নাটক - আমার প্রতিবাদের ভাষা, অন্তরের আকুতি

কে যেন জন্ম নেওয়ার পরক্ষণেই আমার কান্নার বহর দেখে বলেছিলেন, ‘‘এমন ‘এক্সপ্রেশন'! এ মেয়ে বড় হয়ে নির্ঘাত থিয়েটার করবে বা নৃত্যশিল্পী হবে৷’’

বড় নাট্যশিল্পী, অভিনেত্রী অথবা নৃত্যশিল্পী হয়ে ওঠা না হলেও নাটক, নাট্য, নটী - এই শব্দগুলোর মূলে যে ‘নট' শব্দটি রয়েছে, অর্থাৎ নড়াচড়া, অঙ্গচালনা, কথাবার্তা - সেটা নৃত্য বিষারদ পরীক্ষা দেওয়ার সময় নিজের হাতেই লিখেছিলাম৷ পড়েছিলাম, নাটকের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘ড্রামা' কথাটি এসেছে গ্রিক ‘ড্রাসিন' শব্দটি থেকে, যার মানে কোনো কিছু করা৷

মঞ্চে উঠে কোনো একটা কিছু করার ইচ্ছে আমার ছোটবেলা থেকেই ছিল৷ মা বলতেন, ‘‘হবে না? রক্তের ধাত যে…!'' বাবা বাংলাদেশে থাকতে মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন৷ জগন্নাথ হলে থাকার সময় আবৃত্তি আর আভিনয়ে সকলে বাবাকে এক নামে চিনতো৷ তাই বন্ধু-বান্ধবহীন ভারতে আসার পর জীবন-জীবিকার তাগিদে আইনজীবীর কালো কোট পরতে হলেও বাবার মন পড়ে থাকতো মঞ্চে৷ তা সে কলকাতা হাইকোর্টের বার কাউন্সিলে হোক অথবা পাড়ার মণ্ডপে, দেশভাগের দুঃখ ভুলতে বাবা মঞ্চনাটককেই বেছে নিয়েছিলেন৷

খুব ঘটা করে পাড়ার ছেলে-বুড়োদের নিয়ে মাসের পর মাস রিহার্সাল দিতেন৷ মঞ্চস্থ হতো ‘ভাড়াটে চাই', ‘বর্ধমানের বর, বরিশালের কনে', ‘বাবুদের ডালকুকুরে' আরো কত কী! কিন্তু আমাকে কিছুতেই নিজের দলে নিতেন না বাবা৷ মায়ের কথায় নাচ করতে দিলেও মঞ্চে অভিনয় করার অধিকার ছিল না আমার৷ সেখানে যে ছেলে-মেয়ে একসাথে অভিনয় করে…৷ তাই রবীন্দ্রসদন, শিরিষ মঞ্চ, গোর্কি সদন, মধুসূদন মঞ্চ - যেখানে যত নাচের অনুষ্ঠানই করি না কেন, নাটক করার কথা বললেই শুনতে হতো বিশাল একটা ‘না'৷ আমি প্রতিবাদ করতাম, কিন্তু কোনো ফল হতো না৷

ডয়চে ভেলেতে একটি নাটকে অভিনয় করছেন দেবারতি গুহ

তবে ঘরভর্তি আলমারিগুলোতে আইনের বইয়ের পাশেই ছিল নাটকের বইয়ের তাক আর সেই বইয়ের তাক ঘেটেই জেনেছিলাম রুশ যুবক গেরেসিম স্তিফানোভিচ লেবেডফের কথা৷ ১৭৯৫ সালে তিনিই তো বাংলা ভাষায় নাটকের সূচনা করেছিলেন৷ জন্ম দিয়েছিলেন ‘বেঙ্গলি থিয়েটার'-এর৷

শেল্ফে ছিল শেক্সপিয়ার সমগ্রও৷ মাত্র ১১ বছর বয়সে ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস' পড়ে আমি যখন লম্বা গাউন আর মাথায় ফিতে বেঁধে সারা ঘরময় হেঁটে বেড়াতাম, তখন সেই বাবাই আমায় ডাকতেন ‘পোর্শিয়া' বলে৷ এরপরও অবশ্য মেয়েকে মঞ্চনাটকে অভিনয় করার অনুমতি তিনি বহু বছর পর্যন্ত দেননি৷

