পানির ভয় দূর করতে সাঁতার প্রশিক্ষণ

গরমে শীতল জলের ছোঁয়া কে না চায়! কিন্তু বাঁশের পুলে সাঁতারের এ আয়োজন শুধু গ্রীষ্মকে বোকা বানাতে নয়৷ বাংলাদেশে অসংখ্য খাল-বিল, নদী-নালার পানিতে ডুবে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন শিশুর মৃত্যু হয়৷ ভবিষ্যতে এমনটা রোধ করতেই এই আয়োজন৷

১১ বছরের এই মেয়ে একসময় পানি দেখলেই ভয় পেত৷ এখন সে বাঁশ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী এক সুইমিং পুলে সাঁতার শিখছে৷ সে যখন এক পাশ থেকে সাঁতরে পুলের অন্যপাশে যেতে পারলো, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য শিশুদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে সে উচ্ছ্বাস৷

বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার অনেক বেশি৷ ২০০১ সালের এক সরকারি প্রতিবেদন বলছে, প্রতি বছর পানিতে ডুবে ১৮ হাজার শিশু মারা যায়৷ এদের সবাই ১৮ বছরের কম বয়সি এবং এর মধ্যে ৪৩ শতাংশের বয়সই পাঁচ বছরের কম৷

গোসলের পোশাকে যত ফ্যাশন

গোসলের পোশাকের ধারা

অষ্টাদশ শতাব্দীতে নারী ও পুরুষদের জন্য গোসলের পৃথক পোশাক প্রথম দেখা যায়৷ পাতলা উল এবং কটনের কাপড়ে তৈরি পোশাক পরে মানুষ গোসল করতো৷ সেই পোশাকের পানি শোষণের ক্ষমতা ছিল অনেক৷ ওই সময় নারী ও পুরুষের পোশাকে যেমন ভিন্নতা ছিল, তেমনি গোসলের জন্য জায়গাও আলাদা ছিল৷

গোসলের পোশাকে যত ফ্যাশন

অগ্রগতি

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে পর্যটনের প্রসার শুরু হলে সাগরে সাঁতার ট্রিপ শুরু হয়৷ মৌসুমের শুরুতে সাগর থাকতো উন্মুক্ত৷ এ সময় সাঁতারের পোশাক কিছুটা টানটান হতে শুরু করে৷ ইলাস্টিকের পাতলা কাপড়ের প্রচলন শুরু হয়৷ রোদ থেকে বাঁচতে এখনকার হ্যাটের মতো ক্যাপের ব্যবহার শুরু হয়৷

গোসলের পোশাকে যত ফ্যাশন

আধুনিকতা

বিংশ শতাব্দীতে এসে শেষ পর্যন্ত আধুনিকতায় প্রবেশ করে সাঁতারের পোশাক৷ ছোট বেল্ট, সোনালি বোতাম এই ধারার পোশাকে নারীসুলভ ভাব নিয়ে আসে৷ এ সময় সাঁতারের পোশাক ছোট হয়ে যায়৷ তখন প্লাস সাইজের পোশাক পাওয়া যেত না৷

গোসলের পোশাকে যত ফ্যাশন

বিকিনির আত্মপ্রকাশ

কেবল চারটা ছোট ত্রিভুজে নতুন এক পোশাক আসে, যা বিস্ময়ের সাথে প্রত্যক্ষ করে বিশ্ব৷ এর নাম বিকিনি৷ ১৯৪৬ সালের ৫ জুলাই নৃত্যশিল্পী মিশেলিন বার্নারডিনি এই পোশাকে প্যারিসিয়ান পুলে ক্যামেরার সামনে আসেন৷ লুই রেয়ার্ড এর ডিজাইন করেন৷ তিনিও হয়ত জানতেন না যে, এটা নারীদের গোসলের পোশাকের স্টাইল চিরদিনের জন্য বদলে দেবে৷

