জার্মান সংসদে চরম দক্ষিণপন্থিরা এলো কী করে!

ব্রেক্সিট ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনের পর ইউরোপের নির্বাচনে চরম দক্ষিণপন্থিদের সাফল্য থমকে গিয়েছিল৷ জার্মানিতে এএফডি দলের অভাবনীয় সাফল্যের পর পপুলিস্ট শিবিরে উল্লাস দেখা যাচ্ছে৷

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম একটি চরম দক্ষিণপন্থি দল জার্মানির সংসদে প্রবেশ করলো৷ শুধু ‘পপুলিস্ট' ও ইউরোপ-বিরোধী হিসেবে এএফডি বা ‘জার্মানির জন্য বিকল্প' দল যাত্রা শুরু করলেও নির্বাচনি প্রচারে দলের নেতারা বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী ও বিদেশি-বিদ্বেষী মন্তব্য করেজার্মানির রাজনৈতিক আঙিনায় গভীর অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের কালো অধ্যায়ের পর জার্মানিতে কীভাবে এমন এক দল এই মাত্রায় সাফল্য পেল? বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন দেশের অর্থনীতির অবস্থা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং বেকারত্বের হার খুবই কম৷ অর্থাৎ ইউরোপের বাকি দেশের তুলনায় জার্মানির পরিস্থিতি অত্যন্ত উজ্জ্বল৷ এমনকি ২০১৫ সালে শরণার্থীর ঢল নামার ফলে যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, গত ২ বছরে সরকার তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে৷ তা সত্ত্বেও এমন অসন্তোষ কেন?

রাজনীতি

ফ্রাউকে পেট্রি

‘অবৈধভাবে জার্মানিতে প্রবেশকারী শরণার্থীদের দিকে গুলি ছোড়া উচিত জার্মানির বর্ডার পুলিশের’, বলেছিলেন এএফডি’র কো-চেয়ার৷ ২০১৬ সালে জার্মানির একটি আঞ্চলিক পত্রিকাকে তিনি জানান, পুলিশ অফিসাররা সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে প্রয়োজনে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারে৷ সর্বশেষ সাবেক কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানির নেতা এরিক হ্যোনেকার এ ধরনের কথা বলেছেন৷

রাজনীতি

বও্যর্ন হ্যোকে

জার্মানির থ্যুরিঙ্গা রাজ্যের এএফডির প্রধান বার্লিনের হলোকস্ট মেমোরিয়ালকে ‘মন্যুমেন্ট অফ শেইম’ আখ্যা দিয়ে জার্মানিতে নাৎসি অতীতের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন৷ গুরুত্বপূর্ণ এক নির্বাচনের বছরে এই মন্তব্য করায় তাকে বহিস্কার করার পথে যেতে বাধ্য হয়েছেন এএফডির সদস্যরা৷

রাজনীতি

আলেক্সান্ডার গাউলান্ড

এএফডির ডেপুটি চেয়ারম্যান আলেক্সান্ডার গাউলান্ড গতবছর বলেন, জার্মানির জাতীয় ফুটবল দলের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় জ্যেরম বোয়াটেংকে তাঁর পারফর্মেন্সের জন্য অনেকে প্রশংসা করলেও, তাঁর মতো কাউকে কেউ প্রতিবেশী হিসেবে চাইবে না৷ কৃষ্ণাঙ্গ বোয়াটেংকে নিয়ে এমন মন্তব্য সমালোচনার ঝড় তোলে জার্মানিতে৷

রাজনীতি

বিট্রিক্স ফন স্টর্চ

প্রাথমিকভাবে এএফডি ইউরো এবং বেইলআউটের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছিল৷ কিন্তু পরবর্তীতে দ্রুতই শরণার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় দলটি৷ ইউরোপের এই আইনপ্রণেতা বলেছেন, ‘‘যারা সীমান্তে আমাদের থামার নির্দেশ গ্রহণ করে না, তারা আক্রমণকারী৷ আর সেসব আক্রমণকারীকে প্রতিহত করতে হবে৷’’

