‘দলীয় রাজনীতির কারণে একাডেমিক পরিবেশের অবনতি ঘটেছে'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে ‘হাতাহাতি'-র ঘটনা নজিরবিহীন উল্লেখ করে শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মন্তব্য করেছেন যে, দলীয় রাজনীতির কারণে একাডেমিক পরিবেশের অবনতি ঘটেছে৷

ডয়চে ভেলের সঙ্গে টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ইতিহাস বিভাগের বিশিষ্ট এই অধ্যাপক বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরি হলে তা সামাল দেবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদের সঙ্গে হাতাহাতি করতে পারেন না৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলতে পারেন না৷ উভয় দিক থেকেই বিষয়টি নিন্দনীয়৷ বলেন, এটিই প্রমাণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশের কতটা অবনতি ঘটেছে৷ ‘‘এর একটি বড় কারণ হচ্ছে, গত কয়েক বছরে শিক্ষক নিয়োগ হয়নি৷ দলীয় ভোটার নিয়োগ হয়েছে৷'' বলছিলেন ড. হোসেন৷

গেল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজনের উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন করা হয়৷ সেনেটে কোনো শিক্ষার্থী প্রতিনিধি না থাকায় এ নির্বাচনের বিরোধিতা করে কিছু সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী সেখানে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানান৷ মল চত্বরের পাশে মূল ফটক বন্ধ থাকায় তা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন তারা৷ এ সময় শিক্ষকদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে৷ মূল ধারার গণমাধ্যমসহ সামাজিক মাধ্যমে এ সংক্রান্ত অনেকগুলো ছবিও প্রকাশিত হয়৷

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি তুহিন কান্তি দাশ বলেন, গত ২৭ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন, ডাকসু নির্বাচন বন্ধ৷ অথচ ডাকসুতে নির্বাচিত পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি থাকার কথা সেনেটের এই উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনে৷ তাই এই নির্বাচনের উপযোগিতা নিয়ে প্রতিবাদ যৌক্তিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, অথচ এ কারণে শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের ওপর চড়াও হয়েছেন৷

‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু রাখতে ডাকসুর বিকল্প নেই৷ সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই দাবি যৌক্তিক৷ অথচ দলীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা দলে তাদের অবস্থান আরো পাকাপোক্ত করতে এ কাজটি করেছেন৷'' এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ‘ভয়ানক' বলে মনে করেন তিনি৷

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন  মনে করেন, সেনেটে বর্তমান উপাচার্য প্যানেলের নির্বাচন নজিরবিহীনভাবে একটি বেআইনি কাজ৷ ‘‘নিবন্ধিত স্নাতকদের নির্বাচন করা হয়নি৷ ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়নি৷ কেন করা হয়নি তার ব্যাখ্যা উপাচার্য দেননি, চানওনি৷''

অসম্পূর্ণ সেনেটে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ১৯৭৩ এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের মূল চেতনার পরিপন্থি বলে মত তাঁর৷

বর্তমান উপাচার্য শুরু থেকেই ‘বেআইনি' কাজ করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি৷ বলেন, ‘‘সাড়ে চার বছর সাময়িক নিয়োগে তিনি কাজ করে গেছেন৷ তারপর ২০১৩ সালে একটি লোকদেখানো নির্বাচন করলেন৷ ১০৫ জনের সেনেটে  সদস্য ছিলেন মাত্র ২৫ জন৷ এবারো তিনি একই কাজ করলেন৷''

উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হবার আগেই এই প্যানেল নির্বাচনেরও সমালোচনা করেন তিনি৷ বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক আআমস আরেফিন সিদ্দিকের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২৪ আগস্ট৷

নিবন্ধিত স্নাতক প্রতিনিধি নির্ধারণ না করে সেনেটে উপাচার্য প্যানেল মনোনয়নের এই উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের মধ্যেই৷ শনিবারের এই সভা আটকাতে হাইকোর্টে রিট আবেদনও করা হয়েছিল৷ স্থগিতাদেশও দিয়েছিলেন আদালত৷ কিন্তু পরে আপিল বিভাগ সভা অনুষ্ঠিত হবার পক্ষে আদেশ দেন৷

আর কোনো প্যানেল না থাকায় বর্তমান উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিক, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক কামাল উদ্দীন ও বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন মো. আব্দুল আজিজের তিন সদস্যের প্যানেল মনোনীত হয়৷

এ সব বিষয়ে উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আরেক মেয়াদে তিনি যেন নির্বাচিত না হতে পারেন সেজন্য ষড়যন্ত্র চলছে৷ ‘‘একটা চক্রান্ত হচ্ছে তা তো স্পষ্ট৷ তারা তো আদালতে গেছেন৷ একটা অংশ বাধা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে৷ আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে৷ এ বিষয়গুলো আমরা দেখছি৷''

গত ২৭ বছর ধরে ডাকসু নির্বাচন বন্ধ আছে৷ হঠাৎ শনিবার কেন ছাত্রছাত্রীরা সেনেট ভবনের সামনে প্রতিবাদ শুরু করল তা তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান আরেফিন সিদ্দিক৷ ‘‘ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে আমাদের প্রায়ই আলোচনা হয়৷ কিন্তু হঠাৎ করে প্যানেল নির্বাচনের দিন তাদের কেন ডাকা হলো, কেন পাঠানো হলো, তা তদন্ত কমিটি দেখবে৷''

