জার্মান নির্বাচন: সরকার গঠনের পালা

এসপিডি দল এবার ‘বৃহৎ জোটে' থাকবে না৷ কাজেই সরকার গঠনের একমাত্র সম্ভাবনা হলো, সিডিইউ-সিএসইউ, এফডিপি ও সবুজ দলের মধ্যে জোট৷ অথচ এই চারটি দলের মধ্যে ফারাক কম নয়৷

গুঁতোর নাম বাবাজীবন৷ তাই রবিবারের নির্বাচনে সফল দলগুলিকে এখন একটি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে৷ বর্তমান জোট সরকারের ছোট তরফ এসিপিডি দল তাদের নির্বাচনি বিপর্যয়ের সন্ধ্যাতেই ঘোষণা করে যে, তারা এবার বিরোধীপক্ষে যাবে – যার অর্থ, জার্মানিতে একটি তথাকথিত ‘জামাইকা' জোট গঠনের সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে৷ জার্মান রাজনীতির প্রতীকী রঙের খেলায় রক্ষণশীল সিডিইউ-সিএসইউ দলকে কালো, উদারপন্থি মুক্ত গণতন্ত্রী এফডিপি দলকে হলুদ ও সবুজদের স্বভাবতই সবুজ হিসেবে অভিহিত করা হয়৷ অপরদিকে জামাইকার জাতীয় পতাকার রং হলো কালো-হলুদ-সবুজ, তাই চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলকে তাঁর চতুর্থ কর্মকালের জন্য এবার এই ‘জামাইকা' জোটের উপর নির্ভর করতে হবে, যা কিনা কেন্দ্রে একেবারেই অভিনব, যদিও অতীতে ও বর্তমানে রাজ্য পর্যায়ে কালো-হলুদ-সবুজ সরকার গঠিত হয়েছে৷

গত জুন মাস যাবৎ উত্তরের শ্লেসভিগ-হলস্টাইন রাজ্যে যে ‘জামাইকা' জোট শাসন চালাচ্ছে, তার স্থায়িত্ব সম্পর্কে এই স্বল্প সময়ে কিছু বলা সম্ভব নয়৷ দেশে প্রথম কালো-হলুদ-জোট গঠিত হয় পশ্চিমের ক্ষুদ্র সারলান্ড রাজ্যে ২০০৯ সালের শেষে, যদিও তা ২০১২ সালের সূচনাতেই ভেঙে যায়৷ অবশ্য সেই জোট সরকারের পতনের কারণ ছিল, জোট সহযোগীদের মধ্যে কোঁদল নয়, বরং এফডিপি দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব, যার ফলে সিডিইউ মুখ্যমন্ত্রী আনেগ্রেট ক্রাম্প-কারেনবাউয়ার এফডিপি-র সঙ্গে সহযোগিতার অন্ত ঘোষণা করেন৷ কাজেই তথাকথিত ‘জামাইকা' জোটের সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে ক্রাম্প-কারেনবাউয়ার দলনেত্রী আঙ্গেলা ম্যার্কেলকে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা শোনাতে পারেন৷ এক্ষেত্রে শ্লেসভিগ-হলস্টাইনের সিডিইউ মুখ্যমন্ত্রী ডানিয়েল গ্যুন্টারের অভিজ্ঞতা মাত্র তিন মাসের, তিনিও হয়ত কিছু কিছু যোগ করতে পারেন৷

রাজনীতি

জার্মানিতে বিদেশি পতাকার রং

জার্মানির সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আবারো নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে সিডিইউ বা খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রীরা৷ অর্থাৎ চতুর্থবারের মতো জার্মানির চ্যান্সেলর হতে চলেছেন আঙ্গেলা ম্যার্কেল৷ কিন্তু সরকার গঠনের ক্ষেত্রে চিরাচরিত কালো-হলুদ নয়, দেখা দিতে পারে জামাইকা, কেনিয়া বা ট্র্যাফিক লাইটের মতো কোয়ালিশন৷

রাজনীতি

কালো-লালের দিন শেষ?

চার বছর আগে, সিডিইউ-সিএসইউ আর সামাজিক গণতন্ত্রী, মানে এসপিডি দল একত্রে জোট সরকার গঠন করেছিল৷ অর্থাৎ বৃহৎ কোয়ালিশনের রং ছিল কালো-লাল৷ কিন্তু ২০১৭ সালের সংসদীয় নির্বাচনের পর এসপিডি দলের চ্যান্সেলর পদপ্রার্থী মার্টিন শুলৎস বেশ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে এবার আর মহাজোটের সম্ভাবনা নেই৷ বরং বিরোধী দল হিসেবেই সংসদে বসবে এসপিডি৷

রাজনীতি

তৃতীয় বৃহত্তম দল এএফডি

জার্মানির সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফলে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা জার্মানির জন্য বিকল্প দল (এএফডি)৷ এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে৷ তুলনামূলকভাবে জার্মানির রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন দল হলেও, প্রতিষ্ঠার পাঁচ মাস পরের নির্বাচনেই প্রায় পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়ে সাড়া ফেলে দেয় এই দল৷ আর এবার, সেই এএফডি-ই তৃতীয় বৃহত্তম দল৷