এর আরো ক'বছর পর বাংলা ভাষার ইতিহাস পড়ার সময় চর্যাপদ, কবিগান, যাত্রা-পালা, আখড়াইয়ের কথা জানলাম৷ মাইকেল মধুসূদন দত্তের পাশ্চাত্য নাট্যরীতিতে লেখা ‘শর্মিষ্ঠা' নাটকটি পড়ে শোনালেন দুর্গা স্যার৷ একে একে শুনলাম ‘একেই কি বলে সভ্যতা', ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ', দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ, ‘সধবার একাদশী', মীর মশাররফ হোসেনের ‘বসন্ত কুমারী', গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘সিরাজউদ্দৌলা', দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘সাজাহান'-এর কথা৷

বাবার বইয়ের তাকে শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, শিশির কুমার ভাদুড়ি, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, মনোজ মিত্রের নাটকও ছিল৷ পড়তে শুরু করলাম৷ ওদিকে নাচ শেখার ফলে রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যগুলির সঙ্গে পরিচয় আমার আগেই হয়েছিল৷ ছোটবেলা থেকে ‘রক্তকরবী', ‘চিত্রাঙ্গদা', ‘শ্যামা', ‘চন্ডালিকা' করতে করতে তার গল্প, ভাব, এমনকি গানগুলোও আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু ক্লাস ইলেভেনে এসে যে নাটকটা আমাকে সবচেয়ে নাড়া দিলো সেটা ছিল বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন'৷ আজও সে কথা ভাবলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাংলার মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষ, শরীরে যেন ছুঁয়ে যায় কটকটে রোদ, আর শুনতে পাই সেই ডাক ‘ফ্যান দাও মা, ফ্যান দাও…'৷

সমাজ সংস্কৃতি | 07.10.2012

মঞ্চনাটকের উৎপত্তি সুদূর গ্রিস দেশে হলেও একটা সময় বুঝতে শিখেছিলাম যে, নাটক ততদিনে আমারও মজ্জায় ঢুকে গেছে৷ বুঝেছিলাম এ এক প্রতিবাদের ভাষা৷ সমাজের ভাঙা-গড়া, উত্থান-পতন, শাসক দলের রক্তচক্ষু - সবকিছুর সাক্ষী এই থিয়েটার৷ তাই ঠিক করলাম নাটক আমায় করতেই হবে৷

একদিন সুযোগও এসে গেল৷ প্রথমে পাড়ায় ছোটদের একটা নাটকে ৮০ বছরের এক বৃদ্ধার ‘রোল' করে মনে আছে বাবাকেও চমকে দিয়েছিলাম৷ তখন আমার বয়স ১৫-১৬ হবে৷ অথচ কণ্ঠ শুনে নাকি কেউ বুঝতেই পারেনি যে ওটা আমি!

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

রক্তকরবী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ নাটক ঢাকার মঞ্চে এনেছিল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়। নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন আতাউর রহমান। নাটকটি এখনো জনপ্রিয়, নিয়মিত মঞ্চস্থ হচ্ছে ঢাকার মঞ্চে।

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

নূরলদীনের সারাজীবন

সৈয়দ শামসুল হক রচিত নাটকটি সর্বপ্রথম মঞ্চে আসে ১৯৮২ সালে৷ আলী যাকেরের নির্দেশনায় নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ করে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়। ইতিহাসের কৃষক বিদ্রোহের নেতা নূরলদীনের জীবন চেতনা নিয়ে নির্মিত এ নাটকের কাহিনী।

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

বিচ্ছু

ফরাসি নাট্যকার মলিয়রের এই নাটক ১৯৯১ সালে মঞ্চে আনে নাট্যকেন্দ্র৷ নাটকটির নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন তারিক আনাম খান। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নিয়মিত মঞ্চস্থ হয়েছে নাটকটি। পরে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু প্রদর্শনী হয়েছে।

