জার্মানি আবার তর্ক-বিতর্কের পথে চলেছে

আজকের নির্বাচনের দিনটি জার্মানির জন্য বিশাল পরিবর্তনের দিন৷ দক্ষিণপন্থি পপুলিস্ট এক দল এই প্রথম জার্মান সংসদে প্রবেশ করলো৷ ডয়চে ভেলের প্রধান সম্পাদক মনে করেন, আঙ্গেলা ম্যার্কেল বড় ঘা খেয়েছেন৷

এই নির্বাচন এক স্পষ্ট বার্তা বহন করছে৷ সবকিছু আর আগের মতন চলবে না৷ এবং এই নির্বাচনে দুই শিবিরের স্পষ্ট পরাজয় ঘটেছে৷ এসপিডি দল ২০ শতাংশের মতো ভোট পেয়ে ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের মুখ দেখেছে৷ অন্যদিকে চ্যান্সেলরের নিজের দল প্রায় ৮ শতাংশ সমর্থন হারিয়েছে৷ এমন ভূমিকম্প ঘটলে সাধারণ অবস্থায় নেতাদের পদত্যাগের প্রসঙ্গ উঠে আসে৷ কিন্তু জার্মানির জন্য এটা মোটেই স্বাভাবিক সময় নয়৷ প্রায় ১৩ শতাংশ ভোট পেয়ে এএফডি দল যেভাবে সংসদে প্রবেশ করলো, সেটাই শুধু অস্বাভাবিক বিষয় নয়৷ ফেডারেল জার্মান প্রজাতন্ত্র পত্তনের পর এই প্রথম কোনো দক্ষিণপন্থি পপুলিস্ট দল জার্মান সংসদে পা রাখছে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

Ines Pohl

ডয়চে ভেলের প্রধান সম্পাদক ইনেস পোল

দেশটা বদলে গেছে

এ এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সময়৷ আজকের নির্বাচনের দিনটি জার্মানির জন্য বিশাল পরিবর্তনের দিন৷ এটা কোনো হীনম্মন্যতার বিষয় নয়, একে সাক্ষাৎ বিপর্যয় বলা চলে৷ এটা একটা চ্যালেঞ্জ৷ সবার শেষে বলতে হয়, এটাই হলো গণতন্ত্র৷ গোটা বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করলে এটা বিশ্বাস করে নেওয়া যায়, যে জার্মানি এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে৷ সংসদে আবার সেরা যুক্তি-তর্ক নিয়ে বাকবিতণ্ডা হবে, যা বেশ ইতিবাচক প্রবণতা হতে পারে৷ প্রকৃত বিরোধিতার অভাবে এক শক্তিশালী চ্যান্সেলর ইচ্ছামতো দেশ শাসন করে যাবেন, এমনটা আর সম্ভব হবে না৷ আজ সন্ধ্যায় এটাও একটা বার্তা বটে৷

তবে সেই পরিস্থিতি সম্ভব করতে হলে গণতান্ত্রিক দলগুলিকে এএফডি দলের জনমোহিনী বিতর্কের জালে জড়িয়ে পড়লে চলবে না৷ বিভিন্ন সমস্যার চটজলদি পপুলিস্ট সমাধানসূত্রের মোকাবিলা করে তাদের সে সম্পর্কে প্রকৃত জবাব দিতে হবে৷ শরণার্থীরা এসে তাদের দেশ বদলে দিতে পারে বলে অসংখ্য মানুষের মনে আজ যে ভয় জন্মেছে, সেই আবেগকেও অবশেষে গুরুত্ব দিতে হবে৷ জার্মানিকে এমন সব বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্কের ক্ষমতা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হবে৷ মানুষের ভয়কে গুরুত্ব না দিয়ে তাকে ‘ট্যাবু' বা নিষিদ্ধ বিষয় করে তুললে চরম রাজনৈতিক শক্তির পালে বাতাস দেওয়া হয়৷

এটাও এবারের নির্বাচনের এক বার্তা৷

এসপিডি বিরোধী আসনে বসছে

এই অবস্থায় সরকার গঠন করা হবে প্রথম চ্যালেঞ্জ৷ এসপিডি দল যেভাবে প্রথমেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, যে তারা বিরোধী আসনে বসবে, তা অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয়৷ একমাত্র এভাবেই এই দল নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করতে পারবে এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে তুলতে পারবে৷ তাছাড়া এর ফলে এএফডি সংসদে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা ভোগ করতে পারবে না৷ এমন বড় ধাক্কা খেয়ে আঙ্গেলা ম্যার্কেলকে জোট গড়তে জটিল আলোচনার পথে এগোতে হবে৷ নিজের শিবিরেই অনেকে সরাসরি তাঁকে এবং তাঁর শরণার্থী নীতিকে দলের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করায় তাঁকে সেই বোঝাও বহন করতে হবে৷ অন্যদিকে তাঁর প্রতি গোটা বিশ্বের প্রত্যাশা এই, যে নির্বাচনের এই ফলাফল সত্ত্বেও তিনি পশ্চিমা জগতের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে থেকে যাবেন এবং তাঁর সঙ্গে জার্মানি আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্থিতিশীল ও আস্থাভাজন সহযোগী থেকে যাবে৷ এমন এক মুক্ত জার্মানি, যেখানে গণতন্ত্রের শিকড় অত্যন্ত গভীর৷

