জার্মান ফুটবলের সমস্যা হলো মাত্রাধিক শৃঙ্খলা

ফুটবল এমন একটি গেম, যা দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও টিম স্পিরিটের সঙ্গে খানিকটা কাব্য, কিছুটা উচ্ছৃঙ্খলতা ও এক খামচা পাগলামোর এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ৷ জার্মান ফুটবলকে আরো উন্নতি করতে গেলে অবাধ্য হতে শিখতে হবে৷

এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা এবং আমি শুধু একজন – ভিনদেশি – ফুটবলমোদী৷ তায় যতো বয়স বেড়েছে, ততোই যেন আমি ‘দ্য বিউটিফুল গেম'-এর আরো কট্টর সমর্থক হয়ে পড়েছি৷ বিশ্বকাপ বা ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পরিসংখ্যান দেখিয়ে আমাকে চমকে দেওয়ার প্রচেষ্টা বৃথা৷ আমি ভবি ভুলব না, ফুটবল ও আধুনিকতার সব দাবি নস্যাৎ করে আমি বলব, যে ফুটবল দেখে মন ভরে না, প্রাণ ভরে না, তাতে কে জিতল বা হারল, তাতে আমার বয়ে গেল৷ আমি ফুটবলের মহাকাব্যে সম্মুখসমর দেখি, পাড়ার হাতাহাতি, মারামারি, গুণ্ডাবাজি নয়৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

মনে রাখবেন, টিমটা ব্রাজিল হোক আর স্পেন হোক আর ফ্রান্স হোক, বাজে খেলে হারার নাম দ্য বিউটিফুল গেম নয়; ভালো খেলে হারা কিংবা জেতার নাম দ্য বিউটিফুল গেম৷ এই বিউটিফুল গেম আসে এলিজাবেথান যুগে শেক্সপীয়ারের আবির্ভাবের মতো: যুগসত্তা, একের জিনিয়াস ও বহুর সমঝদারি থেকে৷ মাঠের বোদ্ধা দর্শক পরে লোকাল ট্রেনে বাড়ি ফেরার সময় বিয়ারের ক্যান হাতে করে যা নিয়ে আলোচনা করেন৷ আবার দলের কোচ যেমন কোনো না কোনো সময়ে ঠিক বুঝে যান ও মেনে নেন যে, ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো বা লিওনেল মেসি যখন ফর্মে থাকে, তখন কোচ স্বয়ং একজন দর্শক, খালি তাঁর সিটটা একেবারে রিংসাইডে, এই যা ফারাক৷

পেশাজীবী ক্লাবগুলোর দায়িত্ব

২০০২ সালে জার্মানিতে ‘মেধা-উন্নয়ন কর্মসূচি’ গ্রহণ করা হয়৷ এর আওতায় তরুণ ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাবগুলোর জন্য একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড ঠিক করে দেয়া হয়৷ ফলে প্রতিবছর ক্লাবগুলো তরুণদের প্রশিক্ষণ খাতে প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করছে৷ জার্মানিতে এরকম ৫৪টি ‘ইয়থ টেলেন্ট সেন্টার’ আছে৷

কেউ যেন বাদ না পড়ে

প্রতিভাসম্পন্ন কোনো ফুটবলার যেন চোখে এড়িয়ে না যায় সে চেষ্টা থাকে জার্মান ফুটবল এসোসিয়েশন, ডিএফবি-র৷ সেজন্য প্রায় ১,৩০০ বেতনভোগী কোচ নিয়োগ দেয়া হয়েছে যাঁরা ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সি প্রতিভা খুঁজে বের করে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়৷ এ জন্য দেশব্যাপী ৩৬৬টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে৷

কঠোর পরিশ্রম

১২ বছর বয়সি কার্ল মেন্টনারকে (মাঝখানে) ফুটবলের তরুণ প্রতিভা হিসাবে আবিষ্কার করেছে ডিএফবি৷ ফলে মেন্টনারের জীবন পাল্টে গেছে৷ এখন তাকে সপ্তাহে অন্তত চারদিন অনুশীলন করতে হয়৷ আর প্রতি সপ্তাহে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলতে হয়৷

তবে জার্মানির এখনও যেটা নেই

ছবিতে ঐ দেশগুলোকেই দেখানো হয়েছে যাদের জাতীয় দলের জন্য আলাদা ‘পারফরম্যান্স সেন্টার’ আছে৷ স্পেন, ইংল্যান্ড, ইটালি, নেদারল্যান্ডস আর ফ্রান্সের পতাকা দেখা যাচ্ছে৷ জার্মানির এখনও এমন সেন্টার নেই৷ তবে ২০১৭ সালে ফ্রাংকফুর্টে এমন একটি সেন্টার গড়ে তোলার কাজ শুরু করবে জার্মানি৷

শীর্ষে স্পেন

ইউরোপের অনূর্ধ্ব ১৭, ১৯ আর ২১ চ্যাম্পিয়নশিপে সবচেয়ে বেশি সফলতা দেখিয়েছে স্পেন৷ মোট নয়বার তারা এগুলো জিতেছে৷ আর চারবার জিতে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে আছে জার্মানি৷ সবশেষ ২০১৪ সালে অনূর্ধ্ব ১৯ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে তারা৷

