নয় মাস মেয়াদ বাড়লো অ্যাকর্ডের

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানার পরিবেশ ও নিরাপত্তা উন্নয়ন কাজে ইউরোপের ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড আরো ২৮১ দিন অর্থাৎ নয় মাস কাজ করতে পারবে৷ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ রবিবার এই আদেশ দেয়৷

বর্ধিত এ সময়ে পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ'র সাথে যৌথভাবে কাজ করবে সংস্থাটি৷ প্রধান  বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন৷
আদেশে আরো বলা হয়, বর্ধিত এ সময়ে অ্যাকর্ডকে বিজিএমইএ'র সাথে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্বারক (এমওইউ) অনুযায়ী কাজ করে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে৷ আর অ্যাকর্ডে বিজিএমইএ'র একটি সেল গঠন করতে হবে৷ তারা যৌথভাবে কারখানা পরিদর্শন করবে৷

ব্যবসা-বাণিজ্য | 30.03.2019

২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল সাভারে রানাপ্লাজা ধসে পোশাক কারখানার ১১শ'র অধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্ম পরিবেশের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়ে৷ সে প্রক্ষিতে বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় শ্রমিদের নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশের উন্নয়নে ইউরোপীয় ক্রেতারা অ্যাকর্ড ও অ্যামেরিকার ক্রেতারা অ্যালায়েন্স নামে দু'টি আলাদা জোট গঠন করে৷ ইউরোপের ২০টি দেশের ২০০ ক্রেতার জোট হলো অ্যাকর্ড৷

২০২১ সালের ৩ মে'র  মধ্যে বাংলাদেশের  ১,৭০০টি  পোশাক কারখানার নিরাপত্তা এবং কাজের পরিবেশের উন্নয়নে কাজ করার কথা অ্যাকর্ডের৷ কিন্তু ৭৪৫ টি কারখানাকে তাদের রিমেডিয়েশন কোঅর্ডিনেশন সেলের (আরসিসি) আওতায় আনার পর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় সংস্থাটির৷ চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে অ্যাকর্ডের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে স্মার্ট জিন্স নামে চট্টগ্রামের একটি পোশাক কারখানা৷ স্মার্ট জিন্স-এর অভিযোগ ছিল, অ্যাকর্ড চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে৷ চুক্তি অনুযায়ী, যেসকল কারখানা অ্যামেরিকান ক্রেতাজোটের অ্যালায়েন্সের পরিদর্শনের আওতায় আসবে সেসকল কারখানা অ্যাকর্ড পরিদর্শন করবে না৷

এখন লাইভ
00:49 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 19.05.2019

‘আদালত নতুন কোনো শর্ত আরোপ করেননি’

এদিকে মামলা দায়েরের পর হাইকোর্ট ৬ মাসের সময় দিয়ে গত বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে অ্যাকর্ডকে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়৷ তবে এই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে অ্যাকর্ড-এর পক্ষ থেকে আপিল করা হয়৷ আপিলের জবাবে আদালত  প্রথমে এক মাস এবং পরে শুনানির তারিখ অনুযায়ী বাংলাদেশে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে বলেন৷

গত ৮ এপ্রিল এ বিষয়ে পুর্ণাঙ্গ আদেশ দেয়ার কথা ছিল আদালতের৷ কিন্তু শুনানি সম্পন্ন না হওয়ায় ১৯মে আদেশের দিন ধার্য করে আদালত৷ আর ১৯মে দেয়া এ আদেশে আদালত ইউরোপীয় ক্রেতাদের এ সংস্থাটিকে আরো ২৮১ দিন অর্থাৎ নয় মাস বাংলাদেশের পোশাক কারখানার শ্রম পরিবেশের উন্নয়নে কাজ করার অনুমতি প্রদান করেন৷

আদালতের এ আদেশের বিষয়ে বিজিএমইএ'র আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ মইনুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, রায়ে আদালত অ্যাকর্ড-এর কাজ করার ক্ষেত্রে নতুন কোনো শর্ত আরোপ করেননি৷ এ বিষয়ে মামলা চলাকালে বিজিএমইএ'র সাথে অ্যাকর্ড-এর একটি এমওইউ স্বাক্ষর হয়েছে৷ আর সেটা মেনেই অ্যাকর্ডকে কাজ করে যেতে বলেছেন আদালত৷ তবে ২৮১ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করে দায়িত্ব বিজিএমইএ'র কাছে হস্তান্তর করার আদেশ দিয়েছে আদালত, জানান তিনি৷

এদিকে অ্যাকর্ডের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর এইচ খান ডয়চে ভেলেকে বলেন যে, এ মাসেই বিজিএমইএ এবং অ্যাকর্ড দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা করে একটি সমঝোতা স্বারক তৈরি করেছে৷ ‘‘আমরা কি পদ্ধতিতে কাজ করব, আমাদের চলে যাওয়ার পর কি হবে, কার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবো এই বিষয়গুলো এমওইউতে আছে,'' বলেন তিনি৷