গোসলের পোশাকে যত ফ্যাশন

একদিনে বদলে গেল দুনিয়া

অলিম্পিক সাঁতারু এস্থার উইলিয়ামস একটা ওয়াটার শো-তে অংশ নিতে গিয়ে হলিউডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে অলিম্পিকে অংশ নিতে পারেননি৷ এটা তাঁকে আয়ের একটা পথ করে দেয়৷ ওই সময় তিনি ‘নেপচুন’স ডটার’ নামে একটা সিনেমায় অভিনয় করেন, যা ১৯৪৯ সালে মুক্তি পায়৷ এতে তিনি আকর্ষণীয় গোসল-সৌন্দর্য্যের জন্য তারকাখ্যাতি পান৷ তা পরে তাকে হলিউডের অন্যতম ধনী নারীতে পরিণত করে৷

গোসলের পোশাকে যত ফ্যাশন

সাঁতারের পোশাকে সুন্দরী প্রতিযোগিতা

১৯৫০-এর দশকে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বেশ মডেস্ট একটা ভাব ছিল৷ হাই হিল জুতা পরা এই প্রতিযোগীদের সাঁতারের পোশাকে আসতে উৎসাহ দেয়া হতো৷ মিস জার্মানি পেট্রা শুরমান (বাম থেকে সপ্তম) ১৯৫৬ সালে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন৷

গোসলের পোশাকে যত ফ্যাশন

জ্যামিতিক প্রভাব

পপ আর্ট দৃশ্যপটে আসার পর জ্যামিতিক ধরণ ফ্যাশন জগতে প্রবেশ করতে শুরু করে৷ এটা ১৯৬০’র দশকের অন্যতম প্রধান স্টাইলে পরিণত হয়৷

গোসলের পোশাকে যত ফ্যাশন

অগ্রাধিকারে মাথা

১৯৬০’র দশকে নারীদের সাঁতারের পোশাকে অগ্রাধিকারে থাকতো মাথা-ঢাকা৷ যেমনটা করেছিলেন ইটালিয়ান অভিনেত্রী জিনা লোলোব্রিজিডা৷

গোসলের পোশাকে যত ফ্যাশন

সাঁতার পোশাক নিয়ে টিভি সিরিজ

আমেরিকান টিভি সিরিজ ‘বে-ওয়াচ’ লেখা হয়েছে সাঁতার পোশাকের ইতিহাস নিয়ে৷ এই সিরিজের তরুণীদের পরা পোশাক ৯০ দশকের প্রথমদিকে রাজত্ব করেছে৷

গোসলের পোশাকে যত ফ্যাশন

দ্য বন্ড গার্লস

১৯৬২ সালে যখন উরসুলা অ্যান্ড্রেস সাগর থেকে ওঠেন, তখন তাঁর গায়ে ছিল দুটো আঁটোসাটো পোশাক৷ ওই সময় সিনেমামুখী ইহুদিরা একে বর্জন করেছিল৷ ৪০ বছর পর হালে বেরি একই পোশাক পরে পানি থেকে বের হয়ে আসেন৷

গোসলের পোশাকে যত ফ্যাশন

আদর্শ সীমারেখার সন্ধানে

সাঁতারের পোশাক ডিজাইনারদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কত বেশি উপকরণ দিলে সেটা অতিরিক্ত হয়ে যাবে? বিকিনি এবং সাঁতার পোশাকের পার্থক্য সুনির্দিষ্ট করে বলাও কঠিন৷ ২০১১ সালে মিয়ামিতে ফ্যাশন সপ্তাহে এই পোশাক উপস্থাপন করা হয়৷

গোসলের পোশাকে যত ফ্যাশন

বুরকিনি কেবল মুসলিমদের জন্য নয়

এই ছবিটা অস্ট্রেলিয়ার সৈকত থেকে নেয়া হয়েছে৷ অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে অনেক মানুষই গোসলের সময় রোদে পুড়তে চান না৷ সে কারণে মুসলিম এবং ভিন্নধর্মীরা সূর্য রশ্মি থেকে তাদের ত্বক বাঁচিয়ে চলেন৷ অন্যদিকে ফরাসি রিভিয়েরা এবং জার্মানির অনেক জায়গাতেও বুরকিনির অনুমোদন নেই৷ বুরকিনিতে নিষেধাজ্ঞা খুবই বিতর্কিত৷

