জার্মানির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে তুর্কি ভাষা শেখার ধুম

ইদানীং জার্মানিতে অনেক শিক্ষার্থী তুর্কি ভাষা শেখায় আগ্রহ দেখাচ্ছে৷ ভবিষ্যতে শুধু তুর্কি বংশোদ্ভূতরা নয়, যে কেউ স্কুলে দ্বিতীয় বিদেশি ভাষা হিসাবে তুর্কি নির্বাচন করতে পারবে৷ বহু জার্মান স্কুলেই তাই শিখানো হচ্ছে এ ভাষা৷

গেলসেনকিয়ার্শেন শহরের রিকার্ডা হুখ গিমনাসিয়ুম বা হাই স্কুলের থার্ড পিরিয়ড চলছে৷ একাদশ শ্রেণির ১৫ জন ছাত্রছাত্রী একটি তুর্কি কবিতা বিশ্লেষণ করছে৷ ‘‘কবি নারীদের নরম প্রকৃতির বলে অভিহিত করেছেন৷ যারা পৃথিবীকে সুন্দর করতে পারেন৷'' ছাত্রী এনেস সেটিনার ব্যাখ্যা করে বলে৷ এটি একটি ক্রেডিট কোর্স৷ যারা এখানে বসে আছে, তারা আবিটুয়র বা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার একটি বিষয় হিসাবে তুর্কি ভাষা নির্বাচন করেছে৷

জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা | 11.03.2014

পাঠ্যবিষয় হিসাবে তুর্কি ভাষা

এই স্কুলটি ৩০ বছরেরও আগে পাঠ্যবিষয় হিসাবে তুর্কি ভাষার প্রবর্তন করে৷ সে সময় অভিবাসী শ্রমিকদের সন্তানদের স্কুলশিক্ষা সহজ করার জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল৷

জার্মান শিক্ষার্থীদের অনেকে বিদেশে সেমেস্টার করার সুযোগ পেলে ইস্তানবুলকে নির্বাচন করেন

৬০-এর দশকে তুরস্ক থেকে খনি ও শিল্প কলকারখানায় কাজ করার জন্য এইসব শ্রমিককে আনা হয়৷ তাদের সন্তানদের অনেকে গিমনাসিয়ুমে পড়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভাষার কারণে তা সম্ভব হতো না৷ স্কুলটি এই সব ছেলেমেয়েকে আবিটুয়র পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার জন্য তাদের ভর্তি করে নেয়৷

জার্মানি ইউরোপ | 04.11.2013

ফ্রেঞ্চ বা ল্যাটিন ভাষার বদলে শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয় বিদেশি ভাষা হিসাবে তুর্কি নির্বাচন করতে পারে৷ তবে যারা একেবারে তুর্কি জানে না, তাদের জন্য এই বিষয় উপযোগী নয়৷ এমনকি তুর্কি বংশোদ্ভূত সেরেনাই উল্কার মতো ছাত্রীদের পক্ষেও সহজ নয় এই ভাষা৷ ‘‘অনেকটা জার্মান ক্লাসের মতো৷ ভাষাটা জানা থাকতে হয়, ক্লাসে মুদ্রিত পাঠ নিয়ে কাজকর্ম করা হয়৷'' জানায় ১৬ বছর বয়স্ক সেরেনাই৷

নর্থরাইন ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যের তথ্য অনুযায়ী গত বছর ৮,৫০০ ছাত্রছাত্রী পাঠ্যবিষয় হিসাবে তুর্কি ভাষা নির্বাচন করে আগের চেয়ে বেশি৷ এ কারণে এখন এমন একটি পাঠ্যসূচি তৈরি করা হয়েছে, যাতে শুধু তুর্কি বংশোদ্ভূতরা নয়, যে কেউ দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে তুর্কি নির্বাচন করতে পারে৷

এই বিষয়টি নেওয়ার ব্যাপারে যেন এখন ধুম পড়ে গিয়েছে৷

বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও তুর্কি ভাষার জনপ্রিয়তা বাড়ছে

এই অভিজ্ঞতা ডুইসবুর্গ-এসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তুর্কি ভাষা ইন্সটিটিউটের পিনার ও ওগুজকানেরও৷ তিনি এই ইন্সটিটিউটের গবেষণা সহকারী৷ এই ইন্সটিটিউটে তুর্কি ভাষার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়৷ ‘‘১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ৩০ জন্য শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হয় ইন্সটিটিউটটির৷ আজ সব মিলিয়ে ৬২০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন এই প্রতিষ্ঠানে৷'' জানান পিনার৷

