ডিজিটাল বাংলাদেশ: শুধু চমক নয়, প্রয়োজন স্থিতিশীলতাও

২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে আওয়ামী লীগ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বেশ কিছু কাজ করেছে৷ তবে স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে চাইলে আরো কিছু কাজ এখনই শুরু করতে হবে৷

আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করা হয়৷ তারপর ক্ষমতায় গিয়ে তারা কাজ শুরু করে৷ ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ করতে চায় দলটি৷

প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী যে উন্নয়ন ঘটে চলেছে আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে সেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে৷ সরকার প্রযুক্তির সেই উন্নয়নের পথটি অনুসরণ করে কাজ করে যাচ্ছে৷ আর এর সুফল পাচ্ছেন নাগরিকরা৷

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

আওয়ামী লীগের ইশতেহার

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদ’-এর অংশ হিসেবে ‘২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর উদ্ভব৷ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর এ ঘোষণা দেয়া হয়৷

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

কম পরিশ্রমে, স্বল্প ব্যয়ে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা

ডিজিটাল বাংলাদেশ হলো তথ্যপ্রযুক্তিসমৃদ্ধ বাংলাদেশ যেখানে আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সকল সুবিধা ব্যবহার করে অল্প সময়ে, কম পরিশ্রমে, স্বল্প ব্যয়ে, মানুষের দোরগোড়ায় তথ্য ও সেবা পৌঁছানোর নিশ্চয়তা দান৷

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

কৃষিক্ষেত্রে সুবিধা

কৃষিক্ষেত্রেও লেগেছে তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া৷ সারাদেশে স্থাপিত প্রায় ২৪৫ কৃষি তথ্য যোগাযোগ কেন্দ্রে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কৃষি সেবা প্রদান করা হচ্ছে৷

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

উন্নত স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র

দশ আঙুলের ছাপ ও চোখের কনীনিকার (আইরিশ) প্রতিচ্ছবি সংগ্রহ করে নিবন্ধিত নাগরিকদের ‘স্মার্ট’ জাতীয় পরিচয়পত্রের পরীক্ষামূলক বিতরণ শুরু হয়েছে বাংলাদেশে৷ যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র আছে বা যারা ভোটার হওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন, তারা এই ‘স্মার্ট’ এই পরিচয়পত্র পাবেন৷ (এখানে পুরানো পরিচয়পত্রের ছবি)

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

মোবাইল ব্যাংকিং চালু

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সব ধরণের জরুরি সেবাই পাওয়া যায়৷ এ সবের মধ্যে রয়েছে – টাকা জমা, টাকা তোলা ও পাঠানো, বিভিন্ন ধরণের বিল প্রদান (বিদ্যুৎ বিল,গ্যাস বিল,পানি বিল ), কেনাকাটা করা, বেতন ভাতা প্রদান ও গ্রহণ, মোবাইল ফোন টপ আপ ইত্যাদি৷

FLASH-GALERIE Solarbetriebene Computer in Bangladesch (Munir Hasan)

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেবা

২০ হাজারের বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম নির্মাণ ও ল্যাপটপসহ ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করা হয়েছে৷ ডিজিটাল কন্টেন্ট শেয়ার করার জন্য ‘শিক্ষক বাতায়ন’ নামে একটি ওয়েবপোর্টাল চালু করেছে সরকার৷

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

২২টি কর্মপন্থা

ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ২২ কর্মপস্থা নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়নে জোর দেয়া হচ্ছে৷ এগুলো হচ্ছে – সরকারি অফিস আদালতে ই-সেবা চালু করা, ই-গভর্নেন্স চালুর মাধ্যমে সরকারি কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ানো, ভূমি রেকর্ড ডিজিটাইজেশন, সরকারি সেবাসমূহ ইউনিয়ন অফিস থেকেই প্রদানের ব্যবস্থা, তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধি৷

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

ঘরে বসে অর্থ উপার্জন

আইসিটি খাতে উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে বসে অর্থ উপার্জনের ধারণা বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছাতে শুরু করেছে৷ বর্তমানে দেশে তরুণ ফ্রিল্যান্সার একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে৷ তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে৷ লাখো তরুণ বিভিন্ন পর্যায়ে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে নিজে সাবলম্বী হয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন৷

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

ডট বাংলা ডোমেইন

ইন্টারনেট জগতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডোমেইন (ইন্টারন্যাশনালাইজড ডোমেইন নেম-আইডিএন) ডট বাংলা (.বাংলা) ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ পেয়েছে বাংলাদেশ৷ ইন্টারনেটে একটি রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের স্বীকৃতি হিসেবে কাজ করে এই ডোমেইন৷

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

তথ্য আদান-প্রদান

দেশে বর্তমানে নানা ধরনের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম রয়েছে৷ স্বল্প খরচে এ সব মাধ্যম ব্যবহার করে অনায়াসেই এক স্থান থেকে আরেক স্থানে তথ্য আদান প্রদান ও ভাবের বিনিময় হচ্ছে৷ ভিডিওতে কথা বলার জন্য রয়েছে একাধিক সফটওয়্যার৷ স্কাইপ, ইমো, ফেসবুক, গুগুল ছাড়াও যে কোনো মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করে থ্রি জি প্রযুক্তির সংযোজনের ফলে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সব ধরনের তথ্য ও ভাবের আদান প্রদান করা যায়৷

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

অনলাইনে আয়কর রিটার্ন, ড্রাইভিং লাইসেন্স

এখন আয়কর রিটার্ন ফরম অনলাইনে পূরণ করা যায়৷ অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যায়৷

