় হিসেবেও মনে করে৷ স্ত্রীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি৷

পরিবেশ

প্রতি ৫টির মধ্যে একটি রাজহাঁস সমকামী

অনেক পাখিদের মতো রাজহাঁসরাও একগামী এবং বছরের পর বছর ধরে তারা এক সঙ্গীর সঙ্গে কাটিয়ে দেয়৷ এদের মধ্যে অনেকেই সঙ্গী হিসেবে সমলিঙ্গের হাঁসকে বেছে নেয়৷ শতকরা ২০ ভাগ রাজহাঁস সমকামী এবং তারা প্রায়ই পরিবার গঠন করে৷

পরিবেশ

সিন্ধুঘোটক

পুরুষ সিন্ধুঘোটক চার বছর বয়সের আগে যৌনসক্ষমতা লাভ করে না৷ এর আগ পর্যন্ত তাদের প্রায় সবাই সমকামী থাকে৷ যখন তাদের চার বছর হয় তখন হয় তারা উভগামী হয়, না হলে কেবল প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী সিন্ধুঘোটকদের সঙ্গে মিলিত হয়৷

পরিবেশ

ভেড়াদের পছন্দ

গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পুরুষ ভেড়ার পালের ৮ ভাগ ভেড়াই সঙ্গী হিসেবে পুরুষদের পছন্দ করে, এমনকি প্রজননের সময়ও৷

২০০১ সাল থেকেই সমকামী যুগলরা সিভিল ম্যারেজের মতো তাদের সিভিল পার্টনারশিপ রেজিস্ট্রি করতে পারতেন৷ সংসদে ভোটের পর এবার তারা পূর্ণ বৈবাহিক সমতা পেলেন৷ এর ফলে নারী-পুরুষের সিভিল ম্যারেজ ও সমকামীদের সিভিল পার্টনারশিপের মধ্যে ব্যবধানের অন্ত ঘটল৷ সমকামী যুগলরা যে সন্তান দত্তক নিতে পারতেন না, বিশেষ করে সেই বাধাটি দূর হলো৷

কার্ল ক্রাইলে-র বয়সএখন ৫৯ বছর৷ বোডো মেন্ডে-র ৬০৷ দু'জনের প্রথম আলাপ ১৯৭৯ সালে সাবেক পশ্চিম বার্লিনে৷ তখন থেকেই তাঁরা জার্মানিতে সমকামীদের অধিকারের জন্য আন্দোলন করে আসছেন৷ ‘‘এটি একটি আবেগপূর্ণ মুহূর্ত যার প্রতীকী গুরুত্ব অসীম,’’ বলেন ক্রাইলে৷ ‘‘বিবাহ শব্দটিতে উত্তরণ প্রমাণ করে যে, জার্মান রাষ্ট্র আমাদের বাস্তবিক সমান বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে৷’’

সাংবিধানিক বাধা

গত জুন মাসে পরিস্থিতি হঠাৎ পাল্টে যায়, যখন চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল সমকামী বিবাহ প্রসঙ্গে তাঁর দলের বিধায়কদের নিজেদের বিবেক অনুযায়ী ভোট দেবার সুযোগ দেন৷ ম্যার্কেল স্বয়ং সমকামী বিবাহের বিরুদ্ধে ভোট দিলেও, সাংসদদের একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিলটির সপক্ষে ভোট দেন৷ ফলে জার্মানি ইউরোপে চতুর্দশ ও বিশ্বের ২৩তম দেশ হিসেবে সমকামী বিবাহকে বৈধ করে৷

‘‘আমার মতে, এই বিল এতদিন দেরি করানো ও (ম্যার্কেলের) পক্ষে তার বিরুদ্ধে ভোট দেওয়াটা অশোভন হয়েছে,’’ বলে মন্তব্য করেন সামাজিক গণতন্ত্রী দলের সাংসদ ও সমকামী বিষয়ক কমিশনার ইওহানেস কার্স৷ কার্স এএফপি সংসাদ সংস্থাকে বলেন যে, লিঙ্গ অথবা যৌন প্রবণতার কারণে বৈষম্যের বিরুদ্ধে পূর্ণ সুরক্ষার জন্য এখনও সংবিধান সংশোধন করার প্রয়োজন রয়েছে৷ ‘‘সে সব ধীরে ধীরে করতে হবে৷ আসল কথা হলো, আমরা বিবাহের ক্ষেত্রে দুয়ার খুলে দিয়েছি, যা সংকেত হিসেবে কাজ করবে,’’ বলেন কার্স৷

