দেশবাসীদের কল্যাণেই আদিবাসীদের প্রয়োজন

মণিপুরি, চাকমা, মগ, খাসিয়া বা সাঁওতালদের মতো আদিবাসীদের প্রয়োজন কেন ও কতটা? আপাতদৃষ্টিতে অকিঞ্চিৎকর মনে হলেও, নৃতত্ত্ব বা সংস্কৃতির বিচারে একটি দেশ বা সমাজ বা জাতির বিকাশে আদিবাসীদের গুরুত্ব অসীম৷

মানব ইতিহাস হিংসাময়, সহিংস৷ সবলের জয়, দুর্বলের পরাজয়৷ আধুনিকতার জয়, প্রাচীনপন্থার পরাজয়৷ তাই পৃথিবী জুড়ে, দেশের পর দেশে দেখা যায় , প্রভাব ও আধিপত্যশালী মুখ্য নৃগোষ্ঠীর পাশাপাশি মুখ গুঁজে বাস করে চলেছেন সেই ভূখণ্ডের আদিবাসীরা৷ উপনিবেশবাদ থেকে শুরু করে পুঁজিবাদ বা বিশ্বায়নের প্রতিটি ঢেউয়ে প্রথমেই মুখ থুবড়ে পড়ছে তাদের পর্ণকুটিরগুলি৷ তারা হন ধর্মের শিকার, শুচি-অশুচির শিকার, শোষণের শিকার৷ তবে তারা আছেন কেন? তারা উধাও হন না কেন? দেশ বা সমাজের কোন কাজে লাগেন তারা?

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

কথাটা নিউজিল্যান্ডের মানুষ ও সরকার বহু আগে বুঝতে শিখেছেন – যে কারণে মাওরিদের সম্পর্কে সে দেশ বিশেষভাবে সচেতন ও সচেষ্ট৷ অস্ট্রেলিয়ার সরকার ও জনতা ধীরে ধীরে বুঝছেন, তথাকথিত অ্যাবরিজিনরা অস্ট্রেলীয় সংস্কৃতির, পঞ্চম মহাদেশটির অতীতের, অতীত ইতিহাসের কত বড় অঙ্গ৷

সংস্কৃতি

বৈসাবি উৎসব

ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ‘বৈসুক’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ আর চাকমাদের ‘বিজু’ – এই তিন উৎসবের নামের প্রথম অক্ষর থেকে ‘বৈসাবি’ উৎসবের নাম এসেছে৷ তিনটিই বর্ষবরণের অনুষ্ঠান৷ ফলে পার্বত্য এলাকার আদিবাসীরা সবাই মিলে বৈসাবি উৎসবে অংশ নেয়ার মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়৷ উপরের ছবিটি সাংগ্রাই উৎসবের৷

সংস্কৃতি

চাকমাদের বিজু

বাংলা বছরের শেষ দু’দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন এই উৎসব হয়৷ অনুষ্ঠানের প্রথম দিন ‘ফুল বিজু’ নামে পরিচিত৷ এই দিন ভোরে পানিতে ফুল ভাসানো হয়৷ তরুণ-তরুণীরা পাড়ার বৃদ্ধদের গোসল করিয়ে দেয়৷ তবে বিজু উৎসবের মূল দিন নববর্ষের প্রথম দিন৷ চাকমা ভাষায় এই দিনটির নাম গজ্জ্যেপজ্জ্যে, অর্থাৎ গড়াগড়ি খাওয়ার দিন৷ এই দিন ভালো খাবার রান্না করা হয়৷ কারণ মনে করা হয়, বছরের প্রথম দিন ভালো রান্না করলে বছরজুড়ে অভাব থাকবে না৷