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

কঞ্জুস

লোক নাট্যদলের দর্শকনন্দিত নাটক ‘কঞ্জুস’। ফরাসি নাট্যকার মলিয়ের ‘দ্য মাইজার’-এর অনুবাদ করে নাট্যরূপ দিয়েছেন তারিক আনাম খান৷ নাটকের নির্দেশনায় ছিলেন লিয়াকত আলী লাকী৷ গত ৩০ বছর ধরে নাটকটি নিয়মিতভাবে মঞ্চস্থ হয়ে আসছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ৭০০তম প্রদর্শনী হয়েছে এই নাটকের৷

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

যৈবতী কন্যার মন

নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের ‘যৈবতী কন্যার মন’ নাটকটি মঞ্চে এনেছিল ঢাকা থিয়েটার। এর নির্দেশনা দিয়েছিলেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। ২০০২ সাল পর্যন্ত নাটকটির নিয়মিত মঞ্চায়ন হয় ঢাকায়।

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

বিনোদিনী

ঢাকার ‘মঞ্চকমল’ হিসেবে পরিচিত শিমুল ইউসুফের অনবদ্য অভিনয়ে বাংলাদেশে দর্শকপ্রিয় হয়ে ওঠে নাটক ‘বিনোদিনী’৷ ঢাকা থিয়েটারের ৩১তম প্রযোজনা এটি৷ ‘বিনোদিনী দাসী’র আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমার কথা’ ও ‘আমার অভিনয় জীবন’-এর আলোকে এ নাটকের নাট্যরূপ দিয়েছেন সাইমন জাকারিয়া। নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু।

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

দেওয়ান গাজীর কিসসা

নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের এ নাটক সর্বপ্রথম মঞ্চে আসে ১৯৭৭ সালে। বের্টল্ড ব্রেশটের মূল নাটকটির রূপান্তর ও নির্দেশনায় ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। নাটকের কেন্দ্রীয় দুই চরিত্র দেওয়ান গাজী ও মাখন চরিত্রে অভিনয় করেন আলী যাকের ও আবুল হায়াত৷

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

বেহুলার ভাসান

বেহুলা লখিন্দর উপাখ্যান অবলম্বনে নাটক-চলচ্চিত্র হয়েছে ঢের৷ তবে ‘বেহুলার ভাসান’ নামে এর নাট্যরূপ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ জামিল আহমেদ৷ তাঁর নির্দেশনায় ২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমণ্ডলে নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন হয়।

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

ম্যাকবেথ

উইলিয়াম শেকসপিয়ারের এই ট্রাজেডি মঞ্চে এনেছে পদাতিক নাট্য সংসদসহ একাধিক নাট্যদল৷ বহুল আলোচিত এই নাটকও মঞ্চায়ন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ৷ বিভাগের অধ্যাপক ড. ইস্রাফিল শাহিনের নির্দেশনায় ২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমণ্ডলে তাদের প্রথম মঞ্চায়ন হয়৷ শিক্ষার্থীদের পরিবেশনারই ছবি এটি৷

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

কথা ৭১

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে লেখা ‘কথা ৭১’ নাটকটি মঞ্চে এনেছিল ঢাকা পদাতিক৷ কুমার প্রীতিশ বলের লেখা এই নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন দেবাশীষ ঘোষ।

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

সময়ের প্রয়োজনে

শহীদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হানের ছোট গল্প অবলম্বনে ‘সময়ের প্রয়োজনে’ নাটকটির নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন মোহাম্মদ বারী। নাটকটি প্রথম মঞ্চে আসে ২০০৫ সালে। এ নাটকটিও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক।

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

ত্রিংশ শতাব্দী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আনবিক বোমা বিস্ফোরণের বিষাদময় ঘটনা নিয়ে আবর্তিত নাটক ‘ত্রিংশ শতাব্দী’৷ নাটকটির রূপান্তর ও নির্দেশনা দিয়েছেন জাহিদ রিপন।

