জীবনযুদ্ধের কাহিনি শরণার্থীদের কবিতায়

পালিয়ে এসেছে তারা৷ আফগানিস্তান থেকে এসে পৌঁছেছে ইউরোপে৷ ১৪ থেকে ১৮ বছরের এমন কয়েকজন আফগানের কবিতায় উঠে এলো ঘর হারানোর যন্ত্রণা৷ যুদ্ধের ভয়াবহতা৷

‘‘পৃথিবী যখন নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যায়, তখনো জেগে থাকি আমরা৷ পেটে খিদে৷ বুকে তৃষ্ণা৷ পরিশ্রান্ত৷'' যে লিখেছে, তার বয়স মাত্র ১৫৷ আফগানিস্তান থেকে ইরান হয়ে এসে পৌঁছেছেসুদূর জার্মানিতে৷ ইয়াসের নিকসাদা একা নয়, তার মতো আরো বহু কিশোর-তরুণ ইউরোপে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে আফগানিস্তানের ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য৷ তাদের দিবারাত্রির কাব্য লিখে চলেছে সর্বদা৷ যখনই সুযোগ মিলছে৷ সেইসব কবিতা নিয়েই সম্প্রতি জার্মানিতে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়৷ পুরস্কৃত করা হয় কমবয়সি ৬ জন আফগান কবিকে৷ তাদের বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে৷ নিজেদের কবিতায় সকলেই লিখেছে দেশ ছেড়ে আসার যন্ত্রণা এবং ভয়াবহতা৷ ইয়াসেরের কাছাকাছি বয়সের আরেক কবি লিখেছে, ‘‘চোখের সামনে গ্রামের সমস্ত মানুষকে মেরে ফেলছিল ওরা৷ একসময় সেই রক্তপাত বন্ধ হলো৷ আমরা বুঝতে পারলাম, আজকের মতো রক্তের খিদে শেষ হয়েছে ওদের৷''

সমাজ-সংস্কৃতি | 16.02.2018
কাবুলের পাখি বাজার

পুরনো শহরে

কাবুলের পুরনো অংশে কা ফারোশি নামে একটি পাখি মার্কেট আছে৷ পুরনো শহর বলে লেনগুলো সরু৷ সেখানেই ছোট, মাটির তৈরি দোকানগুলো সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে৷

কাবুলের পাখি বাজার

লড়াইয়ের মোরগ

কা ফারোশি মার্কেটে অনেক রকমের পাখি বিক্রি হয়৷ তবে ক্রেতাদের একটি বড় অংশের প্রিয় লড়াই করতে পারে এমন মোরগ৷ সবচেয়ে ভালো এমন একটি মোরগের দাম ১৪ হাজার ডলার (প্রায় সাড়ে ১১ লাখ বাংলাদেশি টাকা) পর্যন্ত হতে পারে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন এক বিক্রেতা৷

কাবুলের পাখি বাজার

অন্যান্য পাখি

মোরগ ছাড়াও তিতির জাতীয় পাখি, ফিঞ্চ, গান গাইতে পারে এমন সব পাখির দেখা মেলে কা ফারোশি মার্কেটে৷

কাবুলের পাখি বাজার

শখ

রাফিউল্লাহ আহমাদি নামের এক পাখি বিক্রেতা বলছেন, পাখি পোষা আফগানিস্তানে একটি শখের মতো৷ ‘‘কেউ লড়াই করতে সক্ষম এমন মোরগ পুষতে পছন্দ করেন, কেউ পোষেন তিতির৷ এটা আফগানিস্তানের একটা রীতি,’’ বলেন তিনি৷

কাবুলের পাখি বাজার

সুকার তিতির

লালচে ধূসর রংয়ের এই পাখিটিও অনেকের বেশ প্রিয়৷ চোখ আর গলায় কালো রংয়ের দাগ, লাল ঠোঁট আর কালো ডোরা - এমন পাখি পোষার লোভ সামলানো সত্যিই কঠিন৷ তিতির জাতীয় এসব পাখি লড়াইয়ের জন্য পালন করা হয়৷