সংস্কৃতি

মারমাদের সাংগ্রাই

পার্বত্য চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম আদিবাসী গোষ্ঠী মারমারা পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন করলেও বাংলা পঞ্জিকা অনুসরণ করে না৷ তারা বর্মীপঞ্জি, অর্থাৎ বার্মা মিয়ানমারের ক্যালেন্ডার মেনে চলে৷ সাংগ্রাই উৎসবের মূল আকর্ষণ ‘রিলং পোয়েহ্’৷ এটি পানি ছো়ড়াছুড়ির খেলা৷ মারমা তরুণ-তরুণীরা একে অপরকে পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দেয়৷ তাঁদের বিশ্বাস, এর মাধ্যমে অতীতের সকল দুঃখ-গ্লানি ও পাপ ধুয়ে-মুছে যায়৷

সংস্কৃতি

ত্রিপুরাদের বৈসুক

চাকমাদের বিজুর মতো এই উৎসবও তিনদিনের৷ নববর্ষের প্রথম দিন বয়স্করা ছোটদের আশীর্বাদ করেন৷ আর কিশোরীরা কলসি কাঁখে নিয়ে বয়স্কদের খুঁজে খুঁজে গোসল করায়৷ তরুণ-তরুণীরা রং খেলায় মেতে ওঠে৷ একজন আরেকজনকে রং ছিটিয়ে রঙিন করে দিয়ে গোসল করে আবারো আনন্দে মেতে ওঠে৷

সংস্কৃতি

তঞ্চঙ্গ্যাদের বৈসুক

তঞ্চঙ্গ্যাদের বর্ষবরণ অনেকটা চাকমাদের মতোই৷ উৎসবের প্রথম দিন মেয়েরা ফুল সংগ্রহ করে ঘর সাজায়৷ পরদিন সবাই গোসল করে নতুন জামা-কাপড় পরে আনন্দ-ফূর্তি করে৷ ঘরে ঘরে ঐতিহ্যবাহী খাবার আর পিঠার আয়োজন করা হয়৷ রাতে ‘ঘিলা’ নামের এক খেলায় মেতে ওঠে সবাই৷ আর নববর্ষের দিন তরুণ-তরুণীরা বয়স্কদের গোসল করায়৷

সংস্কৃতি

মুরংদের চাংক্রান

মূল উৎসবের দিন মুরংরা বাঁশি বাজিয়ে ‘পুষ্প নৃত্য’ করতে করতে মন্দির প্রদক্ষিণ করে৷ ম্রো সমাজে লাঠি খেলা খুবই জনপ্রিয়৷ তাই চাংক্রানের মূল দিনে তারা এই খেলা খেলে থাকে৷

সংস্কৃতি

কারাম উৎসব

সমতলের আদিবাসীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘কারাম উৎসব’ বা ‘ডাল পূজা’৷ ওঁরাও, সাঁওতাল, মালো, মুন্ডা, মাহাতো, ভুইমালি, মাহলীসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে এই উৎসবে অংশ নিয়ে থাকে৷ এই আদিবাসীরা ‘কারাম’ নামক একটি গাছের ডালকে পূজা করেন বলে এই উৎসবের আরেক নাম ‘ডাল পূজা’৷

সংস্কৃতি

সাঁওতালদের সহরায় উৎসব

আদিবাসী সাঁওতালদের কাছে গৃহপালিত গরু, মহিষের গুরুত্ব অনেক৷ সহরায় উৎসবে এসব প্রাণীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়৷ উৎসবকে ঘিরে বিবাহিত মেয়েরা তাদের বাবার বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পান৷ কারণ উৎসবে তাদের আমন্ত্রণ জানানো একটি রেওয়াজ৷ এই পরবের নির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ নেই৷ গ্রামের মোড়লদের নিয়ে সভা করে উৎসবের দিন ঠিক করা হয়৷