ঢাকার জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক

জলদাস

এ নাটকটি মঞ্চে এনেছে ঢাকা পদাতিক। দেশের মৎস্যজীবীদের কঠিন জীবনসংগ্রামের গল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে নাটকের কাহিনি। নাটকটি রচনা করেছেন হারুন অর রশীদ এবং নির্দেশনা দিয়েছেন নাদের চৌধুরী।

এরপর নাচের স্কুলে ‘বহুরূপী' নাট্যদল থেকে কারা যেন এলো৷ তরুণী এক বিধবার চরিত্র৷ মায়ের জোরাজুরিতেই হয়ত এবার আর বাবা না করলেন না৷ সেই থেকে শুরু৷ পরবর্তীতে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মঞ্চনাটকের পাশাপাশি পথ-নাটকের ভূত চেপেছিল ঘাড়ে৷ শুধু মঞ্চের ওপর থেকে নয়, রাস্তায় নেমে মানুষের মধ্যে একেবারে মিশে যেতে চেয়েছিলাম৷ তাছাড়া তখন বামপন্থি রাজনীতিও করি৷ তাই দুইয়ের মিলও হচ্ছিল খুব৷ তার ওপর সুযোগ হলেই চলে যেতাম ‘ইন্ডিয়া হ্যাবিটেট সেন্টার' বা ‘ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা'য় নাটক দেখতে৷

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হতে না হতেই পাড়ি দিতে হলো জার্মানিতে৷ তবে এ দেশে এসেও আমার প্রথম চাকরি ছিল উষা গাঙ্গুলির বিখ্যাত ‘রঙ্গকর্মী' দলের দেখাশোনা করা৷ স্টুটগার্ট শহরে ‘থেয়াটার ডেয়ার ভেল্ট' ফেস্টিভ্যালে নাটক করতে এসেছিলেন ওরা৷ মাত্র এক মাসের কাজ, সামান্য পারিশ্রমিক, তারপরও রাজি হয়ে যাই নাট্য জগতে থাকতে পারবো বলে৷ কাজটার ব্যবস্থা করে দেয় সোফিয়া স্টেপ্ফ, আমার বান্ধবী, ‘ফ্লিন ওয়ার্কস'-এর পরিচালক৷

আমি বরাবরই সোফিয়ার পরিচালিত নাটকের বিশাল ভক্ত৷ ওদের সমস্ত নাটক দেখতাম আর অবাক হতাম৷ ওদের নাটককে বলা হয় ‘অল্টারনেটিভ থিয়েটার'৷ সেখানে মঞ্চের ভিন্ন ব্যবহার, দর্শকদের সঙ্গে ভাব-বিনিময় - এসব কীভাবে করে বুঝতে পারতাম না৷ তাই জার্মানিতে প্রথম ক'টা বছর বিভিন্ন ঘরানার থিয়েটার, অপেরা দেখা ছাড়া আর বিশেষ কিছু করা হয়ে ওঠেনি৷

কয়েক বছর পরে অবশ্য ডয়চে ভেলেরই এক সহকর্মীর উৎসাহে সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে পর পর তিনটে নাটক মঞ্চস্থ করলাম, হাত লাগালাম মঞ্চসজ্জাতেও৷ সুপ্রিয় বন্দোপাধ্যায় পরিচালিত এই নাটকগুলোর মধ্যে ‘দেবদাসী' নাটকটি আমাদের ছোট্ট এই বন শহরে বেশ প্রসংশিতও হলো৷

দেবারতি গুহ, ডয়চে ভেলে

এরই মধ্যে সোফিয়া একদিন বললো,‘‘আমাদের পরবর্তী নাটক বাংলাদেশের পোশাককর্মীদের নিয়ে৷ তোর সাহায্য চাই৷'' এক কথায় ‘রিসার্চ' করতে বাংলাদেশে যেতে রাজি হয়ে গেলাম৷ ঢাকায় ডিডাব্লিউ-র প্রতিনিধি হারুন উর রশিদ স্বপনের সাহায্যে দু-দু'টি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে দুই বিদেশিনীসহ কাজ করলাম প্রায় তিন দিন৷ কথা বললাম প্রায় ৩০-৩২ জন পোশাক শ্রমিকের সঙ্গে, বাংলাদেশের নাট্য প্রতিনিধি, পোশাক সংগঠন, শ্রমিক নেতা, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে৷

