জার্মানিতে শিক্ষকরা কতটা শ্রদ্ধা পান?

জার্মানিতে শিক্ষকরা স্কুলের পড়ুয়াদের কাছে, তাদের বাবা-মায়েদের কাছ থেকে, সমাজের কাছ থেকে কতটা শ্রদ্ধা পান? স্কুলগুলিতে অবশ্যই উদার, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ – যার মূল্য দিতে হয় প্রধানত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

২০১২ সালের আলেনবাখ স্টাডি নামধারী একটি জরিপ আজও জার্মানিতে শিক্ষকতার পেশা নিয়ে কথা উঠলেই উল্লেখ করা হয়৷ সেটি হলো আলেনবাখ ইনস্টিটিউট ফর ডেমোস্কোপির একটি জরিপ৷ সেই জরিপে জার্মানির সব ধরনের স্কুলের বেশ কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকাদের তাঁদের পেশার আদর্শগত ও বাস্তবিক দিকগুলির মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছিল৷

উত্তরদাতাদের ৪৯ শতাংশ বলেন যে, ছাত্র পড়ানো পাঁচ-দশ বছর আগে যা ছিল, আজ (অর্থাৎ ২০১২ সালে) তার চেয়ে অনেক বেশি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ৩৫ শতাংশ শিক্ষক-শিক্ষিকা বলেন, ছাত্র-ছাত্রীরা অমনোযোগী; ৪৪ শতাংশ বলেন, ছাত্র-ছাত্রীরা শৃঙ্খলাবিহীন৷ বিত্ত ও শিক্ষার নিক্তিতে উচ্চবর্গের পরিবার থেকে যে সব ছেলেমেয়ে আসে, তাদের সঙ্গে নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের পার্থক্য ক্রমেই বেড়ে চলেছে, বলে জানান ৬০ শতাংশ শিক্ষক৷ অপরদিকে বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলি থেকে আসা ছেলে-মেয়েরা তাদের বাড়ির নানা সমস্যা স্কুলে বয়ে নিয়ে আসে৷ কাজেই শিক্ষক আর পড়ুয়াদের মধ্যে আসল সম্পর্ক হলো সন্দেহ আর অনাস্থার৷

উদ্বাস্তুদের জন্য ভাষাশিক্ষার পাঠক্রম

জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া এক কথা, এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করা আরেক কথা৷ কারণ তার জন্য প্রয়োজন জার্মান ভাষা শেখা৷ সেটা তো শুধু ক্লাসরুমের বেঞ্চিতে বসেই নয়, বাস্তব ও ব্যবহারিক জীবনেও জার্মান ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু শেখা যায় – যেমন বন শহরের পথেঘাটে৷

‘ইন্টেগ্রেশন কোর্স’

বিদেশি-বহিরাগতকে সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা, সমাজের অংশ করে তোলাকে জার্মানে বলে ‘ইন্টেগ্রেশন’৷ এসিবি লিঙ্গুয়া ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুল রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য একটি বিশেষ ইন্টেগ্রেশন কোর্স চালু করেছে৷ সেই কোর্স অনুযায়ী পড়ুয়াদের মাঝেমধ্যে ক্লাসরুম ছেড়ে পথে বেরিয়ে অচেনা পথচারী বা দোকানিদের জার্মানে প্রশ্ন করতে বলা হয়েছে: ‘আচ্ছা, এটা কী ফল? ঐ সবজিটার নাম কী?’

আনারসের আর্বি যেন কী?

দেখলে চিনতে পারার কথা৷ দামটা না লিখলেও চলে, কিন্তু ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে...৷

পরীক্ষায় নকল নয়, তবে শর্টকাট চলে

ছাত্রদের বলে দেওয়া হয়েছে মোবাইল ব্যবহার না করতে, বরং রাস্তা বা অন্যান্য খোঁজখবরের জন্য মানুষজনকে জার্মানে প্রশ্ন করতে৷ কিন্তু ধরুন যদি বাসাম-এর মতো কাউকে পাওয়া যায়, যে জার্মান আর আর্বি, দু’টো ভাষাই জানে, তাহলে তো পোয়াবারো!

বেটোফেন যেন কবে জন্মেছেন?

লুডভিশ ফান বেটোফেন সম্ভবত বন শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত সন্তান৷ জন্মেছিলেন ১৭৭০ সালে, শহরের মূল চত্বরের কাছের একটি গলিতে বেটোফেনের জন্মের বাড়ি না দেখলে, বন-এ কিছুই দেখা হলো না৷ রাদওয়ান আয়ুজ ও তাঁর ছেলে আলি অতিকষ্টে বেটোফেনের জন্মের তারিখটা খুঁজে বার করেছেন৷

রাস্তাঘাট চেনা

টিমকে হয়ত বলে দেওয়া হয়েছে, ‘ফ্রিডেন্সপ্লাৎস’, মানে শান্তির চত্বরে যাও৷ অথবা ৬০৮ নম্বর বাস কোথায় যাচ্ছে? পরের বাসটা আসবে কখন? বাসটা আবার থামে একটি উদ্বাস্তু আবাসের কাছে, যেখানে দলের অনেকের বাস৷

বন থেকে চিঠি

কোথাও বসে পোস্টকার্ড লেখা হলো ক্লাসের নতুন কাজ৷ তার জন্যে পোস্ট অফিসে গিয়ে স্ট্যাম্প কিনে, পোস্টকার্ডে সেঁটে পোস্ট করতে হবে৷ স্ট্যাম্পের ‘রিসিট’ রেখে দিতে হবে৷

