পরিবেশ রক্ষায় জাতিসংঘের পুরস্কার পেল ভারতীয় এনজিও

স্বচ্ছ বিদ্যুৎ শক্তি গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে দেয়ায় ‘স্বয়ং শিক্ষণ প্রয়োগ' নামে এক ভারতীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে পুরস্কৃত করবে জাতিসংঘ৷ মোট ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে মহারাষ্ট্র ও বিহারের প্রকল্পটির পুরস্কার পাবে বেসরকারি এই সংস্থাটি৷

আগামী নভেম্বরে জলবায়ু সংক্রান্ত শীর্ষ সম্মেলনে ‘স্বয়ং শিক্ষণ প্রয়োগ'-কে পুরস্কৃত করবে জাতিসংঘ৷

গত রবিবার মহাত্মা গান্ধীর জন্মজয়ন্তীর দিনে প্যারিস জলবায়ু পরিবর্তন চুক্তিকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয় মোদী সরকার৷ এর মাধ্যমে গ্রিন হাউস নিঃসরণ ৫২ শতাংশ কম করতে ৫৫টি দেশের সঙ্গে হাত মেলায় ভারত৷ ভারতের মতো বিকাশমুখী দেশগুলিকে এ জন্য যে আর্থিক ক্ষতির সন্মুখীন হতে হবে, তা পূরণের লক্ষ্যেই আগামী মাসে মরক্কোর মারাক্কেশে উন্নত দেশগুলির কাছে ১০০ বিলিয়ন ডলার দেবার দাবি জানাবে ভারত৷

প্রশ্ন

পৃথিবী আসলে কতটা উষ্ণ হয়ে উঠেছে?

উত্তর

১৮৫০ সালে শিল্প-বিপ্লবের শুরু থেকে বিশ্বের তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে৷ তাই গবেষকদের আশঙ্কা, ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি কমানোর লক্ষ্যমাত্রা বিফল হবে৷ জলবায়ু গবেষণার ভিত্তিতে বড়জোর দেড় ডিগ্রির সীমা ধরে রাখার চেষ্টা করা উচিত বলে মনে করেন সমালোচকরা৷

প্রশ্ন

২১০০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পরিণতি কী হতে পারে?

উত্তর

পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বেশি মাত্রায় বাড়লে উপকূলবর্তী এলাকায় প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ বিপদে পড়তে পারেন৷ প্রায় ২০০ কোটি মানুষ জলের অভাবে সমস্যায় পড়বেন৷ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে৷

প্রশ্ন

গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবের উৎস কী?

উত্তর

কয়লা, পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস৷ জীবাশ্মভিত্তিক জ্বালানির সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ঘরবাড়ি গরম রাখা, পরিবহণ ব্যবস্থা চালানো এবং শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদনের ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড সৃষ্টি হয় এবং বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে৷ গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রায় ৬৫ শতাংশই কার্বন-ডাই-অক্সাইড৷ এছাড়া মিথেন, লাফিং গ্যাস ও ক্লোরোফ্লুরোকার্বন এর জন্য দায়ী৷

প্রশ্ন

আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার কারণে কোন দেশগুলি গত বছর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?

উত্তর

সার্বিয়া, আফগানিস্তান এবং বসনিয়া-হ্যারৎসোগোভিনা ২০১৫ সালে আবহাওয়া বিপর্যয়ের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ প্যারিস-ভিত্তিক পরিবেশ সংগঠন ‘জার্মানওয়াচ’ প্রকাশিত বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকির তালিকায় এই তথ্য উঠে এসেছে৷ তবে ১৯৯৫ সাল থেকে হন্ডুরাস, মিয়ানমার, হাইতি ও ফিলিপাইন্সের মতো দক্ষিণ গোলার্ধের দরিদ্র দেশগুলি বন্যা, বিধ্বংসী ঝড় ও তাপপ্রবাহের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷

প্রশ্ন

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র কেন বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়?

উত্তর

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গ্রিনহাউস গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইড সমুদ্রের পানির মধ্যে রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে৷ এই প্রক্রিয়ায় জলের ‘পিএইচ ভ্যালু’ কমে যায়৷ অ্যালজির মতো ক্ষুদ্র প্রাণী ও প্রবাল প্রাচীরের উপর তার প্রভাব পড়ে৷ জলে অম্লের মাত্রা যত বাড়ে, ক্যালশিয়াম বাইকার্বোনেট তত পাতলা হয়ে যায়৷ তখন প্রবালের মৃত্যু হয়৷ ফলে সমুদ্রের গোটা ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷

প্রশ্ন

বার্লিন থেকে প্যারিস যেতে হলে গাড়ি, বিমান অথবা ট্রেন – পরিবহণের কোন মাধ্যম পরিবেশের সবচেয়ে ক্ষতি করে?

