দোভাষীর দোটানায় বিপাকে রাহুল গান্ধী

ভারতের কেরালায় একটি প্রচারসভায় নিজের দোভাষীকে নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে৷ তাঁর বক্তৃতা ও দোভাষীর অনুবাদের একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে৷

ভারতের বহুভাষিকতা মাঝে মাঝে সৃষ্টি করে অদ্ভুত পরিস্থিতি৷ ঠিক যেমনটা হলো মঙ্গলবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর একটি সভায়৷

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্য কেরালায় বেশির ভাগ মানুষই মালায়ালাম ভাষায় কথা বলেন৷

অল্প ইংরেজি তাঁরা জানলেও রাহুল গান্ধীর ইংরেজি বক্তৃতা বোঝার জন্য তা পর্যাপ্ত নয়৷ ইংরেজির মতো হিন্দিতেও কেরালার মানুষ খুব একটা স্বচ্ছন্দ নন৷

বক্তা ও শ্রোতার মধ্যে ভাষার এই ফারাক কমাতে মঙ্গলবারের এই সভায় দোভাষীর ভূমিকায় উপস্থিত ছিলেন বরিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা পি জে কুরিয়েন৷ কিন্তু বয়সজনিত কারণে কুরিয়েনের রয়েছে শ্রবণের অক্ষমতা৷ ফলে, রাহুলের বক্তৃতা বুঝতে বেশ সমস্যা হচ্ছিল তাঁর৷

দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যেও পড়ে যায় হাসির রোল৷ কিন্তু সভায় দোভাষীর ব্যর্থতা সত্ত্বেও রাহুল ধৈর্যের সাথে নিজের বক্তব্য সম্পন্ন করেন৷

এই ঘটনার একটি ভিডিও ইতিমধ্যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাড়া ফেলে দিয়েছে৷

এদিকে, কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভারতীয় জনতা পার্টি অর্থাৎ বিজেপি'র কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এই ভিডিওটি বিদ্রুপের ছলে টুইট করলে তা নিয়ে শুরু হয় আলোচনা৷

একপক্ষ যখন গোয়েলের টুইটের সাথে সুর মিলিয়ে কংগ্রেস'কে কটাক্ষ করায় ব্যস্ত, আরেক পক্ষ তখনই দাঁড়িয়ে যায় রাহুলের পাশে৷

এসবের মাঝে, গোয়েলের টুইটে ভিডিওটি দেখা হয় তিন লক্ষেরও বেশি বার৷ শেয়ার করা হয়েছে ৩০,০০০বার৷ ইউটিউব, টুইটার ও ফেসবুক মিলিয়ে ভিডিওটি দেখা হয়েছে প্রায় দশ লক্ষবারের কাছাকাছি৷

উল্লেখ্য, কেরালার ভায়ানাড় কেন্দ্র থেকে লোকসভা নির্বাচনে লড়ছেন রাহুল গান্ধী৷ ভাষার এমন বিড়ম্বনায় বিপাকে পড়া তিনিই একমাত্র রাজনীতিক নন৷ এর আগে এমন ঘটেছে বিজেপি'র অমিত শাহ এবং রাহুলের মা সোনিয়া গান্ধীর সাথেও৷

এসএস/এসিবি

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

প্রতিষ্ঠা

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ অফিসার অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের উদ্যোগে ১৮৮৫ সালে বোম্বে, অর্থাৎ আজকের মুম্বই শহরে জন্ম নেয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস৷ তৎকালীন বৃটিশ শাসকের সাথে সাধারণ ভারতীয় জনতার সংলাপের মঞ্চ হয়ে ওঠে কংগ্রেস৷ প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন আইনজীবী উমেশচন্দ্র বনার্জী৷ তখন দলের প্রতীক ছিল চরকা৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

স্বাধীনতার লড়াইয়ে ভূমিকা

ভারতের স্বাধীনতার লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে কংগ্রেস৷ দলটি ছিল নানা মতের মিলনমেলা৷ একদিকে গান্ধী, নেহরু, জিন্নাহ’র মধ্যপন্থা, বিপরীতে ঋষি অরবিন্দ, লালা লাজপত রাই, বিপিনচন্দ্র পাল, বাল গঙ্গাধর তিলক ও সুভাষচন্দ্র বসু’র চরমপন্থি জাতীয়তাবাদ — দলটি যেন দেশের মানুষের মতোই বিচিত্র, বহুমুখী৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

