‘জার্মানি ইউরোপের পতিতালয়’

দাসত্ব গোটা বিশ্বে নিষিদ্ধ বটে, তবে তা সত্ত্বেও এই চর্চা এখনো রয়ে গেছে৷ যেমন জার্মানিতে এখনো অনেককে জোর করে পতিতাবৃত্তিসহ বিভিন্ন কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে৷

গোটা বিশ্বে চার কোটি মানুষ এখনো এক অর্থে দাসত্বেরই শিকার৷ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করানো হয় তাঁদের দিয়ে৷ এমন ১৬৭,০০০ জন মানুষ রয়েছেন জার্মানিতে৷ সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত বৈশ্বিক দাসত্ব ইনডেক্স থেকে জানা গেছে এই তথ্য৷

অতীতে একজন মানুষের মালিকানা আইনত যখন আরেকজন মানুষের হাতে থাকতো, তখন তাঁকে দাসত্ব বলা হতো৷ বর্তমানকালে অবশ্য দাসত্বের সংজ্ঞা কিছুটা ভিন্ন৷ এই বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস মিশন (আইজিএম)-এর চেয়ারম্যান ডিটমার রোলার বলেন, ‘‘দাসত্ব আর আইনিভাবে বৈধ নয়৷ তবে এটা বহুরূপী এবং গোপনে আজও টিকে আছে৷'' 

সমাজ

হল্যান্ডের ‘পতিতাপল্লী’ পর্যটকদের মূল আকর্ষণ

নেদারল্যান্ডসে পতিতাবৃত্তি শুধু বৈধ নয়, ইউরোপের এই দ্বীপদেশটির পতিতাপল্লী সত্যিকার অর্থেই বিশ্ববিখ্যাত৷ ঐ ‘রেডলাইট জোন’ দেখতে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক আসে আমস্টারডামে৷ নেদারল্যান্ডসের মতো ইউরোপের আরেক দেশ বেলজিয়ামেও দেহব্যবসা সম্পূর্ণ বৈধ৷

সমাজ

জার্মানি এবং ফ্রান্সে কঠোর আইন

জার্মানি এবং ফ্রান্সেও দেহব্যবসা বৈধ৷ তবে এ দু’দেশেই যৌনকর্মীদের এই ব্যবসা করতে হয় কঠোর আইন মেনে৷ জার্মানির কিছু শহরে এখনো যৌনকর্মীরা রাস্তায় নেমে খদ্দের ডাকতে পারেন না, এভাবে খদ্দের সংগ্রহ করা সেসব জায়গায় আইনত দণ্ডনীয়৷ ফ্রান্সেও ২০১৪ সালে এমন একটা আইন হয়েছে, যা মেনে যথেচ্ছ দেহব্যবসা করা খুব কঠিন৷

সমাজ

সুইডেন আর নরওয়েতেও নিয়ন্ত্রিত পতিতাবৃত্তি

ফ্রান্স ২০১৪ সালে যে আইন প্রবর্তন করে, সেটা প্রথম চালু হয়েছিল সুইডেনে, ১৯৯৯ সালে৷ এ কারণে আইনটি ‘সুইডিশ মডেল’ হিসেবে পরিচিত৷ এ আইনে যৌনকর্মীদের অধিকার রক্ষা করে দালালদের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷

সমাজ

সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ায় স্বাস্থ্যপরীক্ষা বাধ্যতামূলক

সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়াতেও দেহব্যবসা বৈধ৷ তবে এ দু’টি দেশে ১৯ বচর বয়স না হলে কেউ দেহব্যবসায় আসতে পারেন না৷ যৌনকর্মীদের যাতে কোনো যৌনরোগ না হয়, কিংবা তাঁদের মাধ্যমে খদ্দেরদের মাধ্যে যাতে এইডস, সিফিলিস বা অন্য কোনো রোগ ছড়াতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে যৌনকর্মীদের নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করাতে হয়৷ অবশ্য শুধু সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়াতে নয়, জার্মানিতেও ঐ একই নিয়ম৷

সমাজ

গ্রিস এবং তুরস্কে পতিতাবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত

গ্রিস এবং তুরস্কেও পতিতাবৃত্তি পুরোপুরি বৈধ, তবে দেহ ব্যবসার আইন খুব কঠিন৷ জার্মানির মতো এই দু’টি দেশেও যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্যবীমা করা বাধ্যতামূলক৷ এছাড়া যৌনকর্মীরা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান কিনা, তা সবসময় তদারক করা হয়৷ স্বাস্থ্যকার্ডেই লেখা থাকে স্বাস্থপরীক্ষার সব তথ্য৷

