‌পশ্চিমবঙ্গে এখন চিকিৎসক পেটানোই দাওয়াই!‌

রোগীমৃত্যুর জেরে সম্প্রতি কলকাতার উপকণ্ঠের এক হাসপাতালে ভাঙচুর চালায় রোগীর বাড়ির লোকজন৷ পশ্চিমবঙ্গে গত ৫ মাসে এহেন ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৫০টি! এমন পরিস্থিতির জন্য রাজ্য সরকারের করা সাম্প্রতিক এক আইনকেই দায়ী করছেন চিকিৎসকরা৷

কলকাতার এক নামি এবং দামি বেসরকারি হাসপাতালে রোগীমৃত্যু এবং বিপুল অঙ্কের চিকিৎসার খরচ নিয়ে সারা রাজ্য জুড়েই যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তারপর পরিস্থিতির হাল ধরতে আসরে নামেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি৷ শহরের বিভিন্ন বড় বেসরকারি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্তাদের তিনি বৈঠকে ডাকেন এবং সেখানে চিকিৎসার ক্রমশ বেড়ে চলা খরচ এবং তা সত্ত্বেও চিকিৎসায় গাফিলতির প্রসঙ্গ টেনে মৃদু থেকে কড়া ধমক দেন৷ তবে তার আগেই পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের হস্তক্ষেপে ওই রোগীমৃত্যুর ঘটনায় বিলের টাকা মকুব, থানা-পুলিশ, তদন্ত, মামলা, ইত্যাদি ঘটে৷ মুখ্যমন্ত্রীর তলবি বৈঠকের পরেই রাজ্য সরকার একটি নতুন ক্লিনিকাল এস্টাবলিশমেন্ট অ্যাক্ট বিধানসভায় পাস করে, যে আইনে চিকিৎসায় গাফিলতি এবং তার ফলে রোগীমৃত্যুর ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান দেওয়া হয়৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

কিন্তু রাজ্যের চিকিৎসকরা বলছেন, স্বাস্থ্য পরিষেবার হাল ফেরাতে তড়িঘড়ি নিয়ে আসা ওই আইনে হিতে বিপরীত হয়েছে৷ সাধারণভাবে লোকের মনে একটা ধারণা হয়েছে যে, সরকারি হাসপাতালের নিখরচায় বা কম পয়সায় চিকিৎসা করানোর সুযোগ এবার কর্পোরেট হাসপাতালেও পাওয়া যাবে৷ রোগ নিরাময় না হলে, বা রোগীর মৃত্যু হলে সহজেই সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে, এমনকি, ক্ষেত্রবিশেষে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে শাস্তি দেওয়া যাবে ‘‌দোষী'‌ চিকিৎসক এবং হাসপাতালকে৷ ফলে কোনো রোগীর মৃত্যু ঘটলে তাঁর আত্মীয়-বন্ধুদের বিক্ষোভ, হাঙ্গামার যে প্রবণতা বরাবরই ছিল এক শ্রেণির লোকের মধ্যে, তা এবার মহামারীর ব্যাপকতায় ছড়িয়ে পড়ছে৷

অডিও শুনুন 03:16
এখন লাইভ
03:16 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 13.09.2017

‘সবার একটা ধারণা হয়েছে যে, ডাক্তারদের পেটালে, হাসপাতাল ভাংচুর...

তারই নমুনা দেখা গেল সম্প্রতি, দক্ষিণ কলকাতার উপকণ্ঠে জোকায় কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের অধীন একটি ইএসআই হাসপাতালে৷ এক রোগীর মৃত্যুর পর তাঁর বাড়ির লোকজনেরা হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, অর্থাৎ আইসিসিইউতে ঢুকে তাণ্ডব চালায়৷ ভেঙে দেয় ভেন্টিলেটর মেশিন ও অন্যান্য আরও অত্যাবশ্যক যন্ত্রসহ জরুরি চিকিৎসার কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জাম৷ আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অন্য রোগীদেরও বিছানা থেকে ঠেলে ফেলে দিয়ে তাঁদেরও নির্মমভাবে মারধর করে স্বজনমৃত্যুর শোক পালন করল তারা!‌ এবং এই ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও প্রশাসনের তরফ থেকে এমন কোনও সক্রিয়তা দেখা গেল না, যাতে দোষীরা শাস্তি পায়৷