মতবিরোধ এবং সুভাষ বসুর দলত্যাগ

গান্ধী ও সুভাষের মধ্যেও মতবিরোধ ছিল৷ গান্ধী মনোনীত প্রার্থী, পট্টভি সীতারামাইয়াকে হারিয়ে ১৯৩৯ সালে কংগ্রেসের সভাপতি হন সুভাষ৷নিরস্ত্র আন্দোলন না সশস্ত্র আন্দোলন — কোন পথে লড়বে কংগ্রেস? এই প্রশ্নে উত্তাল দলের অভ্যন্তর৷ মতাদর্শগত টানাপড়েনের মুখে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র দল, ফরোয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠা করেন সুভাষ৷ কংগ্রেসের সভাপতি হন রাজেন্দ্র প্রসাদ, যিনি পরবর্তীতে স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

দাঙ্গা

ব্রিটিশরা সাম্প্রদায়িকতার যে বীজ বপন করেছিল, তার ফলে শুরু হয় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা৷ ১৯৪৬ সালে জিন্নাহ’র নেতৃত্বে মুসলীম লীগ মুসলমানদের জন্য পৃথক অঞ্চলের দাবিতে দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়৷ এই ঘটনায় সাম্প্রদায়িক চাপ বাড়লে কলকাতায় ব্যাপক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়৷ ৪০০০-এরও বেশি লোক প্রাণ হারান ও লক্ষাধিক হন গৃহহীন৷ আস্তে আস্তে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের জন্য তৈরি হতে থাকে ভারত৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

কংগ্রেস ও দেশভাগ

দাঙ্গার দগদগে ঘা নিয়েই ১৯৪৭ সালে অর্জিত হয় স্বাধীনতা৷ তবে অখণ্ড ভারত থাকেনি৷ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যায় দেশ, জন্ম নেয় স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান৷ স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন গান্ধীবাদী জওহরলাল নেহরু৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

আততায়ীর গুলিতে নিহত হলেন গান্ধী

স্বাধীনতার পরপরই ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি চরমপন্থি হিন্দু মহাসভার সদস্য, নাথুরাম গডসের হাতে নিহত হন মহাত্মা গান্ধী৷ গান্ধী বেঁচে থাকাকালীন পাকিস্তান নিজেকে ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা করলে হিন্দু মহাসভার মতো কিছু গোষ্ঠী ভারতকে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ঘোষণার উদ্যোগ নেয়৷ গান্ধীর মৃত্যুকে উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরে নেহরু বিভিন্ন চরমপন্থি হিন্দু গোষ্ঠীদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

নেহরুর নেতৃত্বে ভারতবর্ষ

জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে কংগ্রেস ১৯৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ী হয়৷ ১৯৬৪ পর্যন্ত দল ও দেশের নেতৃত্ব দেন নেহেরু৷ তৃতীয় বিশ্বের প্রথম নেতা হিসেবে পরিচিত নেহরু ‘জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলন’ ও ‘সবুজ বিপ্লব’-এর মতো ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়ে দেশের ভেতরে ও বহির্বিশ্বে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

ইন্দিরার হাত ধরে পরিবারতন্ত্রের শুরু

নেহরু-কন্যা ইন্দিরা ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৪ অবধি তাঁর বাবার সহকারী হিসেবে কাজ করেন৷ ১৯৬৪ সালে নেহরুর মৃত্যুর পর দলের হাল ধরেন ইন্দিরা৷ তবে ১৯৫৯ সালেই কংগ্রেসের সভানেত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি৷ নেহরুর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী হন লালবাহাদুর শাস্ত্রী৷ ১৯৬৬ সালে তাঁরও মৃত্যু হলে ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন ইন্দিরা গান্ধী৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

জরুরি অবস্থায় কংগ্রেস

১৯৭৫ সালের ভোটে কারচুপির অভিযোগে সারা দেশে দেখা দেয় রাজনৈতিক অস্থিরতা, ওঠে ইন্দিরা-বিরোধী আওয়াজ৷ পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯৭৭ সালে দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন ইন্দিরা৷ জরুরি অবস্থার শেষে পুনর্নিবাচনে কংগ্রেস হেরে যায়৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