রাজনীতি

জামাইকা কোয়ালিশন

নির্বাচনি প্রচারণা চলাকালেই এএফডি-র সঙ্গে জোট বাঁধতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল সিডিইউ-সিএসইউ, এসপিডি, মুক্ত গণতন্ত্রী (এফডিপি), সবুজ দল এবং বামদলের মতো বড় দলগুলি৷ নির্বাচনের পরেও তারা সেই অবস্থানেই রয়েছে৷ তাই এএফডি যদি জোটের বাইরে থেকে যায়, তবে সরকার গঠন করতে সিডিইউ-সিএসইউ দলের হাত ধরতে পারে এফডিপি আর সবুজ দল৷

রাজনীতি

কেনিয়া কোয়ালিশন

ভোটের অঙ্ক অনুযায়ী অবশ্য আরো একটি কোয়ালিশনের সুযোগ আছে৷ আর সেটা হচ্ছে সিডিইউ-সিএসইউ, এসপিডি এবং সবুজ দলের, যদিও প্রথম দুটি দলেরই সম্মিলিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকছে৷ অর্থাৎ কেনিয়ার ফ্ল্যাগের রঙে কালো-লাল-সবুজের৷ অধিকাংশ রাজনীতিবিদ এ সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিলেও গত বছর স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যেও কিন্তু জোট গঠন করেছিল এই দলগুলি৷

রাজনীতি

লাল-লাল-সবুজ

এসপিডি আর বামদলের সঙ্গে সবুজ দলের জোট হলে তা হতে পারতো লাল-লাল-সবুজের জোট৷ তবে সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফলে এসপিডি দলের ভরাডুবির ফলে সে সম্ভাবনা আর নেই৷

রাজনীতি

ট্র্যাফিক লাইট কোয়ালিশন

যথেষ্ট আসনসংখ্যা না থাকার কারণে লাল-হলুদ-সবুজ বা এসপিডি-এএফডি আর সবুজ দলেরও আর জোট গড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই৷

জোট গঠনের মূলমন্ত্র হবে আপোশ

 আঙ্গেলা ম্যার্কেল গত ১২ বছর ধরে চ্যান্সেলর পদে অধিষ্ঠিত; বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী বা মতামতের মধ্যে মধ্যস্থতা করার ক্ষমতা তাঁর সহজাত বলে কথিত আছে৷ সেই কারণেই আবার তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কাছ থেকে শুনতে হয় যে, তাঁর নিজস্ব কোনো মতামত নেই৷ কিন্তু ‘জামাইকা' জোট গঠনের সময় ম্যার্কেলের এই ‘নিরপেক্ষতাই' কাজ দিতে পারে, যদিও ‘জামাইকা' জোট সম্পর্কে তাঁর নিজের দল সিডিইউ ও তাদের বাভেরীয় ‘সহযোগী দল' সিএসইউ-তে দ্বিধা কম নয়৷ কিন্তু ম্যার্কেলের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, সিডিইউ বা সিএসইউ-তে আপাতত এমন কেউ আছেন বলে মনে হয় না – বিশেষ করে বাভেরিয়ায় সিএসইউ দল বিপর্যয়মূলক ফলাফল করার পর সিএসইউ নেতা হর্স্ট সেহোফার তো ননই৷ তবুও বাভেরিয়া থেকে ম্যার্কেলের দিকে প্রতিরোধ আসবে বলে ধরে নেওয়া যায়; রবিবার সন্ধ্যাতেই সেহোফার ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর দল এবার তাদের দক্ষিণপন্থি ভাবমূর্তিকে আরো স্পষ্ট করে তুলবে৷ সেহোফারের এই ঘোষণার পটভূমিতে রয়েছে রক্ষণশীলদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষিণপন্থি এএফডি দলের সাফল্য৷

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও উদ্বাস্তু নীতির ক্ষেত্রে অতীতে ও বর্তমানে নানা ধরনের কড়া ও চড়া মন্তব্য এফডিপি ও সবুজদের মধ্যে জোট সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে৷ রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত আইন আরো কড়াকড়ির প্রস্তাব সবুজ দলের সাধারণ সদস্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে – যদিও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আপোশ সম্ভব৷ আরো বেশি পুলিশ ও তাদের উন্নততর সরঞ্জাম প্রদানের ক্ষেত্রে এফডিপি ও সবুজরা একমত৷

সিডিইউ দলকে একাধিক ক্ষেত্রে আপোশের মনোভাব দেখাতে হবে৷ নিরাপত্তার প্রয়োজনে নাগরিক অধিকারের উত্তরোত্তর সঙ্কোচন এফডিপি বা সবুজ দলের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়৷ অপরদিকে এই দু'টি ছোট দলকেও পরস্পরের প্রতি তাদের সুর নরম করতে হবে৷ সবুজরা নাগরিকদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায়, বলে এফডিপি-র বহুদিনের অভিযোগ; যেমন এফডিপি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেয় বলে সবুজদের ধারণা৷