জার্মান সমাজ সমকামী বিবাহকে মেনে নিয়েছে

জরিপে দেখা যাচ্ছে যে, ৭৫ শতাংশ জার্মান সমকামী বিবাহের পক্ষে৷

তুরস্ক

১৮৫৮ সালে অটোমান সাম্রাজ্য সমকামিতাকে বৈধতা দেয়৷ এরপর তুরস্ক স্বাধীন হলে সেই আইন বলবৎ রাখে৷ তবে সে দেশের সংবিধানে সমকামীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা না থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে যেমন তেমনি সামাজিকভাবেও সমকামীদের এখনও বৈষম্যের শিকার হতে হয়৷

মালি

পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটির সংবিধানে সমকামী কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়নি৷ তবে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ সমকামিতা পছন্দ করে না৷ তাই বৈধ হলেও মালির সমকামীরা বেশ ভালোই বৈষম্যের শিকার হন৷

জর্ডান

১৯৫১ সালে দেশটিতে সমকামিতাকে বৈধতা দেয়া হয়৷ অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশের তুলনায় সেখানকার সমকামীরা বেশ ভালোই আছে৷ সরকারও আইন করে সমকামীদের ‘অনার কিলিং’-এর হাত থেকে রক্ষা করেছে৷

ইন্দোনেশিয়া

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলমানের বাস এই দেশটিতে৷ সেখানকার আইনে সমকামিতাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়নি৷ ২০০৩ সালে একবার সেরকম উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটি ব্যর্থ হয়৷

আলবেনিয়া

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এই দেশটিতে সমকামিতা বৈধ৷ এমনকি আইন করে সমকামীদের বৈষম্যের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে৷

বাহরাইন

১৯৭৬ সালে সেখানে সমকামিতাকে আইনগত বৈধতা দেয়৷ তবে দেশটিতে এখনও প্রকাশ্যে ছেলেরা মেয়েদের, কিংবা মেয়েরা ছেলেদের পোশাক পরতে পারে না৷

ফিলিস্তিন (পশ্চিম তীর)

পশ্চিম তীরের জর্ডান অংশে ১৯৫১ সাল থেকে সমকামিতা বৈধ৷ তবে গাজাতে নয়৷ মজার ব্যাপার হচ্ছে, গাজায় যে আইনের কারণে সমকামিতা নিষিদ্ধ সেটা বলবৎ হয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে৷

ইরাক

দেশটি সমকামিতাকে বৈধতা দিলেও বিষয়টি এখনও সেখানে ‘ট্যাবু’ হয়েই আছে৷

২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জার্মানিতে প্রায় ৯৪,০০০ সমকামী যুগল একত্রে বাস করেন৷ তাঁদের মধ্যে ৪৩,০০০ নিজেদের সম্পর্ককে ‘সিভিল পার্টনারশিপ’ হিসেবে রেজিস্ট্রি করেছেন৷

জার্মানির সমকামী পুরুষ ও মহিলা সমিতি এলএসভিডি-র বার্লিন শাখার প্রধান ইয়র্গ স্টাইন্যার্ট বলেন যে, বিবাহ করতে পারার ফলে সমকামী দম্পতিরা নানা ধরণের সুযোগযুবিধা পাবেন, দত্তক নেওয়ার অধিকার যার মধ্যে অন্যতম৷ সমকামী দম্পতির দত্তক নেওয়ার প্রথম ঘটনা আগামী চৌঠা অক্টোবর বার্লিনে ঘটতে চলেছে বলে তিনি জানান৷

বার্লিনের কিছু কিছু শহরে রবিবারও রেজিস্ট্রি অফিস খোলা রাখা হয়, যাতে দেশের প্রথম সমকামী দম্পতিরা তাদের বিবাহ উদযাপন করতে পারেন৷ উত্তরের হামবুর্গ শহর ও বার্লিনের শ্যোনেব্যার্গ এলাকা ছিল তার মধ্যে অন্যতম৷ অপরদিকে দৃশ্যত বিভিন্ন রেজিস্ট্রি অফিসের সফ্টওয়্যারে পুরুষ ও পুরুষ বা মহিলা ও মহিলার বিবাহের বিকল্পটি না থাকায়, গোড়ায় দম্পতিদের একজনের লিঙ্গ ভুল দেখাতে হয়েছে৷ তবে সফ্টওয়্যারের গলদ ঠিক করা হচ্ছে বলে প্রকাশ৷

এসি/এসিবি (ডিপিএ, এপি, এএফপি)

প্রিয় পাঠক, আপনি কিছু বলতে চাইলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে...

সংশ্লিষ্ট বিষয়