ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা আক্রান্ত: বেপরোয়া উগ্রপন্থিরা

৬০ ঘণ্টার ব্যবধানে আরো পাঁচজনকে হত্যা করা হয়েছে৷ তাঁদের অন্তত চারজন যে উগ্রবাদীদের হাতে নিহত হয়েছেন, তা নিশ্চিত৷ কলাবাগানে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে এলজিবিটি ম্যাগাজিন রূপবানের সম্পদক জুলহাস মান্নানসহ দু'জনকে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

জুলহাসসহ দু'জনকে সোমবার বিকেলে হত্যা করা হয়৷ এর আগে সকালেই গাজিপুরের কাশিমপুর কারাগারের সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান কারারক্ষী রুস্তম আলীকে ফটকের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়৷ তারপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামন কামাল ঢাকায় সাংবাদিকদের এ সব হত্যাকাণ্ডকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা' বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘‘‘নিরাপত্তাহীনতা' বোধ করার কোনো কারণ নেই৷''

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কথার কয়েক ঘণ্টার মাথায় কলাবাগনে নিজ বাসায় খুন হন জুলহাস মান্নান এবং তার বন্ধু মাহবুব তনয়৷ জুলহাস এলজিবিটি ম্যাগাজিন রূপবানের সম্পদক ছাড়াও বাংলাদেশে ইউএসএইড-এর কর্মকর্তা ও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাবেক প্রটোকল অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন৷ তাঁদের হত্যা করে পালিয়ে যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তরা ‘আল্লাহু আকবর' ধ্বনি দেয়৷

নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যাকাণ্ড

গত ৮ এপ্রিল ঢাকায় খুন হন সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের সক্রিয় সদস্য নাজিমুদ্দিন সামাদ৷ গতবছর ব্লগারদের যেভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে ঠিক সেভাবেই সামাদকে কুপিয়ে হত্যা করে ফেলে রেখে যাওয়া হয়৷ উগ্র ইসলামপন্থি গোষ্ঠী ‘আনসার আল ইসলাম’৷

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খুন

গত ২৩ এপ্রিল রাজশাহীতে খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী৷ বাড়ি থেকে মাত্র কয়েকগজ দূরে বাসস্টান্ডে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে মোটর সাইকেলে পালিয়ে যায় দুই দুর্বৃত্ত৷ তথাকথিত ‘ইসলামিক স্টেট’ বা আইএস এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে৷

রূপবানের সম্পাদক খুন

বাংলাদেশে সমকামীদের একমাত্র পত্রিকা রূপবানের সম্পাদক জুলহাস মান্নানকে হত্যা করা হয় তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যে প্রবেশ করে৷ কমপক্ষে ছয় দুর্বৃত্ত কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী পরিচয় দিয়ে তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করে৷ আর তারপর হত্যাকাণ্ড ঘটায়৷

সমকামী অ্যাক্টিভিস্ট মাহবুব তনয় খুন

সমকামী অ্যাক্টিভিস্ট এবং মঞ্চকর্মী মাহবুব তনয় ছিলেন মান্নানের বন্ধু৷ তাঁকেও ঐ একইসময়ে হত্যা করা হয়৷ জঙ্গি গোষ্ঠী ‘আনসার আল-ইসলাম’ দু’টি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জানিয়েছে, বাংলাদেশে সমকামিতার প্রসারে ভূমিকা রাখায় তাঁদের খুন করা হয়েছে৷

জুলহাস বাংলাদেশ লিঙ্গ সমতা নিয়ে কাজ করতেন৷ তার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র এলজিবিটি ম্যাগাজিন রূপবানের সম্পাদনা করতেন তিনি৷ ২০১৪ সাল থেকে তিনি বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখে লিঙ্গ সমতার প্রতীক হিসেবে ‘রেইনবো ব়্যালি'-র আয়োজন করে আসছিলেন৷ পরপর দু'বছর এই ব়্যালি করতে পারলেও এ বছর পহেলা বৈশাখে ব়্যালি করতে দেয়নি পুলিশ৷ ব়্যালি বের করার চেষ্টা করলে চারজনকে আটক করা হয়৷ এই ঘটনার পর থেকেই জুলহাস অনেকটা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন বলে জানা যায়৷

