নতুন প্রেসিডেন্টের অপেক্ষায় আফগানিস্তান

তালেবানি হামলার হুমকি এবং জালিয়াতির আশঙ্কার মধ্যেই শনিবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটে অংশ নিচ্ছেন আফগানিস্তানের জনগণ, যার মধ্য দিয়ে তাঁরা হামিদ কারজাইয়ের উত্তরসূরি হিসাবে নতুন একজন নেতাকে বেছে নেবেন৷

সব ঠিক থাকলে এই ভোটের মধ্য দিয়েই আফগানিস্তানে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে৷ দেশের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব নেবেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ এবং সাবেক বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তা আশরাফ গনি আহমাদজাইয়ের মধ্যে যে কোনো একজন৷

তবে এমন একটি সময়ে নতুন এই প্রেসিডেন্টকে নেতৃত্বের আসনে বসতে হবে, যখন তালেবান জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ১৩ বছরের যুদ্ধের ইতি টেনে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বিদেশি সৈন্যরা দেশে ফিরছে৷

গত ৫ই এপ্রিল প্রথম দফার ভোটে ফলাফলের নিষ্পত্তি না হলেও ওই নির্বাচনকে ‘সফল' বিবেচনা করা হচ্ছে দুটি কারণে৷ প্রথমত রেকর্ড ৫৮ শতাংশ ভোটার এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন৷ দ্বিতীয়ত বড় ধরনের জঙ্গি হামলার আশঙ্কা থাকলেও তেমন কিছু সেদিন ঘটেনি৷ অবশ্য শনিবারও একই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হবে আফগানিস্তানকে৷ দ্বিতীয় দফা বা ‘রান অফ' ভোটের চূড়ান্ত ফল পাওয়া যাবে আগামী ২২শে জুলাই৷

প্রথম দফায় ভোট দিয়েছেন রেকর্ড ৫৮ শতাংশ ভোটার

তালেবান জঙ্গিরা ইতোমধ্যে হুমকি দিয়েছে, কেন্দ্রে কেন্দ্রে তারা অবিরাম হামলা চালাবে৷ তাদের ভাষায়, এ নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আফগানদের মাথার ওপর নিজেদের একটি পুতুল বসিয়ে দিতে চাইছে৷

সমাজ সংস্কৃতি | 08.07.2014

অন্যদিকে আফগানিস্তানের সেনাবাহিনীর জেনারেল আফজাল আমান ভোটারদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘‘প্রথম পর্বের ভোটের দিন যারা নাশকতার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে, তারা আবারো চেষ্টা করবে৷ তবে আমরা আপনাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, তারা আবারো পরাজিত হবে৷''

এদিকে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের উত্তেজনার মধ্যে ভোট জালিয়াতির আশঙ্কাও চোখ রাঙাচ্ছে৷ কাবুলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জেমস কানিংহ্যাম এক বার্তায় বলেন, ‘‘আমরা দুই প্রার্থীর প্রতি আহ্বান জানাব, তাঁরা যেন কর্মী-সমর্থকদের ভোট জালিয়াতি থেকে দূরে রাখেন৷''

বহুজাতিক বাহিনী আফগানিস্তানের তালেবান জঙ্গিদের হটিয়ে দেয়ার পর ২০০১ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন হামিদ কারজাই৷ দুই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় আফগানিস্তানের নিয়ম অনুযায়ী এবার আর তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

খেলনা!

কাবুলে যু্দ্ধাহতদের জন্য তৈরি একটা নকল হাত নিয়ে খেলছে দুই কিশোরী৷ এমন কিছু ছবিই তেহরানের মাজিদ সাঈদিকে এনে দিয়েছে বেশ কিছু পুরস্কার৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

ছবিই বলে হাজার কথা

১৬ বছর বয়স থেকে ছবি তুলছেন মাজিদ৷ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে মানবিক বিপর্যয়ের দিকেই তাঁর সমস্ত মনযোগ৷ জার্মানির ডেয়ার স্পিগেল, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমসের মতো ম্যাগাজিন এবং আন্তর্জাতিক পত্রিকায় ছাপা হয় তাঁর তোলা ছবি৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

আফগানিস্তানের শিশুরা

ডিডাব্লিউকে সরবরাহ করা মাজিদের ছবির অনেকগুলোতেই ফুটে উঠেছে আফগান শিশুদের জীবনে যুদ্ধের প্রভাব৷ এ ছবিটি যুদ্ধের কারণে হাত হারানো এক আফগান শিশুর৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

