পরিবেশ বাঁচাতে ঘাসের কাগজ!

‘পেপারলেস’ বা কাগজহীন জীবনযাত্রার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে৷ চারিদিকে কাগজের ব্যবহার যেন কমার বদলে বেড়েই চলেছে৷ পরিবেশের এই ক্ষতি এড়াতে জার্মানির এক উদ্ভাবক অভিনব পদ্ধতিতে ঘাস দিয়ে কাগজ সৃষ্টি করছেন৷

ইন্টারনেটে কেনাকাটা করা সহজ হলেও পরিবেশবান্ধব নয়৷ কারণ তার ফলে মোড়কের স্তূপ তৈরি হয়৷ রিসাইক্লিং করা কাগজ ব্যবহার করলেও তার মধ্যে কাঠ থাকে৷ উভে দাগনোন এর বিকল্প খুঁজে পেয়েছেন৷ তাঁর তৈরি মোড়কের উপাদান কাঠ নয় – তিনি খড় ব্যবহার করছেন! এর সুবিধা হলো, জঙ্গলে কাঠের তুলনায় মাঠে অনেক দ্রুত ঘাস জন্মায়৷ তা থেকে ফাইবার বা তন্তু বার করতে হলে অনেক কম পরিমাণ পানি, জ্বালানি ও রাসায়নিকের প্রয়োজন হয়৷ উভে বলেন, ‘‘কিছুকাল আগে আমি কাগজ নিয়ে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করে ভাবলাম, কীভাবে কম কার্বন-ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে আরও টেকসইপদ্ধতিতে কাগজ তৈরি করা যায়? লক্ষ্য করলাম, উপর দিকে বাড়ার কারণে গাছের মধ্যে অনেক আঠার প্রয়োজন হয়৷ লিগনিন নামের সেই আঠা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আলাদা করতে হয়৷ অন্যদিকে যে সব গাছপালা সমতলেই বেড়ে উঠে, তাদের অনেক কম লিগনিন লাগে৷ তাদের তন্তু অনেক দ্রুত আলাদা করা যায়৷’’

ভিডিও দেখুন 01:30
এখন লাইভ
01:30 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 22.01.2018

হাতির মল থেকে কাগজ তৈরি

তার ফলে কাগজের ক্ষেত্রে টনপ্রতি প্রায় ৬,০০০ লিটার পানির সাশ্রয় হয়৷ শুকনো ঘাস ভালোভাবে পেষা হয়৷ প্রয়োজন অনুযায়ী তার মান স্থির করা হয়৷ তারপর সাধারণ কাগজ তৈরির প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হয়৷

উভে দাগনোন নানা ধরনের মোড়ক তৈরি করেছেন৷ ডাকে পাঠানোর জন্য সহজ ও হালকা মোড়ক থেকে শুরু করে শক্ত ও মজবুত পিচবোর্ডের বাক্সও তার মধ্যে রয়েছে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা সাধারণত উপকরণের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ঘাসের তন্তু ব্যবহার করি৷ বাকিটা হয় পুরানো কাগজ অথবা কাঠের তাজা তন্তু৷ এই মুহূর্তে বড় আকারে আমরা উৎপাদন করতে পারছি৷ আমাদের ধারণা, ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাসের তন্তু ব্যবহার করা সম্ভব৷ কিন্তু সেটি প্রস্তুত করতে আরও সময় লাগবে৷’’

এরই মধ্যে বাজার করার ব্যাগ, ফল ও ডিম রাখার বাক্স তৈরি হয়ে গেছে৷ উভে বেশ কয়েকটি বড় সুপারমার্কেট কোম্পানিকে তাঁর আইডিয়া বেচতে পেরেছেন৷ ঠিক কোন ধরনের ঘাস এমন তন্তুর জন্য উপযুক্ত?

বিজ্ঞান | 19.01.2017
ভিডিও দেখুন 01:20
এখন লাইভ
01:20 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 12.06.2017

কফি খাও, কাপও খাও

কোলন শহরের কাছে একটি খামার সেই ঘাস সরবরাহ করছে৷ অরগ্যানিক খাদ্যের চাষী গেয়র্গ হ্যোলার-এর গরুগুলি যে খড় খায় না, সেগুলি পেপার মিলে পাঠানো হয়৷ গেয়র্গ বলেন, ‘‘চাষের মরসুমের শেষে যে খড় তৈরি হয়, অনেক সময়ে প্রাণীদের সেটি চিবোতে বেগ পেতে হয়৷ সেই খড় কাগজ তৈরির কাজে লাগাতে পেরে আমরা খুশি৷ ঘাসের কাগজ উৎপাদনের লক্ষ্যে এই সহযোগিতা আমাদের কাছে দারুণ ব্যাপার৷’’

প্রাণীরা না খেলেও সেই খড় যত্ন করে বাছাই করে গুদামে রেখে শুকাতে হয়৷ উভে দাগনোন নিজে খড়ের মান পরখ করছেন৷ ১২ থেকে ১৩ শতাংশ আর্দ্রতা থেকে গেলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়৷ এই ফসল পরীক্ষা পাস করেছে৷ তন্তুর মানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ ঘাস যতদিন মাঠে থাকে, তত বেশি তন্তু সৃষ্টি হয় এবং সেটি তত সহজে প্রক্রিয়াজাত করা যায়৷ তাছাড়া কাঠ সাধারণত দূর থেকে আনাতে হয়৷ অথচ ঘাস কম খরচে কাছাকাছি পাওয়া যায়৷ উভে বলেন, ‘‘বড়জোর ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে কাঁচামাল সংগ্রহ করাই আমাদের লক্ষ্য৷ সেই কাঁচামাল কাছাকাছি প্রক্রিয়াজাত করতে হবে৷ আঞ্চলিক স্তরে উৎপাদনের এই নীতির আওতায় আমরা বিকেন্দ্রীকরণ করছি৷ মাঠ থেকে কাগজ তৈরির চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে যত কম সম্ভব দূরত্ব রাখতে চাই৷’’

উভে-র সর্বশেষ উদ্ভাবন হলো ঘাসের কাগজ দিয়ে তৈরি কফির কাপ৷ সাধারণ কাগজের কাপের তুলনায় কফি পান করার পর এই পেয়ালা পুরোপুরি রিসাইকেল করা যায়৷ তার কাগজ যে মাঠে গজায়!

