জার্মানিতে সিরীয় শরণার্থীরা সরাসরি রাজনৈতিক আশ্রয় পাবে না

শ্লেসভিগ রাজ্যের উচ্চতর প্রশাসনিক আদালত সিরীয় শরণার্থীদের বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে৷  রায়ে বলা হয়েছে, জার্মানিতে সিরীয় উদ্বাস্তুরা সরাসরি রাজনৈতিক আশ্রয় পাবে না৷

জার্মানির অভিবাসন ও উদ্বাস্তু সংক্রান্ত ফেডারাল কার্যালয় বা বিএএমএফ (‘বাম্ফ') সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া থেকে আগত রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদেরও শুধুমাত্র ‘সাবসিডিয়ারি প্রোটেকশন', অর্থাৎ সহায়ক বা সম্পূরক সুরক্ষা দিচ্ছে, জেনেভা চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণ উদ্বাস্তু সুরক্ষা নয়৷

তফাৎটা এই যে, পূর্ণ সুরক্ষার অর্থ, রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী জার্মানিতে প্রাথমিকভাবে তিন বছর ধরে বাস করার অনুমতি পাবেন এবং সাধারণত তার পরপরই স্থায়ী ‘রেসিডেন্স পার্মিট' দেওয়া হয়ে থাকে৷ এছাড়া এ ধরনের উদ্বাস্তুরা তাদের পরিবারবর্গকে জার্মানিতে নিয়ে আসতে পারেন৷

সাবসিডিয়ারি প্রোটেকশনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের মাত্র এক বছরের রেসিডেন্সি পার্মিট দেওয়া হয়ে থাকে৷ পরে তা আরো দু'বছরের জন্য বাড়ানো হতে পারে৷ কিন্তু সেই মেয়াদবৃদ্ধির জন্য আলাদা করে আবেদন করতে হয়৷ এছাড়া সংশ্লিষ্ট আশ্রয়প্রার্থীর পরিবারবর্গকে ২০১৮ সালের আগে জার্মানিতে আসতে দেওয়া হবে না৷

‘বাম্ফ' এইভাবে মোট ১,১৩,০০০ উদ্বাস্তুকে সহায়ক বা সম্পূরক সুরক্ষা দিয়েছে৷ তাদের মধ্যে ৯৪,০০০ জন এসেছেন সিরিয়া থেকে৷ ৩৩-বছর-বয়সি সিরীয় তরুণী একটি মামলা করেছিলেন৷ সেই মামলার রায় হলো  গতকাল, অর্থাৎ ২৩শে নভেম্বর, বুধবার৷

সিরিয়া থেকে যেভাবে জার্মানিতে এসেছে একটি পরিবার

আলেপ্পোয় সুখি সংসার

২০১৬ সালে তোলা কোটা পরিবারের ছবি৷ খলিল, তাঁর স্ত্রী হামিদা, সন্তান মান্নান, ডোলোভান, আয়াজ এবং নের্ভানা৷ তখন সিরিয়ায় কোনো গৃহযুদ্ধ ছিল না, ছিল না ধ্বংসলীলা৷

সিরিয়া থেকে যেভাবে জার্মানিতে এসেছে একটি পরিবার

দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত

সিরিয়ায় ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর সময় খলিল কোটো সেদেশের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি শাখার প্রধান ছিলেন৷ গৃহযুদ্ধ শুরুর পর চাকুরি হারান এই ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার৷ একসময় খাদ্য এবং পানির অভাব প্রকট হতে থাকে৷ ২০১৪ সালের এপ্রিলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, তারা তুরস্ক চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে খলিলের মা বাস করতেন৷

সিরিয়া থেকে যেভাবে জার্মানিতে এসেছে একটি পরিবার

ধাপে ধাপে আগানো

খলিল তুরস্কে কোনো কাজ খুঁজে পাননি৷ তাই ২০১৪ সালের জুলাইয়ে তাঁর পরিবার জার্মানিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন৷ খলিলের ভাই ইউরোপে বাস করেন৷ তিনিই পরিবারটিকে জার্মানিতে আসতে উৎসাহ যোগান৷ শরণার্থী হিসেবে জার্মানিতে আসার পথে বুলগেরিয়ায় একটি শরণার্থী শিবিরে ছয় মাস কাটান কোটো পরিবার৷ এই চামচটি সেই শিবিরের এক স্মৃতিচিহ্ন৷

