ডাকসু নির্বাচন: ভোটকেন্দ্র এবং সহাবস্থান নিয়ে প্রশ্ন

আগামী ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন৷ তফসিল ঘোষণার ফলে ২৮ বছর পর অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে৷

অধিকাংশ ছাত্র সংগঠনের দাবি উপেক্ষা করে হলেই ভোটকেন্দ্র রেখে সোমবার ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়৷ তফসিল অনুযায়ী ১৯ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র বিতরণ৷ ২৬ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র জমা ও বাছাই ৷ ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা হবে প্রার্থী তালিকা৷ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় সময় ২ মার্চ৷  চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে ৩ মার্চ৷ সম্পূরক  ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ৫ মার্চ। ভোট গ্রহণ ১১ মার্চ সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত৷

সমাজ-সংস্কৃতি | 12.01.2019

এরই মধ্যে বিএনপির ছাত্র সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ডাকসু নির্বাচন পেছানোর দাবিতে মিছিল করেছে৷ তাদের দাবি, হলে ভোট কেন্দ্র নয়, ভোট কেন্দ্র করতে হবে হলের বাইরে ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক অথবা অ্যাকাডেমিক ভবনে৷ আর হল ও ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদি তালুকদার ডয়চে ভেলেকে বলেন,‘‘ হলগুলো এখন ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের দখলে রয়েছে৷ তারাই নিয়ন্ত্রণ করে৷

অডিও শুনুন 05:28
এখন লাইভ
05:28 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 12.02.2019

‘আন্তরিক হলে নির্বাচনের আগে ভোট কেন্দ্র প্রশাসনিক বা অ্যাকাডে...

যারা হলে থাকেন না, তারা হলে ভোট দিতে যেতে ভয় পাবেন৷ আর ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের দখলে থাকায় হলে ভোটকেন্দ্র হলে ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই ভোট হবে৷ ছাত্রদলকে রুটিন করে মিছিল মিটিং করতে দেবে৷ কিন্তু নির্বাচনে কারচুপি করে ফল তাদের পক্ষে নিয়ে যাবে৷''

সহাবস্থানের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘হল ও ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন৷ হলে তারা থাকতে পারছেন না৷ ৩০ ডিসেম্বর জরুহুল হক হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি বোরহান উদ্দিন শিপন নির্যাতনের শিকার হন৷''

নির্বাচন পেছানোর দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘যেভাবে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে তাতে এত অল্প সময়ে ভোটার তালিকা প্রণয়নসহ ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়৷ আগে পরিবেশ নিশ্চিত করে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে৷ নির্বাচন কমিশনের ১৬ জন শিক্ষকের সবাই আওয়ামীপন্থি শিক্ষক৷ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে৷ তারপর নির্বাচন৷ তা না হলে এটা একটা সাজানো নাটক হবে৷''

ছাত্র ইউনিয়নও সহাবস্থান ও হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র চায়৷ তবে তারা নির্বাচন পেছানোর পক্ষে নয়৷

অডিও শুনুন 02:26
এখন লাইভ
02:26 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 12.02.2019

‘তারা যেসব কথা বলছে, তা ইস্যু সৃষ্টির জন্য বলছে’

তারা যথাসময়েই নির্বাচন চায়৷ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ ডয়চে ভেলেকে বলেন,  ‘‘৩১ মার্চের মধ্যে নির্বাচন করার আদেশ আছে উচ্চ আদালতের৷ নির্বাচন পেছানো হোক তা আমরা চাই না৷ কিন্তু ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে নেয়া এবং সহাবস্থানের দাবি পূরণ না করেই তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে৷ আমরা আমাদের দাবি আদায়ে আন্দোলনে আছি৷ আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্তরিক হলে আইনের মধ্যে থেকেই তারা নির্বাচনের আগে ভোট কেন্দ্র হলের বাইরে প্রশাসনিক বা অ্যাকাডেমিক ভবনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে৷ আর তারা চাইলে এর মধ্যেই সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারবেন৷''

তিনি বলেন, ‘‘৭০ ভাগ শিক্ষার্থী সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন৷ হলগুলোতে তারা চাপের মুখে থাকেন৷ ফেসবুকে লেখার জন্য তাদের পিটিয়ে হল থেকে বের করে দেয়া হয়৷ পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়৷ বঙ্গবন্ধু হলে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে৷ সব মিলিয়ে হলে যারা আছেন, তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই৷ আবার হলের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী থাকেন, তারা হলের এই পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত নয়৷ ফলে যে-কোনো ভয়ভীতির কারণে তারা হলে ভোট দিতে না-ও যেতে পারেন৷''

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সাদ্দাম হোসেন মনে করেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরো গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সহাবস্থান আছে৷ তাই প্রত্যেকটি ছাত্র সংগঠনই আসলে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে৷

ডাকসু নির্বাচনের তফসিল

নির্বাচনের তারিখ

নির্বাচন হবে আগামী ১১ মার্চ৷ প্রার্থী হওয়ার শেষ সময় ২ মার্চ৷ যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে ৩ মার্চ৷ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে ৫ মার্চ৷ ১১ মার্চ সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হলগুলোতে স্থাপিত ভোটকেন্দ্রে গিয়ে শিক্ষার্থীরা পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোট দিতে পারবেন৷

ডাকসু নির্বাচনের তফসিল

২৫টি পদে নির্বাচন

ডাকসুতে পদাধিকার বলে উপাচার্য সভাপতির দায়িত্বে থাকেন৷ বাকি ২৫টি পদে নির্বাচন হবে৷