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

রেলওয়ে ও বাস টিকেট

অনলাইনে অনেক সহজে টিকেট কাটা ও সিট বুকিং করা যায়৷ এসএমএস-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃক যাত্রীদের জন্য তথ্যসেবা প্রদান করা হয়৷ এছাড়া বাসের টিকেট কাটা যায় অনলাইনেই৷

ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘রূপকল্প ২০২১’

সব ইউনিয়নে ইন্টারনেট সংযোগ

২০২০ সালের মধ্যে দেশের সকল ইউনিয়নে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করার প্রচেষ্টা আছে সরকারের৷ এছাড়া ২০১৮ সালের মধ্যে ব্রডব্যান্ডের সম্প্রসারণ ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে৷

শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে মোবাইলে কিংবা ইন্টারনেটে পরীক্ষার ফল জানতে পারছে, কৃষকরা জমিতে থেকেই বিভিন্ন বাজারে পণ্যের দামের খবর পাচ্ছেন, তরুণরা দারুণ সব স্টার্টআপ গড়ে তুলছেন, সরকারি নানান সেবাও পাওয়া যাচ্ছে অনলাইনে৷ মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থারও ব্যাপক প্রসার ঘটেছে৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজকাল ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশ ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন৷ এসব উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিতও হয়েছে৷

যেখানে ঘাটতি, যা করতে হবে

প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন যেসব কাজ করা যাচ্ছে, সেগুলো যে একসময় করা সম্ভব হতে পারে, তেমনটি আগে ভাবেননি অনেকে৷

জাহিদুল হক, ডয়চে ভেলে

ফলে তাদের কাছে, সরকারের নেয়া এই উদ্যোগগুলো চমকপ্রদই বটে৷ এখনও আইটি পার্ক স্থাপন, নতুন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু, কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের সফটওয়্যার রপ্তানির মতো স্বপ্নের কথা শোনাচ্ছেন সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা৷ কিন্তু ইতিমধ্যে চালু হওয়া সেবাগুলোর মান উন্নয়ন ও সুরক্ষিত করা নিয়ে তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না৷ অথচ ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এই কাজটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ৷ অবশ্য সরকার যদি মনে করে, চমক দেখিয়ে ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণই আসল লক্ষ্য, তাহলে অন্য কথা৷ তবে স্বপ্ন বাস্তবায়নে আন্তরিক হলে সরকার নীচের প্রস্তাবগুলো ভেবে দেখতে পারে৷

- বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা চুরির ঘটনায় নিরাপত্তা ইস্যুটি এখনো আলোচনায়৷ ঐ ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, দেশের ডিজিটাল ব্যবস্থার নিরাপত্তা কত দুর্বল৷ ভবিষ্যতে যেন এই ধরনের ঘটনা আর ঘটতে না পারে সেই উদ্যোগ নিতে হবে৷ এজন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তির৷ এক্ষেত্রে শুধু কম্পিউটার চালাতে জানা লোক দিয়ে কাজ হবে না, দরকার পড়বে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়টি বোঝে এমন জনশক্তির৷ সেজন্য এই বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে৷ প্রাথমিক পর্যায়ে বিদেশে থাকা বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশিদের পরামর্শ নিয়ে কাজ শুরু করা যেতে পারে৷

- ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিরাপত্তাহীনতার আরেকটি ক্ষেত্র বিদেশি সফটওয়্যার ব্যবহার৷ দেশে সফটওয়্যার ডেভেলপ করার যোগ্য প্রতিষ্ঠান থাকলেও সরকারি, বেসরকারি বড় বড় প্রকল্পে এখনও বিদেশি সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রবণতা আছে৷ এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে, প্রকল্পের কাজে বিদেশিদের সফটওয়্যার ব্যবহার করায় তাদের মাধ্যমে দেশের অনেক গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিদেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে৷ তাই দেশি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমান্বয়ে কাজ দেয়া শুরু করতে হবে৷ আর তাদের মান আরও উন্নয়নে কী কী করা যেতে পারে সে ব্যাপারে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সেসব সুযোগের ব্যবস্থা করতে হবে৷ আর নিতান্তই যদি বিদেশের সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হয়, তাহলে আইন করে ঐসব বিদেশি কোম্পানির বাংলাদেশ অংশের মালিকানার অন্তত ৫০ ভাগ বাংলাদেশি নাগরিকদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে৷ এতে করে সফটওয়্যার নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়লে তাদের কাছ থেকে সমাধান পেতে সুবিধা হবে৷

- প্রতিবছর বেশ কয়েক হাজার শিক্ষার্থী কম্পিউটারে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে৷ স্কুল-কলেজ পর্যায়েও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা এখন বাধ্যতামূলক৷ তবে এর মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষার্থী বেরিয়ে আসছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে৷ কারণ, এই বিষয়ে পড়ানোর মতো মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব আছে৷ এই সমস্যার সমাধানে বিসিএস-এ একটি আলাদা ক্যাডার সার্ভিস চালু করা যেতে পারে৷ তাহলে হয়ত যোগ্য ব্যক্তিরা শিক্ষক হতে কিংবা সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আগ্রহী হবেন৷ বর্তমান অবস্থায় মেধাবীরা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন, কেননা, এখন পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কম্পিউটার পেশাজীবী হিসেবে মেধাবীদের আকৃষ্ট হওয়ার মতো অবস্থা নেই৷

- সরকারের পক্ষ থেকে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন অনেক বলে প্রচার করা হয়৷ তবে এর মধ্যে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাই অনেক বেশি৷ অথচ ইন্টারনেট ব্যবহার করে সত্যিকারের কিছু করতে চাইলে প্রয়োজন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের৷ কিন্তু দেশে এখনও এই ইন্টারনেট ব্যবহার সুলভ নয়৷

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

আমাদের অনুসরণ করুন