দেখা যায়, কিন্তু চোখে পড়ে না

শিশুদের কেন পথে থাকতে হবে? মানবিক বোধসম্পন্ন যে কোনো মানুষের মনেই এই প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক৷ তা আসেও৷ কিন্তু সে প্রশ্ন কতটা নাড়ায় আমাদের?

যেসব দেশে পথশিশু বেশি চোখে পড়ে, সেখানকার মানুষগুলোর নিত্যকার অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্ন একটা সময় হারিয়ে যায়, মলিন হয়ে যায় রাস্তার পাশে পড়ে থাকা শিশুটির জীর্ণ পোশাকের মতো৷ দেখা যায়, কিন্তু ঠিক চোখে পড়ে না৷

তবে মানবিক দিক থেকে এই শিশুদের প্রতি দৃষ্টি না আটকালেও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অন্তত এদের দেখা উচিত৷ যেমন, যুক্তির বিচারে একটি দেশে পথশিশু কী সংখ্যক আছে, তা দেশটির দারিদ্র্যেরও মাপকাঠি৷ সহজ হিসেব৷ যেমন, এই সহস্রাব্দের শুরুতে জিম্বাবোয়ের অর্থনীতি চরম ধাক্কা খাবার পর ২০০৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, আগের এক বছরে সে দেশের পথে শিশুর সংখ্যা বেড়েছে ৫৮ ভাগ!

তাই একটি দেশে পথশিশুর সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে দারিদ্র্য একটি বড় কারণ তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ কিন্তু সবসময়ই কি তাই? তাহলে বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির দেশ ব্রাজিলে কেন এত পথশিশু? বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে৷ তাহলে সেই হারে পথশিশুর সংখ্যা কি কমছে?

বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ঘাটলে দেখা যায়, অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ থেকে ১১ লাখ বলা হচ্ছে৷ কোনো সঠিক পরিসংখ্যান দিতে না পারলেও হিসেব অনেকটা এমনই৷ এর অর্থ সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুরা অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে৷

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর গবেষণা উদ্ধৃত করে দু'বছর আগেও স্থানীয় গণমাধ্যম বলেছে, শুধু ঢাকা শহরে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার পথশিশু রয়েছে৷

সে গবেষণায় আরো দেখা যায় যে, এই শিশুদের প্রায় ৪৪ শতাংশ মাদকাসক্ত এবং ১৯ ভাগ গ্রেফতারও হয়েছে৷ ৪১ শতাংশের ঘুমাবার জায়গা নেই, ৮০ ভাগ কাজ করে খায় এবং ৮৪ শতাংশের শীতবস্ত্র নেই৷ এছাড়া এদের অধিকাংশই স্বাস্থ্যসেবা পায় না৷ নানান শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়৷ শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত এরা৷

প্রশ্ন হলো, এই শিশুদের এভাবে অবহেলায় ছেড়ে দেয়াতে কী কী ক্ষতি হয়? অপরাধ বেড়ে যায়৷ এটা একটা বড় ক্ষতি৷ কিন্তু যেই ক্ষতিটা নিয়ে যথাযথ গবেষণার প্রয়োজন আছে, তা হলো, অর্থনৈতিক ক্ষতি৷

সমাজ-সংস্কৃতি | 19.02.2019

এই শিশুরা ঠিকমতো শিক্ষা পেলে এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশ পেলে দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ইতিবাচক প্রভাব পড়ত, যা থেকে এখন বঞ্চিত হচ্ছে দেশ৷ এটা একটা বিরাট ক্ষতি৷ এর অর্থনৈতিক মূল্য বের করা দরকার৷ তাহলে অন্তত বোঝা যেত, এদের পেছনে সরকারের কতটা ব্যয় করা প্রয়োজন, বা যতটা এখন বরাদ্দ হচ্ছে তা যথেষ্ট কিনা৷

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

একই সঙ্গে এই অর্থ কোথায় ব্যয় করতে হবে, তা-ও বিবেচনায় রাখা দরকার৷ কারণ, যারা পথশিশু, তাদের জন্য কাজ করা যেমন দরকার, তেমনি কেন এই পথশিশু তৈরি হচ্ছে, সে জায়গাতেও কাজ করতে হবে৷