বরিস গাইগার/এসবি

গাছের লতা-পাতা আর আবর্জনা থেকে মুখোশ!

একটি কণ্ঠই গড়ে দিতে পারে পার্থক্য

এড ফ্র্যাংকলিন গাভুয়া একজন জাত শিল্পী৷ তাই হয়ত আবর্জনাতেও তিনি শিল্প খোঁজেন৷ অসংখ্য মুখোশ তৈরি করে তিনি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চান একটি বার্তা – ঘানার মানুষদের ময়লা আবর্জনা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে৷ শুরুতে প্রয়াসটা ছিল একার, কিন্তু এখন তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে ধীরে ধীরে মিলছে অনেক কণ্ঠ৷

গাছের লতা-পাতা আর আবর্জনা থেকে মুখোশ!

দীর্ঘস্থায়ী হোক আশা

এড ফ্র্যাংকলিন গাভুয়ার কর্মদর্শনের মূল কথাই হলো ‘আশা’৷ তাঁর আশা, গাছের শুকনো পাতা, গাছের ছাল, গাছের কষ আর নানা ধরনের ফেলে দেয়া শক্ত কাগজ বা বোর্ড দিয়ে তৈরি মুখোশগুলো ধীরে ধীরে সমাজের সবাইকে আবর্জনা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে৷

গাছের লতা-পাতা আর আবর্জনা থেকে মুখোশ!

যেভাবে তৈরি হয় অপূর্ব সুন্দর মুখোশ

গাছের পাতা, ছাল এবং কষের সঙ্গে কার্ডবোর্ডের টুকরোগুলো মিশিয়ে প্রথমে সেগুলো দিয়ে মণ্ড তৈরি করেন এড ফ্র্যাংকলিন৷ পরে সেই মণ্ড দিয়েই তৈরি করেন মুখোশ৷ শুনতে সহজ মনে হলেও কাজটা কিন্তু কঠিন৷

গাছের লতা-পাতা আর আবর্জনা থেকে মুখোশ!

আবর্জনার সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূরে

সবার ভাবনা যখন ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে রিসাইকেল করার মাঝে আটকে আছে, সেখানে এড ফ্র্যাংকলিন ভাবছেন, মানুষকেও ‘রিসাইকেল’ করার কথা৷ নানান অপরাধে যারা জেল খাটছেন, তাদের সম্পর্কে প্রায়ই ভাবেন তিনি৷ এড মনে করেন, সেই মানুষগুলোকে কারাগার থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করা দরকার৷ এবং তাঁর বিশ্বাস, এ কাজে খুব ভালো সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে মুখোশ৷

গাছের লতা-পাতা আর আবর্জনা থেকে মুখোশ!

আর একা নন

শুরুতে মুখোশ তৈরির সব উপাদান নিজেকেই সংগ্রহ করতে হতো৷ এখন ঘরে বসেই পেয়ে যান অনেক কিছু৷ অচেনা-অজানা মানুষরাও শুকনো পাতা, পুরোনো কার্ডবোর্ড বা হার্ডবোর্ড যা-ই পান, নিয়ে এসে তুলে দেন ফ্র্যাংকলিনের হাতে৷ তাঁরা জানেন, এ সব ফেলে না দিয়ে ফ্র্যাংকলিনকে দিলে সবারই উপকার৷

গাছের লতা-পাতা আর আবর্জনা থেকে মুখোশ!

স্বপ্নের আকাশ

অনেক বড় স্বপ্ন নিয়ে ‘উইকাকাই’ নামের একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করেছেন এড ফ্র্যাংকলিন গাভুয়া৷ আবর্জনা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে তোলার পাশাপাশি সব আবর্জনা রিসাইকেল করার জন্য অর্থ সংগ্রহ করাও এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য৷

গাছের লতা-পাতা আর আবর্জনা থেকে মুখোশ!

নানা মুখ, নানা মুখোশ

শুধু কোনো রকমে অবয়ব ঢেকে দেয়ার উদ্দেশ্যেই মুখোশ তৈরি করেন না এড ফ্র্যাংকলিন গাভুয়া৷ প্রত্যেকটি মুখোশের পেছনে একটি বিশেষ ভাবনা থাকে৷ শিল্পী জানালেন, ‘‘প্রতিটি মুখোশই বহুবিধ মানসিক শক্তি এবং বিশ্বকে দেখার বৈচিত্রপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অভিনব প্রকাশ৷’’

গাছের লতা-পাতা আর আবর্জনা থেকে মুখোশ!

আবর্জনা অমূল্য রতন

এড ফ্র্যাংকলিন গাভুয়া তাঁর সমস্ত কাজকর্মের মাধ্যমে আর যে কথাটা বোঝাতে চান, তা হলো – আবর্জনা হেলাফেলার জিনিস নয়৷ তাঁর মতে, আবর্জনা যত্রতত্র ফেলা ক্ষতিকর, তবে তা যথাস্থানে রাখা বা রিসাইকেল করার উদ্যোগ অতি জনকল্যাণকর, কেননা, তাতে পরিবেশ রক্ষা হয় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ে৷