জার্মানির এখন ঠিক যা প্রয়োজন

ইদানীং জার্মানির আচরণের মধ্যে বেশ কিছু পরস্পরবিরোধী অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ শরণার্থীদের জন্য সহায়তার পাশাপাশি হিংসার ঘটনাও ঘটছে৷ ফেলিক্স স্টাইনার মনে করেন, অবশেষে চ্যান্সেলর ম্যার্কেল এ বিষয়ে মুখ খুলে ভালো কাজ করেছেন৷

গত দুই সপ্তাহ আগে গোটা বিশ্ব জার্মানির মানুষের মতিগতি জানতে পেরেছে৷ নামকরা এক প্রতিষ্ঠান ৫০০টি জনমত সমীক্ষার ফলাফলের এক সংকলন প্রকাশ করেছে৷ তার অনেক অংশ পড়লে হাসি পেতে পারে৷ যেমন জার্মানরা কুকুরের তুলনায় বিড়াল বেশি ভালোবাসে৷ বিয়ারের তুলনায় তারা ওয়াইন পান করতেই পছন্দ করে৷ বাইরে নয়, বাড়ির মধ্যেই তারা উৎসব পালন করতে চায়৷ জার্মানদের সম্পর্কে অনেক প্রচলিত ধারণাই ভুল বলে তুলে ধরা হয়েছে এই সমীক্ষার ফলাফলে৷ তবে একটি বিষয়কে ঘিরে অস্বস্তি রয়ে গেছে৷ সমীক্ষায় একটি বাক্য সম্পর্কে মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল৷ আর তা হলো, ‘জার্মানির বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাই এ পর্যন্ত সেরা'৷ মাত্র তিনটি রাজ্যে অর্ধেকের বেশি মানুষ এ বিষয়ে একমত৷ জার্মানির পূর্বাঞ্চলের তিনটি রাজ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ একমত পোষণ করে৷ পশ্চিমের তিনটি জনবহুল রাজ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ এই বাক্যটি মেনে নিতে প্রস্তুত৷

Felix Steiner

ফেলিক্স স্টাইনার, ডয়চে ভেলে

অনেকেই মৌলিক মূল্যবোধ আত্মস্থ করেনি

এই সমীক্ষার একটি দুর্বলতা অবশ্য স্পষ্ট৷ যারা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে সন্তুষ্ট নয়, তারা ঠিক কী ধরনের শাসন ব্যবস্থা চায়? – জার্মানির সম্রাট, ‘ফ্যুয়রার' বা নাৎসি শীর্ষ নেতা, নাকি কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতার হাতে তারা ক্ষমতা তুলে দিতে চায়? এই প্রশ্নটিও করা উচিত ছিল৷ তবে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে, সেটা হলো – জার্মানির অসংখ্য মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের এক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে৷ সে কারণে তারা সেই রাষ্ট্রের মূল্যবোধের সঙ্গেও তেমন একাত্ম বোধ করে না৷

স্যাক্সনি রাজ্যের হাইডেনাউ শহরে এই মুহূর্তে সেটা অত্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ সেখানে উগ্র দক্ষিণপন্থিরা বহিরাগত শরণার্থীদের দিকে লক্ষ্য করে পাথর, বোতল ও আতশবাজি ছুড়ছে এবং সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে থেকে সেই দৃশ্য দেখছে এবং কার্যত নীরব সমর্থন জানিয়ে চলেছে৷ অসহায় মানুষের উপর হিংসাত্মক হামলা চলছে, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে৷ তাদের মধ্যে অনেকে ভয়াবহ যুদ্ধের নারকীয় পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে এসেছে৷

প্রাথমিক রিসেপশান সেন্টারগুলো পুরোপুরি ভর্তি, কাজেই সাময়িক বাসস্থান হিসেবে অন্যান্য ভবন কাজে লাগানো হচ্ছে৷ নর্থ রাইন ওয়েস্ট ফালিয়া রাজ্যের হাম শহরের টাউন হলে ৫০০ উদ্বাস্তুর থাকার আয়োজন করা হয়েছে৷ ৭০০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের হলটিতে বেড়া দিয়ে দিয়ে আলাদা আলাদা ‘ঘরের’ ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ প্রত্যেকটি ‘ঘরে’ ১৪টি ক্যাম্পবেড রাখা চলে৷

