জার্মান নির্বাচনে নব্যনাৎসীদের উত্থানের আশঙ্কা

এ বছরের জার্মান নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ৬ কোটি ১৫ লাখ৷ কিন্তু আসলে এর কতো ভাগ ভোটার যাচ্ছেন ভোট দিতে? নির্বাচন যখন চলছে, প্রার্থীদের মনে এটাই একমাত্র শংকা৷

শরণার্থী ইস্যু, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কসহ আরো বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক শেষ৷ এখন সবার অপেক্ষা কার বক্তব্য, কার অবস্থান ঠিক মনে করছেন বেশিরভাগ ভোটার৷ কিন্তু ভোটগ্রহণের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ভোটাররা ঠিকঠাক নিজেদের মত প্রকাশ করবেন কিনা, সে বিষয়েই নিশ্চিত হতে পারছে না দলগুলো৷

২০০৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে প্রথমবার চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন আঙ্গেলা ম্যার্কেল৷ সেই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিলো ৭৭.৭ ভাগ৷ কিন্তু হঠাৎই এর পরের নির্বাচনগুলোতে কমে যায় উপস্থিতির হার৷ ২০০৯ সালের ফেডারেল নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিলো ৭০.৮ শতাংশ৷ ২০১৩ সালে তা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১.৫ শতাংশে৷

প্রায় সব জনমত জরিপেই শেষ মুহূর্তেও এগিয়ে আছে ম্যার্কেলের খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী ইউনিয়ন - সিডিইউ এবং বাভেরিয়ায় সহযোগী দল খ্রিষ্টীয় সামাজিক ইউনিয়ন – সিএসইউ৷ খুব কাছাকাছি থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মার্টিন শুলৎসের সামাজিক গণতন্ত্রী দল – এসপিডি৷ ফলে ম্যার্কেলের চতুর্থবারের মতো চ্যান্সেলর হওয়ার সম্ভাবনাও বেশ প্রবল৷

বিশ্লেষকদের আশংকা, এই সম্ভাবনা প্রবল আকারে দেখা দেয়ায় এবার ভোটার উপস্থিতি হতে পারে আরো কম৷ জরিপে দেখা গেছে, এ বছর অন্তত ৩৪ শতাংশ ভোটারই ভোট দেয়ার ব্যাপারে দ্বিধায় আছেন৷ অর্থাৎ, এই জরিপ সঠিক হলে এবারের উপস্থিতি হতে পারে ৬৬ শতাংশের কাছাকাছি৷

ভোট দিয়ে আর লাভ কি, ম্যার্কেল তো নির্বাচিত হয়েই যাচ্ছেন -  এমন চিন্তাভাবনা ভোটারদের নির্বাচনবিমুখ করে তুলতে পারে বলেও মনে করছেন তাঁরা৷ তবে এমন চিন্তাভাবনার বিপদের দিকটাও দেখিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা৷ প্রথমত, জরিপে যে সবসময় মূল নির্বাচনের ফলের প্রতিফলন ঘটে না ব্রেক্সিট ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন তার অন্যতম উদাহরণ৷

মূল আশংকা এএফডি

এবারের নির্বাচনকে গত কয়েকবারের চেয়ে আলাদা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা৷ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে কট্টর ডানপন্থি অলটারনেটিভ ফর ডয়েচলান্ড – এএফডির উত্থানকে৷ প্রতিষ্ঠার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে ২০১৩ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়ে সাড়া ফেলে দেয় এই দল৷

তবে ২০১৭ সালে আরো পরিপক্ব হয়েছে দলটি৷ এমনকি প্রথম তিন দলের মধ্যে এএফডির চলে আসার সম্ভাবনাও দেখছেন অনেকে৷ অভিবাসী ও ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী এই দলকে নব্য-নাৎসীদের আশ্রয়স্থল হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন অন্যান্য দলের নেতারা৷

এএফডি নিয়ে কেন শংকা?

জার্মানির ভোটারদের দুটি করে ভোট দিতে হয়৷ একটি সরাসরি প্রার্থীকে এবং অপরটি পার্লামেন্টে যে দলকে তাঁরা দেখতে চান, সেই দলকে৷ আর এই দ্বিতীয় ভোট নিয়েও চলছে যতো আলোচনা৷

প্রথম তিন দলের মধ্যে এএফডির চলে আসার সম্ভাবনাও দেখছেন অনেকে

২০১৩ সালের সবশেষ সংসদ নির্বাচনে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে ছিলো যথাক্রমে সিডিইউ এবং এসপিডি৷ তৃতীয় স্থান দখল করেছিলো বাম দল৷ তবে এবার আগস্টের এক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, বাম দল, সবুজ দল এবং মুক্ত গণতন্ত্রী দল – এফডিপির চেয়ে কয়েক শতাংশ ভোটে এগিয়ে আছে কট্টর ডানপন্থি দল - এএফডি