নতুন প্রতীক, নতুন আঙ্গিকের কংগ্রেস

১৯৫১ সাল পর্যন্ত দলের প্রতীক ছিল চরকা৷ ১৯৫২-৭১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত কংগ্রেসের প্রতীক ছিল হাল ও বাছুর৷ ১৯৭৭ সালে পরাজয়ের পর ইন্দিরার নতুন দল কংগ্রেস (আই)-এর প্রতীক হয় হাত৷ পরে তা হয় একত্রিত কংগ্রেসের প্রতীক৷ বর্তমানে কংগ্রেসের প্রতীক ভারতের জাতীয় পতাকার সামনে ডান হাত৷ ১৯৮০ সালে ইন্দিরার নেতৃত্বে আবার ক্ষমতায় আসে কংগ্রেস৷ পুত্র সঞ্জয়ের মৃত্যুর পর ইন্দিরা রাজনীতিতে নিয়ে আসেন দ্বিতীয় পুত্র রাজীবকে৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

ইন্দিরার প্রয়াণ, রাজীবের আগমন

১৯৮৪ সালে শিখ চরমপন্থিদের ঠেকাতে ইন্দিরা শুরু করেন ‘অপারেশন ব্লু-স্টার’৷ স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন, যা শিখ ধর্মাবলম্বীদের একাংশকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে৷ সে বছরের অক্টোবর মাসের শেষে দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ইন্দিরা৷ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক রাজীব গান্ধী ভারতের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

রাজীব গান্ধীর অকালমৃত্যু

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন রাজীব৷ ১৯৮৭ সালে তিনি শ্রীলঙ্কায় শান্তিরক্ষা বাহিনী পাঠিয়ে চরমপন্থি তামিল গোষ্ঠী লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলম (এলটিটিই)-এর রোষের মুখে পড়েন৷ ১৯৯১ সালে নির্বাচনের প্রচার করার সময় এলটিটিই কর্মীদের আত্মঘাতী বোমায় মারা যান রাজীব৷ ফলে আবার নেতৃত্বের সংকটে পড়ে কংগ্রেস৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

পরিবারতন্ত্রে সাময়িক ছেদ

রাজীবের মৃত্যুর পর কংগ্রেস সভাপতি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন পিভি নরসিংহ রাও৷ পাশাপাশি চলতে থাকে রাজীব গান্ধীর ইটালীয় বংশোদ্ভূত স্ত্রী সোনিয়াকে রাজনীতিতে আনার প্রস্তুতি৷ বিজেপির নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালে ক্ষমতায় আসে এনডিএ জোট সরকার৷ ২০০৪ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকে তারা৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

ক্ষমতায় আসা যাওয়া

২০০৪ সালে সোনিয়ার নেতৃত্বে ক্ষমতায় ফেরে কংগ্রেস৷ তবে প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি সোনিয়া৷ সেই দায়িত্ব পান মনমোহন সিং৷ কিন্তু ২০০৪ থেকে ২০১৪ অবধি ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের ইউপিএ জোট সরকারের সাথে জুড়তে থাকে ‘টু-জি মামলা’ বা কয়লা কেলেঙ্কারির মতো দুর্নীতির অভিযোগ৷ ২০১৪ সালে মাত্র ৪৪টি আসন জিতে ধরাশায়ী হয় কংগ্রেস৷ ২০১৭ সালের শেষে সোনিয়া রাজনীতি থেকে অবসর নিলে দলের নেতৃত্ব নেন রাজীব-সোনিয়ার পুত্র রাহুল৷

কংগ্রেসের একাল-সেকাল

দলের নেতৃত্বে রাহুল গান্ধী

২০১৩ সালে উপ-সভাপতি হওয়ার মাধ্যমে কংগ্রেসের নেতৃত্বে আগমনের পথ ধরেছিলেন রাহুল৷ ২০১৪’র নির্বাচনে রাহুলের নেতৃত্বে কংগ্রেস ভরাডুবি হয়৷ এর জন্য তাঁর নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবকেই দায়ী করেন অনেকে৷ তবে ২০১৯ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বেই আবার ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছে কংগ্রেস৷

আমাদের অনুসরণ করুন