দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষার সুযোগ

জার্মানিতে দৃষ্টিহীন শিশুর সংখ্যা খুব বেশি নয়৷ দৃষ্টিহীনদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা স্কুলগুলির মধ্যে একটি এই জার্মানিতেই৷ ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুল উন্নয়নশীল দেশগুলিতেও দৃষ্টিহীনদের শিক্ষায় সাহায্য করে থাকে৷

কথা হচ্ছে মারবুর্গের ‘ব্লিন্ডেনস্টুডিয়েনআনস্টাল্ট' বা দৃষ্টিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে৷ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জার্মান ছাত্রছাত্রীরা মারবুর্গ প্রণালীর কল্যাণে স্কুল-কলেজের পাঠ শেষ করতে পারে৷ অথচ জার্মানিতে দৃষ্টিহীনদের সংখ্যা বিশ্বের চার কোটি দৃষ্টিহীনের সঙ্গে তুলনা করলে, কিছুই নয়৷ কাজেই উন্নয়নশীল দেশগুলির স্কুল-কলেজকেও সাহায্য করে তাকে মারবুর্গের দৃষ্টিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান৷

মারবুর্গের দৃষ্টিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

আশ্চর্য ক্ষমতা

দৃষ্টিহীনদের হয়ত দৃষ্টি নেই বলেই তাদের মধ্যে অনেক আশ্চর্য ক্ষমতার বিকাশ ঘটে৷ ডেভ ইয়ানিশাক-এর কথাই ধরা যাক৷ ডেভ ‘দেখে' ঠিক বাদুড়দের মতো: অর্থাৎ সে প্রতিধ্বনি শুনে বস্তুর আকৃতি চিনতে পরে৷ এবং সে যে সেটা করতে পারে, তা সে একাধিক টিভি শো-তে প্রমাণ করে দেখিয়েছে৷ ২০১২ সালে স্টেজে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিল ডেভ৷ তার সামনে রাখা ছিল একটি ফুলঝারি, একটি সাইকেল, একটি মোমবাতিদান ইত্যাদি৷ ডেভ শুধু নিজের জিভ দিয়ে আওয়াজ করে এবং ঐ বস্তুগুলি থেকে সেই আওয়াজের প্রতিধ্বনি শুনে বলে দিতে পেরেছিল, বস্তুগুলি কি৷ দর্শকদের হাততালি কল্পনাই করা যেতে পারে৷

ডেভ কার্ল-স্ট্রেল-শুলে নামধারী স্কুলটির ছাত্র৷ স্কুলটি মারবুর্গের ‘ডয়েচে ব্লিন্ডেনস্টুডিয়েনআনস্টাল্ট' বা ‘ব্লিস্টা'-র অংশ৷ ব্লিস্টা'র প্রধান ক্লাউস ডুঙ্কার তাঁর ছাত্রের কৃতিত্বে গর্বিত৷ তবে ডেভকে নিয়ে মিডিয়ায় যে হাইপ চলেছে, সে সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য: ‘‘লোকে যা মনে করে, তার চেয়ে অনেক বেশি দৃষ্টিহীন ছাত্রের এই ক্ষমতা আছে৷'' এছাড়া ঐ ক্ষমতা দিয়ে পথে-ঘাটের সব প্রতিবন্ধক চেনা কিংবা ঠাহর করা যায় না৷ কাজেই দৃষ্টিহীন ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের অন্ধের যষ্টি ও অন্যান্য সহকারী সরঞ্জামের সঙ্গে পরিচিত থাকা উচিত৷

‘লোকে যা মনে করে, তার চেয়ে অনেক বেশি দৃষ্টিহীন ছাত্রের এই ক্ষমতা আছে’ বলেন, ব্লিস্টা'র প্রধান ক্লাউস ডুঙ্কার

জীবনের শিক্ষা

জার্মানিতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ৭০টি বিশেষ স্কুল আছে৷ তবে সেই সব স্কুল থেকে ‘আবিটুর' – অর্থাৎ ১৩ বছর প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার পর জার্মান স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট, যা কিনা বস্তুত একটি স্নাতক উপাধির সমান – দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য এই ‘ফ্যোর্ডেরশুলে' থেকে এই ‘আবিটুর' পাস করা সবসময় সম্ভব নয়৷ মারবুর্গের কার্ল-স্ট্রেল-শুলের বিশেষত্ব সেখানেই: এটি হলো জার্মানিতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘গিমনাজিউম' বা হাই স্কুল৷

এখানে পঞ্চম ক্লাস থেকে ‘আবিটুর' অবধি পড়ছে সারা জার্মানি থেকে আসা প্রায় ৩০০ ছাত্রছাত্রী৷ আবাসিক স্কুল৷ এখানে তারা শুধু স্কুলের পড়াই শেখে না, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জীবনের প্রাত্যহিক সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করতেও শেখে৷ শুধু অঙ্কই নয়, সেই সঙ্গে ভ্যাকুয়াম ক্লিনিং! ‘‘আমরা ওদের জীবনের শিক্ষা দিই,'' বলেছেন স্কুলের অধ্যক্ষ ক্লাউস ডুঙ্কার৷ যার মধ্যে বিদেশি ভাষা শিক্ষাও থাকে – যদিও তার একটা ব্যবহারিক দিকও আছে৷

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের স্কুলবই

বিদেশে সহযোগিতা

বিদেশে বিভিন্ন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বোধহয় সেই সূত্রেই, যেমন ইংল্যান্ডের রয়াল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ব্লাইন্ড-এর সঙ্গে৷ ৮০-র দশকের শেষ থেকেই কার্ল-স্ট্রেল-শুলে এবং আরএনআইবি-র মধ্যে ছাত্রের আদানপ্রাদান চলেছে৷ প্রতিবছর মারবুর্গ থেকে সাতজন অবধি ছাত্রছাত্রী ইংল্যান্ডে গিয়ে এক সপ্তাহ কাটানোর সুযোগ পায়৷

অনুরূপভাবে পোল্যান্ডের ক্রাকাও শহরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখে চলেছে মারবুর্গের স্কুলটি৷ তবে যে সব দেশে মারবুর্গের প্রতিষ্ঠানটি পথিকৃতের কাজ করছে, তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে জর্জিয়ার নাম করতে হয়৷ জর্জিয়া হলো এমন একটি দেশ, যেখানে দৃষ্টিহীন শিশুদের শুধু লোকলজ্জার কারণে অনেক সময় বাড়িতে আটকে রাখা হয় – জানিয়েছেন ডুঙ্কার৷ সেক্ষেত্রে ‘ব্লিস্টা' জর্জিয়ায় কিছু ছাত্র ও শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দৃষ্টিহীন পুনর্বাসন কর্মসূচির উপযোগী করে তুলেছে; সরকারি মন্ত্রণালয়গুলিকে দৃষ্টিহীনদের কথা ভাবতে বাধ্য করেছে৷

আমাদের অনুসরণ করুন