ক্যানাডা সরকার ‘ইন্ডিয়ানদের' জন্য যা করার চেষ্টা করছেন, মার্কিন সরকার তথাকথিত রেড ইন্ডিয়ানদের জন্য, ঠিক হোক, ভুল হোক, যা করার চেষ্টা করছেন ও ভবিষ্যতে আরো বেশি করে করবেন – এ সবের পিছনে রয়েছে একটি তত্ত্ব, যার নাম হলো জীববৈচিত্র্য, প্রাণীবৈচিত্র্য৷

বৈচিত্র্য ছাড়া জীবন বাঁচে না, বাড়ে না, বিকাশ পায় না৷ সংমিশ্রণই মানবজাতির বিকাশ ও প্রগতির মূল কারণ – শুধু মানবজাতিরই বা কেন? ‘জিন পুল'-এর কথা আমরা সবাই জানি৷ কোনো প্রজাতির জিন পুলে বৈচিত্র্য কমে এলে, সে প্রজাতির বিলুপ্ত হবার বিপদ দেখা দেয়৷ সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এই বৈচিত্র্যের প্রয়োজন৷ কোন সংস্কৃতির সঙ্গে কোনো সংস্কৃতির ঠোক্কর বা টক্কর থেকে যে সাংস্কৃতিক বিবর্তনের পরবর্তী প্রেরণা আসবে, তা বড় বড় নৃতত্ত্ববিদরাও বলতে পারবেন না৷

আবার ভেবে দেখুন, এই যে আজকাল ‘অরগ্যানিক ফার্মিং', ‘অরগ্যানিক' খাবারদাবার নিয়ে সকলের এতো উৎসাহ, তার মূল কথাটা হলো এই যে, ‘অরগ্যানিক' কলা-মুলোর আকৃতি একটু বিদ্ঘুটে হয় আর বালি-কাদা একটু বেশি থাকে বটে – কিন্তু সেটাই তো তার ‘বিশুদ্ধতার', অর্থাৎ বিশুদ্ধভাবে ‘অরগ্যানিক' হওয়ার প্রমাণ৷ অর্থাৎ বিশুদ্ধ না হওয়াটাই বিশুদ্ধতার প্রমাণ! বঙ্গদেশ যে বাঙালিদের রাজত্ব, সেটা কিছু অবাঙালি না থাকলে উপলব্ধি করবেন কি করে, আর বাঙালিত্বের মজাটাই বা পাবেন কী করে?

Deutsche Welle DW Arun Chowdhury

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

চিকিৎসাশাস্ত্রে বলে, শরীরে অ্যান্টিবডি থাকলে জীবাণুরা কিছু করতে পারে না৷ সংখ্যালঘুরা হলেন ‘বডি পলিটিকের' সেই অ্যান্টিবডি৷ তাদের উপস্থিতি আমাদের জাতীয় সত্তাকে আরো সুস্থ, আরো জোরদার করে৷ আর যদি এতেও না হয়, তাহলে পরিবেশবাদীদের তূণ থেকে আরো একটা যুক্তি যোগ করতে পারি: বন-বনানীর ক্ষেত্রে ‘মোনোকালচার' কা-কে বলে, জানেন তো? অর্থাৎ মাইলের পর মাইল একই গাছের বন, একই গাছের চাষ, কোথাও ইউক্যালিপ্টাস তো কোথাও অয়েল পাম৷ এর ফলে পরিবেশের ক্ষতি হয়, মাটির ক্ষতি হয়, জীবজন্তুর ক্ষতি হয়, শেষমেষ মানুষের ক্ষতি হয়৷

কাজেই নৃতত্ত্বের ক্ষেত্রেও (সরকারি ভাষায়) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলিকে উপেক্ষা করবেন না৷ আমাদের সভ্যতা আর সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা, সতেজ রাখার পিছনে তাদের যে কি অবদান, তা শেষমেষ শুধু সৃষ্টিকর্তা আর তাঁর কাজের বুয়া প্রকৃতিরাণীই জানেন৷

অরুণ শঙ্কর চৌধুরীর লেখাটি নিয়ে কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