সিরিয়া থেকে যেভাবে জার্মানিতে এসেছে একটি পরিবার

জার্মানিতে স্বাগতম

অবশেষে জার্মানিতে কোটো পরিবার৷ জার্মানির উত্তরের শহর ব্রেমেনে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে৷ সেখানকার এক নারী খলিলকে এই জিন্সের প্যান্টটি দিয়েছেন, জার্মানিতে পাওয়া তাঁর প্রথম পোশাক এটি৷

সিরিয়া থেকে যেভাবে জার্মানিতে এসেছে একটি পরিবার

অনিশ্চিত ভবিষ্যত

খলিলের সন্তানরা এখন জার্মান স্কুলে যাচ্ছেন৷ আর খলিল এবং তাঁর স্ত্রী হামিদা শিখছেন জার্মান৷ ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার জার্মানিতে একটি চাকরি পাবেন বলে আশা করছেন৷ সিরিয়ায় ফেলে আসা অতীত মাঝে মাঝে মনে করে আনন্দ খোঁজেন তারা৷ আয়াজের সিরিয়ার স্কুলের আইডি কার্ড এটি৷

শ্লেসভিগের প্রশাসনিক আদালতের প্রাথমিক রায় অনুযায়ী, সেই তরুণীর পূর্ণ উদ্বাস্তু সুরক্ষা পাওয়ার কথা৷ কিন্তু ‘বাম্ফ' এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর প্রশাসনিক আদালতে আপিল করে৷ সিরীয় নারীর বক্তব্য ছিল, দামেস্কে তাদের বসবাসের এলাকায় একটি ‘গণহত্যার' পর তারা সপরিবারে পলায়ন করেন৷ পথে বন্দুকধারীরা তাদের হত্যা করার ভয় দেখিয়েছে বলেও তিনি জানান৷ ওই নারীর স্বামী ও চার সন্তান আপাতত তুরস্কে রয়েছেন৷

শ্লেসভিগের উচ্চতর প্রশাসনিক আদালতের বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি উটা স্ট্রিজ বলেছেন, ‘‘সিরীয়া যে (দেশে প্রত্যাবর্তনকারী) সকলকেই বিরোধী বলে সন্দেহ করে, তার কোনো প্রমাণ নেই৷'' ‘সেনেট', অর্থাৎ বেঞ্চের মতে সিরিয়ায় প্রত্যাবর্তনকারীদের যে নিয়মিত জেরা করা হয়, সে সম্বন্ধেও আদলতের কাছে কোনো খবর নেই৷ কাজেই ফরিয়াদী সিরীয় নারীকেই দেখাতে হবে যে, তাঁর রাজনৈতিক নিপীড়নের আশঙ্কা রয়েছে৷ শুধুমাত্র সিরিয়া থেকে পলায়ন রাজনৈতিক আশ্রয় পাবার কারণ হতে পারে না৷ অভিবাসন ও উদ্বাস্তু সংক্রান্ত ফেডারাল কার্যালয় ‘বাম্ফ' ঠিক এই যুক্তিই দেখিয়েছিল৷

সারা জার্মানিতে আপাতত ৩২,০০০ এ ধরনের মামলা বিভিন্ন প্রশাসনিক আদালতে ঝুলছে৷ এ পর্যন্ত যে ৩,৪৯০টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, তার তিন-চতুর্থাংশ মামলায় রায় গেছে উদ্বাস্তুদের দিকে৷ নয়তো বহুকাল ধরে ইরিত্রিয়া, আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে আগত উদ্বাস্তুদের ‘সহায়ক সুরক্ষা' দিয়ে আসা হচ্ছিল৷ অন্যদিকে সিরীয়রা প্রায় বিনা ব্যতিক্রমে পূর্ণ সুরক্ষা পাচ্ছিলেন৷ ২০১৬ সালের মার্চে ‘দ্বিতীয় অ্যাসাইলাম প্যাকেজ' গৃহীত হবার পর সিরিয়া থেকে উদ্বাস্তুদের আগমন হ্রাস করা হবে ও সিরীয় উদ্বাস্তুদের স্বীকৃতি পাওয়ার নিয়মাবলী আরো কঠিন করা হবে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়৷ অতঃপর  স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই মর্মে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে উদ্বাস্তুদের পক্ষের উকিলরা সন্দেহ করছেন৷

