জার্মান আইনমন্ত্রী বহিষ্কারের ভয় দেখালেন

নববর্ষের প্রাক্কালে কোলোন ক্যাথিড্রালের বাইরে মহিলাদের যৌন হয়রানির যে অভিযোগ উঠেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে জার্মান আইনমন্ত্রী হাইকো মাস প্রয়োজনে আক্রমণকারীদের দেশ থেকে বহিষ্কারের হুমকি দিয়েছেন৷

হাইকো মাস জার্মান মিডিয়া গ্রুপ ‘‘ফুঙ্কে''-কে বলেছেন যে, অপরাধীদের জার্মানি থেকে বহিষ্কার করার কথা ‘‘পুরোমাত্রায় কল্পনা করা যায়''৷ যে সব মহিলাদের উপর যৌন হামলা চালানো হয়েছে, তাঁরা তাঁদের আক্রমণকারীদের ‘‘আরব বা উত্তর আফ্রিকার বাসিন্দাদের মতো দেখতে'', বলে বর্ণনা করেছেন৷

এক্ষেত্রে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদেরও এক বছর অবধি কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে, বলেছেন মাস৷ অবশ্য মাস সহ সব কর্মকর্তারাই সাবধান করে দিচ্ছেন যে, কোলোনের অপরাধীরা উদ্বাস্তু বা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী ছিল কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়৷

আইনমন্ত্রীর মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টোমাস ডেমেজিয়ের জার্মানিতে যাঁরা বাস করেন, তাঁদের সবার প্রতি নারী-পুরুষের সমানাধিকারকে শ্রদ্ধা করে চলার আহ্বান জানিয়েছেন৷ তিনিও বিদেশি অপরাধীদের বহিষ্কার করার ভয় দেখিয়েছেন: ‘‘কেউ যদি কোনো গুরুতর অপরাধ করে, তাহলে তাকে জার্মানি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও ভাবতে হবে – তা তার পরিস্থিতি যাই হোক না কেন'' – অর্থাৎ সে উদ্বাস্তু বা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী, যাই হোক না কেন৷ এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ আভাসও দেন যে, আইন বদলে অপরাধীদের জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া রোধ করা হতে পারে৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

‘বিশ্বাসঘাতক’ ম্যার্কেল

জার্মানির ইসলাম ও অভিবাসী বিরোধী গোষ্ঠী পেগিডার হাজার হাজার সমর্থক সোমবার জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের শরণার্থী নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে৷ শরণার্থীদের প্রতি নরম মনোভাবের কারণ তারা ম্যার্কেলের বিরুদ্ধে ‘উচ্চ পর্যায়ের বিশ্বাসঘাতকতা’ ও ‘জার্মানির মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ’-এর অভিযোগ আনেন৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

শরণার্থীদের নিয়ে কটূক্তি

পেগিডার (প্যাট্রিয়টিক ইউরোপিয়ান অ্যাগেনস্ট দ্য ইসলামাইজেশন অফ দ্য অক্সিডেন্ট) প্রতিষ্ঠাতা লুটৎস বাখমান সম্প্রতি শরণার্থীদের ‘পশু’, ‘আবর্জনা’ ও ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতা’ বলে আখ্যায়িত করেন৷ এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে সরকার৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

সমাজে অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়

সোমবার বিক্ষোভের সময় বাখমান বলেন, শরণার্থীর সংখ্যা দেড় কিংবা দুই মিলিয়নেই থেমে থাকবে না৷ এরপর আসবে তাদের স্ত্রী; আসবে এক, দুই কিংবা তিন সন্তান৷ ফলে এতগুলো লোকের জার্মান সমাজে অন্তর্ভুক্তির কাজ অসম্ভব হয়ে পড়বে৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

জার্মান সরকারের অস্বীকার

জার্মানির জনপ্রিয় পত্রিকা ‘বিল্ড’ সরকারের গোপন ডকুমেন্টের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, চলতি বছর জার্মানিতে প্রায় দেড় মিলিয়ন শরণার্থী আসবে বলে মনে করছে সরকার৷ যদিও প্রকাশ্যে সরকার বলছে সংখ্যাটা এক মিলিয়ন হতে পারে৷ তবে জার্মান সরকারের এক মুখপাত্র এ ধরনের কোনো গোপন ডকুমেন্টের কথা তিনি জানেন না বলে সাংবাদিকদের বলেছেন৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