ফিরে এসে বার্লিনে বসে আমরা রেকর্ড করে আনা সে সমস্ত ইন্টারভিউগুলো শুনছি, সোফিয়াকে বলছি আমাদের অভিজ্ঞতার কথা…৷ হঠাৎ সে বলে বসলো, ‘‘সোনাটা, এ কথাগুলোই দাঁড়িয়ে বলো তো৷ আমি ১-২-৩ গুনছি৷''

তখনও জানতাম না, এমনকি আজও বুঝতে পারি না, কীভাবে ঐ কথা বলতে বলতেই একদিন জার্মানির মতো দেশে বিদেশি ভাষায় আমিও অভিনয় করতে শুরু করলাম, নাটকের মধ্যে ঢুকে গেলাম৷ পাশ্চাত্যের সঙ্গে প্রাচ্যের মেলবন্ধন করে নতুনভাবে গাইতে শিখলাম রবীন্দ্র-নজরুলের গান৷ শিখলাম ‘প্রোসেনিয়াম' নয়, সমান্তরাল স্টেজে অথবা দর্শকে ঘিরে অভিনয় করতে, শুধু ‘স্প্রিপ্ট' মুখস্থ করা নয়, মঞ্চে দর্শকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে, তাত্ত্বিক বিবাদ করতে৷ জার্মানি তো বটেই ইউরোপের বিভিন্ন শহরেও মঞ্চস্থ হলো ‘সংগস অফ দ্য টি-শার্ট'৷ তার পরের বছর ‘ইন্টারন্যাশনাল সারোগেসি' নিয়ে করলাম ‘গ্লোবাল বেলি'৷ এ নাটকের জন্য গবেষণা করতে আমাদের যেতে হলো ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও সুইজারল্যান্ডে৷ কথা বললাম ৭২ জন সারোগেট মা, অসংখ্য ডাক্তার, এজেন্টদের সঙ্গে৷

ইউরোপের মতো জার্মান থিয়েটারেরও রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য৷ প্রতিটি রাজ্যে রয়েছে সরকারি থিয়েটার, রয়েছে নানা রকমের পৃষ্ঠপোষকতা৷ এমনকি এ ধরনের ‘অল্টারনেটিভ থিয়েটার'-এর জন্যও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে থাকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা৷ তা না হলে শুধুমাত্র থিয়েটার করে কি আর আনা, লেয়া, মাটিয়াস, কনরাডিন বা সোফিয়ারা বাঁচতে পারতো? চালিয়ে যেতে পারতো অন্যায়, অনৈতিকতার বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ?

আজ ‘ফ্লিন ওয়ার্কস'-এ আমার পরিচয় দেবারতি গুহ নয়, ‘সোনাটা'৷ হ্যাঁ, ডাকনামটা আজ আমার শৈল্পিক নামে পরিণত হয়েছে৷ প্রতিবছর প্রায় ছয় সপ্তাহ আমি কাটাই নাটক করে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘উইদাউট পে লিভ' নিয়ে এবং নিজস্ব ছুটি বিসর্জন দিয়ে৷ পাল্লা দেই পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে, রোজ আট ঘণ্টা করে প্রশিক্ষণ করি, গলা সাধি…সবই করি নাটককে ভালোবেসে৷ বাহ্ রে, এতদিনে নাটক যে আমার কাছে শুধু প্রতিবাদের ভাষা নয়, অন্তরের আকুতিতেও পরিণত হয়েছে৷

এমন অভিজ্ঞতা আর অনুভূতি কি আপনারও হয়েছে নাটক নিয়ে? লিখুন নীচের ঘরে৷ 

আমাদের অনুসরণ করুন