উদ্বাস্তু পরিস্থিতি ও জার্মান রাজনীতি

উদ্বাস্তু শিবিরে দাঙ্গা

হামবুর্গ শহরের ভিলহেল্মসবুর্গ এলাকায় শরণার্থীদের প্রাথমিক আশ্রয়কেন্দ্রটি ভরে যাওয়ায় আগন্তুকদের তাঁবুতে থাকার ব্যবস্থা করা হয়৷ মঙ্গলবার (৬ই অক্টোবর) সেখানে আফগানিস্তান ও আলবেনিয়া থেকে আগত উদ্বাস্তুদের মধ্যে ব্যাপক দাঙ্গা বাঁধে৷ লোয়ার স্যাক্সনি-র ব্রাউনশোয়াইগ-এও অনুরূপভাবে আলজিরীয় ও সিরীয় উদ্বাস্তুদের মধ্যে দাঙ্গা বাঁধে একটি চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে৷

উদ্বাস্তু পরিস্থিতি ও জার্মান রাজনীতি

ইসলাম বিরোধীরা আবার মাথা চাড়া দিয়েছে

ড্রেসডেনে ইসলাম বিরোধী পেগিডা গোষ্ঠীর বিক্ষোভ সমাবেশে গত সোমবার প্রায় ন’হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন৷ বিক্ষোভকারীরা মূলত চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল-কেই বর্তমান উদ্বাস্তু সংকটের জন্য দায়ী করছেন৷

উদ্বাস্তু পরিস্থিতি ও জার্মান রাজনীতি

ম্যার্কেল লাগাম টানলেন

চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল দৃশ্যত তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টোমাস ডেমেজিয়ের-এর গুরুত্ব কিছুটা খর্ব করে চ্যান্সেলরের দপ্তরের প্রধান পেটার আল্টমায়ার-কে শরণার্থী সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন৷

উদ্বাস্তু পরিস্থিতি ও জার্মান রাজনীতি

উদ্বাস্তুর লাশ

টুরিঙ্গিয়া রাজ্যের সালফেল্ড-এ অবস্থিত একটি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী আবাসে সোমবার একটি অগ্নিকাণ্ডের পর ২৯ বছর বয়সি এক ইরিট্রিয়ান উদ্বাস্তুর লাশ পাওয়া যায়৷ কিভাবে এই শরণার্থী প্রাণ হারিয়েছেন, তা এখনও অজ্ঞাত৷ তবে আবাসটিতে ইচ্ছাকৃতভাবে অগ্নিসংযোগের কোনো হদিশ পুলিশ এখনও পায়নি৷

উদ্বাস্তু পরিস্থিতি ও জার্মান রাজনীতি

যে কোনো পন্থায়

টুরিঙ্গিয়ায় এর আগেও উদ্বাস্তু আবাস হিসেবে চিহ্নিত বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে শরণার্থীদের আসা বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে৷ যেমন বিশহাগেন-এর এই বাড়িটির ছাদ পুরোপুরি পুড়ে গিয়েছে৷ গত সোমবার এখানে প্রথম উদ্বাস্তুদের আসার কথা ছিল৷

উদ্বাস্তু পরিস্থিতি ও জার্মান রাজনীতি

ঘরে বাইরে

শরণার্থী সংকট এখন জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও টান ধরাচ্ছে৷ চ্যান্সেলর ম্যার্কেলের সিডিইউ দলের জোড়োয়া দল বাভারিয়ার সিএসইউ৷ তাদের প্রধান হর্স্ট জেহোফার সেপ্টেম্বর মাসের শেষে একটি দলীয় সম্মেলনে বক্তা হিসেব আমন্ত্রণ জানান হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অর্বান-কে, যিনি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে উদ্বাস্তুর স্রোত আটকানোর চেষ্টা করেছেন৷

উদ্বাস্তু পরিস্থিতি ও জার্মান রাজনীতি

হাওয়া যদি বদলায়

বাভারিয়ার অর্থমন্ত্রী মার্কুস জ্যোডার ইতিপূর্বেও বলেছেন: ‘‘আমরা (অর্থাৎ জার্মানি) বিশ্বকে বাঁচাতে পারি না৷’’ এমনকি তিনি অস্ট্রিয়া সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কথাও চিন্তা করেছেন৷ তবে জ্যোডার যখন সম্প্রতি রাজনৈতিক আশ্রয় প্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকার সীমিত করার কথা বলেন, তখন জেহোফার স্বয়ং সাথে সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন৷

প্রতিবেদন: ভোলফগাং  ডিক/এসি

সম্পাদনা : আশীষ চক্রবর্ত্তী

আমাদের অনুসরণ করুন