উত্তর

এই দূরত্ব অতিক্রম করতে এয়ারবাস এথ্রিটুজিরো বিমানে যাত্রীপিছু ২৪৮ কিলোগ্রাম কার্বন-ডাই-অক্সাইড সৃষ্টি হয়৷ ফলক্সভাগেন কোম্পানির গল্ফ মডেলের নতুন গাড়িতে চড়ে গেলে নির্গমনের পরিমাণটা দাঁড়ায় ১৭৯ কিলো৷ অন্যদিকে সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব বাহন হলো ট্রেন৷ সে ক্ষেত্রে নির্গমনের পরিমাণ প্রায় ১১ কিলো৷

মারাক্কেশে আন্তর্জাতিক স্তরে ভূ-মণ্ডলের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ইস্যু এবং তার যৌক্তিকতা নিয়ে শুরু হতে চলেছে বিতর্ক৷ কিন্তু বিন্দু বিন্দু জল দিয়ে যেমন সিন্ধু হয়, সেই আপ্তবাক্য সামনে রেখে এক বড় লক্ষ্যের দিকে এক ছোট্ট পদক্ষেপের নজির রেখেছে ভারতের এক এনজিও৷ নাম ‘স্বয়ং শিক্ষণ প্রয়োগ' বা এসএসপি৷ বস্তুত নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ১৯৮৯ সালে মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ মারাঠাওয়াড়ে এলাকায় এই এনজিও গঠিত হয়৷ মূলত মহারাষ্ট্র সরকার, ইউএস-এইড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় কাজ করছে তারা৷ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে গ্রামের গরিব অশিক্ষিত মহিলাদের মধ্যে পুষ্টিকর আহার, স্বাস্থ্যরক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়৷ এটাই নারীর স্বশক্তিকরণের প্রথম ধাপ৷ এসএসপি সেই লক্ষ্য অর্জনে নিরলস৷

এই এনজিও-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রেমা গোপালন মাইক্রো-স্তরের এই প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘ভারতের বড় বড় নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের অঙ্গ হিসেবে এ সব মাইক্রো প্রকল্প এক বড় ভূমিকা পালন করতে পারে৷ গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় প্রচলিত বিদ্যুতের নিদারুণ অনটন৷ বেশিরভাগ সময়ে সেখানে বিদ্যুৎ থাকে না৷ অনেক গরিব পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ নেবার মতো আর্থিক ক্ষমতা নেই৷ সেইসব এলাকায় সৌর বিদ্যুতের মতো স্বচ্ছ বিদ্যুৎ সরবরাহের এক কার্যকর উদ্যোগ ‘স্বয়ং শিক্ষণ প্রয়োগ'৷ এবার জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেতে চলেছে তারা৷

প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে গ্রামীন সৌর বিদ্যুৎ বণ্টনের জন্য ১১০০ মহিলা উদ্যোক্তাকে নিয়ে যে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে, তা এক কথায় বেনজীর – ‘স্বয়ং শিক্ষণ প্রয়োগ'-এর প্রশংসায় এ মন্তব্য করেছে জতিসংঘের জলবায়ু সংক্রান্ত সংস্থা৷

দুই মাস আগে, পরে

জলবায়ু যে পরিবর্তন হচ্ছে তা বোঝার অন্যতম উপায় প্রবালের দিকে খেয়াল করা৷ উপরে যে ছবিটি দেখছেন তার বাম পাশেরটি ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে তোলা, আর ডানেরটি দুই মাস পর, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসের৷ এবার নীচে কোরালগুলোর দিকে তাকান৷ বামেরগুলো এক রংয়ের আর ডানেরগুলো সাদা হয়ে গেছে৷ হ্যাঁ, এটা জলবায়ু পরিবর্তিত হয়ে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে হয়েছে৷ ছবিটি অ্যামেরিকান সামোয়া এলাকার৷

সাদা হয়ে যাওয়া

এই ছবিটি হাওয়াই এলাকার৷ এখানেও সাদা হয়ে যাওয়া কোরাল দেখা যাচ্ছে৷ কোরাল তার গায়ে থাকা জলজ উদ্ভিদ, অ্যালজির কারণে বেঁচে থাকে৷ কিন্তু তাপমাত্রা বেড়ে গেলে কোরাল থেকে ঐ উদ্ভিদ ঝরে পড়ে৷ ফলে কোরালেরও আয়ু শেষ হতে থাকে৷

একেবারে স্পষ্ট

এতক্ষণ দূর থেকে সাদা অংশ দেখেছেন৷ এখন দেখুন একেবারে কাছ থেকে তোলা ও বর্ধিত করা একটি ছবি৷ এটি কোরালের একটি অংশ৷ দেখুন, গায়ে থাকা জলজ উদ্ভিদ আর না থাকায় কীরকম সাদা হয়ে গেছে কোরালটি৷

