নাৎসি আমলের ঘণ্টার কারণে গির্জার বিরুদ্ধে মামলা

জার্মানির টুরিংগেন শহরে নাৎসি বাহিনীর চিহ্ন সম্বলিত ঘণ্টা ব্যবহার করায় কয়েকটি গির্জার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে৷ মোট ২৩টি গির্জায় আইন অমান্য করে নাৎসি আমলের বিশেষ ধরনের ঘণ্টা ব্যবহারের খবর পাওয়া গেছে৷

মামলার বাদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার নাৎসি বাহিনীর হামলায় আক্রান্ত এক ব্যক্তির আত্মীয়৷ তিনি বলেন,টুরিংগেন শহরের পাঁচটি গির্জা নাৎসি আমলের ঘণ্টা ব্যবহারকরছে৷ গির্জা কর্তৃপক্ষকে এ ধরনের ঘণ্টা ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্ক করা হলেও তাঁরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি৷

শহরটির পাবলিক প্রসিকিউটর হানেস গ্রুনসেইসেন বলেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নাৎসি আমলের ঘণ্টা ব্যবহার করার কারণে গির্জাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন ক্ষুদ্ধ এক ব্যক্তি৷ এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপের চিন্তা করছে কর্তৃপক্ষ৷

এদিকে অভিযুক্ত গির্জার কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এক চিঠিতে গির্জাগুলোকে ওই ঘণ্টা ব্যবহার করতে বলেছিল৷ এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য তাঁরা আগামী এপ্রিল মাসে একটি সভাও আহ্বান করেছে৷

গির্জার মুখপাত্র ফ্রিডমান কাল বলেন, ঘণ্টাগুলো কেউ দেখতে পায় না, কেননা, এগুলো যেখানে রাখা আছে, সেখানে সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে পারে না৷ তিনি বলেন, ঘণ্টাগুলো যে কোনো সময়ই সরিয়ে নেয়া যেতে পারে৷ তবে সরিয়ে নেয়ার বিষয়টি অবশ্যই দেশের ইতিহাস সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

দেশের জন্য নিবেদন

অনেক জার্মান সিন্টিই দেশের জন্য অস্ত্র হাতে লড়েছেন৷ শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেই নয়, ১৯৩৯ সাল থেকেই তারা এ দেশের সশ্বস্ত্র বাহিনীতে ভূমিকা রেখেছেন৷ ১৯৪১ সালে জার্মান হাইকমান্ড ‘জাতিগত ও রাজনৈতিক’ কারণ দেখিয়ে সব ‘জিপসি ও তাদের ঔরসদের’ সক্রিয় সামরিক বাহিনী থেকে বের করে দেয়৷ আলফনস ল্যামপের্ট ও তার স্ত্রী এলসাকে বন্দি শিবির আউশভিৎসে পাঠানো হয় এবং পরে সেখানে তাদের হত্যা করা হয়৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

তালিকা তৈরি

সিন্টি ও রোমাদের আস্থা অর্জনের জন্য রোমানি ভাষা শিখেছিলেন এভা জাস্টিন নামের একজন নার্স ও নৃতাত্ত্বিক৷ কথিত সায়েন্টিফিক রেসিজম স্পেশালিস্ট হিসেবে তিনি এই দুই জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সম্পর্কে ধারণা পেতে জার্মানিজুড়ে ঘোরেন এবং জিপসি ও জিপসি বাবা বা মায়ের সন্তানদের তালিকা তৈরি করেন৷ সেই তালিকা ধরেই গণহত্যা চালিয়েছিল নাৎসিরা৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