রাজনীতি

মার্কুস প্রেতজেল

এএফডির নর্থ রাইন-ওয়েস্টফেলিয়া রাজ্যের চেয়ারম্যান মার্কুস প্রেতজেল৷ ফ্রাউকে পেট্রির নতুন স্বামীও তিনি৷ বার্লিনে গত বছর ক্রিসমাস মার্কেটে প্রাণঘাতি হামলার পর তার মন্তব্য, ‘‘ম্যার্কেলের কারণেই প্রাণ হারিয়েছে এরা৷’’

রাজনীতি

আন্দ্রে ভেন্ডট

স্যাক্সনি রাজ্যের সাংসদ সম্প্রতি জানতে চেয়েছেন অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক শরণার্থীর পেছনে রাষ্ট্র কতটা খরচ বহন করবে৷ তাঁর এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা হয়েছে৷ গত বছরের জুলাই অবধি ৫২,০০০ অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক শরণার্থী জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছে৷

এমন প্রেক্ষাপটে জার্মান নির্বাচনে সম্ভবত ১৩ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে সংসদে তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠার পর তাই প্রশ্ন উঠছে, কারা এই দলের প্রতি এমন সমর্থন দেখিয়েছেন এবং তাদের এই ব়্যাডিকাল সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ কী?

অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, এএফডি-র উত্থান ঠেকাতে মূল স্রোতের রাজনৈতিক দলগুলি সঠিক কৌশল গ্রহণ করেনি৷ এএফডি-র সম্ভাব্য সমর্থকদের মন বুঝে তাদের দলে টানতে ব্যর্থ হয়েছে তারা৷ জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল অনেক মানুষও এই দলকে ভোট দিয়েছে৷ তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ বাকি দলগুলির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে এই দলকে ভোট দিয়েছে৷ অর্থাৎ এএফডি-র কর্মসূচির প্রতি তাদের আনুগত্য ছিল না৷

যে সব ভোটার এএফডি-র কর্মসূচিকে আকর্ষণীয় মনে করেছেন, তাদের সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ কী ছিল? শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অবসর ভাতা, পরিবেশ ও ডিজিটাল রূপান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এএফডি দলের স্পষ্ট অবস্থান নেই৷ শরণার্থী ও অভিবাসীদের কারণে জার্মানির ‘মূল সংস্কৃতি'-র অবক্ষয়, ইসলাম-বিরোধিতা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো বিভাজনমূলক বিষয়কে হাতিয়ার করে তারা এই সাফল্য দেখিয়েছে৷ অর্থাৎ এই সব বিষয়গুলি অনেক মানুষের কাছেই গুরুত্ব পেয়েছে৷ বিশ্বায়ন থেকে শুরু করে বহু জাতি-ধর্ম-বর্ণের সমন্বয় নিয়ে তাদের মনে সংশয় রয়েছে৷ মূল স্রোতের রাজনৈতিক দলগুলির কাছে এই সব প্রশ্নের জবাব পায়নি এই সব মানুষ৷ সেই শূন্যতা পূরণ করতে সফল হয়েছে এএফডি৷ দুই প্রধান দলের মহাজোট সরকার সেই পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে৷

সংসদে এএফডি দলের শক্তিশালী উপস্থিতি আগামী চার বছরের জন্য বাকি দলগুলির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে৷ প্ররোচনা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকে এই দলকে কোণঠাসা করা তাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা হতে চলেছে৷

আগামী চার বছরে এএফডি বনাম বাকি দলগুলির সংঘাতের ফলাফল কোনো পথে এগোয়, সে দিকে লক্ষ্য রাখবে জার্মানি সহ গোটা বিশ্বের মানুষ৷

সমাজ-সংস্কৃতি | 08.09.2017

বন্ধু, জার্মান নির্বাচন নিয়ে আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে লিখুন নীচের ঘরে৷