‘দুদকের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে'

অভিযোগ জানাতে দুর্নীতি দমন কমিশনের হটলাইন খোলার প্রথম সাত-আট কর্মদিবসেই প্রায় এক লাখ ফোনকল এসেছে৷ এর অর্থ দুদকের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান৷

গেল ২৭শে জুলাই কমিশন হটলাইন ১০৬ চালু করে৷ উদ্দেশ্য ছিল এর মাধ্যমে দুর্নীতি ঠেকাতে আরো ঘনিষ্ঠভাবে জনগণের সঙ্গে কাজ করা৷ এতে ব্যাপক সাড়াও মিলেছে৷ প্রথম দিনেই প্রায় ২,০০০ কল আসে৷ আর এক সপ্তাহের মাথায় সংখ্যাটি প্রায় পৌনে এক লাখে পৌঁছায়৷

তবে বেশিরভাগ অভিযোগই দুদক আইনের আওতার বাইরে বলে বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন কমিশনের মুখপাত্র প্রণব কুমার ভট্টাচার্য৷ ‘‘অনেকেই পারিবারিক বিষয়ে অভিযোগ করছেন৷ যৌতুকের অভিযোগও আসছে৷ কিন্তু এগুলো আমাদের এখতিয়ারে নয়৷''

দুদক আইনের আওতায় যেসব বিষয় পরে, তা হলো, সরকারি অফিস ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘুষ দেয়া বা নেয়া, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থের অবৈধ ব্যবহার, রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করা, অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং ও ব্যাংক জালিয়াতি৷

দুদক কর্মকর্তারা মনে করেন, জনগণ আস্তে আস্তে বিষয়টিতে অভ্যস্ত হবেন৷

যেসব অভিযোগ আমলে নেয়া হয়েছে তার বেশিরভাগই সরকারি ভূমি রেকর্ড অফিস, সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল ও স্কুল এবং সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে৷

দুদকে হাজার হাজার অভিযোগ জমা পড়া সংস্থাটির প্রতি মানুষের আস্থার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান৷ ‘‘এর অর্থ মানুষের মধ্যে দুদকের প্রতি প্রত্যাশা বেড়েছে৷ দুদকের বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি আস্থা তৈরি হয়েছে৷'' বলছিলেন তিনি৷

তবে এটি দুদকের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ বলেও মনে করেন ড. ইফতেখার৷ ‘‘দুদককে এই আস্থা ধরে রাখতে হলে যেসব অভিযোগ আসছে, সেগুলো তদন্ত করে দেখতে হবে এবং ব্যবস্থা নিতে হবে৷ এটা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ৷''

তবে  দুদক আইনের আওতায় দুর্নীতির যেসব খাত আছে,  সেগুলোতে দুর্নীতি ‘বিশাল' ও ‘গভীর' বলে মন্তব্য করেন তিনি৷

গত বছরের হিসেবে দুর্নীতি সূচকে ১০০ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশের পয়েন্ট ২৭৷ এটি ৪৩ হলে মোটামুটি একটা পর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতি রোধ করা গেছে বলে মনে করা হয়৷

ড. ইফতেখার বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত দুর্নীতিতে এক নম্বরে থাকা বাংলাদেশের অবস্থান এখন আগের চেয়ে ভালো হয়েছে৷ ‘‘কিন্তু এখনো আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় নিচের দিক থেকে দ্বিতীয়৷ আমাদের নীচে একমাত্র আফগানিস্তান৷''

টিআইবির সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষ সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার৷

দুদকের হটলাইন উদ্বোধন করতে এসে অর্থমন্ত্রী ‘সবাই পরোক্ষভাবে দুর্নীতিতে জড়িত' বলে যে মন্তব্য করেছেন তার সমালোচনা করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, এ ধরনের মন্তব্য ঠিক না৷

‘‘সেবা খাতে যারা দুর্নীতিবাজদের কারণে জিম্মি হয়ে জনগণ দুর্নীতির আশ্রয় নেয়৷ এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে৷''

ড. ইফতেখার মনে করেন, এক ধরনের হতাশা বা হাল ছেড়ে দেয়ার মতো এ ধরনের মন্তব্য দুর্নীতি ঠেকাতে সরকারের সামর্থ্যহীনতা যতটা না প্রকাশ করে, তার চেয়ে সদিচ্ছার অভাবের প্রশ্নটিই সামনে আনে৷

সরকারি চাকুরেদের জন্য ভালো বেতন

যাঁরা সরকারি চাকরি করেন তাঁদের বেতন যদি খুব কম হয়, তাহলে আয় বাড়াতে তাঁরা ‘অনানুষ্ঠানিক’ পথ অবলম্বন করতে পারেন৷ বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে সরকারি চাকুরেদের কম বেতন ও দুর্নীতির মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে৷

অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা

যে সমস্ত দেশের নাগরিকদের সরকারি কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার সুযোগ আছে সেসব দেশে দুর্নীতি কম হয়৷ অর্থাৎ যেখানে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, শিক্ষিতের হার বেশি এবং সক্রিয় সুশীল সমাজ রয়েছে সেখানে দুর্নীতির হার কম৷ কেননা এর ফলে বিভিন্ন প্রকল্পে সরকারের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, সরকারের নীতি নিয়ে আলোচনা করা যায়৷

লাল ফিতার দৌরাত্ম কমানো

বিশ্বব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস’ প্রতিবেদন বলছে, যে সব দেশে ব্যবসা শুরু করতে, সম্পত্তি নিবন্ধন করতে, আন্তর্জাতিক ব্যবসায় জড়িত হতে নানা ধরনের সার্টিফিকেট, আইন, লাইসেন্স ইত্যাদির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সে’সব দেশে দুর্নীতি বেশি হয়৷ তাই বিশ্বব্যাংকের এক গবেষক দুর্নীতির জন্ম দিতে পারে এমন আইনকানুন বাদ দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন৷

ভর্তুকি নয়

জ্বালানি খাতে ভর্তুকির নানা সমস্যা আছে৷ প্রায়ই এর সুবিধাভোগী হন ধনীরা৷ এছাড়া ভর্তুকি মূল্যে কেনা জ্বালানি চোরাচালানের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হন অনেকে৷ তাই ভর্তুকির মতো ব্যয়বহুল পদ্ধতির চেয়ে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষদের অর্থ সহায়তা দেয়া যেতে পারে৷

স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার

সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নাগরিকদের সরাসরি যোগাযোগ যত কমানো যাবে, দুর্নীতি কমানো ততই সম্ভব হবে৷ এক্ষেত্রে বিভিন্নক্ষেত্রে ইন্টারনেটের সহায়তা নেয়া যেতে পারে৷ সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে অনলাইনে টেন্ডার আহ্বানের মতো বিষয়াদি চালু করলে দুর্নীতির সুযোগ কমবে৷