এ কারণে ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ তুর্কি ভাষা বিভাগের জন্য নুমেরুস ক্লাউসুস বা ভর্তির সীমারেখা প্রবর্তন করেছে৷ তুর্কি ভাষার এই জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি একটা কারণও ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা৷

তুরস্ককে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শক্তিশালী দেশ হিসাবে দেখা হচ্ছে জার্মানিতে৷ আর এই জন্যই পালিত হচ্ছে ‘জার্মান-তুরস্ক বিজ্ঞানের বছর'৷

বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মান শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দেশ হিসাবে তুরস্ক জনপ্রিয়৷ বিদেশে কোনো সেমেস্টার করার সুযোগ পেলে ইস্তানবুলকে নির্বাচন করেন অনেকে৷

জার্মানিতে সফল কয়েকজন তুর্কি

চিত্র পরিচালক ফাতিহ আকিন

ফাতিহ আকিন জার্মানির চিত্রজগতের সুপারস্টারদের মধ্যে একজন, যার আন্তর্জাতিক পরিচিতি রয়েছে৷ তাঁর অভিনীত ছবি ‘গেগেন ডি ভান্ড’ (দেয়ালের বিপরীতে) ছবির জন্য তিনি বেশ কয়েকটি পুরস্কারও পেয়েছেন৷ সেগুলোর মধ্যে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব বার্লিনালের ‘গ্লোডেন বেয়ার’ও রয়েছে৷ তাঁর বাবা, মা দুজনই তুরস্ক থেকে এসেছেন৷ ফাতিহ আকিনের জন্ম ১৯৭৩ সালে জার্মানির হামবুর্গ শহরে৷

জার্মানিতে সফল কয়েকজন তুর্কি

রাঁধুনি আলি গ্যুনগোরমুস

গ্যুনগোরমুস ২০০৬ সালে একটি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সেরা রাঁধুনির পুরস্কার লাভ করেন৷ তাঁর ‘ল্য কানার নুভো’ নামের রেস্তোরাঁটি নামকরা রেস্তোরাঁর মধ্যে একটি৷ আলি ১০ বছর বয়সে তুরস্ক থেকে এসেছেন৷ ৩৭ বছর বয়সি আলি বলেন, তিনি যে একটি দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছেন সেটাই তাঁকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা যুগিয়েছে৷

জার্মানিতে সফল কয়েকজন তুর্কি

ব্যবসায়ী ভুরাল ওয়গার

ব্যবসায়ী ভুরাল ওয়গার ১৯৬০ সালে তুরস্ক থেকে জার্মানিতে এসেছেন৷ তিনি পড়াশোনা শেষ করার পর একটি আন্তর্জাতিক ট্রাভেল এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করেন৷ যেটা জার্মানির বৃহত্তম ট্রাভেল এজেন্সি হিসেবে গড়ে উঠে৷ তিনি ২০০৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এসপিডি দলের হয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে সংসদ সদস্য ছিলেন৷ তাঁর আন্ত:সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডের জন্য তাঁকে জার্মানির সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা ‘জার্মান সেবা পদক’ দেয়া হয়৷

জার্মানিতে সফল কয়েকজন তুর্কি

রাজনীতিক: সেম ওসডেমিয়ার

তুর্কি বংশোদ্ভূতদের মধ্যে সেমি ওসডেমিয়ারই প্রথম যিনি ১৯৯৪ সালে সবুজ দলের সদস্য হিসেবে জার্মানির সংসদ সদস্য হন৷ শুধু তাই নয়, পরে তিনি সবুজ দলের চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন৷ তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের অন্তর্ভুক্তির একজন সমর্থক৷ ওসডেমিয়ার জার্মান স্কুলে তুর্কি ভাষা শিক্ষা দেন৷

জার্মানিতে সফল কয়েকজন তুর্কি

উপস্থাপিকা নাজান একেস

হাসি মুখে যিনি বসার ঘরের টিভিতে উপস্থিত হন তিনি হচ্ছেন নাজান একেস৷ তিনি জার্মানির একজন জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপিকা৷ অভিবাসী তুর্কি বাবা-ময়ের সন্তান নাজান ছোট বড় অনেক টিভি অনুষ্ঠানেই উপস্থাপনা করেন৷ ২০১০ সালে নাজানের পরিবারের গল্প নিয়ে তাঁর লেখা একটি বই প্রকাশিত হয়েছে৷ তিনি সামাজিক কর্মকান্ডের সাথেও জড়িত৷ ২০১১ সাল থেকে তিনি জার্মান সরকারের ইন্টিগ্রেশন কাউন্সিল-এ আছেন৷