গত শনিবার সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিমকে হত্যা করা হয় রাজশাহীর শালবন এলকায় তাঁর বাসার সামনে৷ জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএস তাঁকে হত্যার দায় স্বীকার করে৷ অধ্যাপক রেজাউল সংস্কৃতি এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতেন৷ ছোট কাগজ বের করতেন৷

সোমবারের তিন-তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ রবিবার, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় একইভাবে পরমানন্দ রায় নামে এক হিন্দু সাধুকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়৷

কাশিমপুর কারাগারের সাবেক কারারক্ষীকেও সাম্প্রতিক বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের মতো মোটরসাইকেল আরোহীরাই হত্যা করে৷ পুলিশ বলছে, এখনো হত্যাকাণ্ডের পিছনে কোনো জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি৷

এর আগে এ মাসের শুরুতেই ঢাকার সূত্রাপুর এলাকায় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিম উদ্দীন সামাদেকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়৷ সেই হত্যারও দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিরা৷

বাংলাদেশে এখন সেক্যুলারিস্ট বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা হামলা ও হত্যার শিকার হচ্ছেন৷ তাঁদের কখনো ‘নাস্তিক', কখনো ‘ইসলাম বিরোধী' আবার কখনো ‘ধর্মের অবমাননাকারী' আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে৷ পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট যে, যাঁরা উগ্রপন্থিদের হামলার শিকার হচ্ছেন তাঁরা মুক্তচিন্তা, ভিন্নধর্মের, ভিন্ন ধর্মীয় চিন্তা, বিদেশি বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী৷ হামলা ও হত্যার সংখ্যা ও পরিধি বাড়ছে৷ কিন্তু একটি মাত্র ব্যতিক্রম ব্লগার রজীব হায়দার হত্যা ছাড়া আর কোনো ঘটনায় অপরাধীকে গ্রেপ্তার বা বিচারের আওতায় আনার নজির নেই৷

একের পর এক হত্যা

বাংলাদেশে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক হুমায়ূন আজাদকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করার মধ্য দিয়ে প্রথম জঙ্গিদের মুক্তচিন্তার মানুষের ওপর আক্রমণ শুরু হয়৷

এরপর ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউনুসকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়৷

২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী এবং ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ঢাকার পল্লবিতে৷

২০১৪ সালের ১ আগস্ট সাভারে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার আশরাফুল আলমকে৷

১৫ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শফিউল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়৷

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মুক্তমনা লেখক ও ব্লগার অভিজিত্‍ রায়কে৷ হামলায় গুরুতর আহত হন তাঁর স্ত্রী বন্যা আহমেদ৷

৩০ এপ্রিল ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় খুন হন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবু৷

১২ মে সিলেটে খুন হন আরেক মুক্তমনা ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ৷ তিনিও গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন৷

৭ আগস্ট ঢাকার বাসায় ঢুকে হত্যা করা হয় গণজাগরণ মঞ্চের আরেক কর্মী নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়কে৷

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্লগার খুন

একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খুন হন ব্লগার এবং লেখক অভিজিৎ রায়৷ কমপক্ষে দুই দুর্বৃত্ত তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে৷ এসময় তাঁর স্ত্রী বন্যা আহমেদও গুরুতর আহত হন৷ বাংলাদেশি মার্কিন এই দুই নাগরিককে হত্যার দায় স্বীকার করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি গোষ্ঠী ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’৷ পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে৷