জার্মান ফুটবলের মুশকিল হলো – আবার বলছি, এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত এবং একমাত্র আমি এর জন্য দায়ী – জার্মান ফুটবলের সমস্যা হলো একদিকে সৃজনশীলতা; অন্যদিকে সৃজনশীল খেলোয়াড় খুঁজে না পেয়ে (অথবা তৈরি করে নিতে না পেরে), কার্যকরি ও কর্তৃত্বপূর্ণ আর একদল খেলোয়াড়কে মাথায় তুলে নাচা, যারা ভালো হলেও মিডিওকার৷ আমার মতে এভাবে লোথার মাটেউস আর বাস্টিয়ান শোয়াইনস্টাইগারের মতো প্লেয়ারদের মাত্রাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সম্ভবত ভবিষ্যতেও হবে৷

জার্মান ফুটবলের আরেকটি সমস্যা হলো, জার্মান সমাজ ও রাজনীতির যা সমস্যা - বিদেশি বা বহিরাগত প্লেয়ার, যারা জার্মান বুন্ডেসলিগার ক্লাবগুলোর হয়ে খেলে থাকে এবং তাদের সংখ্যার অনুপাতে অনেক বেশি গোল করে থাকে৷ এক হিসেবে এই বিদেশিরাই যেন জার্মান ক্লাব ফুটবলের সৃজনশীল অংশ বলে মনে হতে পারে৷ কিন্তু স্পেনের ক্ষেত্রেও তো সেকথা প্রযোজ্য, ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে৷ তাহলে একা জার্মানিকে দোষ দেওয়া কেন? তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, জার্মান বা স্পেনের মতো দেশ হল সমৃদ্ধ দেশ, অন্তত ক্লাবগুলির হাতে যে পরিমাণ ট্রান্সফারের টাকা থাকে, তার হিসেবে৷ অথচ এই দু'টি দেশেই জুনিয়রদের নিয়ে কাজ, অর্থাৎ কিশোর-তরুণ প্লেয়ার গড়ে নেওয়ার কাজ সবচেয়ে বেশি পরিকল্পিত ভাবে, সবচেয়ে বেশি শৃঙ্খলা ও মনোযোগ সহকারে করা হয়ে থাকে৷ পরবর্তী যুদ্ধের আগেই অস্তরে শান দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় এই সব দেশে, ফ্রান্স সকলের অজ্ঞাতে যে কাজটি করে ফুটবলের দুনিয়াকে একাধিকবার চমকে দিয়েছে৷

Deutsche Welle DW Arun Chowdhury

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

জার্মান ফুটবল একাদশের সাবেক কোচ বার্টি ভোগ্ট্স যখন জার্মান জুনিয়র টিমের কোচ, তখন তিনি একবার দুঃখ করে বলেছিলেন, কোনো মাঠে গিয়ে যদি কোনো ছেলেকে ভালো খেলতে দেখে বলেন, ‘একবার মাঠে এসো' – তাহলে সে নাকি পরের বার তার বাবা আর তার উকিলকে সঙ্গে নিয়ে এসে হাজির হয় আর জানতে চায়, সই করলে কতো টাকা পাবে৷ আরেকভাবে বলতে গেলে, ফুটবলে যতো টাকা ঢুকছে, ততোই এটা ব্যবসা হয়ে পড়ছে৷ তা ঢুকুক; আর্টও আজ ব্যবসা, গানবাজনা, অভিনয় ব্যবসা৷ এখানেও জার্মান ফুটবলকে যা বাঁচাচ্ছে, তা হল এই সহজ সরল সত্য যে, জার্মান ফুটবলে স্প্যানিশ, ইংলিশ বা ইটালিয়ান ফুটবলের মতো টাকা নেই৷ আর জার্মানরা হিসেবি৷ তাই জার্মান ক্লাবগুলো লোভ থাকলেও আকাশছোঁয়া দাম দিয়ে প্লেয়ার কেনে না৷ কাজেই তাদের নিজের ম্যুলার মারিওরাও মোটামুটি মাথা তোলার সুযোগ পায়৷

বাকি রইল অবাধ্যতা৷ কতোবার শনিবার বুন্ডেসলিগার রিপোর্ট দেখতে দেখতে ভাবি, আহা, ঐ প্লেয়ারটা যদি একটু অবাধ্য হতো, কোচের কথা না ভেবে আর একটু ড্রিবল করত, কিংবা গোলে একটা শট নিতো৷ ফুটবলের প্রতিটি ভালো মুভের মধ্যে রয়েছে বেয়াড়াপনা, কোনো একটা ব্যাকরণের ভুল৷ তাতে কী হয়েছে? ব্যাকরণ পরে ঠিক করে নিলেই হলো, ফুটবল যেমন আছে, তেমনই থাকুক৷ কোচ দেখলে, ব্যাকরণ দেখলে কি আর জিদান হয়? বড়জোর ফিলিপ লাম হতে পারে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