স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. জয়াশিস চক্রবর্তি এই ঘটনার পর তাঁর ফেসবুক পোস্টে রাজ্যের চিকিৎসকদের একটি বক্তব্য শেয়ার করলেন, যাতে ব্যঙ্গ করে সরকারকে ‘‌অভিনন্দন'‌ জানিয়ে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য পরিষেবার হাল ফেরাতে সরকারের তৈরি ‘‌টাস্ক ফোর্স'‌ এবং তার মদতপুষ্ট গুণ্ডারা গত ৫ মাসে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মারধরের ৫০টি ঘটনা ঘটিয়েছে৷ ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক বিরাট কোহলির থেকেও দ্রুত এই অর্ধশত রানের জন্য সরকারকে অভিনন্দন!‌  

রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালেও কর্তব্যরত চিকিৎসকরা এখন কী ভীষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তার আরও একটি নমুনা উত্তর শহরতলীর সাগর দত্ত হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তারদের এই ভিডিওবার্তা, যা তাঁরা পোস্ট করেছেন ফেসবুকে৷

ডা. জয়াশিস চক্রবর্তী ডয়চে ভেলেকে জানালেন, চিকিৎসক হিসেবে যে কোনও রোগীর মৃত্যুই তাঁদের কাছে অত্যন্ত দুঃখজনক৷ এবং নিছকই ব্যবসা করতে নামা হাসপাতালের গাফিলতির বিরুদ্ধেও প্রশাসনের কঠোর হওয়ার দরকার আছে৷ কিন্তু তার জন্যে অভিযোগ জানানোর নির্দিষ্ট জায়গা আছে৷ সেখানে অভিযুক্ত চিকিৎসক দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর অবশ্যই শাস্তি পাওয়া উচিত৷ কিন্তু তার বদলে এক শ্রেণির গুন্ডা যেভাবে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে, হাসপাতালে ভাঙচুর করছে, তা কোনও মতেই মেনে নেওয়া যায় না৷ যে হাসপাতালে অমন যথেচ্ছ ভাঙচুর করা হলো, তার আইসিসিইউর যে বিপুল ক্ষতি হলো, তার দরুণ এখন কারা ভুগবেন?‌ সাধারণ মানুষ ছাড়া কেউ নয়!‌ ডা. চক্রবর্তীর মূল আপত্তি, যেভাবে লোকের একটা ধারণা হয়েছে যে, ডাক্তারদের পেটানোই যায়, হাসপাতাল ভাঙচুর করাই যায়, তার জন্য কোনো শাস্তি পেতে হয় না — এই বিপজ্জনক মানসিকতা নিয়ে৷ এক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের একাংশের ভূমিকারও সমালোচনা করেছেন তিনি, যেখানে রোগীমৃত্যু বা চিকিৎসার গাফিলতির অভিযোগের কথাই ফলাও করে বলা হয়, কিন্তু তার পর যে তাণ্ডব চলে, যেভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো, তা আর জনগণের সামনে তুলে ধরা হয় না৷

প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান, লিখুন নীচের ঘরে৷

স্বাস্থ্য

মাত্র দু’টাকায় চিকিৎসা

দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষরা চিকিৎসার জন্য মূলত সরকারি হাসপাতালের ওপরই নির্ভরশীল৷ হাসপাতালের বহির্বিভাগে মাত্র দু’টাকার বিনিময়ে চিকিৎসার পাশাপাশি কম খরচে পেসমেকার স্থাপন, অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, আল্ট্রাসাউন্ড বা ইসিজির মতো পরিষেবাও পাওয়া যায়৷

স্বাস্থ্য

চেতনা বাড়াতে টিভি

প্রসূতির দেখাশোনা বা নবজাতকের প্রতিপালনের নিয়ম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হাসপাতালের সরকারি হাসপাতালের ন্যাটাল ওয়ার্ডে এখন হাজির টিভি৷ তাতে মেগা সিরিয়ালের বদলে সচেতনামূলক অনুষ্ঠান দেখানো হয়!