তিনি বলেন, ‘‘এ সময়ের মধ্যে বিজিএমইএ একটি প্যানেল গঠন করবে৷ তারাও অ্যাকর্ডের সঙ্গে কাজ করবে এবং বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করবেন যেন আমরা চলে যাওয়ার পর তারা এটা চালিয়ে নিতে পারেন৷''

অ্যাকর্ডের এ আইনজীবি আরো বলেন, তারা চলে যাওয়ার পর যেন কোন শুন্যতা তৈরি না হয় সে বিষয়টির দিকে নজর রেখেই কারখানার মালিকদের সংগঠনের সাথে বড় পরিসরে সমঝোতাটি হয়েছে৷ তবে এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত কাজ কববেন বলে জানান তিনি৷

এখন লাইভ
01:52 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 19.05.2019

‘নতুন এ সেল যৌথভাবে কাজ করবে’

তিনি জানান, ‘‘বিজিএমইএ এবং অ্যাকর্ড মিলে একটা সেল গঠন করবে যারা যৌথভাবে কাজ করবেন৷ আর অ্যাকর্ড যাওয়ার সময় এই সেলের কাছেই দায়িত্ব হস্তান্তর করবে৷''

এদিকে সুপ্রিমকোর্টের এই আদেশের পর এক বিবৃতিতে বিজিএমইএ অ্যাকর্ডের ২৮১ দিন কাজ করার ক্ষেত্রে ৪টি শর্তের কথা জানিয়েছে৷

 শর্তগুলো হলো:

১. বিজিএমইএ ইউনিটের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি ছাড়া অ্যাকর্ড এককভাবে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া বা কোনো কঠিন ব্যবস্থা নিতে পারবে না৷

২. কোনো একটি কারখানার ব্যর্থতার জন্য সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না৷

৩. নিরাপত্তা উদ্যোগের অংশ হিসেবে একাধিক পরিদর্শক সংস্থা কোনো কারখানা দ্বিতীয়বার পরিদর্শন করবে না৷

৪. বিজিএমইএ ইউনিট এবং অ্যাকর্ডের মধ্যে কোনো বিরোধের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য বিষযটি  আরসিসি-তে তোলা হবে৷

বিবৃতিতে বিজিএমইএ আরো জানায়, স্বাধীনভাবে পোশাক খাতের কমপ্ল্যায়েন্স মনিটরিং-এর জন্য তারা আরএমজি সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি) প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে৷ পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, পোশাক ক্রেতা ও এ শিল্পে নিয়োজিত কর্মীদের প্রতিনিধিরা মিলে এটি পরিচালনা করবেন৷ এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টেকনিক্যাল সাব-কমিটিও গঠন করা হবে বলে জানায় বিজিএমইএ৷ বুয়েট থেকে বিশেষজ্ঞকেও এ কাউন্সিলে যুক্ত করা হবে৷ এ বিষয়ক কাজের অগ্রগতির আরসিসি-কে নিয়মিতভাবে অবহিত করা হবে৷ সগঠনটি আরো জানায়, অ্যাকর্ডের ঢাকা অফিসে যত দ্রুত সম্ভব ‘বিজিএমইএ ইউনিট' নামের একটি অপারেটিং ইউনিট প্রতিষ্ঠা করবে তারা৷

পোশাক শিল্পে শ্রমশোষণ: ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশ

বৈশ্বিক শিল্প

প্রতিটি পোশাকে মিশে থাকে শ্রমিকের শ্রম-রক্ত-ঘাম৷ ১৯৭০-এর দশক থেকে ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো এশিয়া আর ল্যাটিন অ্যামেরিকার কিছু দেশ থেকে পোশাক কিনতে শুরু করে৷ খুব কম মজুরিতে শ্রমিক পাওয়া যায় বলে দাম পড়ে কম, লাভ হয় বেশি৷ এমন সুযোগ ছাড়ে তারা! কম টাকায় পণ্য কিনবেন, ছবির মতো পোশক তৈরি হবে মিষ্টির দোকানে – তারপর আবার শ্রমিকের অধিকাররক্ষা, পরিবেশ দূষণ রোধ করবেন – তাও কি হয়!