বাড়ির সামনে খুন

ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে হত্যা করা হয় ঢাকায়, গত ৩০ মার্চ৷ তিন দুর্বৃত্ত মাংস কাটার চাপাতি দিতে তাঁকে কোপায়৷ সেসেময় কয়েকজন হিজরে সন্দেহভাজন দুই খুনিকে ধরে ফেলে, তৃতীয়জন পালিয়ে যায়৷ আটকরা জানায়, তারা মাদ্রাসার ছাত্র ছিল এবং বাবুকে হত্যার নির্দেশ পেয়েছিল৷ কে বা কারা এই হত্যার নির্দেশ দিয়েছে জানা যায়নি৷ বাবু ফেসবুকে ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের বিরুদ্ধে লিখতেন৷

সিলেটে আক্রান্ত মুক্তমনা ব্লগার

শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরে ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে৷ গত ১২ মে সিলেটে নিজের বাসার কাছে খুন হন নাস্তিক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস৷ ভারত উপমহাদেশের আল-কায়েদা, যাদের সঙ্গে ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’-এর সম্পর্ক আছে ধারণা করা হয়, এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে৷ দাস ডয়চে ভেলের দ্য বব্স জয়ী মুক্তমনা ব্লগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন৷

বাড়ির মধ্যে জবাই

ব্লগার নিলয় চট্টোপাধ্যায়কে, যিনি নিলয় নীল নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন, হত্যা করা হয় ঢাকায় তাঁর বাড়ির মধ্যে৷ একদল যুবক বাড়ি ভাড়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ৮ আগস্ট তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করে এবং তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে৷ নিজের উপর হামলা হতে পারে, এমন আশঙ্কায় পুলিশের সহায়তা চেয়েছিলেন নিলয়৷ কিন্তু পুলিশ তাঁকে সহায়তা করেনি৷ ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে, তবে তার সত্যতা যাচাই করা যায়নি৷

জগিংয়ের সময় গুলিতে খুন বিদেশি

গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে জগিং করার সময় ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় খুন হন ইটালীয় এনজিও কর্মী সিজার তাবেলা৷ তাঁকে পেছন থেকে পরপর তিনবার গুলি করে দুর্বৃত্তরা৷ জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএস এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে বলে দাবি করেছে জিহাদিদের অনলাইন কর্মকাণ্ডের দিকে নজর রাখা একটি সংস্থা৷ তবে বাংলাদেশে সরকার এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে ‘এক বড় ভাইয়ের’ তাঁকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা৷

রংপুরে নিহত এক জাপানি

গত ৩ অক্টোবর রংপুরে খুন হন জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও৷ মুখোশধারী খুনিরা তাঁকে গুলি করার পর মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়৷ ইসলামিক স্টেট এই হত্যাকাণ্ডেরও দায় স্বীকার করেছে, তবে সরকার তা অস্বীকার করেছে৷ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বাস করেন না যে তাঁর দেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীটির উপস্থিতি রয়েছে৷

হোসনি দালানে বিস্ফোরণ, নিহত ১

গত ২৪ অক্টোবর ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হোসনি দালানে শিয়া মুসলমানদের আশুরার প্রস্তুতির সময় বিস্ফোরণে এক কিশোর নিহত এবং শতাধিক ব্যক্তি আহত হন৷ বাংলাদেশে এর আগে কখনো শিয়াদের উপর এরকম হামলায় হয়নি৷ এই হামলারও দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট, তবে সরকার সে দাবি নাকোচ করে দিয়ে হামলাকারীরা সম্ভবত নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি গোষ্ঠী জেএমবি-র সদস্য৷ সন্দেহভাজনদের একজন ইতোমধ্যে ক্রসফায়ারে মারা গেছে৷