জার্মানিতে সফল কয়েকজন তুর্কি

জার্মান ফুটবল দলের খেলোয়াড় মেসুত ওজিল

মেসুত ওজিল জার্মান ফুটবল তারকাদের একজন৷ তুর্কি বাবা মায়ের সন্তান ওজিল জার্মান নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৯ সালে জার্মান জাতীয় ফুটবল দলে খেলার সুযোগ লাভ করেন৷ ২০১০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় ফুটবল প্রেমীদের হৃদয় জয় করায় তাঁকে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের তালিকায় মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল৷ মেসুত ওজিল জার্মানির সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়৷

জার্মানিতে সফল কয়েকজন তুর্কি

হেলমুট কোলের বিতর্কিত বিবৃতি

জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর হেলমুট কোল ১৯৮২ সালে ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে বলেছিলেন, তিনি জার্মানিতে বসবাসরত তুর্কিদের সংখ্যা অর্ধেকে কমিয়ে ফেলতে চান৷ কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, তুর্কিরা জার্মান সমাজের সঙ্গে নিজেদের ভালভাবে খাপ খাওয়াতে পারছেন না৷ ছবিঘরে থাকছে জার্মানির কয়েকজন সফল তুর্কি বংশোদ্ভূত নাগরিকের কথা৷

বহু সহযোগিতামূলক কর্মসূচি রয়েছে

জার্মান-তুর্কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে সহযোগিতামূলক কর্মসূচি বা প্রকল্প রয়েছে হাজার খানেক৷ এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ইস্তানবুলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গে সম্পৃক্ত৷

ডুইসবুর্গ-এসেন ইউনিভার্সিটির পিনার ওগুজকান এই প্রবণতাটা লক্ষ্য করেছেন৷ ‘‘আমাদের ইন্সটিটিউটের সব ছাত্রছাত্রীকে বিদেশে এক সেমেস্টার পড়াশোনা করতে হয়৷ এদের ৯০ শতাংশই ইস্তানবুলে যান৷''

এতো উচ্ছ্বাস সত্ত্বেও রিকার্ডা হুখ গিমনাসিয়ুমের পরিচালক উর্সুলা ক্লে কিছুটা হতাশার বাণীও শোনান৷ তাঁর স্কুলে তুর্কি ভাষা শেখার আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমাদের প্রাথমিক কোর্সের শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১৫ জন৷ এমনও হতে পারে আগামী বছর একজন ছাত্রও এই বিভাগে থাকবে না৷''

পড়ার পাট চুকিয়ে তুরস্কে কাজ করার ইচ্ছা

সেরেনাই উল্কার সামনের বছর হাই স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা বা আবিটুয়র পাশ করলে ব্যবস্থাপনা বিভাগে পড়াশোনা করতে আগ্রহী৷ তারপর তুরস্কে চাকরি ও বসবাস করতে চায় সে৷ ‘‘সেখানে সূর্য, সাগর, সৈকত সবকিছুই আছে৷'' হেসে জানায় এই কিশোরী৷ পরে কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলে, ‘‘জার্মানিতে ইন্টিগ্রেশন শুধু একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত৷ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ সুবিধা চমৎকার৷ কিন্তু চাকরির বাজারে তুর্কি বংশোদ্ভূত মেয়ে হিসাবে বৈষম্যের শিকার হতে হয়৷''

সেরেনাই শুধু তার ক্লাসে একাই নয়, আরো অনেকে স্কুল ও ইউনিভার্সিটির পড়াশোনা শেষ করে তুরস্কে যেতে আগ্রহী৷

এটা দুঃখজনক, মনে করেন গবেষণাবিদ পিনার ওগুজকান৷ এইভাবে জার্মানি সুশিক্ষিত কর্মী হারাচ্ছে৷ ‘জার্মান-তুরস্ক বিজ্ঞানের বছর' পালনের মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে পরিবর্তন হবে বলে আশা করেন তিনি৷

আমাদের অনুসরণ করুন