শরণার্থীর মৃত্যু

জার্মানির পূর্বাঞ্চলের এক শরণার্থীদের বাসস্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ইরিত্রিয়া থেকে আসা ২৯ বছরের এক শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে৷ অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনও জানা যায়নি৷ এদিকে, জার্মান সরকারের হিসেবে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর শরণার্থী ও তাদের বাসস্থানের উপর হামলার সংখ্যা বেড়েছে৷ এ বছরের প্রথম ছয় মাসেই এরকম ২০২টি ঘটনা ঘটেছে বলে সরকার জানিয়েছে, যেখানে গত বছর সংখ্যাটি ছিল ১৯৮৷

জার্মানিতে এত শরণার্থী চায় না তারা

বিপদে ম্যার্কেল

শরণার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণের কারণে নিজ দল সহ অন্যান্য দলের রাজনীতিবিদদের তোপের মুখে পড়েছেন ম্যার্কেল৷ তাঁরা জার্মানির শরণার্থী নীতি ও শরণার্থীদের আগমনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে চ্যান্সেলরকে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন৷

সেকাল আর একাল

কোলোন, হামবুর্গ, স্টুটগার্ট – নববর্ষের রাত্রিতে জার্মানির বিভিন্ন শহরে একই ধরনের দৃশ্য ও মহিলাদের উপর একই ধরনের যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে৷ ফলে জার্মানি জুড়ে এখন বিতর্ক চলেছে, ২০১৫ সালে প্রায় দশ লক্ষ উদ্বাস্তু-রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের আগমনের সঙ্গে এই সব ঘটনার সম্পর্ক কোথায়, বা আদৌ কোনো সম্পর্কে আছে কিনা – থাকলে চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের ‘‘মুক্ত দুয়ার'' নীতি তার জন্য কতটা দায়ী৷

এই পরিবেশে কোলোনের নতুন মেয়র হেনরিয়েটে রেকার আবার বলে বসেছেন যে, মহিলাদের ‘‘অপরিচিত পুরুষদের থেকে'' কিছুটা দূরে থাকাই বাঞ্ছনীয়৷ এমনকি বর্ষপালনের মতো উৎসবে মেয়েরা একসঙ্গে থাকলেই ভালো ও তাদের বেশি হাসাহাসি করা উচিত নয় – কেননা সেটাকে যৌন আবেদন বলে ভুল করা যেতে পারে৷

রেকার যা ভেবেই এই সব মন্তব্য করে থাকুন, একটি মুক্ত ও নারী-পুরুষের সাম্যবাদী, আধুনিক সমাজে যে মেয়েদের কিভাবে চলতে-বলতে হবে, বা সাজগোজ করতে হবে, সে বিষয়ে অনুশাসন জারি করার বা উপদেশ দেওয়ার অধিকার যে কারো নেই – সেটা তাঁর জানা থাকা উচিত ছিল৷ ফলে নারীবাদীরা বিশেষ করে খড়গহস্ত৷

ডয়চে ভেলের সাংবাদিক ডানা রেগেভ মহিলা হিসেবে প্রশ্ন তুলেছেন, মহিলাদের চেহারা, পোশাকআশাক, সাজগোজ বা আচরণের সঙ্গে যৌন হামলার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা৷ নয়ত বিভিন্ন রক্ষণশীল সমাজেও নিত্যনৈমিত্তিক ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে কী করে?

ডানার মতে, সালটা ২০১৬৷ এতদিনে অন্তত বোঝা উচিত যে, ধর্ষণকারীদের ধর্ষণ না করা শেখানো প্রয়োজন; যারা তাদের শিকার হতে পারত, তাদের আর লুকোতে শেখার দরকার নেই৷

এসি/ডিজি (ডিপিএ, এএফপি, এপি)

শরণার্থী বা আশ্রয়প্রার্থীরা কারুর যৌন হয়রানির কারম হলে তাকে জার্মানি থেকে বহিষ্কার করা কি যুক্তিযুক্ত? জানান নীচের ঘরে৷

আমাদের অনুসরণ করুন