জার্মানি এককালে পর্নো দেখায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ছিল!

ষাটের দশকের মাঝামাঝি জার্মানিতে গর্ভনিরোধক পিল বাজারে আসার সঙ্গে যে ‘যৌন বিপ্লব' শুরু হয়ে যায়, তাতে পর্নোগ্রাফিরও একটা বিশেষ উপাদান ছিল৷ ১৯৬৮ সালে সারা বিশ্বের মধ্যে জার্মানিতেই সবচেয়ে বেশি পর্নো দেখা হতো৷

স্ত্রী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক – বিশেষ করে প্রাক-বৈবাহিক বা বিবাহবর্জিত যৌন সম্পর্ক – কিংবা সাধারণভাবে যৌনতার ক্ষেত্রে ইউরোপ তথা জার্মানি যে চিরকাল এতটা উদার ও প্রগতিশীল ছিল, এমন নয়৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

জার্মানিতে তথাকথিত ‘যৌন বিপ্লব' শুরু হয় গর্ভনিরোধক পিল চালু হবার সাথে৷ সেক্ষেত্রেও বহু দ্বিধা, দ্বন্দ্ব পার হতে হয়েছে৷ ১৯৬৪ সালে পশ্চিম জার্মানিতে মাত্র হাজার দু'য়েক মহিলা পিল পরখ করেছিলেন; অধিকাংশ ডাক্তার অবিবাহিত মহিলাদের পিলের প্রেস্ক্রিপশনই দিতে চাইতেন না৷ ১৯৬৮ সালে দেখা যায়, প্রায় ১৪ লাখ মহিলা পিল ব্যবহার করছেন৷ আরো দশ বছরের মধ্যে ২০ বছরের কমবয়সি মেয়েদের প্রায় ৮০ ভাগ নিয়মিত পিল ব্যবহার করছিলেন৷ অর্থাৎ জার্মানিতে ‘যৌন বিপ্লব' তখনই প্রায় সফল হয়েছে বলা চলে৷

পর্নোগ্রাফির অবদান

যৌনতার প্রতি জার্মান সমাজের মনোভাব বদলাতে পর্নোগ্রাফিও একটা বিশেষ অবদান রেখেছে৷ পর্নোগ্রাফির সূচনা কিন্তু জার্মানিতে নয়, ব্রিটেনে, যেখানে ১৯৬৪ সালে ‘‘কিং'' নামের প্রথম ‘গ্লসি' পর্নো ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়৷ তার এক বছর পরেই বাজারে আসে ‘‘পেন্টহাউস'', তারও পরে মার্কিন মুলুকের ‘‘প্লেবয়'' প্রায় একই সঙ্গে ইউরোপও জয় করে – যখন ইটালীয় পুরুষরা গাড়ি চালিয়ে সুইজারল্যান্ডের সীমান্তে যেতেন শুধু ‘‘প্লেবয়'' কিনতে৷ ওদিকে ১৯৬৮ সালের খবর ছিল যে, সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পর্নোগ্রাফি দেখা হয় জার্মান ফেডারাল প্রজাতন্ত্র নামের দেশটিতে, অর্থাৎ পশ্চিম জার্মানিতে৷

সমাজ

দেশি চটি বই থেকে বিদেশি ‘প্লেবয়’

একটা সময় পর্যন্ত ঢাকায় তো বটেই, দেশের প্রায় সব মফঃস্বল শহরেও গোপনে বিক্রি হতো ‘চটি বই’৷ আদিরসাত্মক গল্পের সেই বইগুলো লেখা হতো ছদ্মনামে৷ চটি বইয়ের বাইরে ‘জলসা’, ‘নাট্যরাজ-’এর মতো নিরীহ নামের কিছু ‘পিনআপ’ ম্যাগাজিনও ছিল, যেগুলো প্রকাশের উদ্দেশ্যই ছিল নারীদেহ এবং যৌনকর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে পাঠক মনে যৌন উদ্দীপনা জাগানো৷ এছাড়া বড় শহরগুলোয় ‘প্লেবয়’ ম্যাগাজিনও পাওয়া যেত৷

সমাজ

ভিসিআরের হাত ধরে ‘ব্লু ফিল্ম’

