জার্মানিতে বন্যা: এখানেও হ্যাশট্যাগ, টুইটার, ফেসবুক

জার্মানিতে ২০১৩ সালের বন্যায় নদী কূল ছাপিয়েছে, বাঁধ ভেঙেছে, শহর প্লাবিত হয়েছে, গ্রাম ডুবে গেছে৷ আর যা হয়েছে, তা হলো সোশ্যাল মিডিয়া এই সংকটেও করে দেখিয়েছে যে, তাকে বাদ দিয়ে আজ কোনো পরিস্থিতিই কল্পনা করা সম্ভব নয়৷

টেলিভিশনে এক মহিলা বাঁধ দেবার জন্য প্লাস্টিকের ব্যাগে বালি ভরতে ভরতে বলছিলেন: আজকাল আর খবর কে শোনে৷ সবাই তো ‘নেট' থেকেই খবর পায়৷ – খবর পায়, আবার দেয়ও বটে৷ লোকের কি মালমশলার দরকার পড়লেও নেটেই খবর চায়৷ নেটটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে সব ধরনের সামাজিক গতিবিধির কেন্দ্রবিন্দু, বিপদ-আপদের সময়ে যা আরো প্রযোজ্য৷

জার্মানি ইউরোপ | 07.06.2013

বন্যার সময় নেটের ব্যবহার? স্বভাবতই জার্মানির সদ্যসৃষ্ট ‘পাইরেটস' দল এখানে অগ্রণী, কেননা দলটির জন্মই বাঁধনহীন, সীমানাছাড়া নেট-স্বাধীনতা, নেট-সংস্কৃতির ডাক থেকে৷

বন্যার পানির পাশে বসে মোবাইলে ব্যস্ত দুই তরুণী

তাদের ওয়েবসাইটেই বন্যাত্রাণ সংক্রান্ত একটি নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করা হয়েছে৷ সেই সাইটে কে একজন বার্তা দিয়েছেন: ‘‘শহরের কেন্দ্রের কাছাকাছি স্নান করার একটা সুযোগ চাই৷ গোটা দিনটা কাদা ঘাঁটার পর খুব ভালো লাগবে৷''

‘হ্যাশট্যাগ হোখভাসার' (হ্যাশট্যাগ বন্যা) হয়ে দাঁড়ায় টুইটারের টপ ট্রেন্ডগুলির মধ্যে অন্যতম৷ ফেসবুকে নিজের থেকেই বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি হয়েছে৷ বন্যাপীড়িত এলাকার মানুষরা সেখানে একত্রিত হচ্ছেন, সংগঠিত হচ্ছেন, পারস্পরিক সাহায্যের ব্যবস্থা করছেন৷ কারোর পরিবহণের প্রয়োজন; খাবার বিতরণ; ওষুধপত্র; বন্যার জল বাড়া-কমা; দান হিসেবে যে সব জিনিসপত্র আসছে; কারা নিজেদের বাড়িতে বন্যার্তদের থাকার ব্যবস্থা করছেন; কারোর যদি জল নেমে যাওয়ার পর বাড়িঘর পরিষ্কার করতে সাহায্য লাগে, তবে তারও আয়োজন করা যাবে৷ এ সবই চলেছে ওয়েবসাইটে, ফেসবুকে৷

ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে বন্যা

বন্যার পানি বাড়ছে

জার্মানির স্যাক্সনি এবং স্যাক্সনি-আনহাল্টের বড় অংশ এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে৷ এলবে এবং সালে নদীর পানি কমার কোন ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে না৷ বৃষ্টি থেমে গেলেও পানি সরে যেতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে৷

ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে বন্যা

কিছু মানুষ নিরাপদ

ডানিউব নদী অন্তত খানিকটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে৷ পাসাউয়ে পানির পরিমাণ কমে গেছে, তবে এখনো শহরের অংশবিশেষের অধিবাসীদের ঘরে ফিরতে দেওয়া হয়নি৷ পাসাউবাসী বড় বন্যার কবলে পড়লেও কোন প্রাণহানি হয়নি৷ মূলত উদ্ধারকর্মী এবং সেনাদের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে৷

ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে বন্যা

বন্যা উপদ্রুত এলাকায় চ্যান্সেলর ম্যার্কেল

হেলিকপ্টারে করে বন্যা উপদ্রুত এলাকা ঘুরে দেখছেন চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল৷ আসন্ন নির্বাচনের স্বার্থে এমন ছবি রাজনীতিবিদদের বড় প্রয়োজন৷ ২০০২ সালে বন্যার সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন ম্যার্কেলের পূর্বসূরি গেয়ারহার্ড শ্র্যোডার৷ ম্যার্কেল বন্যা উপদ্রুতদের অর্থ সহায়তা করার ঘোষণা দিয়েছেন৷

ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে বন্যা

পানি যা রেখে গেছে

বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা পাওয়া যায়৷ পাসাউয়ের বাসিন্দারা এভাবে দ্রুত কাদা সরিয়ে ফেলছেন৷ কেননা, এই কাদা বেশ ক্ষতিকারক৷

ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে বন্যা

গামবুটের সংকট

বন্যা উপদ্রুত এলাকার মানুষদের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে গামবুট৷ কিন্তু জুতার দোকানগুলোতে এই সংকট দেখা দিয়েছে৷ পানি এবং কাদা থেকে রেহাই পেতে অনেকেই এই জুতা কিনেছেন৷

ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে বন্যা

এলবে পানি বাড়ছে

‘এলবের ফ্লোরেন্স’ খ্যাত ড্রেসডেন শহরের ঐতিহাসিক ভবনগুলোর অংশবিশেষে বন্যার পানি ঢুকে গেছে৷ এই পানির ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো কেউ ধারণা করতে পারছে না৷

ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে বন্যা

ভরসা বালুর বস্তা

বন্যার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বালুর বস্তার ব্যবহারও বাড়ছে৷ বালুর বস্তা পরিবহনে সবাই হাত লাগাচ্ছেন৷

ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে বন্যা

এই প্রাচীর কি ভেঙে পড়বে?

হালের গিমরিৎস বাঁধ রক্ষায় এভাবেই বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে৷ কিন্তু পানি বাড়তে থাকলে একসময় এই বাঁধ আর টেকানো যাবে না৷

ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে বন্যা

উদ্বিগ্ন চাহনি

স্যাক্সনি-আনহাল্টের হালে শহর সালে নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে হুমকির মুখে রয়েছে৷ গভীর উদ্বেগের সঙ্গে তাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন সেখানকার বাসিন্দারা৷ ধীরে ধীরে পানির উচ্চতা বাড়ছে৷

জার্মানি ইউরোপ | 03.06.2013

বন্যা তো জার্মানিতে হরহামেশা হয়ে থাকে: ২০০২ সালে, ২০০৬, ২০১০৷ কিন্তু এবার তার খবর ছড়াচ্ছে বিদ্যুৎ নয়, বৈদ্যুতিক গতিতে৷ টেলিভিশন কেন্দ্রগুলি ক্যামেরা টিম পাঠিয়ে ওঠার আগেই বেসরকারি, বেফরমাশি ‘আই-রিপোর্টারদের' তোলা ভিডিও নেটে ছড়িয়ে যাচ্ছে; পরে প্রতিষ্ঠিত, অভিজাত মিডিয়াও তা নির্দ্বিধায় ব্যবহার করছে৷

সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে উঠছে ভবিষ্যতের সিভিল ডিফেন্স, বেসামরিক প্রতিরক্ষা, বন্যাত্রাণ৷ তরুণ প্রজন্মের কাছে তথ্যের, খবরাখবরের মূল উৎসই হলো এই সোশ্যাল মিডিয়া৷ কাজেই সরকার কি প্রশাসন, সকলকেই সোশ্যাল মিডিয়ার খোঁজ রাখতে হচ্ছে, এমনকি প্রয়োজনে দ্বারস্থ হতে হচ্ছে৷ শিখতে হচ্ছে, নাগরিকদের সঙ্গে কিভাবে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়৷ অন্যদিকে নেটে কিভাবে ‘চলাফেরা' করতে হয়, কোন পোস্টিংটা খাঁটি আর কোনটা মেকি, এ সব বুঝতে আমলাদের অনেক সময় লেগে যাবে, আরো লোক রাখতে হবে৷ কাজেই নেট যতদূর এগিয়েছে, সমাজ যতদূর এগিয়েছে, সরকার-প্রশাসনের ততদূর অবধি এগোতে এখনো কিছুটা বাকি৷ কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই হোক কিংবা অন্য কোনো ঘটনাই হোক, নাগরিকরাই এখন তার সিসমোগ্রাফ এবং সেন্সর, এই বন্যা সেটাই আবার প্রমাণ করল৷

আমাদের অনুসরণ করুন