রাজধানী ঢাকার অদূরে গাজীপুরের শ্রীপুর৷ গৃহবধূ সামেলা বেগম নিজের দুই ছেলে এবং ভাতিজাকে হারিয়েছেন নদীতে৷ তারা কেউই সাঁতার জানতো না৷ সামেলা কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘‘সব মা-বোনদের আমি বলবো, সাবধান হন৷ দয়া করে আপনাদের সন্তানকে সাঁতার শেখান৷ আপনাদের যেন আমার মতো কোল খালি না হয়৷’’

সামেলার মতো যাতে আর কোনো মাকে এমন অসহায় হতে না হয়, সেজন্য বাংলাদেশের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে মিলে সাঁতার শেখানোর কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এক ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা৷ শ্রীপুর গ্রামের শিশুদের মন থেকে দূর করা হচ্ছে জলভীতি৷

‘‘আমরা মনে করি শিশুমৃত্যুর হার কমাতে সাঁতার একটা ওষুধের মতো কাজ করতে পারে’’, বলছিলেন ঢাকা-ভিত্তিক সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চের প্রধান গবেষক আমিনুর রহমান৷ এই সংস্থা শ্রীপুর ছাড়াও দেশের অন্যান্য গ্রাম এমনকি ঢাকাতেও সাঁতার প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে৷

শ্রীপুর গ্রামের নামেই ব্রিটেনের কেন্টের এই দাতব্য সংস্থার নাম দ্য শ্রীপুর ভিলেজ৷ ১৪২ জন মা এবং তাদের ২৮০ শিশুকে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নির্বাচন করা হয়েছে৷ মায়েদের ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা বিষয়ে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি নানা বিষয়ে তাদের সন্তানদের দেয়া হচ্ছে সাঁতার প্রশিক্ষণও৷ এরা নিজেদের এলাকায় ফিরে গিয়ে অন্য মা ও শিশুদের নিজেরাই প্রশিক্ষণ দেবেন, এটাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য৷

বরফজলে সাঁতার রাশিয়ায় অনেক দিনের প্রথা

ঠান্ডার মজা

মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রাও সাইবেরিয়ার বরফ সাঁতারুদের ঠান্ডা করতে পারে না৷ বরফের উপর দিয়ে ছুটে তারা বরফ সাঁতারের মরশুমের সূচনা উদযাপন করেন৷

বরফজলে সাঁতার রাশিয়ায় অনেক দিনের প্রথা

ছোটদের সাহস

দু’বছরের আলিসা আর তার সাত বছর বয়সের বোন লিজাকে ধীরে ধীরে বরফজলে স্নান করায় অভ্যস্ত হতে হবে৷ সাম্প্রতিক কয়েক বছরে রাজধানী মস্কোয় বরফ সাঁতারুদের সংখ্যা বেড়ে ৩০,০০০-এ দাঁড়িয়েছে৷

বরফজলে সাঁতার রাশিয়ায় অনেক দিনের প্রথা

বরফ ঠান্ডা জলে রিল্যাক্স করা!?!

নোভোসিবির্স্কের এই ভদ্রলোক যেন ঐ বরফ ঠান্ডা জলে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন৷ নয়ত ঐ জলে নামলে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে, অথবা নিউমোনিয়া হবে৷ কিন্তু অনুরাগীদের মতে বরফ সাঁতারে নাকি শরীর তাজা হয়৷

বরফজলে সাঁতার রাশিয়ায় অনেক দিনের প্রথা

সিন্ধুঘোটক

রুশ বরফ সাঁতারুরা নিজেদের বলেন ‘মর্ঝি’ বা সিন্ধুঘোটক৷ ‘সিন্ধুঘোটক ক্লাবের’ সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে একবার করে বরফ ঠান্ডা পানিতে ঝাঁপ খান – কোনোরকম ডাইভিং সুট কিংবা অন্য কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়া, শুধুমাত্র গ্রীষ্মের সুইমসুট পরে৷

বরফজলে সাঁতার রাশিয়ায় অনেক দিনের প্রথা

‘যেন হাজারটা সুচ ফুটছে’

নোভোসিবির্স্কে বরফ সাঁতারুরা একটি জলের ট্যাংকে নামছেন৷ এক মহিলার ভাষায়: ‘‘যেন একসঙ্গে এক হাজারটা সুচ ফুটল!’’