মাদকের অভিশাপ

আফগানিস্তানের খুব বড় এক সমস্যা মাদক৷ বলা হয়ে থাকে বিশ্বের শতকরা ৯০ ভাগ মাদকদ্রব্যই নাকি উৎপন্ন হয় আফগানিস্তানে৷ বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আফিম হয় দেশটিতে৷ দেশের অনেক নাগরিক আফিমসেবী৷ জাতিসংঘের দেয়া তথ্য অনুযায়ী আফগানিস্তানের অন্তত তিন লক্ষ শিশু নিয়মিত আফিম সেবন করে৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

রোল কল

কাবুলের এক অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ শুরুর আগে ক্যাডেটদের রোল কল চলছে৷ জার্মান সেনাবাহিনী ‘বুন্ডেসভেয়ার’ আফগান নিরাপত্তাকর্মীদের অনেক আগে থেকেই প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছিল৷ প্রশিক্ষণের লক্ষ্য, আফগান সেনাবাহিনী এবং পুলিশকে দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় আত্মনির্ভরশীল করে তোলা৷ ২০১৪ সালের শেষেই অবশ্য আফগানিস্তান থেকে নিজেদের সেনা সদস্যদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে জার্মানি৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

ভয়ংকর শৈশব

স্কুলে লেখাপড়া করতে যাওয়ার সুযোগ শিশুদের কমই মেলে৷ স্কুলে গেলে নগণ্য কারণেও হতে হয় শিক্ষকের কঠোর শাসনের শিকার৷ তা সহ্য করেও পুরো সময় থাকা হয়না, পরিবারের জন্য টাকা রোজগার করতে আগেভাগেই স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়তে হয় তাদের৷ আফগানিস্তানে শিক্ষার হার খুবই কম৷ ২০১১ সালে জার্মান সরকারের উদ্যোগে একটি তথ্যবিবরণী প্রকাশ করা হয়েছিল৷ তখন আফগানিস্তানের শতকরা ৭২ ভাগ পুরুষ আর ৯৩ ভাগ নারীই ছিল নিরক্ষর৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

বোরখা এবং পুতুল

আফগান নারীরা পুতুল বানাতে শেখার ক্লাসে৷ মালয়েশিয়ার একটি বেসরকারি সংস্থার অর্থায়নে এখানে পুতুল বানাতে শেখানো হয় তাঁদের৷ আফগান নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্যই এ উদ্যোগ৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

তালেবানের প্রতিশোধ

২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করার পরই আফগানিস্তানে হামলা চালায় তালেবান৷ প্রতিশোধমূলক সে হামলায় প্রাণ যায় চারজনের, আহত হয়েছিলেন ৩৬ জন৷ ছবিতে দু’জন আহতকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

খেলাধুলা

হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে একটু বিশ্রাম৷ আফগানিস্তানে শরীর চর্চা খুব জনপ্রিয়৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

যুদ্ধের আবাদ

গত ৩০টি বছর ভীষণ প্রভাব ফেলেছে আফগানদের জীবনে৷ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যায় যুদ্ধের প্রভাব৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

মাদ্রাসা

কান্দাহারের মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত শিশুরা৷

আফগানিস্তানে জীবন ও যুদ্ধ

হত্যার প্রশিক্ষণ

কুকুরের লড়াইও আফগানিস্তানে খুব জনপ্রিয়৷ কুকুরদের এমনভাবে লড়াই করতে শেখানো হয় যাতে তারা প্রতিপক্ষকে একেবারে মেরে ফেলে৷ কুকুরের জীবনেও যুদ্ধের প্রভাব!

এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন মোট আটজন৷ কিন্তু কোনো প্রার্থীই ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায় এগিয়ে থাকা দুই প্রার্থীর মধ্যে আবার এই ভোটাভুটির আয়োজন৷

প্রথম দফায় মোট ভোটের ৪৪.৯ শতাংশ পাওয়া আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ মনস্তাত্ত্বিকভাবে অনেকটা এগিয়ে আছেন, যিনি উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন গোত্র ও তাজিকদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়৷ তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আশরাফ গনি প্রথম পর্বে পেয়েছেন মোট ভোটের ৩১.৫ শতাংশ, যার একটি বড় অংশ এসেছে পশতু ভোটারদের কাছ থেকে৷

আব্দুল্লাহ ২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন৷ কিন্তু প্রথম পর্বের ভোট শেষে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে তিনি দ্বিতীয় দফার নির্বাচন বর্জন করলে আবারো সরকারের দায়িত্ব নেন হামিদ কারজাই৷

আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ

১৯৬০ সালে জন্ম নেয়া আবদুল্লাহকে আফগানিস্তানের মানুষ চেনে ডাক্তার আবদুল্লাহ নামে৷ পেশায় চিকিৎসক হলেও সোভিয়েতবিরোধী প্রতিরোধযুদ্ধে তিনি অস্ত্র তুলে নেন এবং ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে আফগান গৃহযুদ্ধের দিনগুলোতে বুরহানউদ্দিন রাব্বানির ঐক্যমত্যের সরকারের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করেন৷ সে সময়ই অনর্গল ইংরেজি বলার দক্ষতা এবং মার্জিত ব্যবহারের জন্য পশ্চিমা বিশ্বের নজর কাড়েন তিনি৷

১৯৯৬-২০০১ সময়ে তালেবানবিরোধী প্রতিরোধযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন আবদুল্লাহ৷ সে সময় তাঁকে বলা হতো তাজিক কমান্ডার আহমেদ শাহ মাসুদের ডান হাত৷

প্রথম পর্বের ভোটে এগিয়ে আছেন আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ

তালেবান শাসনের অবসানের পর হামিদ কারজাই সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান আবদুল্লাহ৷ তবে ২০০৫ সালে তিনি পদত্যাগ করেন এবং ২০০৯ সালের নির্বাচনে কারজাইয়ের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে আবির্ভূত হন৷

পশতু বাবা এবং তাজিক মায়ের সন্তান আবদুল্লাহকে প্রেসিডেন্ট হতে হলে দুই গোত্রেরই সমর্থন পেতে হবে৷ প্রথম পর্বের ভোটে ফার্সিভাষী তাজিক অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলে আব্দুল্লাহ পেয়েছিলেন ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোট৷ কিন্তু পশতু অধ্যুষিত দক্ষিণ ও পূর্বে তিন শতাংশের মতো ভোট পান তিনি৷ চূড়ান্ত সাফল্য পেতে হলে তাঁকে পশতুভাষী ভোটারদেরও মন জয় করতে হবে৷

আশরাফ গনি

অর্থনীতিবিদ থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া আশরাফের জন্ম ১৯৪৯ সালে৷ লেখাপড়ার জন্য ১৯৭৭ সালে দেশ ছাড়ার পর দীর্ঘদিন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, চাকরি করেছেন বিশ্বব্যাংকে৷ ২৪ বছর বিদেশে কাটিয়ে দেশ পুনর্গঠনের স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফেরার পর তিনি যোগ দেন রাজনীতিতে৷

তালেবান শাসনের অবসানের পর আফগানিস্তানের প্রথম অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন আশরাফ৷ ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি হামিদ কারজাই সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন৷

আশরাফ গনির ভোটব্যাংক পশতুভাষীরা

ওই সময়ে নতুন মুদ্রা চালু করে, কর ব্যবস্থার সংস্কার করে এবং দাতাদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন৷ কিন্তু বদমেজাজ, ঔদ্ধত্য এবং কাউকে কাছে ঘেঁষতে না দেয়ার মনোভাবের কারণে যথেষ্ট বদনামও তাঁকে কুড়াতে হয়েছে৷

২০০৯ সালের নির্বাচনে আশরাফও অংশ নিয়েছিলেন৷ কিন্তু সেবার তিনি ভোট পান মাত্র ৩ শতাংশ৷ তবে এবার সাবেক মিলিশিয়া কমান্ডার আবদুল রশিদ দস্তুমকে ‘রানিং মেট' বানিয়ে প্রথম দফার নির্বাচনে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী হিসাবে৷ প্রথম পর্বে তাঁর পাওয়া ভোটের উল্লেখযোগ্য অংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ পশতু ভোটারদের কাছ থেকে এসেছে৷ হামিদ কারজাইয়ের মতো আশরাফও একজন পশতুভাষী৷

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকা আবদুল রশিদ দস্তুমের সঙ্গে জুটি বাঁধায় তরুণ ভোটারদের অনেকের ভোট হারিয়েছে আশরাফ৷ বিশ্লেষকদের মতে, তিনি জয়ী হতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্কের হয়ত উন্নতি ঘটবে৷ কিন্তু নিজের মেজাজ বদলাতে না পারলে দেশ চালানো তার জন্য কঠিনই হবে৷

জেকে/ডিজি (এএফপি, এপি, উইকিপিডিয়া)

আরো প্রতিবেদন...

আমাদের অনুসরণ করুন