পোশাক শিল্পে শ্রমশোষণ: ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশ

সবার জন্য পোশাক

বড় আঙ্গিকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পোশাক তৈরি প্রথম শুরু হয়েছিল ব্রিটেনে, অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই শিল্পবিপ্লবের সময়টাতে৷ এখন বিশ্বাস করতে অনেকের হয়ত কষ্ট হবে, তবে ইতিহাস বলছে, শিল্পবিপ্লবের ওই প্রহরে ব্রিটেনের লন্ডন আর ম্যানচেস্টারও শ্রমিকদের জন্য ছিল আজকের ঢাকার মতো৷ শতাধিক কারখানা ছিল দুটি শহরে৷ শিশুশ্রম, অনির্ধারিত কর্মঘণ্টার সুবিধাভোগ, অল্প মজুরি, কারখানার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ – সবই ছিল সেখানে৷

পোশাক শিল্পে শ্রমশোষণ: ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশ

সেই যুক্তরাষ্ট্র এখন কর্তৃত্বে

যুক্তরাষ্ট্রেও পোশাকশ্রমিকরা স্বর্গসুখে ছিলেন না সব সময়৷ সেখানেও এক সময় কারখানায় আগুন লাগলে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের ভেতরে রেখেই সদর দরজায় তালা লাগাতো৷ ১৯১১ সালে তাই নিউ ইয়র্কের ট্রায়াঙ্গেল শার্টওয়েস্ট ফ্যাক্টরিতে পুড়ে মরেছিল ১৪৬ জন শ্রমিক৷ মৃতদের অধিকাংশই ছিলেন নারী৷ মজুরি, কর্মঘণ্টা, কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা – কোনো কিছুই এশিয়ার এখনকার কারখানাগুলোর চেয়ে ভালো ছিল না৷

পোশাক শিল্পে শ্রমশোষণ: ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশ

পোশাক শিল্পে চীন বিপ্লব

পোশাক রপ্তানিকারী দেশগুলোর মধ্যে চলছে সবচেয়ে কম খরচে পোশাক তৈরির প্রতিযোগিতা৷ রপ্তানিকারী দেশগুলোর মধ্যে চীনের অবস্থা সবচেয়ে ভালো৷ রপ্তানি সবচেয়ে বেশি, শ্রমিকদের মজুরিও খুব ভালো৷ চীনে একজন পোশাক শ্রমিক এখন মাস শেষে ৩৭০ ইউরো, অর্থাৎ, বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৭ হাজার টাকার মতো পেয়ে থাকেন৷

পোশাক শিল্পে শ্রমশোষণ: ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশ

শ্রমশোষণ কাকে বলে...

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর সুমাংগলি৷ তামিল শব্দ ‘সুমাংগলি’-র অর্থ, ‘যে নববধু সম্পদ বয়ে আনে’৷ এলাকায় পোশাক এবং সুতা তৈরির প্রশিক্ষণের নামে খাটানো হয় প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার মেয়েকে৷ দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করে তাঁরা হাতে পান ৬০ ইউরো সেন্ট, অর্থাৎ বাংলাদেশের মুদ্রায় ৬০ টাকা৷ সে হিসেবে মাস শেষে পান ১৮০০ টাকা৷ টাকাটা তাঁদের খুব দরকার৷ বিয়ের সময় বাবাকে তো যৌতুক দিতে হবে!

পোশাক শিল্পে শ্রমশোষণ: ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশ

অধিকার আদায়ের করুণ সংগ্রাম

কম্বোডিয়াতেও অবস্থা খুব খারাপ৷ ৩ লক্ষের মতো পোশাক শ্রমিক আছে সে দেশে৷ কাজের পরিবেশ আর অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কেমন? মাসিক বেতন মাত্র ৫০ ইউরো, অর্থাৎ বাংলাদেশের মুদ্রায় বড় জোর ৫ হাজার টাকা৷ মালিকের কাছে শ্রমিকদের মানুষের মর্যাদা প্রাপ্তি সৌভাগ্যের ব্যাপার৷ মজুরি বাড়ানোর দাবিতে মিছিলে নেমে শ্রমিকরা মালিকপক্ষের গুলিতে মরেছেন – এমন দৃষ্টান্তও আছে সেখানে৷

পোশাক শিল্পে শ্রমশোষণ: ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশ

ট্র্যাজেডি

গত ২৪শে এপ্রিল বাংলাদেশের রানা প্লাজা ধসে পড়ায় মারা যান ১১শ-রও বেশি তৈরি পোশাককর্মী৷ দেয়ালে ফাটল ধরার পরও সেখানে কাজ চালিয়ে যাওয়ায় এতগুলো জীবন শেষ হওয়াকে বিশ্বের কোনো দেশই ভালো চোখে দেখেনি৷ ঘটনার পর জার্মানির এইচঅ্যান্ডএম, কেআইকে এবং মেট্রোসহ বিশ্বের ৮০টির মতো পোশাক কোম্পানি শ্রমিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পোশাক রপ্তানিকারী কারখানাগুলোর সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে৷

পোশাক শিল্পে শ্রমশোষণ: ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশ

আলোয় ঢাকা আঁধার

অভিজাত বিপণিবিতান কিংবা দোকানের পরিপাটি পরিবেশে ঝলমলে আলোয় ঝিকমিক করে থরে থরে সাজানো বাহারি সব পোশাক৷ দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায়৷ ক্রেতাদের ক’জনের মনে পড়ে রানা প্লাজা কিংবা অতীতের ব্রিটেন বা যুক্তরাষ্ট্রের ভাগ্যাহতদের কথা?



আমাদের অনুসরণ করুন