বরফজলে সাঁতার রাশিয়ায় অনেক দিনের প্রথা

খ্রিষ্টীয় এপিফানি পরব

রাশিয়ায় বরফ সাঁতারের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংস্করণটি হলো তথাকথিত বরফে ব্যাপটিজম: পুরু বরফে ক্রুশের আকারের গর্ত খোঁড়া হয়৷ রাশিয়ার সনাতনপন্থি খ্রিষ্টানরা এপিফানি পরব পালন করেন ১৯শে জানুয়ারি তারিখে৷ প্রথায় বলে, এদিন নাকি পানি পবিত্র হয়ে যায় ও সব পাপ ধুয়ে দিতে পারে৷

বরফজলে সাঁতার রাশিয়ায় অনেক দিনের প্রথা

সোভিয়েত আমলের পরের প্রথা

১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের আগে রাশিয়ার খুব কম মানুষই বরফে সাঁতার কাটতেন৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিন্তু বরফ সাঁতার খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে৷ প্রসঙ্গত, কমিউনিস্ট শাসনের অন্তের পর রাশিয়ায় ধর্মীয় অনুভূতিও জোরদার হয়েছে – যদিও সনাতনপন্থি গির্জা সরকারিভাবে বরফ সাঁতার অনুমোদন করেনি৷

বরফজলে সাঁতার রাশিয়ায় অনেক দিনের প্রথা

বিপজ্জনক সখ

অভিজ্ঞ ‘সিন্ধুঘোটক’ না হলে, বরফ সাঁতার সাধারণ মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে৷ পানিতে শরীরের তাপমাত্রা কমে বাতাসের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি তাড়াতাড়ি৷ কাজেই তিন মিনিটের বেশি সময় বরফ ঠান্ডা জলে কাটালে জ্ঞান হারানোর ভয় আছে৷

মায়েরা শ্রীপুর গ্রামে থাকেন প্রায় তিন বছর৷ এক ব্রিটিশ দাতব্য কর্মী ১৯৮০ সালে এই গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন৷ লক্ষ্য ছিল, দরিদ্র নারীদের সহায়তা করা৷ এই গ্রামে কংক্রিটের বাড়ি, খেলার জায়গা, ক্লিনিক এবং ১৮ একর (৮ হেক্টর) কৃষি জমি আছে৷

লন্ডন থেকে কাজ করতে আসা শিশু উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ সিলভেস্টার বলছেন, ‘‘এই শিশুদের আমরা পেশাদার সাঁতারু বানানোর চেষ্টা করছি না৷ শিশুরা যাতে নিজেদের রক্ষা করতে পারে সেজন্য তাদের যতটুকু দক্ষতা দরকার, আমরা তাই দিচ্ছি৷’’

শুরুতে ছোট বাচ্চাদের তিন ফুট গভীর এই সুইমিং পুলে আধা ঘণ্টা হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করতে দেয়া হয়৷ পাশেই একটি পুকুরে তুলনামূলক বড় বাচ্চাদের ভেসে থাকা এবং পানিতে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল শেখান আরেক প্রশিক্ষক৷

প্রশিক্ষক মুক্তা তরফদার বলছেন, ‘‘পুরোটাই আত্মবিশ্বাসের ব্যাপার৷ একসময় যারা জলে ভীষণ ভয় পেত, এখন তারা একেবারেই স্বাভাবিক৷’’

এডিকে­/ডিজি (এপি)

সংশ্লিষ্ট বিষয়

আমাদের অনুসরণ করুন