এবারের নির্বাচনেও কোন দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম৷ ম্যার্কেল এরই মধ্যে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এএফডির সঙ্গে কোন ধরনের কাজ করবেন না তাঁরা৷ বাম দলের সাথেও কাজ না করার কথা বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন ম্যার্কেল৷

ফলে ম্যার্কেলের সামনে এসপিডি এবং সবুজ দল ছাড়া, তেমন বিকল্পও থাকছে না সরকার গঠনের জন্য৷ জরিপে কোন আসনেই এএফডির প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা দেখা না গেলেও, মোট ভোটে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে এএফডির পার্লামেন্টে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে৷ প্রধান বিরোধী দল হলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতিত্ব এবং জার্মানির ভবিষ্যত নীতিনির্ধারণেও প্রভাব রাখার ক্ষমতা থাকবে কট্টরপন্থি দলটির হাতে৷

ফলে চ্যান্সেলর কে হচ্ছেন, তা নিয়ে খুব একটা আগ্রহ এই মুহূর্তে না থাকলেও, জার্মানি ও ইউরোপের ভবিষ্যত রক্ষার জন্য হলেও সব ভোটারকে ব্যালটে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানানো আহ্বান জানাচ্ছেন সব দলের নেতাকর্মীরা৷

এএফডি নেতাদের আপত্তিকর যত মন্তব্য

ফ্রাউকে পেট্রি

‘অবৈধভাবে জার্মানিতে প্রবেশকারী শরণার্থীদের দিকে গুলি ছোড়া উচিত জার্মানির বর্ডার পুলিশের’, বলেছিলেন এএফডি’র কো-চেয়ার৷ ২০১৬ সালে জার্মানির একটি আঞ্চলিক পত্রিকাকে তিনি জানান, পুলিশ অফিসাররা সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে প্রয়োজনে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারে৷ সর্বশেষ সাবেক কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানির নেতা এরিক হ্যোনেকার এ ধরনের কথা বলেছেন৷

এএফডি নেতাদের আপত্তিকর যত মন্তব্য

বও্যর্ন হ্যোকে

জার্মানির থ্যুরিঙ্গা রাজ্যের এএফডির প্রধান বার্লিনের হলোকস্ট মেমোরিয়ালকে ‘মন্যুমেন্ট অফ শেইম’ আখ্যা দিয়ে জার্মানিতে নাৎসি অতীতের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন৷ গুরুত্বপূর্ণ এক নির্বাচনের বছরে এই মন্তব্য করায় তাকে বহিস্কার করার পথে যেতে বাধ্য হয়েছেন এএফডির সদস্যরা৷

এএফডি নেতাদের আপত্তিকর যত মন্তব্য

আলেক্সান্ডার গাউলান্ড

এএফডির ডেপুটি চেয়ারম্যান আলেক্সান্ডার গাউলান্ড গতবছর বলেন, জার্মানির জাতীয় ফুটবল দলের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় জ্যেরম বোয়াটেংকে তাঁর পারফর্মেন্সের জন্য অনেকে প্রশংসা করলেও, তাঁর মতো কাউকে কেউ প্রতিবেশী হিসেবে চাইবে না৷ কৃষ্ণাঙ্গ বোয়াটেংকে নিয়ে এমন মন্তব্য সমালোচনার ঝড় তোলে জার্মানিতে৷

এএফডি নেতাদের আপত্তিকর যত মন্তব্য

বিট্রিক্স ফন স্টর্চ

প্রাথমিকভাবে এএফডি ইউরো এবং বেইলআউটের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছিল৷ কিন্তু পরবর্তীতে দ্রুতই শরণার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় দলটি৷ ইউরোপের এই আইনপ্রণেতা বলেছেন, ‘‘যারা সীমান্তে আমাদের থামার নির্দেশ গ্রহণ করে না, তারা আক্রমণকারী৷ আর সেসব আক্রমণকারীকে প্রতিহত করতে হবে৷’’

এএফডি নেতাদের আপত্তিকর যত মন্তব্য

মার্কুস প্রেতজেল

এএফডির নর্থ রাইন-ওয়েস্টফেলিয়া রাজ্যের চেয়ারম্যান মার্কুস প্রেতজেল৷ ফ্রাউকে পেট্রির নতুন স্বামীও তিনি৷ বার্লিনে গত বছর ক্রিসমাস মার্কেটে প্রাণঘাতি হামলার পর তার মন্তব্য, ‘‘ম্যার্কেলের কারণেই প্রাণ হারিয়েছে এরা৷’’

এএফডি নেতাদের আপত্তিকর যত মন্তব্য

আন্দ্রে ভেন্ডট

স্যাক্সনি রাজ্যের সাংসদ সম্প্রতি জানতে চেয়েছেন অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক শরণার্থীর পেছনে রাষ্ট্র কতটা খরচ বহন করবে৷ তাঁর এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা হয়েছে৷ গত বছরের জুলাই অবধি ৫২,০০০ অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক শরণার্থী জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছে৷

এডিকে/এপিবি (এপি, ডি ডাব্লিউ)

আমাদের অনুসরণ করুন