স্বাস্থ্য

সর্বক্ষণের চিকিৎসক

রাতবিরেতে অসুখ-বিসুখে সরকারি হাসপাতালই ভরসা৷ এখানে আপৎকালীন পরিষেবা ছাড়াও ২৪x৭ চিকিৎসক পাওয়া যায়৷ সারা পশ্চিমবঙ্গেই বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় এই ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতাল অনেকটা এগিয়ে৷

স্বাস্থ্য

উন্নতমানের পরিষেবা

সম্প্রতি সরকারি হাসপাতালে সংকটাপন্ন রোগী ও শিশুদের বিশেষ পরিচর্যার জন্য এসএনসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ চালু করা হয়েছে, যা এতদিন ছিল কেবল বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিংহোমেই৷ উপকৃত হয়েছে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার৷

স্বাস্থ্য

ন্যায্য মূল্যে ওষুধ

ব্র্যান্ডের থাবা থেকে ওষুধ মুক্তি পেতেই মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে৷ চিকিৎসক জেনেরিক নামে ওষুধ লেখার ফলে ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকানে মানুষের যাতায়াত বেড়েছে৷ এ সব দোকানে ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় মেলে৷

স্বাস্থ্য

নাগালে আধুনিক পরিষেবা

সরকারি হাসপাতালে ডিজিটাল এক্স-রে, ইউএসজি, সিটি স্ক্যানের মতো আধুনিক পরিষেবা পাওয়া যায়৷ তবে রোগীর চাপে অনেক সময়েই এসব যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন বিকল হয়ে পড়ে থাকে৷

স্বাস্থ্য

নানারকম প্রকল্প

পশ্চিমবঙ্গে সরকারি স্তরে স্বাস্থ্য পরিষেবায় নানা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে৷ জননী শিশু সুরক্ষার মতো প্রকল্প এখন বেশ জনপ্রিয়৷ এর সাহায্যে মায়ের প্রসবকালীন মৃত্যুর হারও কমিয়ে ফেলা গেছে৷

স্বাস্থ্য

সরকারি হাসপাতাল প্রাঙ্গণ

বেশিরভাগ সময়েই তিল ধারণের জায়গা থাকে না৷ তবুও পরিষেবার খোঁজে দৈনিক কত না মানুষের জমায়েত হয় সরকারি হাসপাতালে! তৃতীয় বিশ্বের জনবহুল দেশে এটাই দস্তুর৷

স্বাস্থ্য

অতিথি দেবঃ ভব

সরকারি হাসপাতাল আগের থেকে পরিচ্ছন্ন হয়েছে, সুলভে মিলছে পরিষেবা: কিন্তু কিছু ছবি এখনও বদলায়নি: যেমন বিভিন্ন ওয়ার্ডে চারপেয়েদের অবাধ বিচরণ৷

স্বাস্থ্য

স্বাস্থ্য যখন পণ্য

যাঁদের হাতে টাকা রয়েছে, তাঁরা সরকারি হাসপাতালে ভিড় এড়াতে বেসরকারি পরিষেবার সুযোগ নেন৷ যদিও কলকাতার এমন বেসরকারি ক্লিনিকেও এখন ভালো ভিড় নজরে পড়ে৷

স্বাস্থ্য

যেখানে বিশ্বাস

অ্যালোপ্যাথির পাশাপাশি এ রাজ্যে হৈ হৈ করে হোমিওপ্যাথি বা আয়ুর্বেদ চিকিৎসাও চলছে৷ এর খরচ কম, তাছাড়া ব্যয়সাপেক্ষ পরীক্ষার ঝামেলা থাকে না বলে অনেকেই এ সবের উপর আস্থা রাখেন৷

স্বাস্থ্য

নার্সিংহোম দিকে দিকে

এখন পশ্চিমবঙ্গে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল চালু হয়েছে৷ তবুও নার্সিংহোমের রমরমা কিন্তু কমেনি৷ সার্জারি, ডায়ালিসিস ইত্যাদির জন্য মানুষ এখনও এদের ওপর নির্ভরশীল৷

স্বাস্থ্য

বহুরূপে সম্মুখে

কলকাতা সহ সর্বত্রই রক্তসহ নানা পরীক্ষাগার বা প্যাথোলজি ল্যাব গজিয়ে উঠেছে৷ গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও দিব্যি তারা লাভজনক ব্যবসা করছে৷ উল্টোদিকে গ্রামীণ এলাকায় অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান নেই৷