বন্দিত্ব

তিরিশের দশকে বিভিন্ন জায়গা থেকে সিন্টি ও রোমাদের জোর করে ধরে এনে শহরের বাইরের শিবিরগুলোতে রাখা হয়৷ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা এ সব শিবিরের বাইরে পাহারা বসানো হতো কেউ যাতে বেরিয়ে যেতে না পারে৷ তেমনই একটি বন্দি শিবির জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেভেনসবুর্গ৷ শিবিরের বাসিন্দাদের গৃহপালিত সব পশু মেরে ফেলা হয়েছিল৷ দাসের মতো করে তাদের দিয়ে কাজ করানো হত৷ অনেককে জোর করে বন্ধ্যা করে দেওয়া হয়েছিল৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

প্রকাশ্য দিবালোকে দেশান্তর

১৯৪০ সালের মে মাসে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জার্মানির এরপার্জ শহরের রাস্তা ধরে বহু সিন্টি ও রোমা পরিবারকে নিয়ে যাওয়া হতa ট্রেন স্টেশনে এবং সেখান থেকে তাদের সরাসরি নাৎসি অধিকৃত পোল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হত৷ ‘‘ঝামেলা ছাড়াই সুশৃঙ্খলভাবে তাদের পাঠানো সম্পন্ন হয়েছে,’’ বলা হয় একটি পুলিশ প্রতিবেদনে৷ এভাবে দেশান্তরিতদের অধিকাংশেরই মৃত্যু হয় তাদের কাজের জায়গা ও ইহুদি ঘাঁটিগুলোতে৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

স্কুল থেকে আউশভিৎসে

১৯৩০ দশকের শেষের দিকে কার্লসরুয়ে শহরের একটি ক্লাসরুমের ছবিতে দেখা যায় কার্ল ক্লিংকে৷ ১৯৪৩ সালের বসন্তে স্কুল থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয়৷ এরপর তাকে পাঠানো হয় আউশভিৎস-বিরকেনাউয়ের ‘জিপসি ক্যাম্পে’৷ সেখানেই গণহত্যার বলি হয় শিশুটি৷ সেখান থেকে যারা প্রাণ নিয়ে ফিরতে পেরেছিলেন তাদের ভাষ্য মতে, সেখানে পাঠানোর আগেই তাদের আলাদা করে ফেলা হয়, রাখা হয় চাপের মধ্যে, কখনও কখনও ক্লাসেও অংশ নিতে দেওয়া হতো না৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

ভয়ানক মিথ্যা দিয়ে অভ্যর্থনা

১৯৪৩ সালে পরিবারের সঙ্গে পশুবাহী গাড়িতে করে আউশভিৎসে পৌঁছানোর সময় নয় বছরের হুগো হ্যোলেনরাইনার মনে মনে বলছিল, আমি কাজ করতে পারি৷ সেখানে গিয়ে ফটকের উপরে ‘কাজ তোমাকে মুক্তি দেবে’ লেখা দেখেই এই ভাবনা এসেছিল শিশুটির মনে৷ সে তার বাবার কাজে সহযোগিতা করতে চেয়েছিল৷ ওই মৃত্যুকূপে যাদের নেওয়া হয় তাদের প্রতি ১০ জনে একজন ফিরে আসতে পেরেছিল, তাদেরই একজন হ্যোলেনরাইনার৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

‘মৃত্যুদূত’ থেকে নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা

আউশভিৎসে নিয়োজিত ছিলেন কুখ্যাত এসএস ড. জোসেফ মেঙ্গেলে৷ তিনি ও তার সহকর্মীরা অসংখ্য বন্দিকে নির্যাতন করেন৷ তারা শিশুদের বিকলাঙ্গ করতেন, তাদের শরীরে ঢুকিয়ে দিতেন জীবাণু, যমজদের নিয়ে বর্বরোচিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন৷ বন্দিদের চোখ ও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা করে বার্লিনে পাঠাতেন৷ ১৯৪৪ সালের জুন মাসে ১২ বছরের একটি শিশুর মাথা পাঠিয়েছিলেন তিনি৷ বিশ্বযুদ্ধের পর আর বিচারের মুখোমুখি হননি তিনি৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