চারদিক কেমন যেন খাঁ-খাঁ করছে

মন খারাপ করা একটি ছবি৷ অ্যালজি না থাকায় মরে গেছে কোরাল৷ পড়ে আছে শুধু কঙ্কাল৷

কয়েক দশক সময় প্রয়োজন

এবার আরেকটি ছবি৷ বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি থেকে কোরাল রিফের বেঁচে উঠতে (আদৌ যদি বেঁচে ওঠে) কয়েক দশক সময় লাগতে পারে৷

প্রমাণ সংগ্রহ

বিশ্বের কোরাল রিফগুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণে ২০১২ সালে ক্যাটলিন গ্রুপের সহায়তায় ‘এক্সএল ক্যাটলিন সিভিউ সার্ভে’ নামে একটি সমীক্ষা শুরু হয়৷ এর মাধ্যমে উচ্চপ্রযুক্তির ক্যামেরা ও রোবট ব্যবহার করে কোরালের বর্তমান অবস্থা তুলে আনা হচ্ছে৷ অনেক ছবি গুগল স্ট্রিট ভিউ-তে আপলোড করা হয়েছে৷

হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে তাপমাত্রা বাড়ছে তার প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি অংশ শুষে নেয় সাগর৷ ফলে জলবায়ু যে পরিবর্তন হচ্ছে তা বোঝার একটি ভালো উপায় হচ্ছে কোরাল৷ সমুদ্রের প্রায় ২৫ শতাংশ প্রজাতির বেঁচে থাকার পেছনে রয়েছে কোরাল রিফ৷ তাই কোরাল না থাকে মানে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়া৷

প্রাণিকুলের খাবার

দেখছেন অ্যামেরিকান সামোয়ার ‘এয়ারপোর্ট রিফ’৷ স্বাস্থ্যবান এ সব কোরালের মধ্যে যে গাছপালা থাকে সেখান থেকেই খাবার সংগ্রহ করে পানির নীচে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী৷

খাবার পাবে কোথায়?

লম্বা নাকের সুন্দর এই মাছটি কোরাল থেকে খাবার সংগ্রহ করে থাকে৷ কিন্তু কোরালই যদি না থাকে তাহলে তার কী হবে?

এসএসপি-র আরেক শীর্ষ উদ্যোক্তা নীতা তানওয়াড়ে সংবাদমাধ্যমকে জানান, তাঁর গ্রামের দু'হাজার পরিবার সৌর বাতি এবং রান্নার স্টোভ কিনেছে৷ সৌর বাতির দাম ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা৷ রান্না করার সৌরস্টোভের দাম ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা৷ যেসব পরিবারের একসঙ্গে টাকা দেবার ক্ষমতা নেই, তাঁদের জন্য মাসিক কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থাো রয়েছে৷ পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে এর এক বড় সার্থকতা হলো, গ্রামীণ পরিবারগুলি রান্নাবান্নার জন্য ব্যবহার করে জ্বালানি কাঠ, যা ঘরের ভেতরে বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ৷ এটি বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগব্যাধিরও কারণ৷ আন্তর্জাতিক এনার্জি সংস্থার মতে, ভারতের জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশ রান্নার জন্য চিরাচরিত কাঠ বা জৈব-বর্জ্য পদার্থের ওপর নির্ভরশীল৷ অর্থাৎ সংখ্যাগত হিসেবে সেটা দাঁড়ায় প্রায় ৮৪ কোটি টাকা৷ সৌর শক্তির মতো স্বচ্ছ দূষণমুক্ত বিদ্যুৎ কাঠ বা জৈব-বর্জ্য পদার্থের ওপর নির্ভরতা অনেক কমিয়ে আনতে পারে৷ জাতিসংঘের জলবায়ু সংস্থার হিসেব বলছে, স্বয়ং শিক্ষণ প্রয়োগ নামের এই এনজিও দুই লাখ পরিবারকে রান্নার জন্য সৌর স্টোভ সরবরাহ করায় দৈনিক ১০০ টন জ্বালানি কাঠের সাশ্রয় হয়৷ মহারাষ্ট্র সরকার সৌর শক্তির নিজস্ব গ্রিড থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দিতে শুরু করেছে৷ দূষণমুক্ত সৌর শক্তি যদি গোটা ভারতে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে স্বচ্ছ বিদ্যুতে ভারত স্বয়ম্ভর হয়ে উঠতে পারে৷

এর আগে ‘চিন্তন' নামে দিল্লির এক এনজিও জাতিসংঘের জলবায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ পুরস্কার পেয়েছিল৷ ই-ওয়েস্ট বিজ্ঞানসম্মতভাবে নষ্ট করার উপায় বের করার কারণে ২০১৫ সালে পুরস্কারটি পেয়েছিল তারা৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়