রাজনীতি

আঙ্গেলা ম্যার্কেল

বার্লিনের একটি কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন বর্তমান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল৷ ধরেই নেয়া যায়, খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী দল – সিডিইউ-এর এই নেতা ভোটটা নিজেকেই দিয়েছেন৷

রাজনীতি

মার্টিন শুলৎস

ম্যার্কেলের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরা হচ্ছে সামাজিক গণতন্ত্রী দল – এসপিডি-র নেতা মার্টিন শুলৎসকে৷ বর্তমান সরকারে সিডিইউ-এসপিডি জোটে থাকলেও নির্বাচনে কোন ছাড় নেই৷ স্ত্রী ইঙ্গেকে নিয়ে আখেনের পাশে ভ্যুরসেলেনে ভোট দিয়েছেন শুলৎস৷

রাজনীতি

চেম ও্যজদেমির

গ্রিন পার্টি বা সবুজ দলের নেতা চেম ও্যজদেমির ভোট দিয়েছেন বার্লিনে৷ পর্যাপ্ত ভোট পেলে জোট সরকার গঠনের আলোচনায় অংশ নেয়ার সম্ভাবনা থাকছে ও্যজদেমিরের দলের৷

রাজনীতি

বার্লিনে ভোটারদের সারি

এমন চিত্র খুব একটা দেখা যায় না জার্মান নির্বাচনে৷ তবে দিনের শুরুর অংশে এমন দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়েই ভোট দিয়েছেন জার্মানরা৷ তবে দুপুরের দিকে একেবারেই কমে যায় ভোটারদের আনাগোনা৷

রাজনীতি

অভিবাসী জার্মান ভোটার

মাথায় স্কার্ফ পড়া এক নারী ভোট দিচ্ছেন বার্লিনের ক্রয়েসবার্গের একটি কেন্দ্রে৷ জার্মানিতে প্রতি দশ জন ভোটারের একজন অভিবাসী পরিবার থেকে আসা৷ অর্থাৎ তাঁরা অথবা তাঁদের বাবা-মায়ের জন্ম জার্মানির বাইরে৷

রাজনীতি

বহুসংস্কৃতির জার্মানি

বার্লিনে ভোট দেয়ার পর ডয়চে ভেলের সাথে কথা বলছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক জার্মান পরিবার৷ জার্মান পার্লামেন্টে ৬৩১ জন প্রতিনিধির ৩৭ জনই নিজেরা অভিবাসী অথবা অভিবাসী পরিবারের সন্তান৷

শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচিতেই নয়, পরস্পরের প্রতি আচরণও জোট গঠনের ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ হবে: এক্ষেত্রে সবুজ ও এফডিপি দলের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতাদের উপর একটা বড় দায়িত্ব এসে পড়বে – যেমন বাডেন-ভ্যুর্টেমব্যার্গ রাজ্যের সবুজ মুখ্যমন্ত্রী ভিনফ্রিড ক্রেট্শমান, যিনি তাঁর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রক্ষণশীল মনোবৃত্তির প্রদেশে সিডিইউ দলের সঙ্গে একটি সফল জোট সরকার চালাচ্ছেন৷ তবে সবুজ দলের বামঘেঁষা সদস্যদের সম্মত করতে ৬৯ বছর বয়সি ক্রেট্শমানকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে৷

এফডিপি দলে ক্রেট্শমানের ভূমিকা নেবেন দলের উপসভাপতি, ৬৫ বছর বয়সি ভল্ফগাং কুবিকি, যার উদ্যোগে গত জুন মাসের শেষে শ্লেসভিগ-হলস্টাইন রাজ্যে ক্ষমতাসীন ‘জামাইকা' জোট চালু হয়৷ মুশকিল এই যে, কেন্দ্রে ‘জামাইকা' জোট গঠনের জন্য এফডিপি-কে চাপের মুখে পড়তে দিতে রাজি নন কুবিকি; ভোটের দিন সন্ধ্যাতেই তিনি এসপিডি-কে তাদের বিরোধীপক্ষে যাবার সিদ্ধান্তের জন্য সমালোচনা করেন৷

নতুন নির্বাচনে শুধু এএফডি-র সুবিধা

অগঠিত নতুন সরকারের সব সম্ভাব্য সহযোগীরাই এএফডি-র চাপ অনুভব করছে৷ আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সঙ্গে দু-দু'বার জোট সরকার গঠন করে তার মূল্য দেওয়ার পর এসপিডি যে বিরোধীপক্ষে যেতে চায়, তা বোধগম্য৷ কিন্তু সিডিইউ-সিএসইউ, এফডিপি ও সবুজরা একমত না হতে পারলে, নতুন মধ্যকালীন নির্বাচন অনিবার্য, যা কিনা একমাত্র দক্ষিণপন্থি পপুলিস্ট এএফডি দলের কাজে লাগবে, বুন্ডেসটাগের অন্যান্য দলগুলির কারোরই যা কাম্য নয়৷ 

মার্সেল ফ্যুর্স্টেনাউ/এসি