কাবুলের পাখি বাজার

বন থেকে বাজারে

আফগানিস্তানের বিভিন্ন বনজঙ্গল থেকে পাখিদের কা ফারোশি মার্কেটে নিয়ে আসা হয়৷ লড়াইয়ের মোরগ আসে উত্তর আফগানিস্তান থেকে৷ এছাড়া পাকিস্তান ও ইরান থেকেও পাখি আমদানি করা হয়৷

কাবুলের পাখি বাজার

চাপ থেকে মুক্তি

পাখি ব্যবসায়ী জহির তানহা বলেন, কাবুলবাসীদের অনেক ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়৷ সেখান থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে তিনি পাখি পোষেন৷ তাঁর কাছে প্রায় ৫০টি কবুতর আছে৷ ‘‘আমার একটা মানসিক সমস্যা আছে৷ ডাক্তাররা আমাকে পাখি পালার পরামর্শ দিয়েছেন৷’’

কাবুলের পাখি বাজার

বার্ড ফ্লু?

গওহার খান নামের আরেক পাখি ব্যবসায়ী জানান, আফগানিস্তানের পাখিদের বার্ড ফ্লু নেই৷ তবে পাকিস্তান ও ইরান থেকে আসা পাখিদের বার্ড ফ্লু আছে৷

কাবুলের পাখি বাজার

পাখির খাবার

কাবুলের এই বাজারে পাখিদের নানান খাদ্যও পাওয়া যায়৷

জার্মানির এলজে লাসকার-শুলার  সোসাইটি দিয়েছে এই পুরস্কার৷ অনেকেই জানেন, শুলার নিজেও ছিলেন এক বিশিষ্ট কবি এবং শরণার্থী৷ ইহুদি শুলার নাৎসি আমলে জেরুসালেমে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন৷ তাঁর কবিতাতেও ধরা পড়েছিল শরণার্থীর যন্ত্রণা৷ ভিনদেশে জীবন কাটানোর যন্ত্রণা জড়িয়ে ছিল তাঁর লেখার পরতে পরতে৷ সে কথা মনে রেখেই প্রতি বছর শুলারের নামে একটি পুরস্কার দেয় শুলার ট্রাস্ট৷ এবার যে পুরস্কার পেলেন আফগান উঠতি কবিরা৷

পরিবার বিচ্ছিন্ন এই কিশোররা জানে না, আদৌ আর দেশে ফিরতে পারবে কিনা৷ ইয়াসের যেমন বলেছে, ভিনদেশে চলে আসা কঠিন৷ কিন্তু আরো কঠিন নিজের দেশে ফিরে যাওয়া৷ সে রাস্তা আপাতত বন্ধ৷ কিন্তু তারা ফিরতে চায৷ দেখা করতে চায় পরিবারের সঙ্গে৷ পরিবার ভালো না থাকলে নিজেদেরও ভালো রাখা যায় না৷

আফগান তরুণদের লেখা পড়ে এবং কথা শুনে মুগ্ধ জার্মানির বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের কর্মীরা৷ অনুষ্ঠানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁরা বলেছেন, বয়সের তুলনায় অনেক বড় হয়ে গিয়েছে ওই কবিরা৷ কারণ, জীবনযুদ্ধ খুব কাছ থেকে দেখে ফেলেছে তারা৷ তাদের মতো প্রতিভাদের পাশে যদি দাঁড়ানো যায়, একটা অন্যরকম সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন তাহলে দেখাই যায়৷

রাজনীতি চলে রাজনীতির মতো, কূটনীতি কূটনীতির মতো৷ সেখানে কেবলই যুদ্ধ আর হানাহানি৷ তবু মানবতার জন্য যুদ্ধ আগে ছিল, এখনো আছে৷ সে ব্যাটন কখনো ছিল লোরকার মতো কবিদের হাতে, বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়েও যাঁরা কবিতা বলতে পারতেন৷ ছিল কবি একরম্যানের হাতে৷ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবরিজিনাল যে কবি ঔপনিবেশিক দাসত্বের কথা লিখেছেন নিজের কবিতায়৷ এখন হয়তো সেই ব্যাটনই চলে এসেছে অসংখ্য আফগান, সিরিয় শরণার্থীদের হাতে৷ জীবনের এক অন্য উপাখ্যান লিখছেন তাঁরা৷

স্টেফান ডেগে/এসজি

আমাদের অনুসরণ করুন