১৯৮৪ সালে ইউনিসেফ পথশিশুদের তিন ভাগে ভাগ করেছে৷ রাস্তায় শিশু, ঝুঁকির মুখে শিশু ও রাস্তার শিশু৷ রাস্তায় শিশু হলো যাদের ঘর আছে, কিন্তু জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নেমে আসে৷ আইএলও'র ২৩ বছর আগে করা হিসেবে দেখা যায়, এই শিশুরা গড়ে ঘরের ৩০ ভাগ খরচ জোগায়৷

এছাড়া আছে, শহুরে গরীবদের শিশুরা, যাদের বলা হয়, ঝুঁকির মুখে শিশু৷ এরা কাজ করুক আর না-ই করুক রাস্তায় শিশুদের যে বিরাট সংখ্যা তাতে অবদান রাখে৷ এর বাইরে পরিত্যক্ত, বাড়ি পালিয়ে আসা ও মা-বাবাহীন শিশুরা পড়ে তৃতীয় ভাগে, অর্থাৎ রাস্তার শিশুর তালিকায়৷ এরা সাধারণত ঘরহীন৷

তাই পথশিশুর সংখ্যা কমাতে হলে এসব বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে হবে৷ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন৷ তিনি আগের মেয়াদে এই শিশুদের নিয়ে কথা বলেছেন৷ পেশাগত কাজে তাঁর সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আমি নিজে শুনেছি যে, তিনি বলছেন, একটি শিশুও যেন ঘরহীন না থাকে৷ সে সময়ে কিছু প্রকল্প নেয়া হয়েছিল৷ সেগুলোর কী অবস্থা?

বাজেটে বরাদ্দ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে৷ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পথশিশুদের নিয়ে প্রকল্প রাখার কথা বলা হয়েছে৷ কিন্তু খুব একটা কাজ হয়েছে বলে আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে না৷

বলছি, পথশিশুদের জন্য মায়াকান্না কেঁদে লাভ নেই৷ বছরে দু'তিন বার এদের কয়েকজনকে নিয়ে অনুষ্ঠান করে বাহবা কুড়ানো টুড়ানোর দিন শেষ৷ এখন যেতে হবে সমস্যার গভীরে৷ মানবিক নয়, দেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা উচিত৷ কারণ, দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, আর তার সুবিধা শুধু ধনীরাই পাবেন, তা হতে পারে না৷

পথশিশুদের জীবনকথা

বাস স্টেশনই আনোয়ারের জগৎ

পথশিশু আনোয়ার হোসেনের বেড়ে ওঠা সায়দাবাদ বাস স্টেশন এলাকায়৷ মা ভিক্ষা করে বেড়ান শহরের বিভিন্ন এলাকায়৷ বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তার পাশেই খেলাধুলায় কেটে যায় তার দিন৷ এর বাইরে নিজের বাড়ি ও বাবা সম্পর্কে আর কিছুই জানে না সে৷

পথশিশুদের জীবনকথা

বড় হয়ে বাসচালক হতে চায় রকিব

মালিবাগ এলাকায় সড়কের পাশেই পলিথিন দিয়ে বানানো ছোট্ট এক ঘরে মায়ের সঙ্গে থাকে রকিব৷ রকিবের মা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে প্লাস্টিক কুড়িয়ে বিক্রি করেন৷ বড় হয়ে বড় বড় বাস চালানো রকিবের স্বপ্ন৷

পথশিশুদের জীবনকথা

খেলাধুলায় দিন কাটে সম্রাটের

বাবা-মায়ের সঙ্গে খিলগাঁওয়ে রাস্তার পাশের এক খুপড়ি ঘরে থাকে সম্রাট৷ বাবা কোনো কাজ-কর্ম না করলেও মা দিনমজুরের কাজ করেন৷ কাজ না পেলে ঠিক মতো তিনবেলা খাবার জোটে না তার৷ ফুটপাথে খেলাধুলা করে কাটে যায় তার দিন৷ 

পথশিশুদের জীবনকথা

ঠিক মতো খেতে পায় না মরিয়ম

মরিয়মের জন্মের পর থেকে তার মায়ের আর খোঁজ নেয় না তার বাবা৷ মা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে বিক্রি করেন৷ খিলগাঁও এলাকার সড়কের পাশেই মায়ের সঙ্গে থাকে মরিয়ম৷ মা সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় বোতলের সন্ধানে থাকায় তিনবেলা ঠিকমতো খাবারও খেতে পায় না মরিয়ম৷ 