পয়েন্ট মানেই ‘প্রাইজ’

এরপরেও ডয়চে ভেলের রিপোর্টার যে দলটির সাথে ছিলেন, তাঁরা খুব ভালো ফলাফল করতে পারেনি – সম্ভবত রিপোর্টারের কচকচানি, তার ওপর আবার রিপোর্টারকে কোনো প্রশ্নের উত্তর জিগ্যেস করা চলবে না, এই কারণে৷

তারপরে আছেন বাবা-মায়েরা৷ তাদের মধ্যে কিছু বাবা-মায়ের মতে শিক্ষকরা বড় বেশি সদয় ও সহিষ্ণু হয়ে পড়েছেন; সাজা না দিলে শৃঙ্খলা রক্ষা করা যায় না৷ আরেকদল বাবা-মায়ের মতে ছাত্র-ছাত্রীদেরই উচিত,তাদের শিক্ষক-শিক্ষিকারা ঠিকমতো পড়াচ্ছেন কিনা, নিয়মিত তার মূল্যায়ন করা৷ অর্থাৎ অভিভাবকদের সাথে শিক্ষকদের সম্পর্কও সহজ নয়৷

এর ওপর যখন সাবেক সামাজিক গণতন্ত্রী গেরহার্ড শ্রোয়ডার-এর মতো রাজনীতিকরা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ‘‘ফাউলে জেকে'' বা ‘কুঁড়ের বাদশা' বলে অভিহিত করেন, তার ওপর বাজারে ধুয়ো ওঠে যে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সরকারি কর্মকর্তার মর্যাদা না দিয়ে, করণিকের মর্যাদা দেওয়া উচিত – যার ফলে তাদের মাসমাইনে প্রায় ৫০০ ইউরো কমে যাবে – তাহলে জার্মানিতে শিক্ষকতার পেশা যে তার প্রথাগত আকর্ষণীয়তা হারাচ্ছে, তা বলা বাহুল্য৷

শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আরেকটি অভিযোগ হলো ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা বড় বেশি৷ সেই সঙ্গে শৃঙ্খলাহীনতা৷ সব মিলিয়ে বিশেষ করে ‘গিমনাজিয়ুম' বা হাইস্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে অসুখে পড়ার প্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে বেশি, যার ফলে নাকি বছরে দশ লাখ ঘণ্টা ক্লাস বাতিল করতে হয়! ওদিকে শিক্ষাব্যবস্থা হল রাজ্য সরকারের অধীনে ও তারা আরো বেশি শিক্ষক নিয়োগ করতে অনিচ্ছুক৷

এ সব বলার পরেও প্রশ্ন থেকে যায়: তাহলে কি জার্মানির স্কুলগুলিতে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়েছে, না কমেছে? আসল উত্তর সম্ভবত এই যে, অন্য সব সমাজের মতোই জার্মান সমাজেও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি শ্রদ্ধা নির্ভর করছে সাধারণভাবে সমাজে বয়ঃকনিষ্ঠরা বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে কিরকম ব্যবহার করছে,তার উপর৷ সমাজে যদি শিশু-কিশোরদের দাপট, স্বাধীনতা, ঔদ্ধত্য, অভব্যতা বাড়ে, তবে তার ঢেউ শ্রেণিকক্ষ অবধি এসে পৌঁছবে বৈকি৷

Deutsche Welle DW Arun Chowdhury

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

মনে রাখতে হবে, জার্মানিতে শিক্ষকদের কোনো ধরনের শারীরিক শাস্তি দেবার অধিকার নেই৷ অথচ বিচ্ছিন্নতার সমাজে বিচ্ছিন্ন পরিবারবর্গের সন্তানরা আজ আরো বেশি করে এমন একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ খোঁজে, যার কাছে তারা তাদের বয়ঃসন্ধিসুলভ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, ক্ষেত্রবিশেষে দুই সংস্কৃতির সংঘাত নিয়ে কথাবার্তা বলতে পারে – অথবা শুধুই উচ্ছৃঙ্খলতা করে তাদের বিষাদকে অভিব্যক্তি দিতে পারে৷ এ সবের বোঝা বইতে হয়, ধাক্কা সামলাতে হয় – শিক্ষককে৷

শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা বা অশ্রদ্ধা নয়, শিক্ষকের প্রতি আচরণ হলো এই কিশোর-কিশোরীদের মানসিক পরিস্থিতি, আশা-আকাঙ্খা-হতাশার মুকুর বা প্রতিবিম্ব৷ এ হলো যেন একটা রোগের লক্ষণ – সিম্পটম – বুদ্ধিমান ডাক্তার যা চেপে দেবার চেষ্টা না করে, বোঝার চেষ্টা করবেন৷ কিন্তু রোগনির্ণয়ের পর রোগ নিরাময়ের পদক্ষেপ নেবার দায়িত্বটা হবে শুধু চিকিৎসকের নয়, অভিভাবক, সমাজ, সরকার, সকলের৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

২০১২ সালের আলেনবাখ স্টাডি নামধারী একটি জরিপ আজও জার্মানিতে শিক্ষকতার পেশা নিয়ে কথা উঠলেই উল্লেখ করা হয়৷ সেটি হলো আলেনবাখ ইনস্টিটিউট ফর ডেমোস্কোপির একটি জরিপ৷ সেই জরিপে জার্মানির সব ধরনের স্কুলের বেশ কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকাদের তাঁদের পেশার আদর্শগত ও বাস্তবিক দিকগুলির মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছিল৷