উদ্বাস্তুদের জন্য একটি সুবিশাল টেন্ট ক্যাম্প বা ‘তাঁবু শিবির’ সৃষ্টি করা হয়েছে স্যাক্সনি রাজ্যের রাজধানী ড্রেসডেন শহরে৷ শৌচাগারের সামনে লম্বা লাইন পড়ে, খাবারের জন্যও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়৷ এখানে আপাতত ১৫টি দেশ থেকে আগত মোট এক হাজার মানুষের বাস৷ আগামীতে আরো শ’খানেক মানুষ এখানে থাকতে বাধ্য হবেন৷

উদ্বাস্তুদের বসবাসের জন্য একাধিক পৌর এলাকায় নতুন বাড়ি তৈরি করা হচ্ছে, যেমন বাভেরিয়ার একেনটাল শহরে৷ এখানে মোট ৬০ জন মানুষ বাস করতে পারবেন৷ আগামী বছরের সূচনাতে এখানে প্রথম উদ্বাস্তুরা বসবাস করতে পারবেন, বলে আশা করা হচ্ছে৷

গত দুই সপ্তাহ আগে গোটা বিশ্ব জার্মানির মানুষের মতিগতি জানতে পেরেছে৷ নামকরা এক প্রতিষ্ঠান ৫০০টি জনমত সমীক্ষার ফলাফলের এক সংকলন প্রকাশ করেছে৷ তার অনেক অংশ পড়লে হাসি পেতে পারে৷ যেমন জার্মানরা কুকুরের তুলনায় বিড়াল বেশি ভালোবাসে৷ বিয়ারের তুলনায় তারা ওয়াইন পান করতেই পছন্দ করে৷ বাইরে নয়, বাড়ির মধ্যেই তারা উৎসব পালন করতে চায়৷ জার্মানদের সম্পর্কে অনেক প্রচলিত ধারণাই ভুল বলে তুলে ধরা হয়েছে এই সমীক্ষার ফলাফলে৷ তবে একটি বিষয়কে ঘিরে অস্বস্তি রয়ে গেছে৷ সমীক্ষায় একটি বাক্য সম্পর্কে মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল৷ আর তা হলো, ‘জার্মানির বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাই এ পর্যন্ত সেরা'৷ মাত্র তিনটি রাজ্যে অর্ধেকের বেশি মানুষ এ বিষয়ে একমত৷ জার্মানির পূর্বাঞ্চলের তিনটি রাজ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ একমত পোষণ করে৷ পশ্চিমের তিনটি জনবহুল রাজ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ এই বাক্যটি মেনে নিতে প্রস্তুত৷

Felix Steiner

ফেলিক্স স্টাইনার, ডয়চে ভেলে

অনেকেই মৌলিক মূল্যবোধ আত্মস্থ করেনি

এই সমীক্ষার একটি দুর্বলতা অবশ্য স্পষ্ট৷ যারা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে সন্তুষ্ট নয়, তারা ঠিক কী ধরনের শাসন ব্যবস্থা চায়? – জার্মানির সম্রাট, ‘ফ্যুয়রার' বা নাৎসি শীর্ষ নেতা, নাকি কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতার হাতে তারা ক্ষমতা তুলে দিতে চায়? এই প্রশ্নটিও করা উচিত ছিল৷ তবে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে, সেটা হলো – জার্মানির অসংখ্য মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের এক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে৷ সে কারণে তারা সেই রাষ্ট্রের মূল্যবোধের সঙ্গেও তেমন একাত্ম বোধ করে না৷