পথশিশুদের জীবনকথা

বন্ধুর টানে ঢাকায়

বাবা-মায়ের মধ্যে অশান্তিতে ঘর ছেড়েছিল সামির৷ কিছুদিন খুলনা রেলস্টেশনকেই বেছে নিয়েছিল ঠিকানা হিসেবে৷ একবার ট্রেনে চড়ে চলে এলো ঢাকায়৷ জুটে গেল কিছু বন্ধুও৷ এখন খুলনা আর কমলাপুর রেল স্টেশনই সামিরের ঠিকানা৷ যতদিন ভালো লাগে, সে থাকে খুলনা রেল স্টেশনে৷ তারপরে আবার ট্রেনে চড়ে সোজা কমলাপুর৷ 

পথশিশুদের জীবনকথা

বাবা-মায়ের কথা জানে না সাহান

কমলাপুর রেল স্টেশনেই থাকে পথশিশু সাহান৷ বাবা-মা কোথায়, জানা নেই তার৷ স্টেশনে যাত্রীদের লাগেজ বহন করে যে টাকা পায়, তা দিয়ে খাবার কিনে খায় সে৷ রাতে ঘুমায় স্টেশনের প্লাটফর্মেই৷ 

পথশিশুদের জীবনকথা

কমলাপুরে থাকে হৃদয়

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর আবার বিয়ে করেছেন হৃদয়ের মা৷ মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর অত্যাচার সইতে না পেরে বাড়ি ছেড়েছে সে৷ কমলাপুর রেলস্টেশনেই অনেক পথশিশুর সঙ্গে রাত কাটে তারও৷

পথশিশুদের জীবনকথা

বাবা-মা নেশাগ্রস্ত

হাসান আলীও থাকে ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে৷ নেশাগ্রস্ত বাবা-মা থাকেন গোপিবাগের রেল লাইনের পাশের বস্তিতে৷ বাবা-মা ঠিকমতো খাবার দিতে পারেন না বলেই কমলাপুরে চলে এসেছে সে৷ এখন ভিক্ষা করে খাবার কিনে খায় হাসান৷ 

পথশিশুদের জীবনকথা

সদরঘাট থেকে কমলাপুর

বাড়ি থেকে পালিয়ে ভোলা থেকে লঞ্চে চড়ে ঢাকায় আসে মাহফুজ৷ ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বেশ কিছুদিন থাকার পর পরিচয় হয় আরেক পথশিশু জলিলের সঙ্গে৷ তার সাথে ঘুরতে ঘুরতে সে চলে আসে কমলাপুর৷ এখানেই এখন দিনরাত কাটে তার৷ 

পথশিশুদের জীবনকথা

ভাগ্যবান হিরা

মোহাম্মদ হিরার বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে৷ বাবা-মা মারা যাবার পর বছর দশেক আগে ট্রেনে চড়ে চলে আসে কমলাপুর৷ কমলাপুর স্টেশনেই দীর্ঘ সময় কেটেছে তার৷ তবে গত বছর থেকে মুগদাপাড়ার ইনসিটি বাংলাদেশ নামে একটি বেসরকারি সংস্থার শেল্টার হোমে রাত কাটানোর সুযোগ পেয়েছে সে৷

পথশিশুদের জীবনকথা

জুমা বেগম

জুম্মার নামাজের দিন জন্ম হয়েছিল বলে বামা-মা নাম রেখেছিল জুমা বেগম৷ তার জন্মের পর বাবা-মায়ের সম্পর্ক বেশি দিন স্থায়ী হয়নি৷ দু’জনেই আবার বিয়ে করায় জুমার ঠাঁই হয়েছিল এক খালার কাছে৷ কিন্তু অভাব-অনটনের কারণে একসময় ঘর ছাড়ে সে৷ গত ছয়-সাত বছর ধরে তার ঠিকানা কমলাপুর রেল স্টেশন৷

পথশিশুদের জীবনকথা

নেশায় বুঁদ পথ শিশু

জামাল, সোহেল ও হানিফের মতো অনেক পথশিশু নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে ঢাকা শহরে৷ পথশিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ‘ড্যান্ডি’-র নেশায়৷ জুতা কিংবা ফোমে ব্যবহৃত সলিউশন (আঠা) পলিথিনে ভরে কিছুক্ষণ পরপর মুখের সামনে নিয়ে শ্বাস টেনে নেয়া – এই নেশার নামই ড্যান্ডি৷

আপনারও কি মনে হয়, পথশিশু সংকটের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন? লিখুন নীচের ঘরে৷ 

আমাদের অনুসরণ করুন