ডাকসু নির্বাচনের তফসিল

ভোটার তালিকা

১১ ফেব্রুয়ারি সোমবার হলের নোটিস বোর্ড ও ডাকসুর ওয়েবসাইটে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়৷ ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আপত্তি গ্রহণের পর খসড়া ভোটার তালিকা সংশোধন করে ২০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা হবে৷ ৫ মার্চ সম্পূরক বা চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে হলের নোটিস বোর্ড ও ডাকসুর ওয়েবসাইটে৷

ডাকসু নির্বাচনের তফসিল

মনোনয়নপত্র বিতরণ

হলগুলোর প্রাধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হবে৷ ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা থেকে ১২টার মধ্যে হলের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে৷ ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টায় ডাকসুর মনোনয়নপত্র বাছাই করবেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা৷

ডাকসু নির্বাচনের তফসিল

প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ

২৭ ফেব্রুয়ারি হলের নোটিস বোর্ড ও ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হবে৷ প্রকাশিত তালিকার বিষয়ে কোনো প্রার্থীর আপত্তি থাকলে তা ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টার মধ্যে ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যকে লিখিতভাবে জানাতে হবে৷ মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময় ২ মার্চ৷ ৩ মার্চ হলের নোটিস বোর্ড ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা৷

ডাকসু নির্বাচনের তফসিল

হল সংসদ

হল সংসদে ১৩টি পদের জন্য নির্বাচন হবে৷ হল সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বিতরণ, জমা বাছাই ও প্রত্যাহারের তারিখ কেন্দ্রীয় সংসদের জন্য নির্ধারিত তারিখেই রাখা হয়েছে৷ তবে প্রচার ও প্রচারণার বিষয়ে তফসিলে কিছু বলা হয়নি৷

ডাকসু নির্বাচনের তফসিল

ভোটকেন্দ্র নিয়ে বিরোধ

হলগুলোতে ভোটকেন্দ্র স্থাপনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তকে ছাত্রলীগ স্বাগত জানালেও ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগগুলো একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দাবি তোলে৷ তবে কর্তৃপক্ষ আগের মতোই হলেই ভোটকেন্দ্র রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷

তারা যেসব কথা বলছে, তা ইস্যু সৃষ্টির জন্য বলছে৷ ইস্যু সৃষ্টি করে তারা সুবিধা নিতে চায়৷ যারা এসব বলছে, তাদের অনেক নেতার ছাত্রত্ব নেই৷ তারা প্রার্থী হতে পারবেন না, ভোট দিতে পারবেন না৷ নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা নির্বাচন পেছানোর কথা বলছেন৷ কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা নির্বাচন চায়৷ তারা ডাকসুতে সঠিক এবং যোগ্য নেতৃত্ব দেখতে চায়৷''

তিনি বলেন, ‘‘সহাবস্থানের কোনো সংকট বিশ্ববিদ্যলয়ে নেই৷ আচরণবিধি কমিটি আছে৷ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সিসি ক্যামেরায় মনিটর করা হচ্ছে৷ কে কী করছেন তা গোপন থাকছে না৷ হলে ভোট দিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো আপত্তি নেই৷ আর কোনো অসুবিধাও নেই৷ যারা সংকটের কথা বলছেন, তারা মূলত প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কায় এসব কথা বলছেন৷''

নির্বাচনকে সামনে রেখে এরই মধ্যে একটি আচরণবিধি কমিটি করা হয়েছে৷ সেই কামিটির সদস্য ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সফিউল আলম ভুঁইয়া৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ডাকসু'র একটি ঐতিহ্য হলো হলে ভোট কেন্দ্র৷ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ছাড়াও একই সঙ্গে হল সংসদের নির্বাচনও হয়৷

অডিও শুনুন 03:34
এখন লাইভ
03:34 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 12.02.2019

‘ডাকসুর ঐতিহ্য আমরা কেন ভাঙবো?’

ডাকসুর ঐতিহ্য আমরা কেন ভাঙবো ? তাই হলের বাইরে ভোট কেন্দ্র নেয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ দেখি না৷ আর কেউ যদি হলে গিয়ে ভোট দিতে ভয় পায়, তাহলে নির্বাচিত হলে হলে যাবে কিভাবে?''

সহাবস্থানের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘এই কথাটি রাজনৈতিক চিন্তাপ্রসূত৷ ডাকসু নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে হয়৷ এখানে বিভিন্ন দলের অনুসারী ছাত্র সংগঠন আছে সত্য, কিন্তু নির্বাচনটি হয় স্বতন্ত্র৷ যারা নির্বাচন করেন, তারা তাদের সুবিধার জন্য প্যানেল করে নেন৷ যারা সহাবস্থানের কথা বলছে, তারা হলের বৈধ ছাত্র-ছাত্রী কিনা, যদি হন এবং হলে থাকতে না পারেন, তাহলে প্রভোস্ট মহোদয়দের লিখিতভাবে জানালেই তারা ব্যবস্থা নেবেন৷কিন্তু এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কোথায়?''

তিনি আরো বলেন, ‘‘নির্বাচনি প্রচারে হলে বা ক্যাম্পাসে বাধা পেলে রিটার্নিং অফিসারদের জানালে তারা ব্যবস্থা নেবেন৷ আচরণবিধি আছে৷ আচরণবিধি কমিটি আছে৷ নির্বাচনে কী হবে, ভোট রিগিং হবে এটা তো হাইপোথেটিক্যাল কথা৷ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করা উচিত৷''

প্রসঙ্গত,  সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ৬ জুন ডাকসু  নির্বাচন হয়৷ ১৯৭১ সালের পর ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র সাত বার৷