স্যাক্সনি রাজ্যের হাইডেনাউ শহরে এই মুহূর্তে সেটা অত্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ সেখানে উগ্র দক্ষিণপন্থিরা বহিরাগত শরণার্থীদের দিকে লক্ষ্য করে পাথর, বোতল ও আতশবাজি ছুড়ছে এবং সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে থেকে সেই দৃশ্য দেখছে এবং কার্যত নীরব সমর্থন জানিয়ে চলেছে৷ অসহায় মানুষের উপর হিংসাত্মক হামলা চলছে, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে৷ তাদের মধ্যে অনেকে ভয়াবহ যুদ্ধের নারকীয় পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে এসেছে৷

সমস্যাটা শুধু একটি শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়৷ জার্মানির অনেক অঞ্চলে গত ৪৮ ঘণ্টায় শরণার্থী শিবিরে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে৷ এই অবস্থায় জার্মান চ্যান্সেলর বুধবার হাইডেনাউ সফর করছেন৷ এটা সত্যিই সুখবর৷ গত সপ্তাহান্ত থেকে এই শহরটি ঘৃণা ও চরম দক্ষিণপন্থি হিংসার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে৷

প্রাথমিক অভ্যর্থনা কেন্দ্রে প্রথম তিন মাস

রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের প্রাথমিকভাবে রাখার জন্য এই ‘রিসেপশান সেন্টারগুলি’ আছে – যেমন রাইনল্যান্ড প্যালেটিনেট রাজ্যের ট্রিয়ার শহরে৷ উদ্বাস্তুরা জার্মানিতে পৌঁছনোর পর তাঁদের সাধারণত এ ধরনের প্রাথমিক অভ্যর্থনা কেন্দ্রে রাখা হয়৷ সেখানে তিন মাস থাকার পর তাঁদের কোনো শহর কি জেলায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়৷

টাউন হলে ক্যাম্পবেড

প্রাথমিক রিসেপশান সেন্টারগুলো পুরোপুরি ভর্তি, কাজেই সাময়িক বাসস্থান হিসেবে অন্যান্য ভবন কাজে লাগানো হচ্ছে৷ নর্থ রাইন ওয়েস্ট ফালিয়া রাজ্যের হাম শহরের টাউন হলে ৫০০ উদ্বাস্তুর থাকার আয়োজন করা হয়েছে৷ ৭০০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের হলটিতে বেড়া দিয়ে দিয়ে আলাদা আলাদা ‘ঘরের’ ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ প্রত্যেকটি ‘ঘরে’ ১৪টি ক্যাম্পবেড রাখা চলে৷

ক্লাশরুমে রাত্রিবাস

উদ্বাস্তুর স্রোতে শহরগুলি নাজেহাল! আখেন শহরকে গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে ৩০০ উদ্বাস্তুকে রাখার ভার নিতে হয়৷ একমাত্র সমাধান: উদ্বাস্তুদের শোয়ার জন্য ইন্ডা গিমনাজিয়ুম নামের একটি স্কুলের ক্লাশরুমে ম্যাট্রেস পাতা৷

তাঁবুতে বাস

বর্তমানে জার্মানিতে ক্রমেই আরো বেশি সাময়িক উদ্বাস্তু শিবির সৃষ্টি করা হচ্ছে – তাঁবু গেড়ে৷ স্যাক্সনি আনহাল্ট রাজ্যের হালব্যারস্টাট শহরে এ ধরনের একটি অস্থায়ী ক্যাম্প সৃষ্টি করে আরো অনেক বেশি উদ্বাস্তুদের রাখা সম্ভব হয়েছে৷

ড্রেসডেনের টেন্ট ক্যাম্প

উদ্বাস্তুদের জন্য একটি সুবিশাল টেন্ট ক্যাম্প বা ‘তাঁবু শিবির’ সৃষ্টি করা হয়েছে স্যাক্সনি রাজ্যের রাজধানী ড্রেসডেন শহরে৷ শৌচাগারের সামনে লম্বা লাইন পড়ে, খাবারের জন্যও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়৷ এখানে আপাতত ১৫টি দেশ থেকে আগত মোট এক হাজার মানুষের বাস৷ আগামীতে আরো শ’খানেক মানুষ এখানে থাকতে বাধ্য হবেন৷