ঢাকায় প্রকাশক খুন

গত ৩১ অক্টোবর ঢাকায় দু’টি স্থানে কাছাকাছি সময়ে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়৷ এতে খুন হন এক ‘সেক্যুলার’ প্রকাশক এবং গুরুতর আহত হন আরেক প্রকাশক ও দুই ব্লগার৷ নিহত প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের সঙ্গে ঢাকায় খুন হওয়া ব্লগার অভিজিৎ রায়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল৷ জঙ্গি গোষ্ঠী ‘আনসার-আল-ইসলাম’ হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে৷

প্রার্থনারত শিয়াদের গুলি, নিহত ১

গত ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশের বগুড়ায় অবস্থিত একটি শিয়া মসজিদের ভেতরে ঢুকে প্রার্থনারতদের উপর গুলি চালায় কমপক্ষে পাঁচ দুর্বৃত্ত৷ এতে মসজিদের মুয়াজ্জিন নিহত হন এবং অপর তিন ব্যক্তি আহত হন৷ তথকথিত ইসলামিক স্টেট-এর সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা দাবি করা স্থানীয় একটি গোষ্ঠী হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে৷

২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার কূটনৈতিক পাড়া গুলশানে তাভেল্লা সিজার নামের এক ইটালীয় নাগরিককে গুলি করে হত্যা করা হয়৷

৩ অক্টোবর রংপুরে গুলি করে হত্যা করা হয় জাপানি নাগরিক হোশি কুনিওকে৷

৫ অক্টোবর ঈশ্বরদীর ব্যাপ্টিস্ট মিশনের ‘ফেইথ বাইবেল চার্চ অব গড'-এর ফাদার লুক সরকারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়৷

৩১ অক্টোবর ঢাকায় অভিজিত্‍ রায়ের বইয়ের প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলসহ তিনজনকে লালমাটিয়ায় কুপিয়ে জখম করে জঙ্গিরা৷ একই দিনে অভিজিতের আরেক প্রকাশক জাগৃতি প্রকাশনীর ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়৷

১৮ নভেম্বর দিনাজপুরে পিয়েরো পারোলারি নামে এক ইটালীয় পাদ্রিকে হত্যার চেষ্টা হয়৷

২৬ নভেম্বর বগুড়ার শিবগঞ্জের হরিপুরে শিয়া মসজিদে ঢুকে গুলি চালানো হলে মুয়াজ্জিন নিহত হন, আহত হন আরও চারজন৷

২৫ ডিসেম্বর রাজশাহীর বাগমারায় আহমদিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় একজন নিহত হন৷

এরপর ২০১৬ সালের ৮ এপ্রিল রাতে ঢাকার সূত্রাপুরে কুপিয়ে হত্যা করা হয় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজিমুদ্দিন সামাদকে৷

২৩ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়৷

একইভাবে আক্রমণ, তারপর হত্যা

অডিও শুনুন 02:30
এখন লাইভ
02:30 মিনিট
বিষয় | 26.04.2016

সুলতানা কামাল

প্রায় প্রতিটি ঘটনায় জঙ্গিরা দায় স্বীকার করেছে৷ এছাড়া ব্যক্তি আক্রমণের ক্ষেত্রে একই স্টাইলে মোটর সাইকেল আরোহীরা কুপিয়েছে বা গুলি করেছে৷ অন্যান্য আক্রমণের ক্ষেত্রে বোমা বা গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়৷ হত্যার স্টাইল খুবই নৃশংস৷ পুলিশ প্রধানত জেএমবি বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামের দু'টি জঙ্গি সংগঠনকে এ সব হামলা এবং হত্যার জন্য দায়ী করছে৷ তবে তাদের গ্রেপ্তার বা আইনের আওতায় আনার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই৷

বাংলাদেশের মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশে সেক্যুলার, ভিন্নমতের মানুষ বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা আজ আক্রান্ত৷ যারা আক্রমণ এবং হত্যা করছে, তারা মনে করছে তাদের চিন্তার সঙ্গে যাদের মিল নেই তাদেরই হত্যা করতে হবে৷ এবং তারা তা অব্যাহতভাবে করে যাচ্ছে৷ এটা সম্ভব হচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে৷ এই অপরাধীরা ধরা পড়ছে না, তাদের বিচারও হচ্ছে না৷''