জার্মানির সংবিধানই সেই বার্তা বহন করে৷ এএফডি-সহ সবার জন্যই সেই বার্তা খাটে – ‘মানুষের মর্যাদা অলঙ্ঘনীয়'৷

ইনেস পোল/এসবি

রাজনীতি

জার্মানিতে বিদেশি পতাকার রং

জার্মানির সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আবারো নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে সিডিইউ বা খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রীরা৷ অর্থাৎ চতুর্থবারের মতো জার্মানির চ্যান্সেলর হতে চলেছেন আঙ্গেলা ম্যার্কেল৷ কিন্তু সরকার গঠনের ক্ষেত্রে চিরাচরিত কালো-হলুদ নয়, দেখা দিতে পারে জামাইকা, কেনিয়া বা ট্র্যাফিক লাইটের মতো কোয়ালিশন৷

রাজনীতি

কালো-লালের দিন শেষ?

চার বছর আগে, সিডিইউ-সিএসইউ আর সামাজিক গণতন্ত্রী, মানে এসপিডি দল একত্রে জোট সরকার গঠন করেছিল৷ অর্থাৎ বৃহৎ কোয়ালিশনের রং ছিল কালো-লাল৷ কিন্তু ২০১৭ সালের সংসদীয় নির্বাচনের পর এসপিডি দলের চ্যান্সেলর পদপ্রার্থী মার্টিন শুলৎস বেশ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে এবার আর মহাজোটের সম্ভাবনা নেই৷ বরং বিরোধী দল হিসেবেই সংসদে বসবে এসপিডি৷

রাজনীতি

তৃতীয় বৃহত্তম দল এএফডি

জার্মানির সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফলে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা জার্মানির জন্য বিকল্প দল (এএফডি)৷ এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে৷ তুলনামূলকভাবে জার্মানির রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন দল হলেও, প্রতিষ্ঠার পাঁচ মাস পরের নির্বাচনেই প্রায় পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়ে সাড়া ফেলে দেয় এই দল৷ আর এবার, সেই এএফডি-ই তৃতীয় বৃহত্তম দল৷

রাজনীতি

জামাইকা কোয়ালিশন

নির্বাচনি প্রচারণা চলাকালেই এএফডি-র সঙ্গে জোট বাঁধতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল সিডিইউ-সিএসইউ, এসপিডি, মুক্ত গণতন্ত্রী (এফডিপি), সবুজ দল এবং বামদলের মতো বড় দলগুলি৷ নির্বাচনের পরেও তারা সেই অবস্থানেই রয়েছে৷ তাই এএফডি যদি জোটের বাইরে থেকে যায়, তবে সরকার গঠন করতে সিডিইউ-সিএসইউ দলের হাত ধরতে পারে এফডিপি আর সবুজ দল৷

রাজনীতি

কেনিয়া কোয়ালিশন

ভোটের অঙ্ক অনুযায়ী অবশ্য আরো একটি কোয়ালিশনের সুযোগ আছে৷ আর সেটা হচ্ছে সিডিইউ-সিএসইউ, এসপিডি এবং সবুজ দলের, যদিও প্রথম দুটি দলেরই সম্মিলিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকছে৷ অর্থাৎ কেনিয়ার ফ্ল্যাগের রঙে কালো-লাল-সবুজের৷ অধিকাংশ রাজনীতিবিদ এ সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিলেও গত বছর স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যেও কিন্তু জোট গঠন করেছিল এই দলগুলি৷

রাজনীতি

লাল-লাল-সবুজ

এসপিডি আর বামদলের সঙ্গে সবুজ দলের জোট হলে তা হতে পারতো লাল-লাল-সবুজের জোট৷ তবে সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফলে এসপিডি দলের ভরাডুবির ফলে সে সম্ভাবনা আর নেই৷

রাজনীতি

ট্র্যাফিক লাইট কোয়ালিশন

যথেষ্ট আসনসংখ্যা না থাকার কারণে লাল-হলুদ-সবুজ বা এসপিডি-এএফডি আর সবুজ দলেরও আর জোট গড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই৷

ডয়চে ভেলের প্রধান সম্পাদকের বক্তব্য আপনার কেমন লাগলো? লিখুন নীচের ঘরে৷