বিলম্বে মুক্তি

১৯৪৫ সালের ২৭ জানুয়ারি যখন আউসভিৎসে রাশিয়ার লালফৌজ এলো তখন বন্দিদের মধ্যে শিশুরাও ছিল৷ কিন্তু সিন্টি ও রোমাদের জন্য মুক্তি এসেছিল দেরিতে৷ ১৯৪৪ সালের ২-৩ আগস্ট রাতে আউসভিৎশের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ‘জিপসি ক্যাম্পের’ জীবিতদের গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন৷ পরদিন সকালে কাঁদতে কাঁদতে ব্যারাকের বাইরে আসা দু’টি শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

জাতিগত বিদ্বেষের ক্ষত

কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলো মুক্ত হওয়ার পর জার্মান কর্তৃপক্ষ সেখানকার জীবিতদের জাতিগত নিপীড়নের শিকার ও বন্দিত্ববরণের সনদ দেয়৷ পরে অনেকে বলতে শুরু করে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্যই তাদের সাজা ভোগ করতে হয়৷ ক্ষতিপূরণ চেয়েও প্রত্যাখ্যাত হয় তারা৷ আউশভিৎসে শিশু তিন মেয়েকে হারিয়েছিলেন হিল্ডগার্ড রাইনহার্ডট৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন

সিন্টি ও রোমা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা আশির দশকের শুরুর দিকে ডাকাউ কনেসনট্রেশন ক্যাম্পের ফটকে অনশন করেন৷ জাতিগত বিদ্বেষের প্রতিবাদ এবং নাৎসি নিপীড়নের স্বীকৃতি দাবি করেন তারা৷ ১৯৮২ সালে তৎকালীন জার্মান চ্যান্সেলর হেলমুট স্মিড্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সিন্টি ও রোমাদের নাৎসি গণহত্যার শিকার হওয়ার স্বীকৃতি দেন৷

নাৎসিদের সিন্টি ও রোমা গণহত্যা স্মরণ

বার্লিনে স্মৃতিসৌধ

সিন্টি ও রোমাদের ওপর নাৎসি গণহত্যার স্মরণে ২০১২ সালে বার্লিনের বুন্দেসটাগের কাছে একটি সৌধ নির্মাণ করা হয়৷ বিশ্বজুড়ে এই দুই সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এই স্মৃতিসৌধ৷

গির্জায় নাৎসি ঘণ্টা ব্যবহারের বিষয়ে টুরিংগেন রাজ্যের ইহুদি সম্প্রদায়ও গত জানুয়ারি মাসে অভিযোগ করেছিল৷ রাজ্যের ইহুদি সমিতির সভাপতি রাইনহার্ড স্ক্রাম স্থানীয় দৈনিক ‘টুরিংগার আলগেমাইনে'-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকার বলেন, গির্জায় নাৎসি ঘণ্টা ব্যবহারের ঘটনা ইহুদিদের জন্য বেদনাদায়ক৷               

নাৎসি আমলের ঘণ্টা ব্যবহারের ঘটনায় জার্মানিতে গির্জার বিরুদ্ধে মামলার ঘটনা এটিই প্রথম নয়৷ টুরিংগেনের মামলার বাদি জানান, পশ্চিম জার্মানির হের্ক্সহাইম আম ব্যার্গ শহরের কয়েকটি গির্জার বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করেছিলেন তিনি৷ বাদির মামলার সাথে একমত পোষণ করে শহর কর্তৃপক্ষ জানায়, গির্জায় এ ধরনের ঘণ্টা ব্যবহারের ঘটনা ‘সহিংসতা ও অন্যায়ের স্মৃতিকেই' মনে করিয়ে দেয়৷তবে দুই সপ্তাহ আগে শহরটির আঞ্চলিক আদালত এক রায়ে গির্জায় ‘নাৎসি ঘণ্টা' ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে৷

আরআর/এসিবি (ইপিডি/কেএনএ)  

আরো প্রতিবেদন...

আমাদের অনুসরণ করুন