কনটেইনারে বাস

তাঁবুর বদলে উদ্বাস্তুদের কনটেইনারে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে কোথাও কোথাও৷ ট্রিয়ারে ২০১৪ সাল থেকেই এই পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে৷ আজ সেখানে এক হাজারের বেশি উদ্বাস্তু বাস করেন৷

উদ্বাস্তু আবাসের উপর আক্রমণ

বাডেন ভুর্টেনব্যার্গ রাজ্যের রেমকিঙ্গেন শহরে গত জুলাই মাসের ১৮ তারিখে একটি অগ্নিকাণ্ড ঘটে৷ অজ্ঞাত আততায়ীরা যে বাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়, সেখানে উদ্বাস্তুদের রাখার কথা ছিল৷ উদ্বাস্তুদের প্রতি এ ধরনের বিরূপ মনোভাব এখন অন্যত্রও পরিলক্ষিত হচ্ছে, বিশেষ করে জার্মানির পূর্ব এবং দক্ষিণাঞ্চলে৷

নতুন আবাসন গড়ার কাজ চলেছে

উদ্বাস্তুদের বসবাসের জন্য একাধিক পৌর এলাকায় নতুন বাড়ি তৈরি করা হচ্ছে, যেমন বাভেরিয়ার একেনটাল শহরে৷ এখানে মোট ৬০ জন মানুষ বাস করতে পারবেন৷ আগামী বছরের সূচনাতে এখানে প্রথম উদ্বাস্তুরা বসবাস করতে পারবেন, বলে আশা করা হচ্ছে৷

আঙ্গেলা ম্যার্কেল বুদ্ধিমতী হলে তিনি তাঁর ভাইস চ্যান্সেলর সিগমার গাব্রিয়েল-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন না৷ গাব্রিয়েল সোমবার হাইডেনাউ গিয়ে ঢালাওভাবে সব বিক্ষোভকারীদের একই পাত্রে ঢেলে তাদের বিরুদ্ধে কটূক্তি করেছেন৷ আবেগের ভিত্তিতে এমন প্রতিক্রিয়া অপ্রত্যাশিত নয় – কিন্তু একই সঙ্গে অর্থহীন৷ কারণ গালি দেওয়ার অর্থ বিচ্ছিন্ন করা, সরিয়ে দেওয়া৷ জার্মানির সামনে এই মুহূর্তে বিশাল চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করে রয়েছে৷ এই কাজে নাগরিকদেরও মন জয় করতে হবে৷ বিশেষ করে সেই সব মানুষকে, যাঁরা এতকাল উদাসীন ছিলেন৷

চ্যান্সেলরকে মানুষের মন জয় করতে হবে

এ কারণে আঙ্গেলা ম্যার্কেলকে কথা বলতে হবে, আবেগ-অনুভূতি দেখাতে হবে৷ সবার আগে ভীত শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে হবে৷ তারপর সাহায্যকারীদের সঙ্গে – যাঁদের অনেকে পেশাদারী ভিত্তিতে কাজ করছেন, অনেক স্বেচ্ছাসেবীও তাঁদের মধ্যে রয়েছেন৷ হাইডেনাউ শহরের সাধারণ মানুষের সঙ্গেও কথা বলতে হবে, যাঁদের মনে অনেক সন্দেহ ও সংশয় রয়েছে৷

ম্যার্কেল-এর সফর সফল হলে শহরের সাধারণ মানুষের চিত্তে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে৷ জনপ্রিয় ‘বিল্ড সাইটুং' সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে এমন চিত্তশুদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ ‘শরণার্থীদের বন্যা' বা ‘শরণার্থীদের ডেউ'-এর মতো শব্দ আচমকা এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে৷ তার বদলে শিরোনামে লেখা হয়েছে, ‘শরণার্থীদের সহায়তা – আমি এখন কী করতে পারি'৷ এই মুহূর্তে জার্মানির ঠিক এই সুরের প্রয়োজন রয়েছে৷