ভিডিও ক্যাসেট রেকর্ডার, অর্থাৎ ভিসিআরের কয়েক বছর পর হয়ত কোনো চিহ্নই থাকবে না৷ গত বছরের জুনেজাপানে তৈরি হলো বিশ্বের সর্বশেষ ভিসিআর৷ মানে বিশ্বের কোথাও আর কখনো ভিসিআর তৈরি হবে না৷ বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফির বিস্তারে এই ভিসিআর একসময় খুব বড় ভূমিকা রেখেছে৷ প্রেক্ষাগৃহে না গিয়ে ঘরে বসে হিন্দি, ইংরেজি ছবি দেখা শুরু হয়েছিল ভিসিআর দিয়ে৷ একটি চক্র তখন নানা জায়গায় গোপনে ‘ব্লু ফিল্ম’-ও দেখাতে শুরু করে৷

সমাজ

সিনেমা হলে ‘কাটপিস’

দেশের কিছু প্রেক্ষাগৃহে হলিউডের মুভি দেখানো হতো৷ এক সময় ঘোষিত মুভির ফাঁকে ফাঁকে দেখানো শুরু হয় ‘ব্লু ফিল্ম’৷ এই প্রবণতা অন্য হলগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে৷ বাংলা ছবির ফাঁকে ফাঁকে দেখানো শুরু হয় ‘কাট পিস’, অর্থাৎ পর্নো ছবির অংশ বিশেষ৷

সমাজ

সিডি থেকে ডিভিডি

কম্পিউটারের আগমনের পর থেকে অল্প অল্প করে কমপ্যাক্ট ডিস্ক, অর্থাৎ সিডিতেও ঢুকে পড়ে পর্নো ছবি৷ সেই ছবি পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে৷ সিডির পর এলো ডিজিটাল ভার্সেটাইল ডিস্ক, অর্থাৎ ডিভিডি৷ ভার্সেটাইল ডিস্ক দেশে জ্ঞান এবং সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে নিঃসন্দেহে ‘ভার্সেটাইল’ ভূমিকাই রাখছে, তবে পাশাপাশি যে পর্নোগ্রাফির ধারক, বাহক হিসেবেও এর একটা পরিচিতি গড়ে উঠেছে তা-ও অস্কীকার করা যাবে না৷

সমাজ

অন্তর্জালে পর্নোজাল

গত কয়েক বছরে দেশে ইন্টারনেট ও তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বিষ্ময়কর হারে বেড়েছে৷ সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬ দশমিক ৬৮ কোটি৷ ইন্টারনেটের অপব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে৷ পর্নোসাইটের দৌরাত্ম এত ভয়াবহভাবে যে, সম্প্রতি পর্নোগ্রাফি ও আপত্তিকর কন্টেন্ট প্রকাশ বন্ধের উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি) পাঁচশ’রও বেশি পর্নোসাইট বন্ধ করেছে৷

সমাজ

মোবাইল ফোনে পর্নোগ্রাফি

দেশের ৬ দশমিক ৬৮ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৯৪ দশমিক ১৮ শতাংশই মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্রাউজ করে৷ ফলে মোবাইলই হয়ে উঠেছে পর্নোগ্রাফির সবচেয়ে বড় উৎস৷ হাতে হাতে মোবাইল, তাই পর্নোগ্রাফি ও আপত্তিকর কন্টেন্টও হয়ে উঠেছে সহজলভ্য৷

সমাজ

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক একবার জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, ‘‘দেশে প্রতি ১২ সেকেন্ডে অন্তত একটি করে নতুন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে৷’’ নতুন অ্যাকাউন্টগুলোর উল্লেখযোগ্য একটি অংশই ‘ভুয়া’৷ এভাবে কিছু লোক ফেসবুক, টুইটারেও নানা ধরণের অপতৎপরতা চালাচ্ছে৷ এর ফলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও পর্নোগ্রাফির বিস্তার বাড়ছে৷