তিনি বলেন, ‘‘উগ্রপন্থিরা যে কোনো অজুহাত তৈরি করছে হত্যার জন্য, কারণ, তাদের চিন্তার সঙ্গে যারা একমত নয় তাদেরকে তারা ধ্বংস করে দিতে চায়৷ একটি উগ্রগোষ্ঠী তাদের উগ্রপন্থা প্রতিষ্ঠিত করতে চায়৷ সরকার যদি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখায়, তাহলে এই দেশে ভিন্নমত, ভিন্ন চিন্তা ধর্মনিরপেক্ষতা – যা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, তা বজায় রাখা কঠিন হবে৷''

বাংলাদেশে কেন বিচারহীনতার সংস্কৃতিবিরাজ করছে? জানান আপনার মতামত, নীচের ঘরে৷

‘‘জাতিগত ও ধর্মীয় সহিংসতাকে ‘না’ বলুন’’

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিগত ও ধর্মীয় সহিংসতার কারণে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ৷ তাই এই বার্তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ৷ আরেকটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘‘ধর্মীয় সন্ত্রাসকে আপনার মুখ বন্ধ করতে দেবেন না৷’’

‘‘আল্লাহ’র নামে কোনো হত্যাকাণ্ড নয়’’

এই বার্তাটাও পরিষ্কার৷ ডয়চে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ধর্মীয় মৌলবাদীদের হামলার শিকার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী (টুটুল) বলেছিলেন, ‘‘আল্লাহু আকবর’’ বলে তাঁকে কোপানো হয়েছিল৷ বার্লিনে মানববন্ধনে আরেকটি প্ল্যাকার্ডে আল্লাহ’র জায়গায় সৃষ্টিকর্তার কথা উল্লেখ করা হয়৷

‘‘ধর্মভিত্তিক সহিংসতা বন্ধ কর’’

ধর্মভিত্তিক সহিংসতা বন্ধের দাবি জানান মানববন্ধনে অংশ নেয়া এক প্রবাসী বাঙালি৷ ধর্মভিত্তিক রাজনীতিরও বিপক্ষে অবস্থান তাঁর৷

‘‘ধর্মীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরব হোন’’

ধর্মের নামে যারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালাচ্ছেন তাদের বিরুদ্দে সরব হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এই প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে৷ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালাচ্ছে৷

বাংলা প্ল্যাকার্ড

বাংলা ভাষায় লেখা প্ল্যাকার্ডও প্রদর্শন করা হয়েছে মানববন্ধনে৷

‘‘নাস্তিকতার জন্য মৃত্যু নয়’’

নাস্তিকতা কারো মৃত্যু বা কারাভোগের কারণ হতে পারে না, এমন প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছেন একাধিক ব্যক্তি৷ মানবন্ধনে অংশ নেয়াদের সবাই নাস্তিক নন, তবে তাঁরা বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী৷

‘‘শব্দ হত্যা করে না, মানুষ করে’’

গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় খুন হওয়া ব্লগার, লেখক অভিজিৎ রায়ের ছবির সঙ্গে এই বাক্যটি লেখা প্ল্যাকার্ডও ছিল বার্লিনের ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে৷ চলতি বছর বাংলাদেশে খুন হয়েছেন চারজন ব্লগার এবং একজন প্রকাশক৷

জুলহাসসহ দু'জনকে সোমবার বিকেলে হত্যা করা হয়৷ এর আগে সকালেই গাজিপুরের কাশিমপুর কারাগারের সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান কারারক্ষী রুস্তম আলীকে ফটকের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়৷ তারপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামন কামাল ঢাকায় সাংবাদিকদের এ সব হত্যাকাণ্ডকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা' বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘‘‘নিরাপত্তাহীনতা' বোধ করার কোনো কারণ নেই৷''