সমাজ

যে দুই দেশের পতিতাপল্লীতে ধীরে চলা মানা

ব্রিটেন আর আয়ারল্যান্ডের পতিতাপল্লী বা ‘রেড লাইট জোন’-এর প্রায় সব আইনই জার্মানির মতো ছিল৷ তবে সম্প্রতি ব্রিটেনে কিছু বেসরকারি সংস্থার দাবিতে এতে নতুন কিছু বিষয় যোগ করা হয়েছে৷ ব্রিটেনের রেড লাইট জোন-এ এখন যেমন ধীরে গাড়ি চালানো নিষেধ৷

সমাজ

কাউকে জোর করে পতিতা বানানো যায় না

ইউরোপের সব দেশেই পতিতাবৃত্তি আইনত বৈধ৷ তবে আইন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেশভেদে একটু হলেও অন্যরকম৷ যেমন স্পেন এবং পর্তুগালেও দেহব্যবসা বৈধ৷ কিন্তু স্পেনে কাউকে জোর করে বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনকর্মী বানানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷

সমাজ

দক্ষিণ অ্যামেরিকায় অন্যরূপ

দক্ষিণ অ্যামেরিকার অধিকাংশ দেশেই যৌনব্যবসা বৈধ৷ তবে কিছু দেশে মাফিয়া এবং মানবপাচার বড় সমস্যা হয়ে ওঠায়, এই ব্যবসার ওপর কড়াকড়ি এবং তদারকি বেড়েছে৷ দেহব্যবসাকে মাফিয়া চক্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখতে ব্রাজিল এবং মেক্সিকোতে রয়েছে কঠোর আইন৷ তারপরও দেশ দু’টিতে মাফিয়া চক্রের আধিপত্য রয়ে গেছে৷

সমাজ

প্রতিবেশী হয়েও নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া আলাদা

নিউজিল্যান্ডে যৌনব্যবসা একেবারেই বৈধ৷ তবে প্রতিবেশী দেশ অস্ট্রেলিয়ার অনেক রাজ্যে এই ব্যবসা এখনো অবৈধ৷ ২০০৩ সালে আইন করে সব প্রাপ্তবয়স্কের জন্য যৌনব্যবসাকে বৈধ করে দেয় নিউজিল্যান্ড৷

সমাজ

এশিয়ায় লুকোনো পতিতাবৃত্তি

ভারতের পতিতাবৃত্তি বৈধ৷ তারপরও পতিতাবৃত্তি চলে আড়ালে-আবডালে৷ রাস্তায় নেমে পতিতারা খদ্দের সংগ্রহ করতে পারেন না৷ খদ্দেররা অর্থের বিনিময়ে যৌনক্ষুধা মেটাতে যায় রাতের আঁধারে৷ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে পতিতালয় কমলেও মাসাজ পার্লার এবং আবাসিক হোটেলে প্রায়ই চলে পুলিশি অভিযান৷ খদ্দেরসহ পতিতা আটকের খবর আসে তখন৷ থাইল্যান্ড ও ফিলিপিন্সে পতিতাবৃত্তি চলে অবাধে৷ তবে দেশ দুটিতে এই ব্যবসা আইনের চোখে অবৈধ৷

আধুনিক দাসত্ব সম্পর্কে ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন লিখেছে, ‘‘আধুনিক দাসত্ব বলতে এমন পরিস্থিতি বোঝানো হচ্ছে যেখানে একজন মানুষের স্বাধীনতা অন্য কেউ কেড়ে নিয়েছে৷ এটা একজনের নিজের শরীর নিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা হতে পারে, হতে পারে একজনের অপছন্দের কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকার অধিকার হারানোর মতো ব্যাপার৷ এই স্বাধীনতা হুমকি, সহিংসতা আর ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে হরণ করা হয়৷''

জার্মানিতে আধুনিক দাসত্বের দেখা মেলে মূলত অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে৷ দেশটির কেন্দ্রীয় ক্রিমিনাল পুলিশ (বিকেকে) জানিয়েছে, নির্মাণ খাত এবং খাদ্য পরিবেশন খাতে শ্রমিকদের জোর করে খাটানোর নমুনা পাওয়া গেছে৷ অবশ্য স্থানীয় শ্রমিকদের ভেতর থেকেও একইরকম অভিযোগ এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ৷ গত বছর এ সংক্রান্ত ১১টি ঘটনা অনুসন্ধান করে ১৮০ জন আধুনিক দাসত্বের শিকার শ্রমিকের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ৷

তবে জার্মানিতে যৌন শোষনের হার ইউরোপের অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি৷ অবস্থা এমন যে, দেশটিকে ‘ইউরোপের পতিতালয়' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন রোলার৷ বিকেএ'র হিসেবে জার্মানিতে ২০১৭ সালে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে সম্পৃক্ত করা সংক্রান্ত ৩২৭টি মামলা হয়েছে৷ আর এসব মামলায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন প্রথমে বুলগেরিয়া, রোমানিয়া এবং তারপর জার্মানির নারীরা৷

প্রতিবেদন: ইনেস ইসেলে / এআই