‘বহিরাগত' শিক্ষার্থীরাই ঘটনায় জড়িত বলে তিনি দাবি করেন৷ ‘‘ কিছু বহিরাগত স্টুডেন্ট সেখানে আগে থেকেই ছিল৷ তাদের সঙ্গে শিক্ষকদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে৷'' বলছিলেন উপাচার্য৷ তবে বিষয়টি যেহেতু তদন্তাধীন, তাই চট করে কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না বলেও জানান৷ 

ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি তুহিন অবশ্য উপাচার্যের দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন৷ তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থীই সেদিন বহিরাগত ছিলেন না৷ ‘‘বানোয়াট কথা৷ ওখানে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের৷ ৩০ থেকে ৪০ জন ছিল৷'' জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, বহিরাগত ছিলেন কোন কোন শিক্ষক৷

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা কারো পক্ষে বা বিপক্ষে আন্দোলন করছি না৷ আর সেদিনই আন্দোলন করেছি বিষয়টি তাও নয়৷ আমরা ধারাবাহিক আন্দোলন করছি৷ সেদিনের বিষয়টি চোখে পড়েছে সবার৷''

ঘটনায় যে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে তাতে দলীয় শিক্ষকদেরই রাখা হয়েছে অভিযোগ করে তুহিন বলেন, সেখানে ছাত্র প্রতিনিধি বা দলীয় নন এমন শিক্ষকদের রাখা হয়নি৷ এই কমিটি কোনো শিক্ষার্থীকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দিলে তা মানা হবে না বলেও জানান তিনি৷

আপনার কোনো মন্তব্য আছে? জানান নীচের ঘরে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

অনন্ত সাদ

ঢাকা নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী অনন্ত সাদ একজন শিক্ষকের ছেলে৷ তাঁর মতে, ‘‘মাতা-পিতার পরেই যাঁদের স্থান তাঁরাই হলেন শিক্ষক৷ আর এটা আমরা শিখেছি পরিবার থেকেই৷ শিক্ষকরা আমাদের সঙ্গে যতই রাগারাগি করেন না কেন সেটা আমাদের ভালোর জন্যই করে থাকেন৷ আমার বাবাও একজন শিক্ষক এবং তিনিই আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে শিক্ষকদের সম্মান করতে হয়৷’’

সমাজ-সংস্কৃতি

কাজী ফয়সাল আরেফিন

তিনিও ঢাকার নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী৷ তিনি মনে করেন, শিক্ষকদের সম্মান সবার উপরে৷ তাই শুধু ছাত্রদের নয়, সবারই উচিত শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান করা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

মোহাম্মদ নাঈম

ঢাকার নটরডেম কলেজের আরেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাঈম৷ তাঁর মতে, ‘‘শিক্ষক হলেন আমাদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার কারিগর৷ সেই শিক্ষকদের যদি সম্মান করা না হয় তাহলে আমাদের উন্নতি সম্ভব নয়৷’’

সমাজ-সংস্কৃতি

সুজানা জাহিদ

ঢাকার আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী সুজানা জাহিদ মনে করেন, শিক্ষকরা বাবা-মায়ের মতোই৷ সুজানা জানালেন, বাবা মা-কে যতটা সম্মান করেন, ঠিক ততটাই সম্মান করেন তিনি শিক্ষকদের৷

সমাজ-সংস্কৃতি

মুনিয়া

ঢাকার মতিঝিল মডেল স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুনিয়া শিক্ষকদের পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবেই দেখেন৷

সমাজ-সংস্কৃতি

সারজিমা হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের শিক্ষার্থী সারজিমা হোসেন তৃমার বাবা-মা দুজনই শিক্ষক৷ তাঁর মতে, ‘‘আমাদের সমাজে বর্তমানে শিক্ষকদের সম্মান অনেক কমে গেছে৷ তবে আমরা সবসময়ই শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান দিয়ে থাকি৷ আরেকটা বিষয় হলো, রাজনৈতিকভাবে শিক্ষদের অনেক হেয়, অসম্মান করা হয় যেটা বন্ধ হওয়া উচিত৷’’

সমাজ-সংস্কৃতি

মেহনাজ জাহান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের আরেক শিক্ষার্থী মেহনাজ জাহান বলেন, ‘‘শিক্ষকরা আমাদের গুরুজন৷’’ তাঁর মতে, শিক্ষকরা একেকজন পিতা-মাতা৷ সুতরাং তাঁরা ‍যদি কোনো ভুলও করে থাকেন সেজন্য তাঁদের কোনোভাবেই অসম্মান করা যাবে না৷ ‘‘আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে সামান্য কিছু হলেও আমরা তাঁদের কাছে শিখেছি,’’ বলেন তিনি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ইফতেখার ইসলাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডি বিভাগের শিক্ষার্থী ইফতেখার ইসলাম৷ তিনি বলেন, ‘‘যাঁদের হাত ধরে এতদূর এসেছি, তাঁরাই হলেন আমাদের শিক্ষক৷ তাই তাঁদের সম্মান সবার আগে৷’’

সমাজ-সংস্কৃতি

মাহবুবুর রহমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী মাহবুবুর রহমান৷ তাঁর মতে, বাবা-মা কোনো ভুল করলে যেমন আমরা তাঁদের বিরুদ্ধে যেতে পারিনা, তেমনি শিক্ষকরাও ভুল করলে তাঁদের অসম্মান করতে পারিনা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

তাহমিদ ইবনে আলম

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি সাহিত্যের শিক্ষার্থী৷ তাঁর মতে, শিক্ষকরা হাতে ধরে সবকিছু শিক্ষা দেন, সুতরাং তাঁদের সম্মান সবার আগে৷ কোনো শিক্ষার্থীরই উচিত হবে না শিক্ষকদের অসম্মান করা৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়