ততদিনে পর্নোগ্রাফি ফিল্মেও এসে গেছে৷ ‘‘কাউন্ট পর্নো ও তাঁর সঙ্গিনীরা'' শীর্ষক একটি ছবি ১৯৬৮ সালে বাজারে আসে ও ৩০ লাখের বেশি মানুষ রীতিমতো টিকিট কেটে সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটি দেখেন৷ কাউন্ট পর্নোর সাফল্য থেকে এক পর্যায় পর্নো ছবি জন্ম নেয়, যাদের মধ্যে সবচেয়ে নামকরা ছিল ‘‘স্কুলগার্ল রিপোর্ট, বাবা-মায়েরা যা অসম্ভব বলে মনে করেন''৷ এই সব ছবির আশ্চর্য জনপ্রিয়তা দেখেই জার্মান মিডিয়া ‘‘সেক্স ওয়েভ''-এর কথা বলতে শুরু করে৷

বিশ্ব | 10.11.2015

জার্মান পর্নো ছবির সেক্স সিনগুলি ক্রমেই আরো চমকদার হতে থাকে৷ পর্নোগ্রাফির উপর আইনগত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় ১৯৭৫ সালে৷ আজ জার্মান পর্নোগ্রাফির দু'টি ভাগ আছে বলা চলে: একদিকে মার্কিন ‘গ্ল্যামার' পর্নোগ্রাফি, অন্যদিকে বিশেষভাবে ‘হার্ডকোর' জার্মান ‘হোম-মেড' পর্নোগ্রাফি, যা তার বিকৃত রুচির কারণে বিদেশেও প্রচুর গ্রাহক পেয়ে থাকে৷

অবশ্য মনে রাখা দরকার যে, জার্মান আইন হার্ডকোর পর্নোগ্রাফির ব্যাপারে বিশেষ কড়া, যদিও সফ্টকোর পর্নোগ্রাফি, গণিকাবৃত্তি বা সেক্স শপের ক্ষেত্রে খুবই উদার৷ ১৮ বছরের কম বয়সিদের হার্ডকোর পর্নোগ্রাফি সরবরাহ করাটা এদেশে একটা অপরাধ; যে দোকানে তা বিক্রি হচ্ছে, সেখানেও ১৮ বছরের কম বয়সিদের ঢুকতে দেওয়া চলবে না৷ যে সব ওয়েবসাইটে পর্নোগ্রাফিক কন্টেন্ট আছে, তাদের নিশ্চিত হতে হবে যে ব্যবহারকারীর বয়স ১৮-র বেশি৷ অপরদিকে টিভি চ্যানেলগুলো রাতের দিকে সফ্টকোর কন্টেন্ট দেখাতে পারে; এক্ষেত্রে বয়সসীমা হলো ১৬ বছর৷

Deutsche Welle DW Arun Chowdhury

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো?

বিশ্বে কোন দেশের নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি পর্নো দেখেন, তা নিয়ে বহু ধরনের পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে ইন্টারনেটে – যদিও সে সব পরিসংখ্যান কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে৷ তবে সাধারণভাবে এটুকু বলা চলে যে, ধর্মীয় কড়াকড়ি ও সমাজব্যবস্থার বিচারে সবচেয়ে রক্ষণশীল দেশগুলিতেই সবচেয়ে বেশি পর্নোগ্রাফি দেখা হয়ে থাকে৷

যৌনতার প্রতি মানবের আকর্ষণ ও কৌতূহল চিরকালের ও তার একটা আধুনিক বাণিজ্যিক রূপ হলো পর্নোগ্রাফি৷ অন্য বাকি সব পণ্যের মতোই, এখানে চাহিদা ও সরবরাহের খেলায় কোন দেশ যে কখন এগিয়ে থাকবে, তা বলা শক্ত৷ ষাটের দশকের শেষে জার্মানি যেমন পর্নোগ্রাফির সবচেয়ে বড় গ্রাহক ছিল, তেমন পর্নোগ্রাফি রপ্তানির ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে শীর্ষস্থানটি অধিকার করে ছিল – ডেনমার্ক! ছোট দেশ বলে নয়, উদারপন্থি দেশ বলে, যার সুযোগ নিয়ে পর্নো ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠতে পেরেছে৷

দুনিয়া জুড়ে যে ইন্টারনেট বিপ্লব চলেছে, তার একটি ফল সম্ভবত এই যে, যৌন বিপ্লবের কামনা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পথ না খুঁজে পেয়ে, পর্নোগ্রাফির মাত্রাধিক ব্যবহারে নিবৃত্তি খুঁজতে পারে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